আমেরিকার বিচার বিভাগ সম্প্রতি ‘অপারেশন হার্ড বল’ নামের একটি অভিযানের ঘোষণা দিয়েছে। ভারতে বসে যারা আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্র চালায়, তাদের বিরুদ্ধে এটি ইতিহাসে অন্যতম বড় এক আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ। আমেরিকা, কানাডা ও ইউরোপের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো একসঙ্গে মিলে এই অভিযানটি চালিয়েছে। তারা বেশ কয়েকটি বড় অপরাধী চক্রের নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এই চক্রগুলোর বিরুদ্ধে উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়াজুড়ে চাঁদাবাজি, মাদক পাচার, ভাড়া করে খুন, অস্ত্রের কারবার এবং মানি লন্ডারিংয়ের মতো মারাত্মক সব অভিযোগ রয়েছে। তবে এই অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর অন্য একটি বিষয় আবার আলোচনায় এসেছে। ২০২৩ সালের জুন মাসে কানাডায় শিখ অ্যাক্টিভিস্ট হরদীপ সিং নিজ্জারকে হত্যা করা হয়েছিল। সেই ঘটনাটি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে শোরগোল শুরু হয়েছে। অনেকেই এখন নিজ দেশের সীমানা পেরিয়ে অন্য দেশে গিয়ে ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনের একটি চেনা ছক বা ধারা দেখতে পাচ্ছেন।
এই মাসের শুরুর দিকে আমেরিকার একটি ফেডারেল আদালতে একটি অভিযোগপত্র পেশ করা হয়। সেখানে কারাগারে বন্দি গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোই এবং উত্তর আমেরিকায় তার সহযোগী সতিন্দরজিৎ সিং ওরফে গোল্ডি ব্রারের নাম রয়েছে। নিজ্জার হত্যাকাণ্ডে এই দুজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে সরাসরি ভারত সরকারকে দায়ী করা না হলেও পরোক্ষভাবে তাদের দিকেই আঙুল তোলা হয়েছে। তবে অভিযোগের ভাষাটা বেশ কৌশলী। কিন্তু এই ঘটনার কারণে ভারতের গায়ে যে অপবাদের দাগ লেগেছে, তা সহজে মুছে যাওয়ার নয়। এটি ভারতের ভাবমূর্তির ওপর দীর্ঘ সময় ধরে কালো ছায়া ফেলে রাখবে।
অপারেশন হার্ড বল : একটি ঐতিহাসিক তদন্ত
সরকারি কৌঁসুলিরা জানিয়েছেন, ভারতীয় নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্র উত্তর আমেরিকা এবং ভারত থেকে এই অপরাধের জাল বুনেছিল। অপারেশন হার্ড বলের মূল লক্ষ্য ছিল ভারতে সক্রিয় অন্তত তিনটি অপরাধী সিন্ডিকেট। এই অভিযানে আমেরিকার ফেডারেল প্রসিকিউটররা ৩৭ জন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন। পুলিশ আমেরিকা, কানাডা, স্পেনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ২৪ জন সন্দেহভাজন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করেছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো দুই দেশ থেকেই প্রায় এক হাজার কেজি কোকেন এবং মেথামফেটামিন উদ্ধার করেছে। সেইসঙ্গে হেরোইন, বিপুল পরিমাণ অস্ত্র এবং লাখ লাখ ডলার জব্দ করা হয়েছে।
একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ফেডারেল আদালতের নথিপত্র ঘেঁটে এক বিশাল আন্তর্জাতিক অপরাধের ষড়যন্ত্রের প্রমাণ মিলেছে। বিভিন্ন দেশের পুলিশ একজোট হয়ে ভারতে গড়ে ওঠা তিনটি বড় অপরাধী চক্রের বিশাল নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে। এরা উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে প্রায় এক হাজার কেজি কোকেন ও মেথামফেটামিনসহ প্রচুর হেরোইন পাচার করেছিল।
কারাগার থেকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ সিন্ডিকেট চালাচ্ছে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং : আমেরিকার আদালতের চার্জশিট
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরো জানানো হয়েছে, লরেন্স বিষ্ণোইয়ের অপরাধ চক্রটি এখন আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটে পরিণত হয়েছে। এর নেতারা ভারতের কারাগারে বন্দি থেকেও চোরাই মোবাইল ফোন, এনক্রিপ্টেড অ্যাপ এবং বিদেশের বন্ধুদের ব্যবহার করছে। তারা বিদেশ থেকেই চাঁদাবাজি করছে, ভাড়াটে দিয়ে মানুষ খুন করাচ্ছে, মাদকের চালান পাঠাচ্ছে এবং প্রবাসী ভারতীয় সম্প্রদায়ের মানুষদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে।
নিজ্জার হত্যাকাণ্ড এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েন
সবচেয়ে বড় অভিযোগটি হলো, লরেন্স বিষ্ণোই এবং গোল্ডি ব্রার তাদের লোকজনকে দিয়ে ব্রিটিশ কলম্বিয়ার সারি এলাকার একটি শিখ মন্দিরের বাইরে হরদীপ সিং নিজ্জারকে খুন করিয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ডের পর ভারত ও কানাডার মধ্যে চরম কূটনৈতিক বিরোধ তৈরি হয়। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো নিজেই তখন ঘোষণা করেছিলেন, নিজ্জার হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার হাত থাকার বিষয়টি তাদের গোয়েন্দারা তদন্ত করে দেখছেন।
নয়াদিল্লি সঙ্গে সঙ্গেই এই অভিযোগকে ‘অযৌক্তিক’ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দেয়। ফলে কমনওয়েলথভুক্ত এই দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে মারাত্মক অবনতি ঘটে।
হরদীপ সিং নিজ্জার ছিলেন শিখদের স্বাধীন রাষ্ট্র ‘খালিস্তান’ প্রতিষ্ঠা আন্দোলনের কর্মী। তিনি ব্রিটিশ কলম্বিয়ার সারিতে অবস্থিত গুরু নানক শিখ গুরুদ্বারের সাবেক সভাপতি ছিলেন। এছাড়া তিনি ‘শিখস ফর জাস্টিস’ সংগঠনে যুক্ত হয়ে খালিস্তান গণভোট আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন।
অন্যদিকে ভারত সরকারের দাবি ছিল ভিন্ন। তারা বলত, নিজ্জার আসলে ভারত সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন ‘খালিস্তান টাইগার ফোর্স’-এর শীর্ষ কমান্ডার এবং মূল পরিকল্পনাকারী। ভারত সরকার তাকে সন্ত্রাসী হিসেবে ঘোষণা করেছিল এবং ইন্টারপোল তার বিরুদ্ধে দুটি রেড নোটিশও জারি করেছিল। তবে নিজ্জারের সমর্থক এবং শিখ সংগঠনগুলো তাকে সবসময়ই শান্তিকামী মানবাধিকার কর্মী হিসেবে বর্ণনা করে এসেছে। ২০২৩ সালের ১৮ জুন নিজ্জারকে তার গুরুদ্বারের বাইরে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই খুনের ঘটনায় কানাডা ও ভারতের মধ্যে তীব্র কূটনৈতিক উত্তেজনা দেখা দেয়। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো দাবি করেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ভারত সরকারের কর্মকর্তারা জড়িত ছিলেন। এরপর ২০২৬ সালের জুলাই মাসে আমেরিকার বিচার বিভাগ ভারতের একটি অপরাধী চক্রের দুই সদস্য লরেন্স বিষ্ণোই ও তার সহযোগীর বিরুদ্ধে এই খুনের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ আনে।
আমেরিকার সাম্প্রতিক এই চার্জশিট কানাডার সেই দাবিকেই আরো জোরালো করেছে যে, নিজ্জার হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা ছিল বিষ্ণোই গ্যাং। তবে একটা বিষয়ে খেয়াল রাখা দরকার। কানাডার গোয়েন্দা রিপোর্টে সরাসরি ভারত সরকারের কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার কথা বলা হলেও আমেরিকার এই ফৌজদারি চার্জশিটে কিন্তু তেমন কোনো দাবি করা হয়নি। এই দুইয়ের তফাতটা আমাদের বুঝতে হবে। আমেরিকার ফেডারেল আদালতে কোনো অপরাধ প্রমাণ করতে হলে অকাট্য প্রমাণের প্রয়োজন হয়। আর গোয়েন্দা রিপোর্টগুলো তৈরি হয় এমন কিছু সংবেদনশীল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে, যা সবসময় সবার সামনে প্রকাশ করা যায় না।
সংগঠিত অপরাধ এবং গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে কথিত যোগাযোগ এই বিতর্কটি এখন আর শুধু অপরাধ জগতের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই। এর পরিধি আরো বেড়ে গেছে।
কানাডার গণমাধ্যম এবং রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, সিঙ্গাপুরে একটি গোপন বৈঠকের সময় কানাডার শীর্ষ কর্মকর্তারা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের হাতে কিছু গোয়েন্দা তথ্য তুলে দিয়েছিলেন। রিপোর্টে বলা হয়েছে, কানাডীয় কর্তৃপক্ষ দোভালকে জানায়, তাদের গোয়েন্দা তথ্যে ভারতীয় কর্মকর্তা এবং বিষ্ণোই নেটওয়ার্কের অপরাধীদের মধ্যে সম্পর্কের প্রমাণ মিলেছে। অজিত ডোভাল অবশ্য ভারত সরকারের জড়িত থাকার কথা পুরোপুরি অস্বীকার করেন। তবে লরেন্স বিষ্ণোই যে জেলখানায় বসেই অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে, সেই বিষয়টি তিনি স্বীকার করেছিলেন।
মনে রাখা ভালো, কোনো অভিযোগ মানেই কিন্তু আদালতের চূড়ান্ত রায় নয়। কোনো আদালত এখনো প্রমাণ করতে পারেনি যে, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। ভারতও শুরু থেকেই এই দাবি অস্বীকার করে আসছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই অভিযোগের কারণে আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের দিকে সন্দেহের চোখেই তাকানো হচ্ছে। ভারত ও পশ্চিমা দেশগুলোর দ্বিপক্ষীয় আলোচনার টেবিলেও এই বিষয়টি বারবার ঘুরেফিরে আসছে।
ভিন্ন দেশে দমনপীড়নের এক বিস্তৃত ছক
নিজ্জার হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক মহলে অন্য একটি পুরোনো বিতর্ককে আবার নতুন করে উসকে দিয়েছে। বিষয়টি হলো ‘ট্রান্সন্যাশনাল রিপ্রেশন’ বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন। এটি এমন একটি চর্চা, যেখানে কোনো দেশের সরকার নিজের সীমানা পেরিয়ে অন্য দেশে গিয়ে রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের ভয় দেখায়, হুমকি দেয়, নজরদারিতে রাখে, অপহরণ করে, কিংবা তাদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করে।
পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলো এখন প্রবাসী সম্প্রদায়ের ওপর বিদেশি শক্তির এমন হস্তক্ষেপ নিয়ে বেশ চিন্তিত। রাশিয়া, চীন, ইরান, সৌদি আরব বা অন্য দেশের নজরদারিতে থাকা গণতান্ত্রিক দেশগুলোর আইনপ্রণেতারা নতুন নতুন আইন তৈরি করছেন। তারা নিজেদের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করার ব্যবস্থা আরো জোরদার করছেন এবং বিদেশি মিশনগুলোর ওপর কড়া নজর রাখছেন।
এখন ভারতও এই আলোচনার অংশ হয়ে পড়েছে। প্রবাসে রাষ্ট্রীয় মদতে পরিকল্পিতভাবে মানুষ হত্যার কোনো সুনির্দিষ্ট বা নিয়মতান্ত্রিক নীতি ভারতের আছে কি না, তার প্রকাশ্য কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। কিন্তু এই অভিযোগ ওঠার কারণেই নয়া দিল্লিকে এখন আন্তর্জাতিক মহলে নজিরবিহীন জবাবদিহিতার মুখে পড়তে হচ্ছে। কানাডা ও আমেরিকার তদন্ত, আর তার সঙ্গে নিউ ইয়র্কে আরেকজন শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীকে ভাড়াটে দিয়ে হত্যার পরিকল্পনার মার্কিন মামলা—সব মিলিয়ে পশ্চিমা নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মনে ভারতকে নিয়ে উদ্বেগ এখন অনেকটাই বেড়ে গেছে।
তবে এই ঘটনাগুলো কি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা, নাকি কোনো মধ্যস্থতাকারীর ব্যক্তিগত কাজ, নাকি এটি বড় কোনো গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ, তা এখনো পরিষ্কার নয়। আদালতের প্রকাশ্য বিচার এবং নিরপেক্ষ তদন্তই কেবল এই প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর দিতে পারে।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও অপহরণের অভিযোগ
বেশ কয়েকটি বিদেশি সরকার, অনুসন্ধানী সাংবাদিক এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, অপহরণ এবং বিদেশে দমনপীড়নের অভিযোগ তুলেছে। তাদের দাবি, মূলত কাশ্মীরি এবং শিখ উগ্রপন্থিদের দমনের জন্য ভারত গোপনে এসব অভিযান চালায়।
বাংলাদেশেও ভারতের এ ধরনের ব্যাপক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। পাকিস্তানের সরকার এবং অন্য তদন্তকারীরা দাবি করেছেন, ভারতের প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW) পাকিস্তানে বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। পাকিস্তানের তদন্তকারীদের দাবি, ডজনেরও বেশি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে স্থানীয় সন্ত্রাসী এবং বিদেশি শুটারদের যোগাযোগ পাওয়া গেছে। আর এদের পেছনে ভারতের এজেন্টরা ‘হাওয়ালা’ বা হুন্ডি সিস্টেমের মাধ্যমে টাকা জুগিয়েছে।
ভারত অবশ্য বরাবরের মতোই দেশের বাইরে এ ধরনের হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে এসেছে। তারা এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলেই দাবি করে।
তবে বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার ও নিরাপত্তা পর্যবেক্ষকরা রাষ্ট্রীয় মদতে সীমান্তের ওপারে এমন দমনপীড়ন বেড়ে যাওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ভূরাজনৈতিক সমীকরণের কারণে যেসব পশ্চিমা দেশ ভারতের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য ও নিরাপত্তা শেয়ার করে, তারাও এখন বেশ সংকটে পড়েছে। এই বিষয়গুলো নিয়ে কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং আন্তর্জাতিক মহলে কড়া নজরদারি এখনো অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্বমঞ্চে ভারতের মর্যাদার ওপর এর প্রভাব
বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ভারতের অবস্থান এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। ভারত এখন আমেরিকার ও ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অংশীদার। তারা কোয়াডের সদস্য, গ্লোবাল সাউথের অন্যতম নেতা এবং বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল প্রধান অর্থনীতিগুলোর একটি। যেকোনো মাপকাঠিতেই ভারতের এই অর্জনগুলো বেশ ঈর্ষণীয়। আর ঠিক এই কারণেই বর্তমান অভিযোগগুলো ভারতের জন্য অনেক বেশি মারাত্মক রূপ নিয়েছে।
গণতান্ত্রিক মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক বিশ্বাস সবচেয়ে বড় বিষয়। বাণিজ্য ঘাটতি কিংবা সমুদ্রে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের চেয়েও এই বিশ্বাসের মূল্য অনেক বেশি। গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান, আসামি প্রত্যর্পণ চুক্তি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর যৌথ কাজ এবং আইনি সহায়তার জন্য দেশগুলোর মধ্যে একে অপরের প্রতি গভীর আস্থা থাকতে হয়। প্রতিটি দেশই আশা করে যে অন্য দেশ আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলবে এবং তাদের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাবে।
ভারতের বিরুদ্ধে এখন যে ধরনের অভিযোগ উঠেছে, তার সত্যতা প্রমাণিত না হলেও দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এর একটা বড় প্রভাব পড়বেই। অন্য একটি দেশের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা লঙ্ঘনের মতো সংবেদনশীল বিষয় যখন সামনে আসে, তখন তার একটি বড় কূটনৈতিক মূল্য চোকাতে হয়। ভারত নিশ্চয়ই চাইবে, যেকোনো বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ উঠলে তা কেবল ফাঁকা বুলি বা রাজনীতির টেবিলে না রেখে আইনি ও কূটনৈতিক উপায়ে খোলামেলাভাবে সমাধান করা হোক। ভবিষ্যতে যাতে এমন অপবাদের মুখে আর পড়তে না হয়, সেজন্যই ভারতের এটি করা দরকার।
ঠিক একইভাবে কানাডার তোলা অভিযোগ কিংবা আমেরিকার আইনি পদক্ষেপের বিষয়টিও রাজনৈতিক বক্তব্যের বদলে তথ্য-প্রমাণ, সঠিক আইনি প্রক্রিয়া এবং আদালতের রায়ের ওপর ভিত্তি করেই বিচার করা উচিত। সরকারের বন্ধু বা শত্রু যার বিরুদ্ধেই অভিযোগ উঠুক না কেন, তা যখন আদালতে সুষ্ঠুভাবে যাচাই করা হয়, তখনই একটি গণতন্ত্র আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, ‘অপারেশন হার্ড বল’ ভারতের সঙ্গে যুক্ত ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল ও বড় একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ সিন্ডিকেটের মুখোশ খুলে দিয়েছে। লরেন্স বিষ্ণোই, গোল্ডি ব্রার এবং তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা থেকে স্পষ্ট, এই নেটওয়ার্কটি বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে বসে খুনের আদেশ দিতে, চাঁদাবাজি করতে, কিংবা মাদকের চালান পাঠাতে সক্ষম।
তবে এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক দমনপীড়নের মতো একটি পুরোনো বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে। প্রবাসে থাকা মানুষদের কীভাবে এই বিপদ থেকে রক্ষা করা যায় এবং আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলোকে কীভাবে দায়বদ্ধ করা যায়, সেই প্রশ্নটি আবার বড় হয়ে উঠেছে। কানাডা যেখানে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযোগ তুলেছে, সেখানে আমেরিকা নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে সীমিত পরিসরে আদালতে মামলা করেছে। এটি প্রমাণ করে, অনেক সময় গোয়েন্দা তথ্য ও আসল আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে কতটা জটিলতা তৈরি হতে পারে।
কিন্তু ভারতের জন্য এই সবকিছুর মানে কি? এর মানে হলো, বিশ্বমঞ্চে একটি উদীয়মান পরাশক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে ভারতকে কেবল অর্থনৈতিক শক্তি কিংবা ক্ষমতার দাপট দেখালেই চলবে না। পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলো ভারতের আইনের শাসন, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং অন্য দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের ওপর কতটা ভরসা করতে পারছে, তার ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করবে। এই অভিযোগগুলো শেষ পর্যন্ত কতটুকু প্রমাণিত হয়, আদালতের রায় কী আসে এবং পরিপক্ব কূটনীতির মাধ্যমে কীভাবে এর সমাধান করা হয়, তার ওপর শুধু কানাডা ও ভারতের সম্পর্কই নির্ভর করছে না; বরং এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ এবং সর্বব্যাপী ছড়িয়ে যাওয়া দমনপীড়নের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক লড়াইয়ের গ্রহণযোগ্যতাও ঠিক করে দেবে।
লেখক : যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাউথ এশিয়া জার্নালের প্রকাশক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


