ভাস্কর্যের সিংহ এবং সিংহচর্মের রাজনীতি

ভাস্কর্যের সিংহ এবং সিংহচর্মের রাজনীতি

ঈশপের একটি বিখ্যাত গল্প দিয়ে শুরু করা যাক। হাজার বছর আগের সেই গল্প আজও বিশ্বরাজনীতিতে এক গভীর সত্যকে সামনে আনে। এক বনে এক সিংহ এবং এক মানুষ একসঙ্গে পথ চলছিল। চলার একপর্যায়ে তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে তর্কবিতর্ক শুরু করল। মানুষটির দাবি ছিল, বুদ্ধিমত্তা এবং শক্তিতে মানুষই পৃথিবীর সেরা জীব। সিংহ তা মানতে নারাজ; তার দাবি, শক্তির আসল প্রতীক সিংহ। চলতে চলতে তারা বনের ধারে মানুষের তৈরি একটি বিশাল পাথরের ভাস্কর্য দেখতে পেল। সেখানে খোদাই করা আছে—‘এক বীর পুরুষ খালি হাতে একটি বিশাল সিংহকে গলা টিপে কুপোকাত করছে।’

মানুষ গর্ব করে বলল, ‘দেখেছ? এটাই প্রমাণ, মানুষই সবচেয়ে শক্তিশালী।’ সিংহ মৃদু হেসে উত্তর দিল, ‘ভাস্কর্যটি মানুষ বানিয়েছে। যদি কোনো সিংহ ভাস্কর্য গড়ত, তবে মানুষটিই সিংহের থাবার নিচে পড়ে থাকত।’

বিজ্ঞাপন

আজকের বিশ্বরাজনীতি, বিশেষ করে পারস্য উপসাগর এবং মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতা বদলের সমীকরণগুলো ঠিক ঈশপের এই গল্পের মতোই। দশকের পর দশক ধরে বিশ্ব কার গল্প শুনবে, কার তৈরি বয়ান গিলবে এবং কার ‘ভাস্কর্য’ দেখে কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা নির্ধারণ করবে—তার চাবিকাঠি ছিল পশ্চিমা বিশ্বের হাতে। তারা ওয়াশিংটন বা লন্ডন থেকে যে বয়ান তৈরি করত, দুনিয়াকে সেটাই গিলতে হতো।

কিন্তু সময় বদলেছে। পারস্য উপসাগরের বুক থেকে শুরু করে তেহরানের রাজপথ—সবখানেই এখন নতুন ভাস্করদের আগমন ঘটেছে। যারা নিজেদের শক্তির গল্প নিজেদের মতো করে খোদাই করতে শুরু করেছে। এই পরিবর্তন বোঝার দুটি বড় জানালা হলো—পারস্য উপসাগরের সাম্প্রতিক সংঘাত থেকে উঠে আসা সাতটি সামরিক-কৌশলগত শিক্ষা এবং তেহরানে অনুষ্ঠিত এক ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় জানাজা ও শোক অনুষ্ঠান। দুটি ঘটনাই ইঙ্গিত দিচ্ছে, পৃথিবী এখন আর আগের মতো একমেরু নয়। স্পষ্টভাবে দুই ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিভক্ত হয়ে আছে আজকের দুনিয়া।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা থেকে তীব্র প্রতিরোধ ও প্রতিশোধের বার্তা দেওয়া হয়েছে। তেহরানে সমবেত শোকাকুল জনতার ঢল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে মুহুর্মুহু স্লোগান উঠেছে। তারা খামেনির মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। এই শোকানুষ্ঠান এবং বিশাল আয়োজনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বকে কয়েকটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করা হলেও দেশটির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো পুরোপুরি অক্ষত। ইরানের পুরো শাসনব্যবস্থা ও সশস্ত্র বাহিনী তাদের বর্তমান নেতৃত্বের পেছনে একতাবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

আঞ্চলিক রাজনীতি ও ইরানের মিত্রদের উদ্দেশেও এখান থেকে বার্তা দেওয়া হয়েছে। ক্ষমতার এই হস্তান্তর এবং উত্তরাধিকার নির্বাচন অত্যন্ত সাবলীল ও স্বাভাবিক নিয়মে সম্পন্ন হচ্ছে। এর পাশাপাশি ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির জন্যও একটি বড় বার্তা রয়েছে। বছরের পর বছর চাপিয়ে দেওয়া বর্বরোচিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, চরম আর্থিক সংকট ও যুদ্ধের ধকল সামলেও ইরান এখন কোনো সংকটে নেই। বরং গোটা দেশের মানুষের মধ্যে এখন এক অভূতপূর্ব ঐক্য ও সংহতির পরিবেশ বিরাজ করছে। এসব আয়োজনের মূলকথা একটাই—‘তোমরা আমাদের নেতাকে হত্যা করতে পেরেছ ঠিকই, কিন্তু আমাদের ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলতে পারনি।’

মিডল ইস্ট মনিটরের বিশ্লেষণ বলছে, এই একটিমাত্র অনুষ্ঠানই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার গভীর ফাটলকে স্পষ্ট করে তুলেছে। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা গণমাধ্যম ও থিংক-ট্যাংকগুলোর ধারণা ছিল, ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিতে পারলেই পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। সামরিক পরিভাষায় একে বলা হয় ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্র্যাটেজি’। তাদের বিশ্বাস ছিল, এতে ইরান ও তার মিত্র অক্ষ ধসে পড়বে। ইরানের নারী-পুরুষ রাস্তায় নেমে উল্লাস করবে। কিন্তু তেহরান, কোম ও ইরাকের কারবালায় লাখো মানুষের উপস্থিতি সেই ধারণাকে ভাসিয়ে দিয়েছে।

সবচেয়ে বড় বার্তাটি এসেছে কূটনৈতিক অঙ্গন থেকেও। শুধু পশ্চিমাদের ঘোষিত প্রতিপক্ষ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অংশীদার হিসেবেও পরিচিত কয়েকটি দেশের নেতারা তেহরানে উপস্থিত হয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন—অনেক রাষ্ট্র এখন নিজেদের জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে চায়, বাইরের চাপের ভিত্তিতে নয়।

সবচেয়ে বড় বিস্ময় দেখা গেছে কূটনৈতিক মঞ্চে। এই জানাজায় শুধু পশ্চিমাদের ঘোষিত প্রতিপক্ষ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অংশীদার বলেও পরিচিত কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিরাও হাজির হয়েছেন। পাকিস্তান ও তাজিকিস্তানের মতো দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—গ্লোবাল সাউথের বহু রাষ্ট্র এখন আর ওয়াশিংটনের ইচ্ছাকেই নিজেদের পররাষ্ট্রনীতির একমাত্র মানদণ্ড মনে করে না। তারা জাতীয় স্বার্থ ও আঞ্চলিক বাস্তবতার ভিত্তিতে নতুন সমীকরণ গড়ছে।

এখানেই আজকের পৃথিবীর বিভাজন স্পষ্ট। একদিকে রয়েছে ওয়াশিংটন ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা, যারা সবাই এখনো নিজেদের নির্ধারিত নিয়মকেই আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। অন্যদিকে রয়েছে বিস্তৃত গ্লোবাল সাউথ, যারা একমেরু কর্তৃত্বের পরিবর্তে বহুমেরু বাস্তবতাকে গ্রহণ করছে।

এই পরিবর্তন বোঝার জন্য ঈশপের আরেকটি গল্প মনে করা যায়—সিংহচর্মাবৃত গাধা। একটি গাধা বনে পড়ে থাকা সিংহের চামড়া গায়ে জড়িয়ে ঘুরতে শুরু করল। দূর থেকে তাকে দেখে সব পশুপাখি ভয়ে পালিয়ে গেল। নতুন এই ভয় দেখানোর ক্ষমতায় সে এতটাই আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠল যে নিজেকে বনের রাজা ভাবতে শুরু করল। কিন্তু একদিন প্রবল বাতাসে সিংহের চামড়া সরে গেল। বেরিয়ে পড়ল তার লম্বা কান। মুহূর্তেই সবাই বুঝে গেল, সে আসলে সিংহ নয়; সিংহের ছদ্মবেশে একটি গাধা। সঙ্গে সঙ্গেই তার ভয়ংকর ভাবমূর্তি ভেঙে পড়ল।

বহু বছর ধরে পশ্চিমা বিশ্বও এক ধরনের ‘সিংহচর্ম’ পরে বিশ্বরাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেছে। সেই চামড়ার নাম—‘রুলস-বেসড ইন্টারন্যাশনাল অর্ডার’ বা নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা। প্রয়োজনে তারা এই ব্যবস্থার কথা বলে অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। আবার নিজেদের বেলায় একই নিয়ম এড়িয়ে যায়। পারস্য উপসাগরের সাম্প্রতিক সংঘাত নিয়ে রাশিয়ার সরকারি গণমাধ্যম ‘আরটি’র বিশ্লেষণে উল্লিখিত সাতটি শিক্ষা এই সিংহচর্মের ফাঁকগুলো আরো স্পষ্ট করেছে।

পারস্য উপসাগরের সাম্প্রতিক সংঘাত নিয়ে আরটি যে সাতটি শিক্ষা তুলে ধরেছে, সেগুলো শুধু যুদ্ধক্ষেত্র নয়, বদলে যাওয়া বিশ্বব্যবস্থারও ইঙ্গিত দেয়।

প্রথমত, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আগের মতো কার্যকর অস্ত্র নয়। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমারা ডলার, তেল ও আর্থিক ব্যবস্থাকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। কিন্তু ইরান বিকল্প বাণিজ্যপথ, আঞ্চলিক অংশীদারত্ব ও নতুন অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তুলে সেই চাপের প্রভাব অনেকটাই কমিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এর প্রভাব পশ্চিমা অর্থনীতিতেও ফিরে এসেছে।

দ্বিতীয়ত, সামরিক প্রযুক্তির একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে যাচ্ছে। কম খরচের ড্রোন, ফাইবার-অপটিক নির্দেশনাভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং নতুন প্রযুক্তি বহু ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

তৃতীয়ত, পারস্য উপসাগরের নৌপথ আর একক শক্তির নিয়ন্ত্রণে নেই। স্থানীয় সামরিক সক্ষমতা ও উপকূলভিত্তিক প্রতিরক্ষা কৌশল বড় নৌবহরের স্বাধীন চলাচলকে আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল করে তুলেছে।

চতুর্থত, অপ্রতিসম যুদ্ধ বা অ্যাসিম্যাট্রিক ওয়ারফেয়ার এখন প্রধান বাস্তবতা। লেবানন থেকে ইয়েমেন পর্যন্ত বিস্তৃত ইরানের মিত্রগোষ্ঠী এই নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। এর বদৌলতে এক অঞ্চলের চাপ অন্য অঞ্চলে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

পঞ্চমত, পেট্রোডলারের একচ্ছত্র অবস্থানেও পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে। ইউয়ান, রুপি-রিয়ালসহ বিকল্প মুদ্রায় জ্বালানি বাণিজ্যের আলোচনা আগের তুলনায় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

ষষ্ঠত, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গঠিত সামরিক জোটে আগের মতো ঐকমত্য দেখা যাচ্ছে না। অনেক ইউরোপীয় মিত্র নিজেদের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনা করে সরাসরি অংশগ্রহণে অনীহা দেখিয়েছে।

সপ্তমত, দ্রুত সামরিক ফলের বদলে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ধৈর্য ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রতিপক্ষকে ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও মানসিক চাপে রাখা—এই কৌশল নতুন বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠেছে।

ভূরাজনীতি কেবল অস্ত্র, জাহাজ বা অর্থনীতির হিসাব নয়; এটি স্মৃতিরও লড়াই। ইউএসএস ভিনসেন্সের হাতে ইরানের যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত হওয়া, দীর্ঘ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, কিংবা বাগদাদে কাসেম সোলাইমানি হত্যার মতো ঘটনাগুলো বহু মানুষের কাছে এখনো জীবন্ত ইতিহাস। তেহরানের রাজপথে কালো পতাকা হাতে দাঁড়ানো একজন তরুণের কাছে এই জানাজা ও শোক অনুষ্ঠান শুধু শোকের অনুষ্ঠান নয়; এটি ইতিহাস, পরিচয় ও রাজনৈতিক অবস্থানেরও প্রকাশ। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষের কৌশলগত হিসাব মাঠের মানুষের আবেগ, দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ এবং ঐতিহাসিক স্মৃতির সঙ্গে মিলিয়ে না দেখলে সেই হিসাব বারবার ভুল প্রমাণিত হবে।

এখানেই আবার ফিরে আসতে হয় ঈশপের সেই ভাস্কর্যের গল্পে। বহু দশক ধরে পশ্চিমা বিশ্ব যে ভাস্কর্য নির্মাণ করেছে, সেখানে তারাই ছিল বিজয়ী, অন্যরা ছিল পরাজিত। কিন্তু সময়ের বাতাসে সেই ভাস্কর্যের গায়ে এখন ফাটল দেখা দিয়েছে। প্রাচ্য, মধ্যপ্রাচ্য এবং গ্লোবাল সাউথ আর অন্যের বানানো গল্পে নিজেদের পরিচয় খুঁজতে রাজি নয়। তারা বুঝেছে, ইতিহাসে টিকে থাকতে হলে নিজের গল্প নিজেকেই লিখতে হয়, নিজের ভাস্কর্য নিজেকেই গড়তে হয়।

তাই পৃথিবী আজ সত্যিই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে; বিভক্তি রয়েছে, প্রতিযোগিতাও রয়েছে। পাশাপাশি একই সঙ্গে জন্ম নিচ্ছে নতুন এক বাস্তবতা। এই নয়া বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক রাজনীতি আর একক শক্তির একচ্ছত্র বয়ানে পরিচালিত হবে না। বহু রাষ্ট্র, বহু অভিজ্ঞতা এবং বহু কণ্ঠ মিলিয়ে তৈরি হবে নতুন শক্তির ভারসাম্য। ঈশপের গল্পের ভাষায় বললে, বনের ভবিষ্যৎ আর শুধু মানুষের ভাস্কর্যে নির্ধারিত হবে না; সিংহও এবার নিজের গল্প নিজেই খোদাই করতে শুরু করেছে।

লেখক : সাংবাদিক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন