আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

শিক্ষকদের প্রতি রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা ও অন্তর্নিহিত সংকট

হাবিব উল্লাহ রিফাত

শিক্ষকদের প্রতি রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা ও অন্তর্নিহিত সংকট

শিক্ষক সমাজের আলোকবর্তিকা। তাদের হাত ধরেই জাতির ভবিষ্যৎ নির্মিত হয়। তারা শুধু জ্ঞান বিতরণে সীমাবদ্ধ নন; বরং নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধের মতো গুণাবলি সঞ্চার করেন। একটি জাতির সুনাগরিক তৈরিতে এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন ঘটাতে সমাজ তথা রাষ্ট্রে শিক্ষকদের ভূমিকা তাই অগ্রগণ্য।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষক সমাজই আজ সবচেয়ে উপেক্ষিত ও অবহেলিত। তাদের প্রাপ্য সম্মান, মর্যাদা ও জীবিকা নির্ধারণের ক্ষেত্রে যে বৈষম্য রয়েছে, তা শুধু শিক্ষকদের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং পুরো জাতির অগ্রগতির ক্ষেত্রে অন্তরায়।

বিজ্ঞাপন

একটি জাতির উন্নয়নে শিক্ষকদের অবদান অপরিসীম। বিশেষ করে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকদের প্রতি বঞ্চনা ও অবহেলার চিত্র আরও বেশি সুস্পষ্ট। ঘুণে ধরা এ সমাজে শিক্ষক শ্রেণির অবস্থা অত্যন্ত করুণ। বাংলাদেশে শিক্ষকদের প্রতি অবহেলার পেছনে বহু কারণ নিহিত। প্রথমত, শিক্ষকের পেশাকে পেশাগতভাবে মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রতুল, ফলে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি এ পেশায় আসতে আগ্রহ হারান।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব প্রকট। কিছু প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা হলেও সেগুলোর গুণগত মান প্রশ্নবিদ্ধ। তৃতীয়ত, শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রেও অবনতি ঘটেছে। একসময় শিক্ষকরা সমাজের সর্বাধিক সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হতেন। কিন্তু বর্তমান বাণিজ্যিকীকৃত শিক্ষাব্যবস্থা তাদের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করেছে।

চতুর্থত, বাংলাদেশ সংবিধানের ১৭নং অনুচ্ছেদে শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই অধিকার বাস্তবায়নের প্রধান কারিগরদের জন্য কোনো সুসংহত নীতিমালা বা আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি। পঞ্চমত, শিক্ষাক্ষেত্রে বাজেট বরাদ্দের অপ্রতুলতা একটি বড় সমস্যা। উন্নত দেশগুলোয় শিক্ষা খাতে জিডিপির চার থেকে ছয় শতাংশ ব্যয় করা হয়, অথচ বাংলাদেশে এই হার দুই শতাংশের নিচে। এতে প্রমাণিত হয়, শিক্ষাব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি শিক্ষকদের উন্নয়নে রাষ্ট্র যথেষ্ট মনোযোগ দিচ্ছে না।

সব মিলিয়ে শিক্ষকদের প্রতি ক্রমবর্ধমান অবহেলার চিত্র জাতির ভবিষ্যতকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ‘শিক্ষার মূল ভিত্তি হলো শিক্ষক,’ এই সত্যটি উপেক্ষা করে কোনো জাতিই টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে পারে না। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (SDG) চতুর্থ লক্ষ্য হলো মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু শিক্ষকদের মানসম্মত কাজের পরিবেশ, প্রশিক্ষণ ও ন্যায্য সম্মান না দিলে এই লক্ষ্য অর্জন করা অসম্ভব।

অতএব শিক্ষকদের প্রতি অবহেলা দূর করতে হলে রাষ্ট্র ও সমাজকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে। শিক্ষকদের বেতন-ভাতা এবং আর্থিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে। তাদের পেশাগত উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে তারা যুগোপযোগী শিক্ষাদানের পদ্ধতি আয়ত্ত করতে পারেন। শিক্ষাব্যবস্থার বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ করে মানসম্মত শিক্ষার প্রসার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং তাদের প্রতি যেকোনো অন্যায় আচরণ প্রতিরোধে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

জাতি গঠনের কারিগর শিক্ষক, কিন্তু তারা যদি অবহেলিত থাকে, তাহলে জাতি কখনোই সঠিক পথে অগ্রসর হতে পারে না। ‘একজন ভালো শিক্ষক হাজার শিক্ষকের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ’—উইলিয়াম আর্থার ওয়ার্ডের এই উক্তি আমাদের বুঝিয়ে দেয় শিক্ষকদের অবদান কতটা গভীর। তাই শিক্ষকদের মর্যাদা, অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা শুধু তাদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন নয়, এটি পুরো জাতির প্রতি দায়িত্ব। শিক্ষককে তার যথাযোগ্য স্থান প্রদান করাই হবে একটি উন্নত, শিক্ষিত ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার মূল চাবিকাঠি।

লেখক: শিক্ষার্থী এমএসএস, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ,

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন