আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

স্বাধীনতা-সংগ্রামের কৌশলগত বিভিন্নতা

ড. আহমদ আনিসুর রহমান

স্বাধীনতা-সংগ্রামের কৌশলগত বিভিন্নতা

বাঙ্গলার স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে মনে রাখার জরুরি কথা হলো, স্বাধীনতা দিবসের উদযাপনের আনুষ্ঠানিকতার আড়ালে, তার প্রকৃত তাৎপর্য, প্রকৃত ও কৃত্রিম স্বাধীনতা, প্রকৃত এবং কৃত্রিম জাতীয়তার পার্থক্য সম্পর্কে টন টনে সচেতনতা বজায় রেখে, প্রকৃত স্বাধীনতা রক্ষায় সদা সচেতন ও সক্রিয়তার প্রয়োজনীয়তা যেন মুহূর্তের জন্য হারিয়ে না যায়, বিস্মৃত না হয়।

প্রথম স্মর্তব্য হলো, বাঙ্গলা কোনো নবজাত জাতি নয়, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধই তার একমাত্র স্বাধীনতা-সংগ্রাম নয়।

বিজ্ঞাপন

১৩৪২ সনে প্রথম বাঙ্গলা নামে স্বাধীন-সার্বভৌম জাতি রাষ্ট্র হিসেবে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়। তারপর হাজারো বছরের ইতিহাসে বারংবারই বিভিন্ন প্রেক্ষিতে বাঙ্গলার হাজার বছরের স্বাধীনতার পুনর্ব্যক্তিমূলক ঘোষণা উচ্চারিত হয়। বিভিন্ন আঙ্গিকে, বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন পটভূমিকায়, বিভিন্ন প্রেক্ষিতে। আর ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই যে তা কার্যকর ও স্বীকৃত রূপে তা অর্জিত হয়ে যায়, তা’ও নয়। এরই ভেতর কোনো একবারের ঘোষণার কোনো একটি বিশেষ দিন-তারিখকেই আনুষ্ঠানিকভাবে সে স্বাধীনতার স্মারক হিসেবে ধরে নিয়ে উদযাপন করলে, এমন কি সাংবিধানিকভাবেও, তাতে খুব বড় যে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়, এমন নয়। যতক্ষণ না বা কোরান কেতাবের মতো অকাট্য মনে করে নিয়ে তাকে ভিতটি করে জাতীয় জীবনের মৌলিক নীতিনির্ধারণমূলক কর্মকাণ্ডের ভিত্তি করে নেওয়া হয়। খোদ মহাভারতের বহু সংস্করণ রয়েছে।

প্রথম স্বাধীনতা ১৩৪২

হাজার বছরেরও পূর্বে বাঙ্গলার স্বাধীন জাতি রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভাব হয়, ১৩৪২ সনের আশেপাশে, কোনো এক মাসে, কোনো এক দিন তার প্রথম অভ্যুদয়, বাঙ্গলা নামে ঐক্যবদ্ধ এমন একটি স্বাধীন-সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র হিসেবে। তার প্রথম সার্বভৌম শাসক, সেকালের প্রচলিত পরিভাষায়, ‘সুলতান’, সোনারগাঁয়ের শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ-এর নেতৃত্বে। তা যে ঠিক কখন, কোন দিন-তারিখে হয়, তা আজ ঠিক করে বলাও যায় না। আর তা’ও হয়েছিল হঠাৎ করে এক দিনে নয়। তার পূর্বের কয়েক শতাব্দী ধরে, বহু প্রাণ দান ও ত্যাগের প্রক্রিয়ার ফলশ্রুতিতে। বহু শতাব্দীর আর অনার্য রক্তক্ষয়ী সংঘাতে, আগ্রাসী আর্যের প্রতিপক্ষে অনার্য ‘বঙ্গ’-সন্তান, ‘বঙ্গের আল’, তথা ‘বঙ্গাল’ বা ‘বাঙ্গলা’-এর মুক্তিযুদ্ধের সফল সমাপ্তিতে।

তারপর থেকে, স্বাধীন জাতি হিসেবে বাঙ্গলার স্বাধীনতার ঘোষণা ও তার কার্যকর ও স্বীকৃত রূপে অর্জন হয়েছে বেশ কয়েকবারই। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রেক্ষিত ও পটভূমিকায় হয়েছে। বিংশ শতাব্দীর পূর্বের প্রায় হাজার বছরে যে সবসময় তা হয়েছে তার সঠিক ঠিক দিন-তারিখ ত’ আজ আর নিশ্চিত করার খুব একটা উপায় নেই। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে শুরু করে, আধুনিককালে তার ঘটনাগুলোর দিন-তারিখ এখনো বিস্মৃত হয়নি।

স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম

বাঙ্গলার স্বাধীনতা হরণ করা হয়, ১৭০৭ থেকে ১৭৬৩ সন পর্যন্তের নানা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে, বিশেষ করে ১৭৫৭ সনে পলাশীর প্রতারণামূলক যুদ্ধে ব্রিটিশ বশংবদদের ‘বিজয়ে’-এর মাধ্যমে, বাঙ্গলার তৎকালীন রাজধানী মুর্শিদাবাদের, সেই বশংবদদের হাতে পতনের পর। তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সেই স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু হয়, উত্তরবঙ্গে অস্থায়ী রাজধানী করে বাঙ্গলার প্রকৃতই শেষ স্বাধীন নবাব, ‘ফকির মজনু শাহ’ নামে পরিচিত হয়ে পড়া, নূরউদ্দীনের নেতৃত্বে পরিচালিত ব্যর্থ, কিন্তু বীরোচিত প্রতিরোধমূলক মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে।

তারপর, ১৮০৩ সনে ব্রিটিশদের তৎকালের উপমহাদেশের রাষ্ট্রসংঘভিত্তিক শাসনব্যবস্থার রাজধানী দিল্লি দখলের পর তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ বাধ্যতামূলক ধর্মীয় দায়িত্ব জ্ঞানে, ১৮৩০-এর দশকে, সৈয়দ আহমদ নামে একজন নবীবংশীয় ধর্মসাধক, তা সূচনা করে শহীদ ও আপাতদৃষ্টে ব্যর্থ হন। সেই একই চেতনায় তাঁর অনুসারীরা আবার ১৮৫৭-এর সশস্ত্র প্রতিরোধমূলক মুক্তিযুদ্ধ শুরু করে তাতেও আপাতদৃষ্টে বার্থ হন।

স্যার সৈয়দ আহমদ

উপরোক্ত সৈয়দ আহমদ শহীদের পরবর্তী প্রজন্মে আবির্ভূত হন আরেক সৈয়দ আহমদ, যিনি পরে ‘স্যার সৈয়দ আহমদ’ বলে পরিচিত হন। তিনি ছিলেন যেই ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔপনিবেশিক দখলের প্রতিপক্ষে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধকে বাধ্যতামূলক ধর্মীয় দায়িত্ব মনে করে তা সূচনা করেছিলেন জ্যেষ্ঠতর সৈয়দ আহমদ, তারই এক কেরানিযিনি ১৮৫৭-এর ‘সিপাহি বিপ্লব’ নামে পরিচিত মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিপক্ষে সহায়তা করেন, ও মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তীকালে ব্রিটিশ নিষ্ঠুরতম প্রতিহিংসামূলক নিষ্পেষণ থেকে মুসলিমদের রক্ষার জন্য তাদের ব্রিটিশদের তাঁবেদারিতে উদ্বুদ্ধ করে, ব্রিটিশদের তাদের প্রতি সদয় করে তুলতে চেষ্টা করেন। এই ধারাটির শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য তিনি আলীগড় অ্যাংলো-মোহামেডান কলেজ, যা পরে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে পরিচিত হয় তা প্রতিষ্ঠা করেন। তারই শাখারূপে প্রথমে কলকাতা ও লাহোর ইসলামিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয় একই চিন্তাচেতনা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য। ভবিষ্যতে বাঙ্গলার ফরিদপুরের শেখ মুজিবুর রহমান কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে পড়তে এসে এঁদের কৌশলগত চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়ে, কালে একসময়, বাঙ্গলার স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের পরিবর্তে নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রামের পথেই অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করবেন, যতদূর সম্ভব।

দেওবন্দ

সৈয়দ আহমদ শহীদের স্বাধীনতা-সংগ্রামের কৌশলগত ধারার অনুসারীরা ১৮৫৭-এর বাঙ্গলার বহরমপুরে সূচিত, ঢাকাসহ বাঙ্গলা ও সারা উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়া তার মুক্তিযুদ্ধের পরাজয় এবং তারপর সে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে স্তিমিত করে দেবে বলে আশঙ্কা করা স্যার সৈয়দ আহমদের পাশ্চাত্য শিক্ষার আন্দোলনের প্রভাবের প্রতিপক্ষে, তাদের নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরে রেখে তার শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও প্রসারের জন্য উত্তর ভারতের দেওবন্দ ‘দারুল উলুম’ নামে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে, কালে ঢাকার লালবাগ ও চাটগাঁর হাটহাজারীসহ বহু জায়গায় তার শাখা প্রতিষ্ঠা করেন। ভবিষ্যতে বাঙ্গলার সিরাজগঞ্জের আব্দুল হামিদ খান এখানে পড়তে এসে এঁদের কৌশলগত চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়ে, পরে মওলানা ভাসানী নামে পরিচিতি নিয়ে, কালে একসময়, বাঙ্গলার স্বাধীনতার জন্য নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রতিপক্ষে সশস্ত্র সংগ্রামের কথা বলবেন।

ঢাকার নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ

স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের সাফল্যের সূচনা হয়, সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পরিবর্তে ঢাকার নবাব খাজা সলিমুল্লাহর রাজনৈতিক-কূটনৈতিক কৌশলী নেতৃত্বে, ১৯০৫ সনের অক্টোবরে ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। স্যার সৈয়দের সূচিত উপরোক্ত পাশ্চাত্য-তোষক শিক্ষা প্রসারের জন্যই ঢাকার নবাব, খাজা সলিমুল্লাহ সর্বভারতীয় মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনের আয়োজন করেন। তাঁর ব্রিটিশ শাসকদের পছন্দ হওয়া এ ধরনের পদক্ষেপে তুষ্ট হয়ে তারা, অনেকটা তাঁরই পরামর্শে বাঙ্গলার স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের প্রথম সাফল্যব্যঞ্জক হিসেবে ১৯০৫ সনের অক্টোবরে ‘পূর্ববাঙ্গলা ও আসাম প্রদেশ’ প্রতিষ্ঠা করে, বাঙ্গলার বিশালতর মুসলিম কৃষক-প্রজা ‘বাঙ্গাল’ জনসংখ্যাকে কলকাতাকেন্দ্রিক রাঁড়ি হিন্দু সাম্প্রদায়িক কম্প্রাডর শ্রেণির জমিদারি শোষণ ও তৎসংশ্লিষ্ট অত্যাচার থেকে কিছুটা রক্ষা করে। তবে কম্প্রাডর শ্রেণির চরম চাপের মুখে ১৯১৩ রদ হয়। এই রদের ভেতর দিয়ে বাঙ্গলা তথা ‘বাঙ্গাল’-এর স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের সাফল্য সাময়িক স্তিমিত হয়, কিন্তু ওই সংগ্রামের চূড়ান্ত সাফল্য, ভবিষ্যতের বাঙ্গলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক স্বকীয়তা রূপরেখা হয়ে যায়।

‘শের-এ বাঙ্গলা’-এর স্বাধীনতার ঘোষণা, ১৯৪০

কিছুদিনের ভেতরই, তারই পথ ধরে তখনো ‘ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্য’-এর অধীনেই হলেও, প্রধানত: অনার্য বাঙ্গলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, তারই বহুল জনপ্রিয় প্রতিনিধি, ‘শের-এ বাঙ্গলা’, মৌলভী আবুল কাসেম ফজলুল হকের নেতৃত্বে, পূর্ণতর বাঙ্গলার স্বায়ত্ত-শাসন অর্জনের ভেতর দিয়ে। সে পথ ধরেই, তাঁরই অসাধারণ আইনজীবী সুলভ কৌশলী পদক্ষেপে, ১৯৪০ সনের ২৩ মার্চ, লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে, কার্যত এক তরফা স্বাধীনতার ঘোষণা (‘De Facto’ ‘Unilateral Declaration of Independence’, ‘UDI’)-এ। সে অর্থে, আধুনিককালে, বাঙ্গলার প্রকৃত স্বাধীনতা দিবস দাঁড়াবে ১৯৪০ সনের ২৩শে মার্চ।

সেই এক তরফা স্বাধীনতার ঘোষণার সূত্র ধরে তাকে সম্পূর্ণরূপে কার্যকর করতে, ও তার সার্বিক, সর্বপক্ষীয় স্বীকৃতি আদায়ের জন্য, বাঙ্গলার প্রথম দুই প্রধানমন্ত্রী রূপে দুই অসাধারণ মেধা, জাতিপ্রেম, দূরদৃষ্টি ও রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কৌশলী বুদ্ধিসম্পন্ন আইনজীবী, বরিশালের মৌলভী ফজলুল হক আর তাঁর পরে, কলকাতার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্ব বাঙ্গলা সুকৌশলে অগ্রসর হয়। বাঙ্গলা তথা ‘বাঙ্গাল’-এর স্বাধীনতার সে সময়কার প্রধান দুই প্রতিপক্ষ দখলদার ‘ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্য’ আর দখল নিতে উদ্যত প্রতিবেশী আর্যাবর্তকেন্দ্রিক ভবিষ্যতের ‘ভারতীয় ইউনিয়ন ’যুগপৎ এই দু’য়ের প্রতিপক্ষে। অসাধারণ রাজনৈতিক-কূটনৈতিক কৌশলে।

স্বাধীনতার কৌশলগত ঐক্যজোট

কৌশলটি ছিল, বাঙ্গলার ঘোষিত এক তরফা স্বাধীনতার উভয় প্রতিপক্ষই আর যেসব জাতির আরাধ্য স্বাধীনতার প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল সে সময় তাদের সবাইকে নিয়ে এমন একটি কার্যকর পারস্পরিক সহায়তামূলক মৈত্রী দাঁড় করানো, যা তাদের সবাই আরাধ্য স্বাধীনতার সাধারণ প্রতিপক্ষ অতীত হতে চলা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য আর ভবিষ্যতে তাদের দেশসমূহ দখল করতে উদ্যত পরিকল্পিত ভারতীয় ইউনিয়ন, উভয়েরই প্রতিপক্ষে ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক-কূটনৈতিক সংগ্রাম করবে। এই মৈত্রীর বাস্তব রূপ হিসেবে বাঙ্গলার ঢাকার নবাব খাজা সলিমুল্লাহ ও তাঁর উত্তরসূরি ঢাকার পরবর্তীকালের নবাব, খাজা নাজিমুদ্দীনÑআর বাঙ্গলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী মৌলভী ফজলুল হক ও তাঁর উত্তরসূরি, দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন বাঙ্গলা নেতৃত্বে বৃহত্তর বাঙ্গলার সঙ্গে বৃহত্তর আসাম, বৃহত্তর পাঞ্জাব, আফগান তথা সীমান্ত, কাশ্মীর আর সিন্ধু ছড়াও হায়দরাবাদ, জুনাগড়-মানভাদর, উত্তর ভারতের রোহিলাখণ্ডের মতো পাঠান রাজ্যসমূহ, ত্রিপুরা, পার্বত্য চট্টগ্রাম, বেলুচিস্তান, ত্রাভান্কোর, এবং আরাকানÑতথা রোসাঙ্গ বা ‘রোহিঙ্গা’ নামক আলাদা আলাদা দেশসমূহের, আলাদা আলাদা জাতি নিয়ে একটি উপমহাদেশীয় রাষ্ট্রসংঘ সৃষ্টি করে, তার ভিন্ন ভিন্ন আবাসস্থলসমূহকে অতীতে সূচিত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী দখল আর ভবিষ্যতে ‘ভারতীয় ইউনিয়ন’ নামে মূলত ও কার্যত উত্তর ভারতীয় হিন্দি বা হিন্দু প্রধান আর্যাবর্তীয় সাম্রাজ্য থেকে মুক্ত করা ও মুক্ত রাখা এমন একটি আন্দোলন গড়ে তোলে। আন্দোলনটি, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক দখলের পর ইংরেজি দ্বারা প্রতিস্থাপিত হওয়ার পূর্বে, বাঙ্গলাসহ এই সবগুলো দেশেরই সরকারি ভাষা ছিল যেই ফারসি, তার একটি শব্দ, ‘পাকিস্তান’, অর্থাৎ, ‘পবিত্র স্থান’ আন্দোলন হিসেবে পরিচিত হয়। তখনো ‘পাকিস্তান’ বলতে, আজকে ‘পাকিস্তান’ বলতে একটি একক দেশ বোঝায়, তা বোঝাত না। বরং, বোঝাত, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী দখল আর ‘ভারতীয় ইউনিয়ন’ নামে মূলত ও প্রধানত, উচ্চবর্ণ আর্যের আর্যাবর্তীয় দখলের উদ্যোগের প্রতিপক্ষে একই সঙ্গে যুগপৎ স্বাধীনতার সংগ্রামের জন্য মৈত্রী জোটে একাট্টা হওয়া জাতিপুঞ্জের আবাসস্থল যেসব স্থানাদিকে ওই দুই পরাধীনতা থেকে ‘পাক’, অর্থাৎ ‘পবিত্র’ করে ও ‘পাক’, অর্থাৎ ‘পবিত্র’ রাখার প্রত্যয়ে তাঁরা ওই রাষ্ট্রসংঘ-গত মৈত্রী সৃষ্টি করেন, সেসবের সামগ্রিক পরিচয়। সে পরিচয়ের ফলে, ওই পরিচয়ের আওতায় চিন্তা করা দেশসমূহের যার যার আলাদা নাম বা পরিচয় লুপ্ত মনে করা হয় না। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে থেকে যেভাবে জানা যায়, তাঁরা ১৯৪৭-এর ১৪ আগস্ট মধ্যরাতে আনুষ্ঠানিক ও সরকারিভাবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্ব থেকেই ১৯৪৬ সনেই তারা বাঙ্গলাদেশকে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ বলতে শুরু করেন; কিন্তু তা যে ‘বাঙ্গলাদেশ’ নামের বিকল্প হিসেবে ছিল না, তা’ও জানা যায় এই থেকে যে ১৯৪৭-এর ১৪ আগস্ট মধ্যরাতে আনুষ্ঠানিক ও সরকারিভাবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বহু বছর পর পর্যন্তও বাঙ্গলাদেশকে সরকারিভাবেও ‘পূর্ববাঙ্গলা’ বলা ও লেখা হতোÑ১৯৫৬ সনে পূর্ববাঙ্গলার প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত, সমগ্র বাঙ্গলার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এবং এবার সমগ্র পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, বাঙ্গলার স্বার্থের প্রবক্তা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর উদ্যোগে বাঙ্গলাদেশে, তথা পূর্ববাঙ্গলা ও আসামের যেটুকু গণভোটের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হিসেবে এসে পূর্ববাঙ্গলার সঙ্গে যোগ দেয়, তাকে সরকারি, আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নামে পরিচিত হয়।

স্পষ্টতই, বাঙ্গলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ‘শের-এ বাঙ্গলা, আইনজীবী মৌলভী কাজী আবুল কাসেম ফজলুল হকের ১৯৪০-এর ‘লাহোর প্রস্তাব’ বলে পরিচিত, এক তরফা স্বাধীনতার ঘোষণার ভিত্তিতে, সেই স্বাধীনতাকে কার্যকর ও স্বীকৃতরূপে অর্জনের উপায় হিসেবে ‘পাকিস্তান’ নামে যে রাজনৈতিক-কূটনৈতিক কৌশল গত মৈত্রী জোটভিত্তিক উপমহাদেশীয় ‘রাষ্ট্রসংঘ’ সৃষ্ট করে বাঙ্গলাদেশ তার নেতৃত্ব গ্রহণ করে, তার অতি দক্ষ, কৌশলী সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে, জোটের অনন্য সদস্য বিশেষত: আসাম, পাঞ্জাব, সীমান্ত, সিন্ধু ও বেলুচিস্তানসহ ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্য এবং ভবিষ্যতের ‘ভারতীয় ইউনিয়ন’-এর নামে উচ্চবর্ণ আর্যের আর্যাবর্তীয় নতুন সাম্রাজ্য উভয় থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে। পাকিস্তান রাষ্ট্রসংঘ মৈত্রী জোটের অংশ হিসেবে এই সবগুলোর একসঙ্গে এই স্বাধীনতা অর্জনটা ছিল অনেকটা কয়েকজনে মিলে একসঙ্গে একটি পুরস্কার অর্জনের মতো। কয়েক মুহূর্ত পরেই, তাদের ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক প্রতিবেশী, উত্তর ভারতকেন্দ্রিক উচ্চবর্ণ আর্যের আর্যাবর্ত ও স্বাধীনতা অর্জন করে, ‘ভারতীয় ইউনিয়ন’ নামে, ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্য থেকে, তার উত্তরসূরি ও প্রতিস্থাপক হিসেবেÑআর তার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক উত্তরসূরি রূপে অবিলম্বেই সাম্রাজ্যবাদী বিস্তারে অগ্রসর হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রসংঘ মৈত্রী জোটের অংশ হিসেবে স্বাধীনতা অর্জনকারী প্রধান দেশগুলোÑবাঙ্গলাদেশ ও পাঞ্জাবের উল্লেখযোগ্য কিয়দংশ (পশ্চিমবঙ্গ, পূর্ব পাঞ্জাব), আসাম ও কাশ্মীরের বিশালতর বৃহদাংশ এবং বাদবাকি সদস্য দেশগুলোর সবটাই দখল করে নেয়, অচিরেই।

এই পরিস্থিতিতে বাঙ্গলা নিজের স্বাধীনতা রক্ষার স্বার্থেই একদিকে ‘পাকিস্তান’ নামক মৈত্রী জোটগত জাতিপুঞ্জে নিজের নেতৃত্বের অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করার সঙ্গে সঙ্গে জোটের মৈত্রীবন্ধনকে আরো শক্তিশালী করা, আর অন্যদিকে এই মৈত্রী জোটটিকে বিশ্বের অন্য জাতি ও জোটের সঙ্গে নানারূপ কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্কে সম্পর্কিত করে জোট আর তার ভেতর বাঙ্গলার নিজের শক্তি বৃদ্ধিতে সচেষ্ট হয়। এই চেষ্টায় বাঙ্গলার ব্রিটিশ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পূর্বের প্রথম তিন প্রধানমন্ত্রী শের-এ বাঙ্গলা ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আর ঢাকার নবাব, খাজা নাজিমুদ্দীন অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এঁদের ভেতর দ্বিতীয় আর তৃতীয় জন মৈত্রী জোট ‘পাকিস্তান’-এর সমগ্রের প্রধানমন্ত্রী হন। এঁদের ছাড়াও বাঙ্গলা থেকে আরো গভর্নর জেনারেল, জাতীয় পরিষদ ও সংবিধান প্রণয়ন পরিষদের স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ, শক্তিধর পদধারী হন পাকিস্তানের উদাহরণস্বরূপ, গভর্নর জেনারেল খাজা নাজিমুদ্দীন, স্পিকার মৌলভী তমীজুদ্দীন খান ও প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী বগুড়া ও অন্যান্য।

পুনরার্জিত স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র

কিন্তু একসঙ্গে সবার স্বাধীনতা অর্জন ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সৃষ্ট এবং লালিত বাঙ্গলার সৃষ্ট এই পাকিস্তান মৈত্রী জোটের ভেতরেই পরস্পরের স্বাধীনতা খর্ব বা হরণ করার ষড়যন্ত্র জোটটির স্বাধীনতা অর্জনের পূর্ব থেকেই শুরু হয়ে যায় আর তার সঙ্গে যোগ হয় জোটভুক্ত বিভিন্ন দেশের একেকটার বা সবারই একসঙ্গে স্বাধীনতা হরণের ষড়যন্ত্র জোটের বাইরে থেকেও। আর ভেতর-বাইরের ষড়যন্ত্রের প্রায়ই পারস্পরিক সম্পর্কও ছিল।

এই ষড়যন্ত্রে, অস্ট্রিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্যে আসা একজন তরুণ যাহূদী ধর্মযাজক, লিওপল্ড ওয়াইস, মুসলমান হয়ে যাওয়ার দাবি করে ‘মুহাম্মদ আসাদ’ নাম নিয়ে এসে পাকিস্তান আন্দোলনের নেতৃত্ব থেকে ‘শের-এ বাঙ্গলা’কে সরিয়ে শেখানো বসানো জিন্নাহকে প্রভাবিত করে মীরজাফরের এমন এক সাক্ষাৎ বংশধর ইস্কান্দর মীর্জাকে নবপ্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বে বসায়, যে বাঙ্গলার নাজিমুদ্দীন আর সোহরাওয়ার্দী নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক নিয়মতান্ত্রিক পাকিস্তানে সামরিক স্বৈরশাসন জারি করে বাঙ্গলাসহ পাকিস্তান জাতিপুঞ্জের অন্তর্ভুক্ত সব জাতিরই স্বাধীনতা হরণ করে, ১৯৫৭ সনে। তারই পথ ধরে, ১৯৫৮ সনে, তার গুরুমারা শিষ্য, তাকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে ওই স্বাধীনতা খর্বের প্রক্রিয়াই জারি রেখে আরো পাকাপোক্ত করে।

স্বাধীনতা খর্বকরণের এই ষড়যন্ত্রের মোকাবিলায় বাঙ্গলার নেতাদের নেতৃত্বে বাঙ্গলা জাতি স্বাধীনতা রক্ষা, আর ক্রমেই বিলীন হতে থাকা স্বাধীনতাকে উদ্ধারের সংগ্রাম শুরু করে। সেই সংগ্রামেরই একপর্যায়ে মওলানা ভাসানী ১৯৭০-এ পাকিস্তান নামক জোটের যে পশ্চিমাংশে আসন গেড়ে সামরিক স্বৈরশাসক জান্তা বাঙ্গলাসহ জোটের বাদবাকি সব জাতিরই স্বাধীনতা হরণ করে শোষণ শাসন করছিল, তা থেকে বাঙ্গলার বিচ্ছিন্নতার ঘোষণা দিয়ে কার্যত (de facto) বাঙ্গলার ‘একতরফা স্বাধীনতার ঘোষণা’ (Unilateral Declaration of Independence) প্রদান করেন, আর অনেকটা তাঁরই প্রেরণায় চীনপন্থি কিছু ছাত্র সংগঠন সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে বাঙ্গলার স্বাধীনতার, যা কিছু বাকি ছিল, তা রক্ষা করে, যা হৃত হয়, তা সামরিক স্বৈরাচারের কবল থেকে মুক্ত করে, পুনরুদ্ধারের চেতনায় ‘বীর বাঙ্গালি অস্ত্র ধর, বাঙ্গলাদেশ স্বাধীন কর’ স্লোগান তোলে।

অন্যদিকে, মওলানা ভাসানীরই কনিষ্ঠতর রাজনৈতিক সহকর্মী, শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্য স্বাধীনতাপ্রেমী নেতারা, তখনো যেই ‘পাকিস্তান’ জোটের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মাধ্যমে জোটের অন্যান্য সদস্য দেশসহ বাঙ্গলার স্বাধীনতা অর্জন করেছিল বাঙ্গলা জাতি ১৯৪৭-এ, সে জোটের আওতায়ই নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে, ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে সামরিক স্বৈরশাসনকে উৎখাতের সঙ্গে, তার মাধ্যমে বাঙ্গলাসহ জোটের অন্যসব জাতিরও স্বাধীনতার, যা বাকি ছিল, তা রক্ষা আর যা হৃত, তা পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় অগ্রসর হন। সেই উদ্দেশ্য সাধনে সশস্ত্র সংগ্রামে বিশ্বাসী সংখ্যালঘিষ্ঠরা, সামরিক শাসন প্রতিস্থাপনকারী নতুন গণনির্বাচিত সরকার গঠনের জন্য ১৯৭০-এ অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন বয়কটের জন্য মওলানা ভাসানীর আহ্বানের অনুসরণে তখন স্লোগান দেয়, ‘ভোটের বাক্সে লাথি মার, বাঙ্গলাদেশ স্বাধীন কর’। কিন্তু নিয়মতান্ত্রিকভাবে ‘শের-এ বাঙ্গলা’-এর ১৯৪০ সনের স্বাধীনতার একতরফা ঘোষণা ও পরিকল্পনার চেতনায়ই, ১৯৪৮-এর মওলানা ভাসানীর ২১ দফা আর ১৯৬৬ সনে তাঁর নিজের উত্থাপিত ৬ দফার ভিত্তিতে, পাকিস্তান জাতিপুঞ্জের আওতায়ই, একটি ‘কনফেডারেট’ ব্যবস্থায় সচ্ছল সম্ভব স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণের জন্য শেখ মুজিবুর রহমান তার দলকে নিয়ে সে নির্বাচনে অংশ নেন। তা’তে তাঁর নেতৃত্বে তাঁর দল ‘পূর্ব পাকিস্তান’, তথা বাঙ্গলাদেশে প্রায় ১০০ ভাগ, আর সারা পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করলে, তিনি নিয়মতান্ত্রিকভাবেই সেই চেতনায়ই স্বাধীনতা রক্ষা ও পুনরুদ্ধারে অগ্রসর হ’ন।

কৌশলগত দুই ভিন্ন চিন্তাধারার মূল

এখানে উল্লেখযোগ্য, মওলানা ভাসানী আর তাঁর রাজনৈতিক শিষ্যতুল্য শেখ মুজিব পূর্বোল্লিখিত তাঁদের পারস্পরিক ভিন্নতর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণগত পটভূমি ও অভিজ্ঞতার পার্থক্যের কারণে রাজনৈতিক আরাধ্য অর্জনে ভিন্নতার মেজাজ ও তজ্জাত ভিন্নতর পদ্ধতির অনুসারী ছিলেন কিঞ্চিৎ, সম্ভবত অবচেতনেই। উভয়েই ইসলাম ধর্মী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন ভাসানী উত্তর প্রদেশের দেওবন্দের ‘দারুল উলুম’ মাদরাসায়, শেখ মুজিব পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার ‘ইসলামিয়া কলেজে’। এ দুটো প্রতিষ্ঠানই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের হাতে শাসন ক্ষমতা হারিয়ে তাদের দ্বারা সবিশেষ নিপীড়িত হয়ে পশ্চাৎপদ হয়ে পড়া উপমহাদেশীয় মুসলমানদের শিক্ষা ও পুনর্বহালের নিমিত্তে প্রতিষ্ঠিত হলেও, দুই পরস্পরবিরোধী কৌশল ও ভাবধারার ধারার অনুসারী চিন্তকদের অনুসারী ছিল। ধারা দুটি এখনো বাঙ্গলাদেশসহ সারা উপমহাদেশ এবং তাদের শিক্ষার্থীদের প্রভাবে আজ সারা বিশ্বেই প্রসারিত।

মওলানা ভাসানী উপরোক্ত সৈয়দ আহমদ শহীদ নির্দেশিত, দেওব্ন্দ প্রশিক্ষিত চেতনা ধারায়ই শিক্ষিত প্রশিক্ষিত হয়ে বিজাতীয় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের প্রবর্তিত আইনভিত্তিক নিয়মনীতি মেনে নিতে অস্বীকৃতিভিত্তিক বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে বিশ্বাসী ছিলেন, অবচেতনায়ই। এই রকম চেতনা থেকেই তিনি খেলাফত আন্দোলনের অসহযোগ, স্বরাজ আন্দোলন ইত্যাদিতে সক্রিয় হন আর অবশেষে তার মাধ্যমে সম্ভবত আবার ব্রিটিশের প্রতিপক্ষরূপে কোনোপ্রকার খেলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার আশায় মুসলিম লীগে যোগ দিলেও, তার ব্রিটিশ নিয়মতান্ত্রিকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠি দেখিয়ে তা ভেঙে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ এবং তা ভেঙে ‘ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি’ এবং এভাবেই একের পর এক বিদ্রোহাত্মক পদক্ষেপের পর জীবনের শেষ রাজনৈতিক দল হিসেবে সূচনা করেন, ‘খোদায়ি খেদমতগার খেলাফতে রব্বানী পার্টি’ নামে, মৃত্যুর মাত্র কিছুদিন পূর্বে।

১৯৩৫ সনে ব্রিটিশ নিয়মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বিবর্তনে বাঙ্গলাসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন দেশে আধা-স্বাধীন স্বায়ত্তশাসিত সরকারের আবির্ভাব হলে বাঙ্গলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী, ব্রিটিশ আইনের অধীন নিয়মতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধাচরণের ভাসানী অনুসৃত ধারা থেকে ভিন্নতর পাশ্চাত্য শিক্ষা ও চিন্তা-চেতনামুখী ধারাটিতে শিক্ষিত ‘শের-এ বাঙ্গলা’ ফজলুল হক ১৯৪০-এ মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে বাঙ্গলাসহ উপমহাদেশের পূর্ব ও পশ্চিম দুই প্রান্তের মুসলিমপ্রধান দেশগুলোকে ‘রাষ্ট্রসমূহে’, অর্থাৎ স্বাধীন রাজ্যসংঘ (‘States’) হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব তথা ঘোষণা দেন। এই ভিত্তিতেই প্রস্তাবিত রাষ্ট্রসংঘ হিসেবেই ‘পাকিস্তান’ একটি যৌথ স্বাধীনতা-সংগ্রাম জোট হিসেবে কোনো একক দেশ রূপে নয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু হয় প্রধানত বাঙ্গলার উদ্যোগ ও নেতৃত্বেই।

তাতে বাঙ্গলার পর পরের তিনজন প্রধানমন্ত্রী, ‘শের-এ বাঙ্গলা’, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, খাজা নাজিমুদ্দীন এবং সরকারের বাইরে থেকে মওলানা ভাসানী, আবুল হাশিম ও কনিষ্ঠতর নেতৃস্থানীয় অনুসারী হিসেবে শেখ মুজিব, তাজউদ্দীন, মনসুর আলীর মতো বাঙ্গালিরাই নেতৃত্ব দেন যদিও শেষের দিকে সিন্ধুর জিন্নাহ-এর আনুষ্ঠানিক নেতৃত্বে আসীন হন, প্রধানত, এঁদেরই সমর্থন ও সহায়তায়, প্রধানত, ব্রিটিশদের সঙ্গে লেনদেনের মাধ্যমে ওই দাবি আদায়ে তাঁর কিছু সুবিধার বিচারে।

এই ধারায়, বিশেষত. ব্রিটিশ আইন ও নিয়মে জিন্নাহর মতোই এবং সম্ভবত তাঁর চেয়েও অধিক পারদর্শী, আইনজীবী সোহরাওয়ার্দীর সাক্ষাৎ শিষ্য এবং কঠোরভাবে আইনভক্ত ও নিয়মতান্ত্রিক আইনজীবী জিন্নাহর পরোক্ষ ভক্ত শিষ্য হিসেবে তরুণ শিক্ষানবিস শেখ মুজিব অবচেতনেই এই ধারায় নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রামের মাধ্যমেই রাজনৈতিক আরাধ্য অর্জনের চেতনায় চালিত হতেন। দরকার মনে করলে সে নিয়মের আওতায় থেকেই, তার সুযোগ নিয়েই, কিছু কারচুপি করে হলেও; কিন্তু তার সরাসরি বিরুদ্ধাচরণ বা ভঞ্জন না করে।

এই চিন্তা ও চেতনায়, অবচেতনেই, চালিত হয়েই শেখ মুজিব শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সশস্ত্র বিদ্রোহমূলক মুক্তিযুদ্ধের পথে না গিয়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবেই, সম্ভব হলে ১৯৪০-এর লাহোর প্রস্তাবে, ১৯৪৮-এর ২১ দফা ও ১৯৬৬ সনে তাঁর নিজেরই উপস্থাপিত ৬ দফার ভিত্তিতেই, ‘পাকিস্তান’ নামক মূলত একটি শিথিল বন্ধনে আবদ্ধ ‘কনফেডারেট’ ‘রাষ্ট্রসংঘ’ জোটের আওতায়ই, তদন্তর্ভুক্ত অন্যসব জাতির সঙ্গেই ও তাদের নেতৃত্বদায়ক ভূমিকাসহ পাকিস্তানি সামরিক স্বৈরশাসক জান্তার কবল থেকে বাঙ্গলার খর্বিত স্বাধীনতাকে মুক্ত করে, তার পুনর্বহালের চিন্তাই সম্ভবত করেছিলেন। এ জন্যই সম্ভবত তিনি ৭ই মার্চের অসাধারণ ভাষণে ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’, ‘মুক্তির সংগ্রাম’ ঘোষণা করলেও, তাতে মূলত বাঙ্গালির দ্বারা প্রস্তাবিত ও প্রতিষ্ঠিত ও ১৯৫৭ সন পর্যন্ত শাসিত ‘পাকিস্তান’ থেকে বেরিয়ে আসার ঘোষণা না দিয়ে বরং, সেই ভাষণ সমাপ্ত করেছিলেন, ‘জয় বাঙ্গলা, জয় পাকিস্তান’ বলে; ২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১০টার দিকে বাঙ্গলাদেশে পাকিস্তানি সামরিক স্বৈরশাসক জান্তা গণহত্যা শুরু করলেও, তিনি নিজে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে যেতে রাজি হননি। ১৯৭১-এর পুরোটা মার্চ মাসই প্রায় ৩ থেকে ২৫ মার্চ রাত পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিসচেতন তরুণ ছাত্র, স্বাধীনতা-সংগ্রামের সাংস্কৃতিক ফ্রন্টের কর্মী ও উদীয়মান সাংবাদিক হিসেবে এসব এবং সে সময়ের এতদসংশ্লিষ্ট অন্যান্য তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার পাশেই ছিলাম নিকট থেকেই দেখেছি বা শুনেছি।

এর অর্থ এ নয় যে শেখ মুজিব বাঙ্গলা স্বাধীনতার প্রবক্তা ছিলেন। তাঁর পূর্বে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নবাব খাজা সলিমুল্লাহ, ‘শের-এ বাঙ্গলা’ ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, সিরাজুল আলম খান, শাহজাহান সিরাজ, আব্দুর রব, এবং ১৯৭১-এর ৭ই মার্চ বক্তব্যে এবং ২৩শে মার্চ কার্যত তিনি নিজেসহ অনেকেই এবং তাঁর পরে ২৬শে মার্চ মেজর জিয়া নিজে এবং ২৭শে মার্চ শেখ মুজিবের পক্ষ থেকে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে বক্তব্যে ও কার্যত, এপ্রিলে জেনারেল ওসমানীসহ অন্যরা তেলিয়াপাড়া ও মেহেরপুরে বাঙ্গলার স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে থাকলেও ১৯৭১ মার্চ নাগাদ শেখ সাহেবই বাঙ্গলার স্বাধীনতার প্রধানতম প্রবক্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন।

এর অর্থ শুধু এই যে, ১৯৭১-এর মার্চের শেষ সপ্তাহ নাগাদ, বাঙ্গলার স্বাধীনতা ও মুক্তির অভিন্ন উদ্দেশ্য সাধনে দুটি ভিন্ন কৌশলগত চিন্তাধারা ও চেতনার উন্মেষ হয়েছিল, যার একটির প্রকাশ ঘটেছিল মওলানা ভাসানীর অবস্থানে আর অন্যটির প্রকাশ ছিল, শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থানে। প্রথমটি ছিল সশস্ত্র বিদ্রোহমূলক মুক্তিযুদ্ধের পথে মূল রাষ্ট্রসংঘরূপ জোটের আদর্শ থেকে বিচ্যুত ‘পাকিস্তান’ থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে এসে, পূর্ণ মুক্ত, স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। অন্যটি ছিল যথাসম্ভব নিয়মতান্ত্রিকভাবে আর তার জন্য তা করা, পূর্ব প্রতিষ্ঠিত ‘পাকিস্তান’ নামক মূলত স্বাধীনতা অর্জন ও সংরক্ষণমূলক কৌশলগত জোটরূপ ‘পাকিস্তান’ রাষ্ট্রসংঘের আওতায়ই, যদি তা আদৌ সম্ভব হয়।

মিশ্র কৌশল

অবশেষে, বাঙ্গলার স্বাধীনতার সংগ্রামের ১৯৭১-৭২-এর পর্যায়ে, স্বাধীনতা অর্জিত হয় উপরোক্ত কৌশলগত দুই ভিন্ন চিন্তাধারা জাত বাস্তব কর্মকৌশলের পারস্পরিক সম্পূরক মিশ্রণে। এর ফলে যাঁরা প্রথমে যুদ্ধের চেয়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে পাকিস্তান নামক জোটাবদ্ধ রাষ্ট্রসংঘের আওতায়ই বাঙ্গলার স্বাধীনতাকে মুক্ত করতে মুক্ত সংগ্রাম চেয়েছিলেন, তাঁরাও অবশেষে বাস্তবতার মুখে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একক রাষ্ট্র হিসেবে বাঙ্গলার প্রতিষ্ঠা ও প্রগতির নায়ক হয়েছেন। আর যাঁরা সেই পাকিস্তান থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে, নিয়মতান্ত্রিক মুক্তিসংগ্রামের প্রতিপক্ষে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ছিলেন প্রবক্তা, তাঁরাও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ ও তার ফলে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাঙ্গলাকে নিয়মতান্ত্রিকতার শৃঙ্খলায় সুশৃঙ্খল করে অরাজকতামুক্তভাবে স্বাধীন রাখতে আগ্রহী হন।

এই মিশ্র কর্মকৌশলগত কর্মকাণ্ডেও স্বাধীনতা সংগ্রামীগণ একাধিক কর্মধারার অনুসরণ করায় তাঁদের নিজেদের ভেতর পারস্পরিক আর তাঁদের বিভিন্ন ধারা সম্পর্কে অন্যদের, বিশেষ করে আমাদের মতো মুক্তিযুদ্ধ যাঁরা করেছেন বা দেখেছেন তাঁদের মতো ন’ন, এমন পরবর্তী প্রজন্মের অনেকের অনেক ভুল বোঝাবুঝি হয়ে এমন এক অবস্থা হয়েছে, যে নানা জনে নানা স্বাধীনতা সংগ্রামীকে এমনকি ১৯৭১-এ স্বাধীনতার প্রধানতম প্রবক্তা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা, শেখ মুজিবুর রহমান, সামরিক মুক্তিযুদ্ধের সূচক জিয়াউর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধের উপ-প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকারকে পর্যন্ত স্বাধীনতাবিরোধী বলে ফেলছে! অথচ এঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন স্বাধীনতা-সংগ্রামের মহানায়ক, মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নেতা বা প্রেরণা। নানা বিভিন্ন বিকল্প কৌশল-উপকৌশলগত চিন্তায় স্বাধীনতাকে সামরিক জান্তার কবল থেকেÑআর বাঙ্গলা জাতিকে তার দানবিক গণহত্যামূলক নিপীড়ন থেকে মুক্ত করতে সচেষ্ট হয়ে ভুল বোঝাবুঝির শিকার হন, বাদবাকি এমন অনেকের কথা তো রইলই।

সমুন্নত স্বাধীনতা

এমন ভুল বোঝাবুঝি ও তজ্জাত অপবাদ আরোপ ও পারস্পরিক অঙ্গুলি নির্দেশ ও দোষারোপ, জাতি হিসেবে বঙ্গকে খণ্ডিত করবে, বাঙ্গলার স্বাধীনতার সব অতীত বা ভবিষ্যৎ, বাস্তব বা সম্ভাব্য শত্রুদের যা বিপন্ন করে, তা খর্ব বা হরণ করার পথ খুলে দেবে। তাই এ ভুল বোঝাবুঝির দ্বার রুদ্ধ করতে বাঙ্গলার স্বাধীনতা অর্জনের কৌশল-কর্মে স্বাধীনতা-সংগ্রামী, স্বাধীনতাপ্রেমীদের ভিন্ন ভিন্ন চিন্তাচেতনা সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা একান্ত বাঞ্ছনীয়।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশ্বের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। যুদ্ধকৌশল তত্ত্বসহ বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটি থেকে পিএইচডি করেন। ইতিহাসবেত্তা, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...