ফ্রান্সসহ ইউরোপে বিক্ষোভের জন্য মুসলমানরা দায়ী!

ফ্রান্সসহ ইউরোপে বিক্ষোভের জন্য মুসলমানরা দায়ী!

ফ্রান্সে চলমান বিক্ষোভ ১৭ অক্টোবর সহিংস রূপ নিলে দেশটির কট্টর ডানপন্থিরা দ্রুতই বর্ণবাদী ভাষা ব্যবহার করে এই সহিংসতার জন্য মুসলিম তরুণদের দায়ী করতে শুরু করে। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও ফ্রান্সের সহিংসতার জন্য মুসলিম অভিবাসীদের দায়ী করেছেন। অবশ্য ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো এক কড়া বিবৃতিতে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর নাম উল্লেখ না করে বলেছেন, ফ্রান্সের সহিংসতার জন্য যারা মুসলমানদের ওপর দায় চাপাচ্ছেন, তারা স্টুপিডের (নির্বোধ) মতো কথা বলছেন।

বিজ্ঞাপন

ফ্রান্সের সহিংস বিক্ষোভের কয়েক সপ্তাহ আগে স্পেনের সিউটা ছিটমহলে প্রতিবেশী মরক্কো থেকে হাজার হাজার অভিবাসী প্রবেশের চেষ্টা করলে স্পেনের কট্টর ডানপন্থিরা একে মরক্কোর মুসলমানদের একটি সুসংগঠিত ‘আগ্রাসন’ বলে অভিহিত করেছিলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও দাবি করেছিলেন, স্পেনে প্রবেশের চেষ্টার মূল কারণÑ‘ইসলাম সবকিছু দখল করে নিতে চায়’। পশ্চিমা বিশ্বে যেকোনো সংকটে ইসলামভীতি (ইসলামোফোবিয়া) উসকে দেওয়ার ক্ষেত্রে কট্টর ডানপন্থিদের এই প্রবণতায় আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কেননা তারা বরাবরই এটা করে আসছে। তবে ইউরোপের ক্রমবর্ধমান দুর্দশার জন্য ইসলাম ও মুসলমানদের দায়ী করার ধারণাটি এখন আর শুধু ইউরোপীয় রাজনীতির চরমপন্থি বলয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এর বাইরেও এটা ছড়িয়ে পড়েছে সাম্প্রতিক সময়ে।

ফ্রান্সে যখন শিক্ষার্থীদের চলমান বিক্ষোভ তীব্র হচ্ছিল, তখন ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নীরবেই ইসলাম ও মুসলিমবিরোধী একটি প্রস্তাব পাস করে। এই প্রস্তাবটির বিষয় ছিলÑ‘ইসলামপন্থি অনুপ্রবেশ এবং মুসলিম ব্রাদারহুড নেটওয়ার্কের প্রভাব মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি কৌশল প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা।’ প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিল মধ্য-ডানপন্থি ‘ইউরোপিয়ান পিপলস পার্টি’ (ইপিপি), যা ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বৃহত্তম রাজনৈতিক গোষ্ঠী। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডের লিয়েন এ দলেরই সদস্য।

প্রস্তাবটির পক্ষে ৩৮১টি এবং বিপক্ষে ১৬৭ ভোট পড়ে। ১৫ জন ভোটদান থেকে বিরত ছিলেন। ইপিপির এই প্রস্তাবকে প্রায় সর্বসম্মতভাবে সমর্থন জানায় চারটি দলÑকট্টর ডানপন্থি ‘প্যাট্রিয়টস ফর ইউরোপ’ ও ‘ইউরোপ অব সভরেন নেশনস’, উদারপন্থি ‘রিনিউ ইউরোপ’ এবং ‘ইউরোপিয়ান কনজারভেটিভস অ্যান্ড রিফার্মিস্টস’। অন্যদিকে, সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট, বামপন্থি এবং গ্রিনসের (সবুজ দল) সদস্যরা এর বিপক্ষে ভোট দিলেও তারা প্রস্তাবটি পাস হওয়া ঠেকাতে পারেননি। ফ্রান্স সরকারের ‘রাজনৈতিক ইসলামবাদ’বিষয়ক একটি বিতর্কিত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই প্রস্তাবে বেশ কিছু ত্রুটিপূর্ণ দাবি করা হয়েছে, যা মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।

এই প্রস্তাবে ইউরোপে ‘ইসলামপন্থি অনুপ্রবেশবাদ’র সংজ্ঞায় তাদের কার্যক্রমের কয়েকটি ধাপের কথা বলা হয়েছে। এগুলো হচ্ছেÑ‘প্রভাব বিস্তার, পর্যায়ক্রমিক কাঠামো গঠন, প্রাতিষ্ঠানিক অনুপ্রবেশ এবং আদর্শগত বৈধতা অর্জনের একটি রাজনৈতিক কৌশল।’ প্রস্তাবে দাবি করা হয়েছে, ‘ইসলামপন্থি প্রভাব বিভিন্ন সংগঠন, ফাউন্ডেশন এবং সাংস্কৃতিক, শিক্ষামূলক, ধর্মীয়, দাতব্য, বিশ্ববিদ্যালয়, যুব, বৈষম্যবিরোধী বা সামাজিক কর্মকাণ্ডের মতো বিস্তৃত ও খণ্ডিত কাঠামোর মাধ্যমে কাজ করে।’ সোজা কথায়, মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো নেটওয়ার্কগুলো ‘ইসলামভীতিবিরোধী’ উদ্যোগের মাধ্যমে ইউরোপীয় সমাজে ‘অনুপ্রবেশ’ করে।

অবশ্য এই প্রস্তাবটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য কার্যকর করা বাধ্যতামূলক নয়। মুসলিম ব্রাদারহুড এবং এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি বা সত্তাগুলোকে সন্ত্রাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার যে আহ্বান এই প্রস্তাবে জানানো হয়েছে, তা পুরো ইউরোপে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ ব্রাদারহুড রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে সহিংসতাকে বর্জন করেছে। তবে, প্রস্তাবটি এমন একটি আদর্শিক কাঠামোকে বৈধতা দেয়, যা মুসলিমদের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। এটি রাষ্ট্র থেকে স্বাধীনভাবে পরিচালিত মুসলিম প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলোকে সন্দেহের চোখে দেখে এবং জনজীবনে মুসলিম সুশীল সমাজের অংশগ্রহণকে এক ধরনের ‘অনুপ্রবেশ’ হিসেবে চিত্রিত করে।

এই প্রস্তাবে ব্রাসেলসভিত্তিক ‘ইউরোপীয় নেটওয়ার্ক অ্যাগেইনস্ট রেসিজম’সহ কয়েকটি সংগঠনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলো ‘ইসলামপন্থি’ আচরণ করছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ কারণে এগুলোর জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের তহবিলপ্রাপ্তির পথ বন্ধ করার এবং ইইউর অর্থায়নে পরিচালিত কোনো সংস্থাকে তাদের সঙ্গে কাজ করা থেকে বিরত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এই প্রস্তাবটি ইউরোপের বাইরের পক্ষগুলোও সহজেই একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে এবং ইতোমধ্যে তা করা হয়েছেও। উদাহরণস্বরূপ সংযুক্ত আরব আমিরাতের কথা বলা যায়। আরব আমিরাত ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলে এমন একটি ব্যাপক প্রচারণায় অর্থায়ন করেছে, যার লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থাকে ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’র সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের ইমেজ ক্ষুণ্ণ করা। এই প্রস্তাবটি উত্থাপনের কয়েক মাস আগে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে আয়োজিত ‘মুসলিম ব্রাদারহুড : ইউরোপের জন্য একটি প্রকৃত হুমকি’ শীর্ষক এক সম্মেলনে আমিরাতের একজন রাষ্ট্রদূত অংশগ্রহণ করেছিলেন। এ থেকে স্পষ্ট, ইইউ পার্লামেন্টে মুসলিমবিরোধী প্রস্তাব পাসে আমিরাত প্রভাব খাটিয়েছে। এই প্রস্তাবে কাতার বা তুরস্ক থেকে আসা তথাকথিত ‘ইসলামপন্থি অনুপ্রবেশ’র পেছনে ‘বিদেশি অর্থায়ন’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, যা পর্দার আড়ালের ভূরাজনীতিরই আরেকটি ইঙ্গিত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রস্তাবটি বর্ণবাদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের সুরক্ষা লাভের প্রচেষ্টাকে একটি ‘ইসলামপন্থি অনুপ্রবেশের ষড়যন্ত্র’ হিসেবে চিত্রিত করেছে। এটি ইউরোপীয় সমাজে ইসলামোফোবিয়া বা ইসলামবিদ্বেষ মোকাবিলার লক্ষ্যে গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। প্রস্তাবটি ইউরোপের কট্টর ডানপন্থি ও মুসলিমবিদ্বেষী শক্তিগুলোর জন্য একটি বড় বিজয়। ইউরোপে ইসলামোফোবিয়া বা ইসলামভীতির ধরন কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, তা এই প্রস্তাব থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

মধ্য-ডানপন্থি রাজনৈতিক শিবিরের জন্য এই ইসলামবিদ্বেষী কাঠামোটি নানা রাজনৈতিক সুবিধা বয়ে আনে। এটি শুধু মুসলিমবিরোধী ভীতি ছড়ানোর মাধ্যমে নির্বাচনি ফায়দা হাসিল করতেই সাহায্য করে না, বরং বামপন্থি সেই অংশটিকেও আঘাত করার সুযোগ করে দেয়, যারা বর্ণবাদকে প্রত্যাখ্যান করে মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়ায়।

ফ্রান্সের রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘ইসলামো-লেফটিজম’ (ফরাসি ভাষায় ‘ইসলামো-গোশিস্ম’) বা ‘ইসলামি-বামপন্থা’ ধারণাটির প্রচার মোটেও আশ্চর্যজনক নয়। বামপন্থি দল ‘লা ফ্রান্স আনসুমিজ’র নেতা জঁ-লুক মেলঁশোঁ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং তিনি আগামী বছরের প্রথমার্ধে হতে যাওয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে একজন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হচ্ছে যে, তিনি ফ্রান্সে চলমান আন্দোলনে তথাকথিত ‘দাঙ্গাবাজদের’ উসকে দিচ্ছেন। আর এই ‘দাঙ্গাবাজ’ বলতে মূলত মুসলিমদেরই ইঙ্গিত করা হচ্ছে। বামপন্থি ও মুসলিমদের ওপর এই দ্বিমুখী আক্রমণ অনেকটা সেই পুরোনো ‘ইহুদি-বলশেভিক’ ষড়যন্ত্র তত্ত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে দাবি করা হতো যে, পশ্চিমা সভ্যতা ধ্বংস করার লক্ষ্যে ইহুদিরাই কমিউনিজম ছড়িয়ে দিচ্ছে।

আজকের দিনে ‘ইসলামো-লেফটিজম’ বা ‘ইসলামি-বামপন্থা’ ধারণাটি রক্ষণশীল, উদারপন্থি এবং কট্টর ডানপন্থিদের কাছে নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। ১৯৬০-এর দশক থেকে বর্ণবাদ ও অসমতা দূর করার ক্ষেত্রে পশ্চিমা বিশ্বে যেটুকু অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে, সেটাকে নস্যাৎ করে একটি প্রতি-বিপ্লব বা কাউন্টার রেভলিউশন সম্পন্ন করার চেষ্টায় তারা এই ধারণাটিকে ব্যবহার করছে। তাদের এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য যেন এমন এক ‘ইউরোপীয় দুর্গ’ গড়ে তোলা, যেখানে মুসলিমদের কোনো স্থান নেই।

‘ইসলামপন্থি অনুপ্রবেশ’-সংক্রান্ত প্রস্তাবটির ভিত্তি এই মুহূর্তে যতই দুর্বল হোক না কেন, ইউরোপের বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্রে কট্টর ডানপন্থি জোটগুলো হয়তো ভবিষ্যতে আরো এমন সব পদক্ষেপ নেবে, যার উদ্দেশ্য হবে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে মুসলমানদের সক্রিয় হয়ে ওঠাকে বাধাগ্রস্ত করা। বিশেষ করে, যখন সেই সক্রিয়তা মুসলিমদের নাগরিক স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলে। একই সঙ্গে, যারা ভীতি ছড়ায়, তারা সামাজিক নানা সমস্যার জন্য ইসলামকেই দায়ী করতে থাকবে, এমনকি কৃচ্ছ্র নীতির বিরুদ্ধে যে ন্যায়সংগত প্রতিবাদ গড়ে ওঠে, তার জন্যও তারা ইসলামকেই দোষারোপ করবে।

ইউরোপের রাজনীতিবিদরা নিজেদের দলীয় সরকারের শাসনকার্যের ব্যর্থতা থেকে সৃষ্ট জনরোষকে মুসলমানদের দিকে ধাবিত করার চেষ্টা করে যাবেন। এর মাধ্যমেই তারা জনগণের দৃষ্টি বা মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে নিতে ইসলাম ও মুসলমানদের সামনে নিয়ে আসবেন। এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজন সবার জন্য নাগরিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া এবং উগ্র ডানপন্থিদের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ গড়ে তোলা।

আলজাজিরা অবলম্বনে মোতালেব জামালী

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন