বাংলাদেশের সাংবাদিকতা নিয়ে অভিযোগ, ক্ষোভ ও হতাশা আছে ঢের। এখানে সাংবাদিকেরা সরকারের লেজুড়বৃত্তি করে, ক্ষমতার পদলেহন করে বিত্তবৈভব গড়ে, অতিশয় রাজনীতিপ্রবণ ও দলান্ধ হয়ে সত্যবিমুখ হয়। এতসব অভিযোগের আংশিক সত্যতা সত্ত্বেও দেশের প্রতিটি মুক্তিসংগ্রামে সাংবাদিকরাই পথ দেখিয়েছেন; লড়াইয়ের অন্যতম নিয়ামক শক্তি হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন। হাজারো প্রতিকূলতা, দমন-পীড়ন ও লালচোখ উপেক্ষা করে মানুষের কাছে তথ্য সরবরাহ করে মুক্তিসংগ্রামকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে অনবদ্য দায়িত্ব পালন করেছেন।
বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিস্মরণীয় বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থানেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের অভূতপূর্ব ও রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদের দোসর একশ্রেণির সাংবাদিকের ভূমিকা যেমন ছিল কলঙ্কময়, আবার অনেকের সাহসী ও গৌরবময় অবদান অস্বীকার করলে সত্যকে উপেক্ষা করা হবে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সূত্র ধরে শুরু হওয়া বিক্ষোভ একপর্যায়ে রূপ নেয় একদফার সরকার পতনের আন্দোলনে। এই ঐতিহাসিক গণজাগরণের দিনগুলোয় অবরুদ্ধ বাংলাদেশে সাংবাদিকতা পেশাটি এক চরম অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছিল। দফায় দফায় ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট বা শাটডাউন করে তথ্যপ্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর ও ভীতিকর পরিস্থিতিতে নিজের জীবনবাজি রেখে দায়িত্ব পালন করেছেন বাংলাদেশের মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকেরা।
একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে তথ্য পাওয়ার অধিকার মানুষের মৌলিক অধিকারের শামিল। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় তৎকালীন সরকার আন্দোলন দমনের কৌশল হিসেবে ইন্টারনেটকে হাতিয়ার বানায়। প্রথমে মোবাইল ইন্টারনেট এবং পরে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটও সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাংলাদেশে আধুনিক ইন্টারনেটের ইতিহাসে এমন দীর্ঘমেয়াদি ও পরিকল্পিত ‘ব্ল্যাকআউট’ এর আগে কখনো দেখা যায়নি।
ডিজিটাল যুগে সাংবাদিকতার অন্যতম সহায়ক ও নিয়ামক হলো ইন্টারনেট। ইন্টারনেট শাটডাউনের ফলে দেশের সংবাদমাধ্যমগুলো প্রায় পঙ্গু হয়ে পড়ে। মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকেরা কী ঘটছে তা তাৎক্ষণিকভাবে অফিসে পাঠাতে পারছিলেন না। আবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও বাংলাদেশ থেকে কোনো খবর পাচ্ছিল না। এই তথ্যহীনতার সুযোগে একদিকে যেমন গুজব ডালপালা মেলেছিল, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় বাহিনী এবং তৎকালীন শাসকদলের ক্যাডারদের চালানো নির্মম নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের চিত্র আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছিল। গোটা দেশ যেন এক মুহূর্তেই বাইরের বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন এক অবরুদ্ধ কারাগারে পরিণত হয়েছিল।
এখানে ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ প্রাসঙ্গিক মনে করছি। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দেড় দশকে সাংবাদিক নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে এবং অধিকার আদায়ের জন্য রাজপথে নিয়মিত মিছিল-সভা যেমন করেছি, তেমনি ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মেও ভয়-ডর তুচ্ছ করে সক্রিয় থেকেছি। আমার দেশ বন্ধ থাকায় ফেসবুক ওয়ালকেই তথ্য প্রচারের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য হয়েছিলাম। জুলাই আন্দোলন শুরু হওয়ার পর নিয়মিত ছবি ও আপডেট দিচ্ছিলাম। ১৮ জুলাই উত্তরায় আন্দোলনরত প্রধানত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায় শেখ হাসিনার পেটোয়া বাহিনী। ওই দিন উত্তরায় শহীদের সংখ্যা শেষ পর্যন্ত ২৯ জনে দাঁড়িয়েছিল।
সেদিন ছাত্র-জনতাও তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এপিসিকে ধাওয়া করে ভাঙচুর এবং পুলিশের পিকআপ ধাওয়া দিয়ে পিছু হটার সময় ছাত্র-জনতাকে পিষে দেওয়ার ভিডিও আমার ফেসবুকে প্রচার করার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া আসে। অজ্ঞাত ফোন থেকে যেকোনো সময় তুলে নেওয়া হবে বলে হুমকি দেওয়া হলে পরিবার বিপন্ন বোধ করে। আমার ছোট ছেলে ও মেয়েও উত্তরার রণাঙ্গনে ছিল। অল্পের জন্য বেঁচে গিয়ে হতাহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিতে সাহসী ভূমিকা রাখে তারা। বাবাকে যেকোনো সময় তুলে নিয়ে যাবে, এই আতঙ্কে ছোট মেয়ে আফরিন তুলি রাতভর ড্রয়িংরুমে বসে মূল সড়কের দিকে থাকা সিসি ক্যামেরায় তাকিয়ে থাকত, যাতে পুলিশ আসতে দেখলে বাবাকে বের করে সরিয়ে দিতে পারে। ভয়াবহ আতঙ্কের সেই দিনগুলো এখনো দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করে বেড়ায়।
আমার একটি নিয়মিত কাজ ছিল সারা দিনের ঘটনাপ্রবাহের একটি সারসংক্ষেপ তৈরি করে মূলধারার ঘনিষ্ঠ সাংবাদিকদের কাছে পাঠানো। আর দেশি-বিদেশি মিডিয়ার সাংবাদিকদের কাছে আলোকচিত্র ও ভিডিও ফুটেজ পৌঁছানোর প্রাণান্তকর চেষ্টা ছিল। এএফপির শফিক ভাইয়ের সঙ্গে পুরো স্বৈরাচারী শাসনামলেই আমার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তিনিও মাঝেমধ্যে ফোন করে বিভিন্ন তথ্যের বিষয়ে শেয়ার করতেন এবং সত্যতা যাচাইয়ে কথা বলতেন। দিনভর উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াতাম। রাতে গ্রেপ্তার ও গুমের আতঙ্কে কাটত। কারণ আগে থেকেই সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে দুর্নীতির রিপোর্টের কারণে ২৭টি মামলা মাথার ওপর ছিল।
ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর নতুন লড়াই শুরু হয়। বাসায় একটি ছাড়া সংবাদপত্র রাখা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু ইন্টারনেট বন্ধ হওয়ার পর অন্ধকারে আলো খুঁজতে ফজর নামাজ পড়েই বেরিয়ে যেতাম হকারের সন্ধানে। অন্তত ১০টি সংবাদপত্র বগলদাবা করে ফিরতাম। দামও দিতে হতো বেশি। কারণ সংবাদপত্রগুলো একদিকে সংবাদের সংকট, অন্যদিকে পরিবহন ও বিতরণ জটিলতায় সীমিত আকারে প্রকাশিত হচ্ছিল। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেশের পরিস্থিতির আপডেট জানার তৃষ্ণা মেটাতে চাইতাম। তবে হতাশার দিক হলো, দু-একটি ছাড়া অন্য সংবাদপত্রগুলোয় কেবলই আন্দোলনকারীদের নাশকতা ও সরকারি স্থাপনা ধ্বংসের কারণে কান্নাকাটি দেখতে হয়েছে। সেসব সংবাদপত্রের অনেকগুলি তাদের আর্কাইভ থেকে মুছে ফেলেছে; তবে আমার কাছে সবগুলোই সংরক্ষিত আছে।
কারফিউর দিনগুলোয় বের হওয়ার চ্যালেঞ্জে পড়ি। আমার দেশ-এর পরিচয়ে রাস্তায় বের হওয়ার সুযোগ ছিল না। সাবেক সহকর্মী ক্র্যাব নেতা আলাউদ্দিন আরিফ ও ইকোনমিক এক্সপ্রেসের রহমতুল্লাহ ভাইকে বললাম কারফিউ পাস সংগ্রহ করে দিতে। দুজনেই দ্রুত সাড়া দিয়ে পাসের ব্যবস্থা করে দেন। হটস্পটগুলোয় ঘুরে ঘুরে তথ্য, ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করি। নিজের অনলাইন পোর্টাল দেশনিউজ ডটনেটে দেওয়া ছাড়াও অনেককে পাঠিয়েছি নিয়মিত। ১৮ জুলাই তিন সাংবাদিক শহীদ হওয়ার ঘটনায় প্রতিবাদ গড়ে তোলার চেষ্টা করি। তবে আনুষ্ঠানিক কিছু করার মতো অবস্থা তখন আর ছিল না।
আন্দোলনের শেষ দিনগুলোয় বিপ্লবী ছাত্র সমন্বয়কদের সঙ্গে মিডিয়ার যোগাযোগ, কর্মসূচি প্রচারের ব্যবস্থা, আত্মগোপন অবস্থায় দেওয়া ভিডিও বক্তব্য দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় পৌঁছানো এবং ৯ দফার প্রেস বিজ্ঞপ্তি মিডিয়া হাউসগুলোয় পৌঁছে দেওয়ার মতো অতীব ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো যেসব সাংবাদিক করেছেন, তাদের প্রতি সম্মান জানাই। কৃতজ্ঞচিত্তে তাদের অবদান স্মরণ করি। তাদের মধ্যে রয়েছেন শফিকুল আলম, কামরুজ্জামান বাবলু (টিআরটি ওয়ার্ল্ড), ইসরাফিল ফরাজী, অন্তু মুজাহিদ, মাহমুদ রাকিব, কেফায়েত শাকিল, বেলায়েত হোসেন, উম্মে মারুফা, হাবিবুল ইসলাম, আজহার লিমনদের সাহসী ভূমিকা স্মরণযোগ্য। আরো অনেকেই সংগোপনে, নেপথ্যে থেকে দেশের বাইরে থাকা সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের কাছে এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় তথ্য পৌঁছানোর ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন। আল জাজিরার সাংবাদিকদের ভূমিকাও ছিল অনবদ্য।
দেশের ভেতরের খবরের উৎসগুলো যখন একপ্রকার অবরুদ্ধ, তখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো অত্যন্ত জোরালো এবং সমালোচনামূলক ভূমিকা পালন করেছিল। তথ্যহীনতার সেই দিনগুলোয় বৈশ্বিক মিডিয়া মূলত তিনটি প্রধান দিক ফোকাস করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। প্রথমত, ‘ডিজিটাল ক্র্যাকডাউন’ ও তথ্য গোপন করার চেষ্টাকে আন্তর্জাতিক মিডিয়া ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। আল জাজিরা, বিবিসি, সিএনএন এবং রয়টার্সের মতো শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো ইন্টারনেট বন্ধ করাকে সরকারের একটি পরিকল্পিত ‘ডিজিটাল ক্র্যাকডাউন’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তখন। ভয়েস অব আমেরিকার প্রতিবেদনে উঠে আসে কীভাবে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট আন্দোলনকারীদের মধ্যে সমন্বয় ভেঙে দিতে এবং দেশের ভেতর কী নৃশংসতা ঘটছে, তা বিশ্ববাসীর চোখ থেকে আড়াল করতে ব্যবহার করা হয়েছিল। কাতারভিত্তিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা মাঠপর্যায়ের রিপোর্টার এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগের মাধ্যমে নিয়মিত আপডেট দেয়। তারা দেখায়, ইন্টারনেট বন্ধ করে সরকার মূলত নির্বিচারে গণহত্যা, অকল্পনীয় বলপ্রয়োগ এবং দমনপীড়নের ঘটনাগুলো ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল।
দ্বিতীয়ত, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের চিত্র তারা বেশ ভালোভাবেই তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। ইন্টারনেট না থাকলেও আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলো বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্র, প্রত্যক্ষদর্শী এবং প্রবাসীদের মাধ্যমে আসা খবরের ওপর ভিত্তি করে সহিংসতার ভয়াবহতা তুলে ধরে। দ্য গার্ডিয়ান ও নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো পত্রিকাগুলো তাদের বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে, শান্তিরক্ষা মিশনে ব্যবহৃত সাঁজোয়া যান (এপিসি) এবং হেলিকপ্টার থেকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালানো হচ্ছে। তারা এটিকে ‘গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার ওপর স্বৈরাচারী আঘাত’ হিসেবে বর্ণনা করে। শান্তিরক্ষা মিশনের এপিসি ব্যবহারের সংবাদটির ক্ষেত্রে ভূমিকা ছিল এএফপির ঢাকা ব্যুরো অফিসের। তখন এর দায়িত্বে ছিলেন পরবর্তীকালে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস সচিবের দায়িত্ব পালনকারী শফিকুল আলম।
কারফিউ এবং সেনা মোতায়েনের খবরের পাশাপাশি হাসপাতালের সূত্রগুলো ব্যবহার করে এএফপি ও রয়টার্স নিহতের সংখ্যা যে সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি, তা সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে প্রচার করতে থাকে। এটি আন্তর্জাতিকভাবে শেখ হাসিনা সরকারকে বেশ চাপে ফেলে দেয়।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম তৃতীয় যে কাজটি করেছে তা হচ্ছে, সাধারণ মানুষের বিচ্ছিন্নতা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়। শুধু রাজনৈতিক দিকই নয়, ইন্টারনেটবিহীন দিনগুলোয় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের চিত্রও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বেশ গুরুত্ব পায়। ২৬ জুলাই প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশন দেখায়, দীর্ঘ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট কীভাবে লাখ লাখ ফ্রিল্যান্সার, প্রযুক্তি খাতের কর্মী এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে পঙ্গু করে দিয়েছে। ব্যাংকিং সেবা ও জরুরি অনলাইন লেনদেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মানুষের বেঁচে থাকার ওপর যে প্রভাব পড়েছিল, তা আন্তর্জাতিক মহলের সামনে আসে।
মোদ্দা কথা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর এই সাহসী রিপোর্টিংয়ের ফলে ইন্টারনেট বন্ধ করেও তৎকালীন সরকার বৈশ্বিক চাপ থেকে রক্ষা পেতে ব্যর্থ হয়। বরং এই ব্ল্যাকআউট বিশ্বমঞ্চে হাসিনা সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক নৃশংসতা ও বর্বরতা ধামাচাপা দেওয়ার মনোভাবকে আরো নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছিল।
ইন্টারনেট বন্ধ করার পর স্থানীয় মিডিয়াগুলোয় একরকম অচলাবস্থা দেখা দেয়। এ সময়ে বাংলাদেশের সাংবাদিকতাকে প্রধানত দুভাগে ভাগ করা যায়। একশ্রেণির সাংবাদিক সরকারের এই ব্ল্যাকআউট এবং নির্বিচারে হত্যা-নিপীড়নকে সমর্থন দিয়ে পেশাগত দায়িত্ব থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়। সরকারের অস্তিত্বের সঙ্গে নিজেদের অস্তিত্বকে একাকার করে টেলিভিশনগুলোয় বাংলা সিনেমা ও নাটক প্রচার শুরু করে দেয়। সংবাদভিত্তিক চ্যানেলগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনার নামে আন্দোলনকারীরা কী ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে, তার বিবরণ ও গুরুগম্ভীর পর্যালোচনা করতে দেখা যায়। ধ্বংসাত্মক আন্দোলনে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি আর প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের সেগুলো পরিদর্শন করে কান্নাকাটি নানা হম্বিতম্বি প্রচার করতে থাকে।
তবে এর মধ্যেও আরেক দল দেশপ্রেমিক ও ফ্যাসিবাদবিরোধী সাংবাদিক অদম্য ভূমিকা পালন করেন। ইন্টারনেট বন্ধ থাকার পরও তারা দমে যাননি। ১৮ জুলাই থেকে অবরুদ্ধ সময়ে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তারা মাঠের চিত্র তুলে এনেছেন। আন্দোলনের নেতৃস্থানীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় সংবাদ, আলোকচিত্র ও ভিডিও ফুটেজ সরবরাহ করেছেন। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুরসহ দেশের প্রতিটি প্রান্তে যখন মুহুর্মুহু গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড আর টিয়ারশেল ছুড়ে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করা হচ্ছিল, তখন দেশপ্রেমিক সাংবাদিকেরা ক্যামেরার লেন্স তাক করে ধরেছিলেন সত্যকে উন্মোচন করার জন্য। মূল্যও দিতে হয়েছে চড়া। ১৮ জুলাই এক দিনেই সারা দেশে তিন সাংবাদিককে জীবন দিতে হয়েছে। ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে হাসান মেহেদী, সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে তৌহিদ জামান ও উত্তরায় মো. শাকিল হোসেন পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। ১৯ জুলাই সিলেটে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন দৈনিক নয়া দিগন্তের সিলেট ব্যুরোর সাংবাদিক এটিএম তুরাব। অপর সাংবাদিক সোহেল আকুঞ্জি হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে শহীদ হন ৫ আগস্ট।
জুলাই অভ্যুত্থানের টালমাটাল দিনগুলোয় পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি শাসকদলের সশস্ত্র ক্যাডাররা সাংবাদিকদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল। পাঁচজন শহীদ হওয়া ছাড়াও বহু সাংবাদিক আহত হয়েছেন। অনেকের ক্যামেরা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নিয়ে ভেঙে ফেলা হয়েছিল, যাতে কোনো সহিংসতার প্রমাণ না থাকে।
সরকার বাহিনীর বাধা ও সংবাদপ্রচারে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বহু সাংবাদিক বেধড়ক মারধরের শিকার হন। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়েও অনেককে হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে; চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। আবার কারফিউ এবং অঘোষিত লকডাউনের কারণে রাস্তায় গণপরিবহন ছিল না। তার ওপর ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় সহকর্মী বা অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
এই চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও সাংবাদিকেরা পায়ে হেঁটে, রিকশায় বা মোটরসাইকেলে করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্পটে গেছেন। ইন্টারনেট না থাকায় অনেকে পেনড্রাইভে করে ভিডিও ও ছবি পায়ে হেঁটে বা মোটরসাইকেলযোগে অফিসে পৌঁছে দিয়েছেন। ল্যান্ডলাইনের মাধ্যমে মুখে মুখে খবরের বিবরণ দিয়েছেন। সত্যকে বাঁচিয়ে রাখার এই লড়াই ছিল আক্ষরিক অর্থেই জীবনবাজি রাখার লড়াই। আহত হন শত শত সংবাদকর্মী, যাদের অনেকেই চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। হেলিকপ্টার থেকে ছোড়া গুলি কিংবা স্নাইপারের নিশানার সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে তারা ছবি তুলেছেন, সংবাদ সংগ্রহ করেছেন। এই আত্মত্যাগ শুধু পেশাদারিত্বের খাতিরে ছিল না, এটি ছিল দেশের প্রতি ও সত্যের প্রতি এক গভীর দায়বদ্ধতা।
ইন্টারনেট শাটডাউন করে দেশের ভেতরের নৃশংসতা আড়াল করার যে চেষ্টা করা হয়েছিল, একদল সাংবাদিকের অদম্য সাহসিকতায় তা ব্যর্থ হয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংগ্রহ করা ছবি ও ভিডিও ফুটেজগুলো বিকল্প উপায়ে, যেমন ভিপিএন বা স্যাটেলাইট সংযোগ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছিল। এর ফলে বিশ্ববাসী দেখতে পায়—কীভাবে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর রাষ্ট্রীয় বর্বরতা চালানো হচ্ছিল। বিশ্ববিবেক জাগ্রত করতে এবং আন্দোলনের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে সাংবাদিকদের এই সাহসী ভূমিকা অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল।
ইন্টারনেট শাটডাউন করে সত্যকে যে চেপে রাখা যায় না, তা বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজ প্রমাণ করেছে। তারা শুধু সংবাদ পরিবেশন করেননি, বরং একটি স্বৈরাচারী শাসনের পতনের এবং নতুন বাংলাদেশের উন্মেষে ইতিহাসের পাতায় নিজেদের নাম খোদাই করে নিয়েছেন। মুক্ত গণমাধ্যম ও স্বাধীন সাংবাদিকতা যে একটি দেশের গণতন্ত্রের জন্য কতটা জরুরি, চব্বিশের জুলাই বিপ্লব আমাদের তা নতুন করে শিখিয়ে গেল।
লেখক : যুগ্ম সম্পাদক, আমার দেশ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


