একটি জীবন, কিছু গান, কিছু স্মৃতি

কামরুন্নেসা হাসান

একটি জীবন, কিছু গান, কিছু স্মৃতি

‘এ খাঁচা ভাঙবো আমি কেমন করে?’ এই পঙক্তিটি শুধু একটি গানের লাইন নয়, এ যেন খান আতাউর রহমানের জীবনের অন্তর্গত ব্যথা, তার শিল্পীসত্তার এক বেদনাময় উচ্চারণ। এই গানটি তিনি গেয়েছিলেন ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রে, যে চলচ্চিত্রে তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন, সুর করেছেন এবং একই সঙ্গে জাতিকে একটি রাজনৈতিক চেতনার ভাষা উপহার দিয়েছেন। গানটি এক ধরনের মেটাফর হয়ে উঠেছিল—দমন-পীড়নের, শৃঙ্খল ছিন্ন করার, স্বাধীনতার অভিপ্রায়ের।

বিজ্ঞাপন

১৯৬৯ সালের উত্তাল সময়ে, যখন ‘জীবন থেকে নেয়া’ নির্মিত হয়, তখনকার রাজনৈতিক অবস্থা ছিল চরম দমনমূলক। এই চলচ্চিত্র ছিল এক অনন্য প্রতিবাদ আর এই গানটি তার হৃদয়। খান আতা ভাই এই গানের মধ্য দিয়ে নিপীড়নের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী আত্মার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি শুধু গানের মধ্যে সুর দেননি—তার কণ্ঠে যেন ক্ষোভ, বেদনা, আশাবাদ ও আহ্বান একসঙ্গে গাঁথা ছিল। তার গাওয়া এই গান অনেকের চোখে জল এনে দিয়েছিল, যেমন আমি নিজেও প্রতিবার শুনলে আবেগে ভেসে যাই।

বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে খান আতাউর রহমানের নাম এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো। তিনি ছিলেন একাধারে কণ্ঠশিল্পী, সুরকার, সংগীত পরিচালক, নাট্যকার, উপস্থাপক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা। তার সৃষ্টিশীলতার পরিধি এতটাই বিস্তৃত ছিল যে, তিনি বাংলা সাংস্কৃতিক ভুবনে এক অনন্য স্থান অধিকার করেছিলেন।

১৯২৮ সালের ১১ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জের সিংগাইরে জন্মগ্রহণ করেন খান আতাউর রহমান। তার পৈতৃক নিবাস থেকে ভারত ভাগের পর বোম্বাই গিয়েছিলেন এবং পরে লন্ডন চলে যান। তৎকালীন পাকিস্তানে তার সাংস্কৃতিক জীবনের সূচনা হয়।

১৯৫০-এর দশকে তিনি পাকিস্তান বেতারে কাজ শুরু করেন এবং সংগীত পরিচালক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ নামে, যা পাকিস্তানের প্রথম আর্ট ফিল্ম হিসেবে বিবেচিত হয়। এই চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসিত হয় এবং কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়।

স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং বাংলা চলচ্চিত্রের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার নির্মিত ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ (১৯৮০) চলচ্চিত্রটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক মাইলফলক। এই চলচ্চিত্রে তিনি নবাব সিরাজউদ্দৌলার ভূমিকায় অভিনয় করেন এবং চলচ্চিত্রটির সংগীত পরিচালনাও করেন। এই চলচ্চিত্রের গানগুলো আজও মানুষের হৃদয়ে গেঁথে আছে।

নবাব সিরাজউদ্দৌলা যতবার দেখি, ততবারই আমি মুগ্ধ হই এবং আবেগে আপ্লুত হই। কান্না আসে। বাংলার ইতিহাসকে এই ছবিটি এক অমূল্য দলিলের মতো সংরক্ষণ করে রেখেছে।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের একটি বিশেষ বর্ণালি অনুষ্ঠানে চলচ্চিত্রের গান নিয়ে একটি পর্ব নির্মিত হয়েছিল। ৫০ থেকে ৬০-৭০ দশকের কিছু দুর্লভ গান ছিল সেই আয়োজনে। সেই অনুষ্ঠানেই আমি আতা ভাইকে অনুরোধ করেছিলাম ‘শ্যামলবরণ মেয়েটি’ গানটি গাইবার জন্য। বলেছিলেন, ‘পুরোনো অডিওতে হবে না, আমি নতুন করে তোমাদের স্টুডিওতেই করব।’ আমরা আনন্দিত হলাম। তিন নম্বর স্টুডিওতে রেকর্ডিং নির্ধারিত হলো। নির্ধারিত সময়েই এলেন আতা ভাই। গান গাইলেন আর শেষে দ্রুত স্টুডিও ত্যাগ করলেন। আমি ধন্যবাদ দিতে ছুটে নিচে নেমে এলাম, দেখলাম উনি চোখ মুছতে মুছতে স্টুডিও থেকে বেরিয়ে গেছেন। পরে শুনি, গান গাওয়ার সময় স্মৃতিতে আপ্লুত হয়ে চোখে জল এসে গিয়েছিল। নিজেরই লেখা ও সুর করা গানে নিজ কণ্ঠ দিতে গিয়ে হয়তো কিছু ব্যথার স্মৃতি মনে পড়ে গিয়েছিল।

আতা ভাই শুধু শিল্পী ছিলেন না, একজন সংবেদনশীল মানুষও ছিলেন। জীবনের শেষদিকে তাকে আর্থিক সংকটে পড়তে হয়েছিল, যেমনটা আমাদের বহু শিল্পীর ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে।

একবার ‘গানের ভুবন’ নামের একটি সংগীত অনুষ্ঠানে উপস্থাপনার দায়িত্ব দিলাম তাকে। তিনজন শিল্পী, প্রত্যেকে তিনটি করে গান পরিবেশন করবেন। পুরোনো দিনের গান, শিল্পীর পরিচয় এবং গানের ইতিহাস নিয়ে তিনি চমৎকারভাবে উপস্থাপনা করতেন। সংগীত পরিচালনা এবং উপস্থাপনায় তিনি ছিলেন একাই এক শ। পারিশ্রমিকও ভালো ছিল।

আমাদের আরেকটি অপূর্ব পরিকল্পনা ছিল, যেখানে তিনজন সুরকার গান পরিবেশন করবেন : খন্দকার নূরুল আলম, সত্য সাহা এবং আতা ভাই নিজে। প্রত্যেকে নিজ নিজ সৃষ্টি পরিবেশন করবেন। এখন তারা কেউ আর আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু তাদের সংগীতে অবদান আজও শ্রদ্ধায় স্মরণ করি।

১৯৬৪ সালে টেলিভিশন প্রতিষ্ঠার সময় যেসব শিশুশিল্পী অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাদের নিয়ে ২৫ বছর পূর্তিতে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান করেছিলাম—‘সেই কলি’। তখনকার শিশুশিল্পীরা আজ দেশের সংগীতজগতে প্রতিষ্ঠিত নাম : নিলুফার ইয়াসমিন, কাদেরী কিবরিয়া, নাশিদ কামাল, সাদিয়া আফরিন মল্লিক, শিমুল ইউসুফ প্রমুখ। আতা ভাই সেদিন তাদের সঙ্গে গল্প করলেন, স্মৃতিচারণ করলেন, গান গাইলেন। উপস্থাপনায়ও ছিলেন অসাধারণ। কোথায় তার পাণ্ডিত্য ছিল না!

বেতারে থাকাকালে স্বাধীনতা দিবসে একটি গীতিনাট্য লেখার জন্য তাকে অনুরোধ করেছিলাম, যেখানে ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত যাত্রাপথ তুলে ধরা হয়। সেই নাট্যে শিশুদের কণ্ঠে ‘ক-এ কলা খ-তে খাই, এত বেশি খেতে নাই’ গানটি ছিল, যা পরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মাহমুদুন্নবী, নিলুফার ইয়াসমিন, সাবিনা ইয়াসমিন, আবিদা সুলতানা—সবার কণ্ঠে তা ধারণ করা হয়েছিল। পরে বিটিভিতে তা নৃত্যনাট্য রূপে প্রচার করা হয়েছিল। নৃত্য পরিচালনায় ছিলেন প্রয়াত এক কুশলী পরিচালক। অনুষ্ঠানটি ছিল মানসম্পন্ন এবং হৃদয়ছোঁয়া।

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আতা ভাই যদি শুধু সংগীতে মনোযোগ দিতেন, তাহলে উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক হয়ে উঠতে পারতেন। আবার অভিনয়ে তিনি যেমন দক্ষ ছিলেন, তেমনি নাট্য রচনাতেও সমান পটু। জীবন থেকে নেওয়া ছবিটি তার এক অনবদ্য সৃষ্টি, যার পরিচালক ছিলেন জহির রায়হান। ১৯৬৯ সালে নির্মিত ছবিটি আজও প্রাসঙ্গিক।

১৯৭১ সালে জহির রায়হান যখন তার ভাই সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সারের খোঁজে যান, তখন তিনি নিজেই নিখোঁজ হন। পরে জানা যায় তিনি শহীদ হয়েছেন। খান আতা ভাইয়ের সঙ্গে তার সৃজনশীল বন্ধন ছিল দৃঢ়। আমার বিশ্বাস, যদি তারা আরো কিছুদিন একত্রে কাজ করতেন, তবে বিশ্বমানের আরো বহু চলচ্চিত্র আমরা পেতাম।

আতা ভাইয়ের উত্তরসূরিরা যদি তার কাজের একটি সুষ্ঠু সংরক্ষণ করেন, তবে আগামী প্রজন্ম তার অবদান সম্পর্কে জানতে পারবে। তার গানগুলো ডিজিটাইজ করে একটি স্থায়ী সংরক্ষণাগার গড়া উচিত—সরকারি বা বেসরকারি যেভাবেই হোক। তার গান, চলচ্চিত্র, নাটক ও অন্য সৃষ্টিকর্মগুলো সংরক্ষণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি মূল্যবান সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা উচিত।

একটি ছোট্ট স্মৃতি দিয়ে শেষ করি। আমি চাইতাম, প্রতিটি অনুষ্ঠানের পরে শিল্পীরা যেন তাদের প্রাপ্য সম্মান ও সম্মানী পেয়ে যান। তাই আগে থেকেই যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হতো। একবার এই দায়িত্ব দিলাম লুৎফর রহমান রিটনকে। তিনি সেগুনবাগিচায় আতা ভাইয়ের অফিসে গিয়ে কনট্রাক্ট করিয়ে আনলেন, রেকর্ডিংয়ের দিন সারাদিন তার সঙ্গে থাকলেন, রূপসজ্জা শেষে স্টুডিওতে নিয়ে এলেন, রেকর্ডিং শেষে গাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিলেন। একবার আগে এমন ঘটেছিল যে, আতা ভাই রেগে গিয়ে অনুষ্ঠান না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাই রিটনের কাজটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৃষ্টিশীল মানুষদের একটু অন্যরকম যত্ন লাগে আর রিটন সেটাই আন্তরিকতার সঙ্গে করেছিল।

খান আতাউর রহমানের সৃষ্টিশীলতা শুধু সংগীত বা চলচ্চিত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি নাট্যকার ও উপস্থাপক হিসেবেও সমান দক্ষ ছিলেন। তার উপস্থাপনায় ছিল এক অনন্য সৌন্দর্য, যা দর্শকদের মুগ্ধ করত।

খান আতাউর রহমান ১৯৯৭ সালের ১ ডিসেম্বর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তার অবদানকে স্মরণ করে ২০০৪ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করে।

খান আতা ভাই আমাদের অনেক কিছু দিয়ে গেছেন—গান, ছবি, আবেগ আর অগণিত স্মৃতি। কিন্তু আমরা কি তাকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দিতে পেরেছি? সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

তার সৃষ্টিশীলতা, মানবিকতা ও সাংস্কৃতিক অবদান আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ। এই স্মৃতিচারণ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, কীভাবে একজন শিল্পীর প্রতি সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শন করা উচিত। তার সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণ ও প্রচার করা আমাদের সাংস্কৃতিক দায়িত্ব।

শ্রদ্ধা নিবেদন

তোমার গানে ছিল ইতিহাসের করুণ ধ্বনি, চোখের জলে মিশে যেত বাংলা নামের যন্ত্রণা। একটি সুরে তুমি জাতির যাত্রা লিখে গেছো, একটি বাক্যে বাংলার আত্মা—‘এ খাঁচা ভাঙবো আমি কেমন করে…’

কে বলেছিল, কণ্ঠে কান্না চাপা দাও? তোমার সুরে তো জন্ম নিয়েছে বিপ্লব, তোমার গানে তো আছে প্রজন্মের পদচিহ্ন। তুমি আজও আছো—চোখে জল এলে মনে পড়ে যে সুরটা বাজে, সেটা তো তোমারই সৃষ্টি!

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...