মধ্যপ্রাচ্যে নারী শ্রমিকের দুর্দশা ও রাষ্ট্রের দায়

মধ্যপ্রাচ্যে নারী শ্রমিকের দুর্দশা ও রাষ্ট্রের দায়

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ধর্মীয়, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে সৌদি আরব, কুয়েতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর গুরুত্ব অনস্বীকার্য। লাখ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক তাদের শ্রম, ঘাম ও ত্যাগের বিনিময়ে এসব দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। তাদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কিন্তু এই অর্থনৈতিক সম্পর্কের আড়ালে রয়েছে বৈষম্য, শোষণ, অমানবিক আচরণ এবং প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকারহরণের এক উদ্বেগজনক বাস্তবতা। কুয়েতে সামরিক কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ব্যাপক ভ্রমণের সুবাদে সেখানকার সমাজব্যবস্থা, প্রশাসনিক সংস্কৃতি, মানুষের আচরণ ও বিদেশিদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি কাছ থেকে পর্যবেক্ষণের সুযোগ আমার হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতার কিছু ছিল ইতিবাচক, আবার কিছু ছিল অত্যন্ত তিক্ত, বিস্ময়কর ও হতাশাজনক।

বিজ্ঞাপন

আমার পর্যবেক্ষণে, এসব দেশের সমাজ ও প্রশাসনের কিছু অংশে পশ্চিমা বিশ্বের নাগরিকদের প্রতি বিশেষ সমীহ এবং বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশের নাগরিকদের প্রতি অবজ্ঞাপূর্ণ মনোভাব লক্ষ করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে মানুষের যোগ্যতা, সততা ও মানবিক মর্যাদার পরিবর্তে তার জাতীয়তা, অর্থনৈতিক অবস্থান এবং পাসপোর্টের গুরুত্বই আচরণের মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়। অবশ্য সব আরব নাগরিক কিংবা সব সরকারি কর্মকর্তার আচরণ এক নয়। অনেক মানবিক, উদার ও ন্যায়পরায়ণ মানুষের সঙ্গেও পরিচয় হয়েছে। কিন্তু কিছু ব্যক্তির ইতিবাচক আচরণ দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও শ্রমিক নির্যাতনের বাস্তবতা আড়াল করা যায় না।

বর্ণবৈষম্য ও শ্রেণিগত অহংকারের বাস্তবতা

মধ্যপ্রাচ্যের কিছু সমাজে বিদেশি নাগরিকদের প্রতি আচরণে একটি অঘোষিত শ্রেণিবিন্যাস লক্ষ করা যায়। পশ্চিমা দেশের নাগরিকরা অনেক ক্ষেত্রে অধিক সম্মান, সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক মর্যাদা পান। অন্যদিকে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল কিংবা আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলো থেকে আসা শ্রমিকরা কখনো কখনো অবজ্ঞা, বৈষম্য এবং অসম আচরণের শিকার হন। এই বৈষম্য শুধু ব্যক্তিগত মনোভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; অনেক ক্ষেত্রে তা মজুরি, কর্মপরিবেশ, আবাসন, বিচারপ্রাপ্তি এবং প্রশাসনিক সেবায়ও প্রতিফলিত হয়।

বিশেষ করে গৃহকর্মী, নির্মাণশ্রমিক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও স্বল্প আয়ের অভিবাসীরা বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। তাদের অনেকেই ভাষা জানেন না, স্থানীয় আইন সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা নেই এবং নিয়োগকর্তার ওপর অর্থনৈতিক ও আইনগতভাবে নির্ভরশীল। প্রশ্ন হচ্ছে, একটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কি অন্য দেশের দরিদ্র মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার অধিকার দেয়? অবশ্যই নয়। মানুষের মর্যাদা তার জাতীয়তা, ধর্ম, বর্ণ কিংবা অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর নির্ভর করতে পারে না।

বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীদের অসহায়ত্ব

সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন বিদেশে গৃহকর্মে নিয়োজিত অনেক নারী। বাংলাদেশের অসংখ্য নারী সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় বহন, পরিবারের ঋণ পরিশোধ, বৃদ্ধ মা-বাবার চিকিৎসা কিংবা একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় বিদেশে যান। তাদের অনেকেই নিজের জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে পরিবারের অর্থনৈতিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু বিদেশে পৌঁছানোর পর কেউ কেউ এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হন, যেখানে তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা, শ্রমের ন্যায্যমূল্য এবং মৌলিক মানবাধিকার বিপন্ন হয়ে পড়ে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের মে মাসের অনুসন্ধানে সৌদি আরবে কর্মরত ৭০ জনের বেশি নারী গৃহকর্মীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, চলাফেরায় বাধা, পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া, মজুরি আটকে রাখা এবং শারীরিক, মৌখিক ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠে আসে। সাক্ষাৎকারদাতাদের অনেকেই দৈনিক অন্তত ১৬ ঘণ্টা কাজ করার কথা জানিয়েছেন। তাদের গড় মাসিক মজুরি ছিল প্রায় ৯০০ সৌদি রিয়ালÑঅর্থাৎ আনুমানিক ২৪০ মার্কিন ডলার। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত অ্যামনেস্টির আরেকটি অনুসন্ধানে সৌদি আরব থেকে ফিরে আসা ১৯ জন ফিলিপিনো নারীর অভিজ্ঞতায় দৈনিক ১৪ থেকে ২১ ঘণ্টা কাজ, সাপ্তাহিক বিশ্রামের অভাব এবং নির্যাতনের অভিযোগ উঠে আসে।

এসব অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সাক্ষাৎকারদাতাদের অভিজ্ঞতাভিত্তিক; সব নিয়োগকর্তা কিংবা সব গৃহকর্মীর অবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে না। কিন্তু অভিযোগগুলোর গুরুত্ব কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সমস্যাটি নতুন নয়। ২০১৯ সালের মার্চে রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে ব্র্যাকের তথ্যের ভিত্তিতে জানানো হয়, ২০১৮ সালে প্রায় ১ হাজার ৩০০ বাংলাদেশি নারী সৌদি আরব থেকে ফিরে নির্যাতন বা শোষণের অভিযোগ করেছিলেন। এই ঘটনাগুলো আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে : বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য রাষ্ট্র কি তার নাগরিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে দ্বিতীয় স্থানে রাখতে পারে?

কাফালাব্যবস্থা: শ্রমিকের ওপর নিয়োগকর্তার নিয়ন্ত্রণ

মধ্যপ্রাচ্যের অভিবাসী শ্রমিকদের দুর্দশার অন্যতম কাঠামোগত কারণ কাফালা বা স্পনসরশিপব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার বিভিন্ন রূপে একজন বিদেশি শ্রমিকের অভিবাসন-সংক্রান্ত অবস্থান নিয়োগকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত থাকে। ফলে কর্মস্থল পরিবর্তন, নিরাপদে চাকরি ছেড়ে দেওয়া কিংবা নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করার ক্ষেত্রে শ্রমিক নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে পারেন। বিশেষত, ব্যক্তিগত বাসাবাড়িতে কর্মরত নারী শ্রমিকদের পরিস্থিতি আরো জটিল। তাদের কর্মস্থল অনেক সময় বাইরের পর্যবেক্ষণ ও নিয়মিত শ্রমপরিদর্শনের আওতার বাইরে থাকে।

যে নারী একই পরিবারের ওপর বেতন, বাসস্থান ও নিরাপত্তার জন্য নির্ভরশীল, তার পক্ষে সেই পরিবারের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ করা অত্যন্ত কঠিন। সৌদি আরবে শ্রমনীতি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অনুসন্ধানে গৃহকর্মীদের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতির কথা উঠে এসেছে।

কুয়েতের ২০১৫ সালের গৃহকর্মী আইনে সাপ্তাহিক ছুটি, বছরে ৩০ দিনের বেতনসহ ছুটি এবং বিশ্রামসহ সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টার কর্মদিবসের বিধান রয়েছে। কিন্তু আইন প্রণয়ন এবং বাস্তবে তার প্রয়োগ এক বিষয় নয়। আইনের কার্যকারিতা বিচার করতে হবে শ্রমিক কতটা স্বাধীনভাবে অভিযোগ করতে পারেন, বিপজ্জনক কর্মস্থল ত্যাগ করতে পারেন এবং ন্যায়বিচার পানÑ এর ভিত্তিতে।

সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থা ও বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা

সৌদি আরবের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা নিয়েও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের হিসাবে, ২০২৫ সালে দেশটিতে অন্তত ৩৫৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩৪৫। সংস্থাটির উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রাণহানিবিহীন মাদকসংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ২৪০ জনের মধ্যে ১৮৮ জন ছিলেন বিদেশি নাগরিক।

এই পরিসংখ্যান সব ধরনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য; এগুলোকে গৃহকর্মীদের মামলা বা শিরশ্ছেদের পৃথক হিসাব হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। অপরাধের বিচার অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়ায় ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, আইনগত সহায়তার অভাব কিংবা যথাযথ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না থাকলে ন্যায়বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

বাংলাদেশের উচিত আটক প্রত্যেক নাগরিকের জন্য দ্রুত কনস্যুলার সহায়তা, দক্ষ আইনজীবী, দোভাষী এবং ন্যায়সংগত বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করা। ধর্মীয় বা আইনগত ব্যাখ্যা কখনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ, স্বচ্ছ বিচার এবং মানবাধিকারের বিকল্প হতে পারে না।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা

ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন বিদেশে গৃহকর্মীদের সুরক্ষার প্রশ্নে বিভিন্ন সময়ে শ্রমিক পাঠানো স্থগিত এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পথ অনুসরণ করেছে। ইন্দোনেশিয়া ২০১৫ সালে সৌদি আরবে কর্মী পাঠানোর ওপর স্থগিতাদেশ দেয়। পরে সুরক্ষাব্যবস্থা পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে সহযোগিতা আবার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফিলিপাইনও সৌদি আরবে কর্মী পাঠানো সাময়িকভাবে স্থগিত করে ২০২২ সালের নভেম্বরে নতুন সুরক্ষাসংক্রান্ত প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে পুনরায় কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ নেয়।

এসব অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, শ্রমিক পাঠানো সাময়িক স্থগিত রাখা কূটনৈতিক দর-কষাকষির একটি উপায় হতে পারে। তবে শুধু নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে বিকল্প কর্মসংস্থান, অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধ এবং কার্যকর নজরদারি থাকতে হবে।

বাংলাদেশের করণীয়: নিরাপত্তা আগে, বৈদেশিক মুদ্রা পরে

বাংলাদেশের অভিবাসননীতিতে মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। কতজন কর্মী বিদেশে গেলেন কিংবা কত বৈদেশিক মুদ্রা এলোÑএগুলোই সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না।

প্রথমত, সৌদি আরব ও কুয়েতে ব্যক্তিগত বাসাবাড়িতে থেকে গৃহকর্মে নিয়োজিত হওয়ার জন্য নতুন নারী কর্মী পাঠানো একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থগিত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত, যতক্ষণ না স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত হয়।

দ্বিতীয়ত, দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে কর্মীর পাসপোর্ট ও ফোন নিজের কাছে রাখা, নিয়মিত মজুরি প্রদান, বিশ্রাম, ছুটি এবং নিরাপদে চাকরি পরিবর্তনের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইং শক্তিশালী করতে হবে। পর্যাপ্ত কর্মকর্তা, নারী সুরক্ষা কর্মকর্তা, জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র, বাংলায় অভিযোগ গ্রহণ এবং দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

চতুর্থত, প্রতারণামূলক নিয়োগ, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, চুক্তি পরিবর্তন এবং বিপজ্জনক নিয়োগকর্তার কাছে জেনেশুনে কর্মী পাঠানোর ঘটনায় সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

পঞ্চমত, নির্যাতিত নারীদের দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা, আইনগত প্রতিকার, ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

ষষ্ঠত, কর্মী পাঠানো, নির্যাতনের অভিযোগ, জরুরি প্রত্যাবর্তন, মৃত্যু, বকেয়া মজুরি আদায় এবং বিচারিক ফলাফল সম্পর্কে নিয়মিত নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান প্রকাশ করতে হবে।

সপ্তমত, নারীদের জন্য দেশ ও বিদেশে নিরাপদ, দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে অর্থনৈতিক অসহায়ত্ব তাদের ঝুঁকিপূর্ণ চাকরি গ্রহণে বাধ্য না করে।

কূটনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে পারস্পরিক মর্যাদা

বাংলাদেশের সঙ্গে সৌদি আরব, কুয়েত এবং অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বন্ধুত্বের অর্থ অন্যায়কে নীরবে মেনে নেওয়া নয়। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের দায়িত্ব তার নাগরিকদের জীবন, স্বাধীনতা ও সম্মান রক্ষা করা। অর্থনৈতিক স্বার্থ কিংবা কূটনৈতিক সৌজন্যের কারণে সেই দায়িত্ব থেকে সরে আসা যায় না।

বাংলাদেশকে মনে রাখতে হবে, প্রবাসী শ্রমিকরা কোনো করুণার পাত্র নন। তারা পরিশ্রমের বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখেন। তাই তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন কোনো অনুগ্রহ নয়, বরং নৈতিক ও আইনগত দায়িত্ব।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকেও উপলব্ধি করতে হবে, আধুনিক অবকাঠামো, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদার প্রকৃত মূল্য তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন সমাজের সবচেয়ে অসহায় মানুষটিও ন্যায়বিচার ও মানবিক আচরণ পান।

শেষ কথা

কুয়েতে একজন বাংলাদেশি কূটনীতিক হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের পর্যবেক্ষণ আমাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধির দিকে নিয়ে গেছেÑঅর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সবসময় মানবিক উৎকর্ষের নিশ্চয়তা দেয় না। একটি রাষ্ট্র কতটা উন্নত, তার বিচার শুধু সম্পদ, আকাশচুম্বী ভবন কিংবা আন্তর্জাতিক প্রভাব দিয়ে করা যায় না। প্রকৃত সভ্যতার পরিচয় পাওয়া যায় দুর্বল, দরিদ্র ও বিদেশি মানুষের প্রতি তার আচরণে।

বাংলাদেশকে তাই আত্মমর্যাদাশীল, বাস্তববাদী ও মানবিক কূটনীতি অনুসরণ করতে হবে। বিদেশে কর্মসংস্থান অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তা কোনোভাবেই নাগরিকের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও সম্মানের বিনিময়ে হতে পারে না। রাষ্ট্রের কাছে একজন প্রবাসী নারীর জীবন ও মর্যাদার মূল্য যেকোনো শ্রমবাজার কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার আয়ের চেয়ে বেশি হতে হবে। কারণ মানুষ অর্থনীতির জন্য নয়; অর্থনীতি মানুষের কল্যাণের জন্য।

hrmrokan@hotmail.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন