শেষ পর্যন্ত সরকার ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিতে বাধ্য হয়েছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যা সৃষ্টির দায় সরকারের ওপরই বর্তায়। রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতা দেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্বার্থের উপরে স্থান করে নেওয়া কোনোক্রমেই বাঞ্ছনীয় নয়। বেশ কিছুদিন থেকেই ইসলামী ব্যাংককে কেন্দ্র করে সরকারি দল এবং প্রধান বিরোধী দল অনভিপ্রেতভাবে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।
দেশের সর্ববৃহৎ বেসরকারি ব্যাংকে অচলাবস্থার প্রেক্ষিতে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)-এর একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে তাদের উদ্বেগ জানাতে দেখা করতে গেলে স্বয়ং গভর্নর বিষয়টিকে রাজনৈতিক ইস্যু বলে স্বীকার করে নিয়েছেন। এভাবে একটি ব্যাংকের মালিকানার বিষয় রাজনৈতিক ইস্যুতে রূপান্তর সার্বিক সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য মোটেও শুভ লক্ষণ নয়। আন্তর্জাতিক মহলও এতে অস্বস্তি বোধ করবে। এবিবির প্রতিনিধি দল যৌক্তিকভাবেই ব্যাংকিং সেক্টরকে রাজনীতির বাইরে রাখতে গভর্নরকে অনুরোধ করেছেন।
বেসরকারি খাতের বৃহত্তম এবং অন্যতম সফল ব্যাংকটিকে শেখ হাসিনার সরকার প্রায় ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে গিয়েছিল। সে সময় ডিজিএফআইকে সরাসরি ব্যবহার করে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা এ দেশের অন্যতম নিকৃষ্ট ব্যাংক লুটেরা এস আলমের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে সিঙ্গাপুরের নাগরিক এস আলম ইসলামী ব্যাংক থেকে নামে ও বেনামে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা লুট করে নিয়ে গেছেন।
তৎকালীন ক্ষমতাসীন মহল সেই টাকার ভাগ পেয়েছিলেন বলে জনগণ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। ব্যাংক লুটপাটে ফ্যাসিস্ট শাসক শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের লোকজনের সম্পৃক্ততা সেই সময়কার ডিজিএফআইয়ের কর্মকাণ্ড থেকেই প্রমাণিত হয়েছে। শেখ হাসিনার নির্দেশ ছাড়া ডিজিএফআইয়ের সামরিক কর্তারা নিশ্চয়ই একটি বেসরকারি ব্যাংক পরিচালনায় নগ্নভাবে নাক গলাতে যেতেন না। এখানে উল্লেখ্য, ইসলামী ব্যাংকে ওই দিনদুপুরে ডাকাতির সময় এস আলমের পক্ষে ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যানের পদধারী ছিলেন বর্তমানে দেশের রাষ্ট্রপতি ‘মহামান্য’
মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। হাসিনার আমলে ডিজিএফআইকে এভাবেই রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যবহার করা হয়েছিল। ফ্যাসিস্ট শাসকগোষ্ঠী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় একটি প্রতিষ্ঠানকে চরমভাবে বিতর্কিত করে বিদায় নিয়েছে। ফলে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা আজ হুমকির মুখে পড়েছে। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে এস আলমের শেয়ার আটক করাসহ ব্যাংকের বোর্ড এবং ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং পুনর্গঠিত ব্যবস্থাপনা পর্ষদের দক্ষতা ও পরিশ্রমের ফলে প্রায় দেউলিয়া হয়ে পড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি মাত্র দেড় বছরের মধ্যে স্বাবলম্বী হতে শুরু করেছিল। খেলাপি ঋণের বোঝায় জর্জরিত ব্যাংকিং খাতের জন্য ইসলামী ব্যাংকের পুনরুত্থান আস্থা ও আশার সঞ্চার করেছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, নির্বাচিত সরকারের চার মাস পূর্ণ না হতেই ইসলামী ব্যাংকে পুনরায় অস্থিরতা সৃষ্টি দেশের সার্বিক অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত।
পাঠক হয়তো ভাবছেন, একটি ব্যাংকের বিষয় নিয়ে সরকার খামোকা এত তাড়াতাড়ি এই ঝামেলা কেন করছে? এর দুটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমটি, পুরোপুরি রাজনৈতিক। আশির দশকে ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় থেকেই সেখানে জামায়াতে ইসলামীর নেতা, কর্মী এবং সমর্থকদের কর্তৃত্ব ছিল। ধারণা করা হয়ে থাকে যে, ব্যাংকটির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে অধিকাংশই হয় জামায়াতের কর্মী অথবা সমর্থক। এস আলম ব্যাংকের মালিকানা নেওয়ার পর তার এলাকা চট্টগ্রামের পটিয়ার বিপুল সংখ্যক ব্যক্তিকে নতুন করে ব্যাংকটিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এদের নিয়োগের সময়কাল বিবেচনা করলে অধিকাংশের আওয়ামী লীগ কর্মী অথবা সমর্থক হওয়ার কথা। অভিযোগ রয়েছে যে, নিয়োগপ্রাপ্তদের অনেকেরই ব্যাংকে চাকরি পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ছিল না।
শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর পটিয়ার সেই সব লোকের চাকরি চলেও গিয়েছিল। চাকরিচ্যুতদের মধ্যে স্বল্পসংখ্যক ব্যক্তি নতুন করে ইন্টারভিউ দিয়ে যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছিলেন এবং চাকরি ফিরে পেয়েছিলেন। যারা চাকরি ফেরত পাননি, তাদের কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছিল। এসব নিয়ে আগে থেকেই ব্যাংকে বেশ উত্তেজনা বিরাজ করছিল। চাকরিসংক্রান্ত এসব জটিলতার বাইরেও বিএনপি অভিযোগ করে থাকে যে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিভিন্ন উপায়ে ব্যাংক থেকে জামায়াতে ইসলামী নাকি বিপুল অঙ্কের আর্থিক সুবিধা পেয়েছে। জামায়াত অবশ্য সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এখন জামায়াতকে বেকায়দায় ফেলার জন্য সরকার ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ে সব নিজের লোকজন বসিয়ে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ শুধু উপরোক্ত কারণে হলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির রাজনীতিকীকরণের চেষ্টা ব্যতীত সরকারের বিরুদ্ধে তেমন একটা প্রতিবাদের ইস্যু নেই। এ দেশে সব রাজনৈতিক দল প্রশাসন থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সর্বত্র তাদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য কায়েম করতে চায়। প্রায় প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ভিসি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকার রাজনৈতিক বিবেচনাকেই প্রাধান্য দিয়েছে। ভালো কিংবা মন্দ, এটাই আমাদের দীর্ঘকালের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। তবে নিছক রাজনৈতিক কারণে সরকার ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালককে সরানোর উদ্যোগ নিয়ে থাকলেও একটা রহস্য অবশ্য থেকে যাচ্ছে।
নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে সরকার যাকে নিয়োগ দিয়েছিল, তাকে ইউনূস সরকারের আমলে বাংলাদেশ ব্যাংকের চুক্তিভিত্তিক ডেপুটি গভর্নর পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। কোন্ অজানা বাধ্যবাধকতায় হাসিনার আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত এবং অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক বরখাস্তকৃত একজন আমলাকে বর্তমান সরকারের পুনর্বাসন করতে হলো, সেটা আমার জানা নেই। শুধু স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, ড. ইউনূসের অর্থ উপদেষ্টা কেবল বিএনপিপন্থি হিসেবেই পরিচিত নন, তিনি সরকারি দলের মহাসচিবের সহপাঠী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ইসলামী ব্যাংকের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান নির্দোষ হলে ড. ইউনূসের বিএনপিপন্থি অর্থ উপদেষ্টা কেন তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের চাকরি থেকে হটিয়ে দিয়েছিলেন, সে প্রশ্ন থেকেই গেল।
বেগম খালেদা জিয়া সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালাহউদ্দিনকে ২০০৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বানিয়েছিলেন। আমি উনাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি। তাকে জামায়াতপন্থি বলার বোধহয় কোনো উপায় নেই। সুতরাং, তার সিদ্ধান্তকে কেন বিএনপি সরকারের কর্তাব্যক্তিরা মর্যাদা দিলেন না, সেটা তারাই জানেন। সরকার কি ওই পদচ্যুত ব্যক্তি ব্যতীত বিএনপির বিশাল কর্মী অথবা সমর্থক বাহিনীর মধ্যে অন্য কোনো দক্ষ ব্যক্তিকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগের জন্য খুঁজে পায়নি? যাহোক, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদ ভেঙে দেওয়ার ফলে পুনর্বাসিত ব্যক্তির চেয়ারম্যানের চাকরি আপাতত গেছে। তিনি অন্য কোথাও নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন কি না সেটা ভবিষ্যতের বিষয়। এবার দ্বিতীয় ‘সম্ভাব্য’ কারণ নিয়ে আলোচনা করব।
ধরে নেওয়া যাক, একজন ব্যবসায়ী হিসেবে এস আলম ফ্যাসিস্ট আমলে শেখ হাসিনাকে সন্তুষ্ট রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যতের চিন্তা থেকে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। সেক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের মধ্যকার অতি প্রভাবশালীদের সঙ্গেও এস আলমের বিশেষ সম্পর্ক থাকতে পারে। সেই পুরোনো সম্পর্কের কারণে হয়তো সেই সব প্রভাবশালী এখন বিতর্কিত ধনকুবেরের অতীত ঋণ পরিশোধের জন্য চাপের মধ্যে আছেন। এ কারণেও সরকার ইসলামী ব্যাংককে জামায়াতের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে এস আলমের মালিকানায় ফিরিয়ে দিতে চাইতে পারে। সংসদের ভেতরে এবং বাইরে বিতর্ককালে কয়েকজন সিনিয়র মন্ত্রীর বক্তব্যে সরকারের সঙ্গে এস আলমের সম্পর্কের সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয়েছে। মন্ত্রীদের একজন বলেছেন, এস আলম কেমন করে ইসলামী ব্যাংকের মালিক হয়েছিলেন সেটা নাকি সরকারের দেখার বিষয় নয়। তিনি ব্যাংকের মালিক এটাই নাকি একমাত্র বিবেচ্য বিষয়।
তার মতে, এস আলমের অবৈধভাবে মালিকানা হাসিল করার প্রক্রিয়া কেবল দুদকের তদন্তের বিষয়। অর্থাৎ, ক্ষমতা থাকলে যে কেউ ডিজিএফআইকে ব্যবহার করে রাতারাতি রাষ্ট্রের যেকোনো প্রতিষ্ঠানের মালিক বনে যেতে পারেন! মন্ত্রীর এই ভয়ানক যুক্তি মেনে নিলে আওয়ামী সমর্থকরাও তো বলতে পারেন যে, শেখ হাসিনা ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে কীভাবে প্রশাসনকে ব্যবহার করে নির্বাচনে জিতেছিলেন সেটা কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়, তিনি প্রধানমন্ত্রী বনে গিয়েছিলেন সেটাই আসল কথা। মন্ত্রী সাহেব, আপনি বোধহয় বুঝতে পারছেন না, সংসদে এস আলমের মালিকানার পক্ষে আইনবিরুদ্ধ ও অনৈতিক যুক্তি পেশ করতে গিয়ে আপনি এক ভয়ংকর প্যান্ডোরার বাক্স খুলে ফেলেছেন। আপনার যুক্তিতেই হাসিনা এখন আপনার সরকারকে ঘায়েল করতে পারে। যে যুক্তিতে শেখ হাসিনা অবৈধ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, সেই একই যুক্তিতে ইসলামী ব্যাংকে এস আলমের মালিকানাও অবৈধ।
অপর এক সিনিয়র মন্ত্রী বলেছেন, তারা নাকি ইসলামী ব্যাংককে প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরিয়ে দিতে চান। এখানেই তো ভাই মূল সমস্যা। ইসলামী ব্যাংকের প্রকৃত মালিকটা কে? আমরা যদি প্রথম মন্ত্রীর যুক্তি মেনে নিই, তাহলে বর্তমান শেয়ার অংশীদারত্বের ভিত্তিতে লুটেরা এস আলমকেই মালিক মেনে নিয়ে জনগণের অর্থ দ্বিতীয়বার লুটে নেওয়ার জন্য ব্যাংক তাকে দিয়ে দিতে হয়। সরকার তো এখনো লুটের দায়ে ইসলামী ব্যাংকে এস আলমের নামে ও বেনামে শেয়ার বাজেয়াপ্ত করেনি। অবৈধ এস আলমরাই যদি রাজনৈতিক আনুকূল্যে আবার জনগণের সম্পদ দখল করতে পারে, তাহলে আমাদের ছেলেমেয়েরা জুলাই বিপ্লবে কেন এত রক্ত ঝরালো? কেবল ক্ষমতার পালাবদলের জন্য তরুণ আবু সাঈদ বুলেটের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়ায়নি, কিশোর আনাস মা-কে চিঠি লিখে শাহাদত বরণ করতে চিরদিনের জন্য ঘর ছাড়েনি। হাসিনাকে যেমন আমরা রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করতে পারি না, তেমনি এস আলমদেরও রাষ্ট্রের সম্পদ পুনরায় লুটপাট করতে দেব না।
ইসলামী ব্যাংক নিয়ে যে অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে, যত দ্রুত সম্ভব তার অবসান সরকারকেই নিজ স্বার্থে করতে হবে। ব্যাংকের গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রথমত লুটের অর্থের খানিকটা পুনরুদ্ধারের জন্য এস আলমের সব শেয়ার রাষ্ট্রীয়ভাবে অধিগ্রহণ করা উচিত; দ্বিতীয়ত ইসলামী ব্যাংকে অবিতর্কিত ও দক্ষ ব্যাংকারদের সমন্বয়ে পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে হবে এবং তৃতীয়ত বাংলাদেশ ব্যাংকের হঠকারী সিদ্ধান্তের ফলে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়ে আমানত তুলে ফেলার কারণে ইসলামী ব্যাংকে নগদ অর্থের যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার সমাধানে প্রয়োজনীয় ঋণ সরবরাহ অব্যাহত রাখতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার যে সাময়িক সহায়তা ঘোষণা করেছে তাতে এই বিশাল ব্যাংকের চাহিদা মিটবে না। ইসলামী ব্যাংক কেবল গ্রাহকসংখ্যার বিবেচনায়ই দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংক নয়, একক ব্যাংক হিসেবে রেমিট্যান্স আহরণেও তারা শীর্ষে।
এ ছাড়া দেশের বস্ত্র এবং তৈরি পোশাক শিল্পে তাদের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে। কাজেই এই ব্যাংকে হাত দেওয়ার আগে সরকারের আরো চিন্তাভাবনা করার প্রয়োজন ছিল। এত দ্রুত ব্যাংকটিকে জামায়াতমুক্ত করার অথবা এস আলমের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার কী এমন তাগিদ ছিল, সেটা সংশ্লিষ্টরাই ভালো বলতে পারবেন। কদিন আগে সরকার দেশি-বিদেশি ঋণনির্ভর এক বিপুলাকায়, জনতুষ্টিমূলক বাজেট পেশ করেছে। বিদেশি ঋণ পেতে হলে সরকারকে অবশ্যই ব্যাংকিং খাতে সংস্কার করতে হবে। ইসলামী ব্যাংকের ঘটনা আন্তর্জাতিক ঋণ প্রদানকারী সংস্থাগুলোকে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে সন্দিহান করে তুলতে পারে। ইতোমধ্যে আইএমএফ পুরোনো চুক্তির অধীনে অর্থছাড় বন্ধ করেছে।
সরকার সেই চুক্তি বাতিল করে আইএমএফের কাছে নতুন ঋণ চুক্তি করার প্রস্তাব দিয়েছে। সরকারি এবং বেসরকারি খাতে কাজ করার পূর্বঅভিজ্ঞতা থেকে নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, নতুন যেকোনো চুক্তিতে আইএমএফ ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের কঠিন শর্ত রাখবে। ইসলামী ব্যাংকের সমস্যা সমাধান সরকারের জন্য লিটমাস টেস্ট হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি। এখনো সময় আছে। সমস্যা দীর্ঘায়িত না করে ইসলামী ব্যাংকের সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধানে আসুন। প্রায় সমাপ্ত অর্থবছরে রপ্তানি, শিল্প, বিনিয়োগ এবং বাণিজ্য ভারসাম্যে কোনো ভালো খবর নেই।
রপ্তানি কমে যাওয়ায় আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং চলতি হিসাবের ভারসাম্য এখন রেমিট্যান্সের ওপর প্রায় এককভাবে নির্ভরশীল। গত মাসে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রেমিট্যান্স রেকর্ড ৪ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। রেমিট্যান্সের এই ঊর্ধ্বগতি ধরে রাখার জন্য সমন্বিত প্রচেষ্টা আবশ্যক। ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের আস্থাহীনতা কোনো কারণে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারীদের মধ্যে সংক্রমিত হয়ে রেমিট্যান্স হাসিনার আমলের শেষ পর্যায়ের মতো হুন্ডিনির্ভর হয়ে পড়লে দেশের অর্থনীতির প্রবল চাপের মধ্যে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আশা করি, ক্ষমতাসীনরা এই তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে অর্থনৈতিক খাতকে রাজনীতির বাইরে রাখবেন। অর্থনীতিতে মন্দা এলে তার দায় কিন্তু সরকারকেই নিতে হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


