বলিষ্ঠ নেতৃত্বই পারে অনৈক্য দূর করতে

বলিষ্ঠ নেতৃত্বই পারে অনৈক্য দূর করতে

যে মাটির মসলিন বিশ্ববাণিজ্যে খ্যাতি পেয়েছিল, যে জনপদ সাহিত্য, জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীলতার সমৃদ্ধ ঐতিহ্য বহন করে, যে মানুষ ভাষার মর্যাদা ও স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছেন, যে দেশের সাত কোটি মানুষ স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়ে শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে দ্বিধাবোধ করেনি, যে জাতির তরুণ-তরুণীরা স্বৈরাচার উৎখাতে বুলেটের সম্মুখে বুক পেতে মৃত‍্যুকে আলিঙ্গন করতে কুণ্ঠাবোধ করেনি, আজ তাদের মধ্যে এত অবিশ্বাস, এক অনৈক্য কেন?

এই প্রশ্ন আত্মনিন্দার নয়; আত্মসমালোচনা ও পুনর্গঠনের। বাঙালির অস্তিত্ব বিলুপ্তির মুখে—এমন সিদ্ধান্তের যথেষ্ট ভিত্তি না থাকলেও নাগরিক সংহতি, নৈতিক সাহস ও প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থার ক্ষয় গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।

বিজ্ঞাপন

গৌরবোজ্জ্বল বাংলার সমৃদ্ধি এবং বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ইতিহাস পরস্পর সম্পর্কিত, কিন্তু অভিন্ন নয়। সব ক্ষেত্রে তৎকালীন পূর্ববঙ্গ বহু দেশের চেয়ে এগিয়ে ছিল, এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। তবে অতীতের ঐশ্বর্য সবার সমান কল্যাণ নিশ্চিত করেনি।

রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জগদীশচন্দ্র, শেরেবাংলা ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, জয়নুল আবেদিন, ফজলুর রহমান খান, ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও ফজলে হাসান আবেদের মতো ব্যক্তিত্ব একসময়ে বাঙালির সৃষ্টিশীল সম্ভাবনার এবং একতার সাক্ষ্য হয়ে থাকলেও, দেশ ও জাতির তুলনায় কারো কারো ব্যক্তি এবং গোষ্ঠী স্বার্থ, লোলুপতা ও অদূরদর্শিতার কারণে সে ঐক্য ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। ব্যক্তির অর্জনকে টেকসই জাতীয় অগ্রগতিতে রূপ দিতে প্রয়োজন স্বাধীন ও দক্ষ প্রতিষ্ঠান এবং সহযোগিতার সংস্কৃতি। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের আত্মত্যাগ আমাদের সেই দায়িত্বই স্মরণ করিয়ে দেয়।

জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি কী

আর্নেস্ট রেনাঁর ভাবনায় জাতির ভিত্তি সম্মিলিত প্রচেষ্টা, আত্মত্যাগ এবং একসঙ্গে ভবিষ্যৎ গড়ার ইচ্ছা। জন স্টুয়ার্ট মিল গুরুত্ব দিয়েছেন পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সহযোগিতার আকাঙ্ক্ষাকে। তাদের ভাবনা অনুসারে জাতীয় ঐক্য হলো মতভেদ বজায় রেখেও অভিন্ন কল্যাণে কাজ করার অঙ্গীকার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তার ভিত্তি হবে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, সমান নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক নিয়ম, যেখানে বাঙালিসহ সব জাতিগোষ্ঠী এবং সব ধর্মের নাগরিক থাকবে সমমর্যাদার অংশীদার।

কেন ঐক্য দুর্বল হয়

প্রথমত, ঔপনিবেশিক শোষণ, জমিদারি বৈষম্য ও দীর্ঘ পরাধীনতা রাষ্ট্রের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্বের ঐতিহাসিক পটভূমি তৈরি করেছে। কিন্তু স্বাধীনতার পরের ব্যর্থতার দায় শুধু অতীতের ওপর চাপানো যায় না।

দ্বিতীয়ত, ক্ষমতা হারানোকে সর্বস্ব হারানোর আশঙ্কা এবং ক্ষমতা পাওয়াকে সর্বময় নিয়ন্ত্রণের সুযোগ ভাবলে আপস ও সহাবস্থান দুর্বল হয়। দলীয়করণ, দুর্নীতি, বিচারহীনতা ও নির্বাচনি অবিশ্বাস তখন বিভাজনকে স্থায়ী করে।

তৃতীয়ত, কর্মসংস্থানের সংকট, অসম সুযোগ, শিক্ষায় বৈষম্য এবং মর্যাদাহানি মানুষের ক্ষোভ বাড়ায়।

বাইরের প্রভাব

রুয়ান্ডায় জাতিগত বিদ্বেষ ১৯৯৪ সালের গণহত্যার পথ তৈরি করে। যুগোস্লাভিয়ায় অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে নেতাদের উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রচার রাষ্ট্রভাঙন ও যুদ্ধকে ত্বরান্বিত করে। শিক্ষা হলো—বৈচিত্র্যের চেয়ে বিপজ্জনক হলো বৈষম্য ও রাজনৈতিকভাবে পরিচালিত ঘৃণা।

বাংলাদেশেও দেশীয় স্বার্থগোষ্ঠী বিভাজন থেকে সুবিধা নিতে পারে; বিদেশি পক্ষ অস্বচ্ছ অর্থায়ন, অপতথ্য বা অর্থনৈতিক নির্ভরতা কাজে লাগাতে পারে। প্রমাণ সাপেক্ষে এদের ‘দেশের শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের মূলোৎপাটন করা অপরিহার্য।

প্রতিকার

দেশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সর্বনিম্ন স্তর পর্যন্ত সততা, নিঃস্বার্থতা ও হঠকারিতা বর্জনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে সব দায়িত্ব স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পাদন করা অত্যাবশ্যক।

১. অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ : রাজনৈতিক দল, নারী, তরুণ, শ্রমিক-কৃষক, পেশাজীবী ও সংখ্যালঘু প্রতিনিধিদের নিয়ে অহিংস রাজনীতি, নাগরিক নিরাপত্তা ও সব স্তরে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনি নিয়মের ন্যূনতম সনদ তৈরি করতে হবে।

২. সৎ নেতৃত্বের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি : দলের অভ্যন্তরে শিক্ষিত, দক্ষ ও সৎ ব্যক্তিদের নেতৃত্বের বিভিন্ন স্তরে নিয়োগ ও নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব দিতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে প্রার্থী বাছাইয়ে স্বচ্ছতা, সম্পদ ও অর্থায়নের হিসাব প্রকাশ এবং যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

৩. শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করা : প্রাথমিক স্তর থেকে সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত সব শিক্ষার্থীকে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও নিরবচ্ছিন্ন উন্নয়নের লক্ষ্যে জাতির ঐক্যবদ্ধ থাকার অপরিহার্যতা সম্পর্কে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করতে হবে।

৪. ন্যায়বিচার ও আস্থা : স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, নিরপেক্ষ প্রশাসন এবং ব্যক্তিগত দায়ভিত্তিক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ঐক্যের নামে দায়মুক্তি দেওয়া চলবে না।

৫. সহযোগিতার বাস্তব ক্ষেত্র : স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবিলা, বিদ্যালয় উন্নয়ন ও জনসেবায় যৌথ উদ্যোগ গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষায় যুক্তিবোধ, সহমর্মিতা ও তথ্য যাচাইয়ের চর্চা বাড়াতে হবে।

৬. পরিমাপযোগ্য জবাবদিহি : প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, বাজেট ও সময়সীমা নির্ধারণ করে ত্রৈমাসিক অগ্রগতির প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে।

‘একতাই বল’ একটি চিরন্তন সত্য। ব্যক্তিগত স্বার্থ ভুলে দেশ ও জনগণের কল্যাণ এবং অগ্রগতির জন্য সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। আমাদের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধ এবং গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারের উৎখাত তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বহন করে। তবে বাংলাদেশের মতো একটি দুর্যোগপীড়িত, সমস্যাজর্জরিত এবং চারপাশ থেকে শকুনের শ্যেনদৃষ্টির শিকার ক্ষুদ্র দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে রাখা একটি দুরূহ কাজ হলেও অসম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে সফলতা অর্জনের জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে সৎ, দেশপ্রেমিক, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব অপরিহার্য।

লেখক : বীর প্রতীক, নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতি বিশ্লেষক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন