আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা

বদরুদ্দীন উমর

বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা

বিগত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কর্তৃত্বে প্রতিষ্ঠিত বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের অবসান ঘটিয়ে প্রশাসনকে গণতান্ত্রিক ভিত্তিতে নতুন করে দাঁড় করানোর প্রয়োজনে কয়েকটি সংস্কার কমিশন গঠন করে এবং তারা এরই মধ্যে সরকারের কাছে তাদের রিপোর্টও দাখিল করেছে। কিন্তু লক্ষ করার বিষয়, এসব ক্ষেত্রে সংস্কার প্রয়োজনীয় হলেও শিক্ষা ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিরাজমান চরম অগণতান্ত্রিক ও নৈরাজ্যিক পরিস্থিতির পরিবর্তন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি হওয়া সত্ত্বেও তারা এখন পর্যন্ত এদিকে দৃষ্টিপাতের কোনো প্রয়োজনবোধ করেননি। বিস্ময়ের ব্যাপার, যে ছাত্ররা জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছিল, তারাও কেউ আজ পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করেননি। নিজেরা শিক্ষার্থী হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষাব্যবস্থার দৈন্যদশার প্রতি তাদের এই ঔদাসীন্য সরকারি ঔদাসীন্যের ক্ষেত্রেও দৃষ্টিভঙ্গির দিক দিয়ে অধিকতর গণতান্ত্রিক চেতনাবিহীন।

শিক্ষা ও চিকিৎসা সম্পর্কে সরকার ও ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বের এই ঔদাসীন্য সত্ত্বেও এ দুই ক্ষেত্রে বড় রকমের সংস্কার এখন জরুরি হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, এ দুই ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন যদি না ঘটানো যায়, তা হলে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান কীভাবে জনগণের জীবনকে গণতান্ত্রিক করতে পারে? বিশাল আকারে জনগণকে অসুস্থ ও কুশিক্ষিত রেখে সমাজ কীভাবে এগিয়ে যেতে পারে? এই অবস্থায় অন্য সব ক্ষেত্রে যতই সংস্কার হোক, সে সংস্কার কতদূর টেকসই ও কার্যকর হতে পারে—এসব চিন্তা সরকার ও ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বের মাথায় নেই। এটা যে বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে বড় বিপদের একটা দিক, এতে সন্দেহ নেই।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষা ও চিকিৎসা এ দুই ক্ষেত্র এভাবে উপেক্ষিত কেন? আমরা এখানে শিক্ষাবিষয়ে কিছু প্রয়োজনীয় আলোচনা করব। শিক্ষাক্ষেত্রে যে গভীর সংকট বিরাজ করছে, সে বিষয়ে ক্ষমতাসীনদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য এই আলোচনার প্রয়োজন আছে। আনুষ্ঠানিক শিক্ষার চারটি চিহ্নিত স্তর হলো—প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চ। প্রত্যেক স্তরেই এখন পাঠ্যক্রমের অবস্থা শোচনীয়। প্রাথমিক স্তরের অতি অল্পবয়স্ক ছাত্রছাত্রীদের দেখা যায়, পিঠে বইপত্রের ভারী ব্যাগ ঝুলিয়ে প্রায় কুঁজো হয়ে স্কুলে যেতে।

পিঠে ভারী বোঝার কারণ—প্রাথমিক পর্যায়েই ছাত্রদের পাঠের জন্য অনেকগুলো বিষয় তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া। একটু চিন্তা করলেই বোঝা যাবে, অল্প বয়সে শিক্ষার্থীদের এসব বিষয়ের সঙ্গে পরিচয় করানোর কোনো প্রয়োজন নেই। রাজনীতি, প্রশাসন, সমাজনীতি, স্বাস্থ্য, ধর্ম প্রভৃতি বিষয়ে এ পর্যায়ে তাদের জ্ঞানদান করতে যাওয়া মূর্খতা। প্রাথমিক পর্যায়ে ছাত্রদের ঘাড়ে এসব বিষয় চাপিয়ে দিলেও তারা এই ‘জ্ঞান’ লাভের দ্বারা উপকৃত হয় না। তারা এসবের অর্থও বোঝে না। তাদের জীবনের সঙ্গে এসবের কোনো সম্পর্ক না থাকায় জ্ঞানার্জনের এই প্রক্রিয়া তাদের মাথায় চাপ সৃষ্টি করে। কাজেই প্রাথমিক পর্যায়ে এসব বিষয় একেবারে বাদ দেওয়া দরকার।

প্রাথমিক পর্যায়ের ছাত্রদের জন্য শুধু ভাষা ও গণিত বা অঙ্ক তাদের পাঠ্যতালিকায় রাখা দরকার। সাধারণভাবে এ দুটি বিষয় শিক্ষাক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ। এ দুটি বিষয়ে যদি একজন ছাত্রের ভালো দক্ষতা থাকে, তা হলে তার জন্য যেকোনো বিষয়ে জ্ঞানলাভ সহজ হয়। আর এ দুটি বিষয়ে যদি একজন দুর্বল থাকে, তাহলে কোনো বিষয়েই জ্ঞান অর্জন তার পক্ষে সহজ তো নয়ই, এমনকি সম্ভবও হয় না। আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এখন প্রাথমিক পর্যায়ে ১০টা বিষয়ের সঙ্গে গণিত ও ভাষা যেভাবে শিক্ষা দেওয়া হয়, তাতে কোনোটির শিক্ষাই ভালো হয় না এবং তার ফলে এ দুই ক্ষেত্রেই ছাত্ররা দুর্বল থাকে এবং দুর্বল থাকার কারণে উচ্চতর স্তরে তাদের শিক্ষা উচিতমতো না হয়ে বিঘ্নিত হয়।

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার এটা এক নেতিবাচক দিক। এ কারণে দেখা যায়, কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে প্রত্যেকটি স্তরের শিক্ষার মান ভয়াবহভাবে নিম্ন। উচ্চ বিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার নিম্নমানের কারণে গবেষণা বলে বিশেষ কিছু থাকে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা বলে কিছু নেই। এ কারণে সারা দুনিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান নির্ণয় বা রেটিংয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্থান অতি নিম্নে।

প্রাথমিক পর্যায়ে ভাষার ওপর জোর দিয়ে তিনটি ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা দরকার—বাংলা, ইংরেজি এবং অন্য একটি ভাষা উর্দু, আরবি, ফারসি অথবা সংস্কৃত। এ পর্যায়ে তিনটি ভাষার কথা বললে অনেকে এর বিরোধিতা করে বলেন, এ পর্যায়ে তিনটি ভাষা ‘কোমলমতি’ শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। খুব অবাক হওয়ার মতো কথা, কারণ ‘কোমলমতি’ শিক্ষার্থীর ঘাড়ে আট-দশটা বিষয় চাপিয়ে দেওয়াকে তারা চাপ হয়েছে বলে মনে করেন না।

এর পরিবর্তে মাত্র একটি ভাষাকে তারা চাপ মনে করেন! আমাদের সময়ে স্কুলে প্রাথমিক পর্যায় শেষে ম্যাট্রিকুলেশন (matriculation) বা এখনকার এসএসসি পর্যন্ত আমরা তিনটি ভাষা শিক্ষা করেছি—বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, সংস্কৃত বা আরবি। এক্ষেত্রে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, অল্প বয়সে রাজনীতি, সমাজনীতি প্রভৃতি বিষয় ছাত্রদের জন্য দুরূহ হলেও ভাষা শিক্ষা অনেক সহজ। অল্প বয়সটাই হচ্ছে ভাষা শিক্ষার বয়স।

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে গণিত ও ভাষা ছাড়া অন্য বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। এ বিষয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ইতিহাস, সাহিত্য ও বিজ্ঞান। বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় হওয়া দরকার এই পর্যায়ে। এজন্য লঘু-গুরু মান নির্ণয় করে কোন পর্যায়ে কী করতে হবে, তা নির্ধারণ করা দরকার। ছোটগল্প এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তার সঙ্গে ভ্রমণকাহিনি।

হালকা প্রবন্ধও এই পর্যায়ে রাখা দরকার। ইতিহাস সম্পর্কে এখানে বিশেষভাবে বলা দরকার এজন্য যে, বাংলাদেশে প্রথম থেকেই স্কুলপর্যায়ে বিষয় হিসেবে ইতিহাসকে একেবারে বাদ দিয়ে শেখ মুজিব ইত্যাদি বিষয়ের স্থান করা হয়, যা সম্পূর্ণ নিষ্প্রয়োজন ও বর্জনযোগ্য। এ বিষয়ে এখানে বিস্তারিত কোনো আলোচনা সম্ভব নয়। শুধু এটুকু গুরুত্বের সঙ্গে বলা দরকার যে, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে যে পাঠ্যতালিকা আছে, তার মধ্যে যথার্থ শিক্ষার কোনো উপাদান নেই। সাধারণভাবে এই পাঠ্যতালিকা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসাধনের জন্যই নির্মিত হয়েছে। এই মাধ্যমিক বা সিলেবাস সম্পূর্ণ বাতিল করে বিজ্ঞানসম্মতভাবে তৈরি করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশই দুনিয়ার এমন এক দেশ যেখানে স্কুলপর্যায়ে ইতিহাসকে একটি পাঠ্যবিষয় হিসেবে উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এজন্য বাংলাদেশের নব্যশিক্ষিত লোকদের ও নতুন প্রজন্মের লোকদের ইতিহাস জ্ঞান বলে কিছু নেই। আমাদের সময় নবম-দশম শ্রেণিতে প্রাচীন ও মধ্যযুগের ভারত, ইংরেজ আমলের ভারত প্রভৃতি ইতিহাস পড়তে হতো। কাজেই একজন ম্যাট্রিক বা মাধ্যমিক পাস করা ছাত্রের সঙ্গে ভারতের ইতিহাসের মোটামুটি একটা পরিচয় থাকত। উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে একই সঙ্গে পড়ানো হতো ইংল্যান্ড ও ইউরোপের ইতিহাস।

বাংলাদেশের জনগণই সেই দুর্দশাগ্রস্ত জাতি, নিজেদের দেশের ইতিহাসের সঙ্গে যাদের কোনো পরিচয় নেই। এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার, ১৯৪৭ সালের আগে পর্যন্ত ভারতের প্রাচীন, মধ্যযুগীয় ও ব্রিটিশ আমলের ইতিহাস আমাদের ইতিহাস! সে ইতিহাস ভারতীয়দের ও পাকিস্তানিদের যেমন, আমাদেরও তেমনি অবশ্যপাঠ্য। তৎকালীন শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিহাসচর্চার দারিদ্র্য ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ অনেক আক্ষেপ, দুঃখ প্রকাশ ও সমালোচনা করেছিলেন। বর্তমান বাংলাদেশে স্কুলপর্যায়ে ইতিহাস পাঠ বন্ধ থাকা এবং সাধারণভাবে ইতিহাসচর্চার ভয়াবহ অবস্থা দেখলে তিনি মূর্ছা যেতেন।

ইতিহাস পাঠের এই অবস্থা এবং প্রকৃত ইতিহাসচর্চার অনুপস্থিতি দেশে মননশীল চিন্তা ও সৃষ্টিশীল সাহিত্যের ক্ষেত্রে কী পরিমাণ ক্ষতিসাধন করছে, তার কোনো চেতনা এ দেশের শিল্পী, সাহিত্যিক, ঐতিহাসিক ও সাধারণভাবে বুদ্ধিজীবীদের নেই। তারা এ বিষয়টি হিসাবের মধ্যেই আনেন না। স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে সৃজনশীল সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যে মরুভূমি-সদৃশ অবস্থা বিরাজ করছে, সে বিষয়ে তাদের কোনো চিন্তাভাবনাই দেখা যায় না। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি বইমেলায় হাজার হাজার অতি নিম্নমানের বইয়ের ছড়াছড়ি দেখে মনে হয়—বিদ্যাচর্চা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যে ভয়াবহতা বিরাজ করছে, সে বিষয়ে কোনো ধারণা বা হিসাব তাদের নেই।

প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার পূর্বোক্ত অবস্থা যে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সমস্যা ও সংকট সৃষ্টি করবে, এটাই স্বাভাবিক। এজন্য দেখা যাবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার মান বাংলাদেশ আমলে ভয়ংকরভাবে নিচে নেমে গেছে। শিক্ষার এই নিম্নমান নানা ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হলেও সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় উল্লেখযোগ্য গবেষণায় অনুপস্থিতির মধ্যে সামান্য ব্যতিক্রম থাকলেও শিক্ষকদের মধ্যে গবেষণার কোনো প্রয়োজনবোধ ও উৎসাহ নেই।

এর অন্যতম কারণ তাদের পদোন্নতি ও নানারকম সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে গবেষণার কোনো প্রয়োজন ও প্রাসঙ্গিকতা নেই। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর হওয়ার জন্য গবেষণালব্ধ জ্ঞান অর্জনের কোনো প্রয়োজন হয় না। সরকারি চাকরির মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সহযোগী প্রফেসর ও প্রফেসর হওয়ার জন্য এর প্রয়োজন না হওয়ায় তাদের মধ্যে এর জন্য স্বাভাবিকভাবেই কোনো তাগিদ সৃষ্টি হয় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর ছিলেন হাতে গোনা কয়েকজন। প্রথম দিকে রমেশ চন্দ্র মজুমদার ছিলেন একমাত্র প্রফেসর। যদুনাথ সরকার, সত্যেন বসু ও মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতো শিক্ষকরাও রিডার ছিলেন।

সাধারণভাবে শিক্ষাব্যবস্থার এই দুরবস্থার প্রভাব যে বিদ্যাচর্চা, বিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস প্রভৃতি চর্চার ওপর পড়বে, এটাই স্বাভাবিক। সাধারণ শিক্ষার ভয়াবহ দুরবস্থার এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের মধ্যে এসব ক্ষেত্রে যে বন্ধ্যত্ব দেখা যায়, তার অবসানের জন্য প্রয়োজন বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। এ বিষয়ে দৃষ্টিদান, প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পরিবর্তন যেকোনো গণতান্ত্রিক সরকারের ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি কর্তব্য।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন