ভূ-স্বর্গের অর্ধ-বিধবারা

ভূ-স্বর্গের অর্ধ-বিধবারা

পর্যটকবাহী বাসটিতে সাকুল্যে আমরা ১৫ জন। বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের সঙ্গে বাংলাদেশের আমরা দুজন। রাত সাড়ে ১১টায় বাসটি ভারত অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগরের বিখ্যাত ডাল লেকের পাশে অবস্থিত হোটেলের লবিতে থামে। বাস থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে হোটেলের সুদর্শন দুই কর্মী কাশ্মীরের রীতি অনুযায়ী আমাদের স্বাগত জানিয়ে লাগেজ নামাতে শুরু করলেন। তাদের দেখে মনে হলো তারা অভিজাত পরিবারের সন্তান। তারা হোটেলে সাধারণ কর্মীর কাজ করেন দেখে অবাক হলাম।

ওয়েলকাম ড্রিংকস নেওয়ার পর আমার জন্য বরাদ্দ করা কক্ষে পৌঁছে দিতে আরেক কর্মী চাবি নিয়ে সামনে এসে সালাম দিলেন। তাকে দেখেও কোনোভাবেই হোটেলকর্মী মনে হয়নি। দেখতে ঠিক যেন বিশ্বখ্যাত পাকিস্তানি ক্রিকেট অলরাউন্ডার শহীদ আফ্রিদি! সালামের জবাব দিয়ে বললাম, ‘You all look like cricketer Shahid Afridi.’ আমার কথা শুনে তারা হাসলেন। একজন বলে উঠলেন, ‘Yes, we are sons of the heaven on earth.’

বিজ্ঞাপন

কক্ষে ঢুকতেই দীর্ঘ ভ্রমণক্লান্তি আর পথের নানা বিড়ম্বনা মন থেকে উবে গেল। সবকিছু আমাকে বুঝিয়ে দিতে লাগলেন আমজাদ (ছদ্মনাম)। হোটেলটিতে ছয় দিন অবস্থানকালে তার সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে। আমজাদ একজন বিশ্বাসী বন্ধু হিসেবেই দেখেছে আমাকে। ‘ভূস্বর্গ’-খ্যাত কাশ্মীরের পারিপার্শ্বিক ও আর্থ-সামাজিক অবস্থা, পরিবেশ-প্রতিবেশ এবং তাদের সুখ-দুঃখ নিয়ে একটু-আধটু কথাও হলো তার সঙ্গে। এই ভূস্বর্গে কাশ্মীরিদের জীবন যে কতটা বেদনা আর বঞ্চনায় ভরা, তা সেখানে গিয়ে স্বচক্ষে না দেখলে আর নিজ কানে না শুনলে অনুধাবনে আসত না।

কাশ্মীরের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে দেশ-বিদেশের কবি, সাহিত্যিক ও ভ্রমণপিপাসুদের লেখা প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও ভ্রমণকাহিনি পড়ে এর প্রেমে পড়েছি। প্রবল আকাঙ্ক্ষা থাকলেও ছাত্রজীবনে কাশ্মীরে যেতে পারিনি। কর্মজীবনে এসেও বহু চেষ্টা করেছি। অবশেষে বছর কয়েক আগে দেশি-বিদেশি কিছু পর্যটকের সঙ্গে কাশ্মীর যাওয়ার সুযোগ হয়।

দিল্লিভিত্তিক একটি ট্যুর কোম্পানির গাইডের সহযোগিতায় সেই যাত্রায় শ্রীনগরের ডাল লেক ও নাগিন লেকের সিকারা হিসেবে পরিচিত হাউসবোট বা ভাসমান হোটেলে রাত কাটানো, মোগলদের ঐতিহ্যবাহী শালিমার বাগ, ইন্দিরা গান্ধী মেমোরিয়াল টিউলিপ গার্ডেন, ঐতিহাসিক হজরত বাল মসজিদ (আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সা.-এর চুল মোবারক সংরক্ষিত রয়েছে এ মসজিদে), গুলমার্গের গন্ডোলা কেব্‌ল কার, পাহাড় ও পাইনবনে ঘেরা পেহেলগামের বেতাব ও আরু ভ্যালি এবং প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড হিসেবে পরিচিত বাইসারান উপত্যকার দৃশ্যগুলো এখনো চোখে ভাসে। এসব জায়গা দেখার পাশাপাশি এগুলো সম্পর্কে গাইড শ্রীচরণের (ছদ্মনাম) বর্ণনা সর্বদা কানে বাজে। মনে মনে ভাবি, প্রকৃতির সব সৌন্দর্য আর রূপ মহান আল্লাহ তায়ালা যেন এই কাশ্মীরেই উদারভাবে দান করেছেন।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনাটি ঘটে আমাদের ভ্রমণের তৃতীয় দিনে। ট্যুর প্ল্যান অনুযায়ী ওই দিন সকালে নাশতা সেরেই আমরা বাইসারান ভ্যালির উদ্দেশে ট্যুরিস্ট বাসে চড়ি। পথে বেতাব ভ্যালিসহ আরো কিছু নজরকাড়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত জায়গায় যাত্রাবিরতি হয় আমাদের। ক্লাব পার্ক এলাকা থেকে পনি বা ঘোড়ায় চড়ে যেতে হয়। আমাদের ১৫ জনের প্রত্যেকের জন্যই একটি করে ঘোড়া ও একজন সহিস সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো ছিল। সহিসদের দলনেতা সবার সামনে কালো রঙের একটি ঘোড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে। সেটিতে চড়লেন আমাদের টিম লিডার।

দ্বিতীয় ঘোড়াটিতে আমি। প্রস্তুতি শেষে সহিসদের দলনেতা তার ঘোড়াটির পেছনের অংশে জোরে একটি থাপ্পড় দিলেন। সেইসঙ্গে হাঁটুতে তার পা দিয়ে আঘাত করে চিৎকার করে বলে উঠলেন—‘মোদিজি! আগ বাড়িয়ে।’ উক্তিটি আমাদের টিমের সবাই শুনলেন। সহিসের হাতে দড়ি। তিনি হেঁটে চলছেন। আমরা ঘোড়ার পিঠে। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা ও উঁচু-নিচু ছয় কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ভ্যালিতে পৌঁছাতে আমাদের সময় লাগল প্রায় দুই ঘণ্টা। ঘণ্টাখানেক অবস্থানের পর আমরা আবার ক্লাব পার্ক এলাকার পথ ধরলাম। সামনের সহিস এবারও তার ঘোড়ার পেছনে থাপ্পড় ও হাঁটুতে লাথি দিয়ে হাঁক ছেড়ে সেই একই আওয়াজ দিলেন—‘মোদিজি আগ বাড়িয়ে।’

বিষয়টি রসিকতা কি না হোটেলে ফিরে জানতে চেয়েছিলাম হোটেলকর্মী আমজাদের কাছে। তিনি হিন্দি, ফার্সি আর ইংরেজির মিশেলে যা বললেন তার অর্থ হচ্ছে, এটি রসিকতা নয়। এটি তাদের মনের খেদ ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। শুধু তাদের ঘোড়াগুলোই নয়, এখানকার মাটি, মানুষ আর প্রকৃতি এমনকি গাছপালাও একই কথা বলে। আমজাদ বললেন, ‘আপনারা নতুন এসেছেন, আবার চলে যাবেন। অন্তত কিছুদিন থাকলে এখানকার লতাপাতা আর প্রকৃতির বেদনার করুণ সুরে গাওয়া গান আর মুসলমানদের আর্তনাদের কথা শুনতে পেতেন।’

ভূ-স্বর্গের-অর্ধ-বিধবারা-২

কাশ্মীরের মুসলমানদের দুঃখের করুণ কাহিনি নিয়ে কোনো কোনো দিন গভীর রাত পর্যন্ত কথা হতো ‘বন্ধু’ আমজাদের সঙ্গে। রাজধানী শ্রীনগরের একটি খুপড়ি ঘরে তাদের বসবাস। তার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে আমাকে কিছু সময় দিতে চাইলেন। টিমের কাছ থেকেও আমি একবেলা চেয়ে নিলাম। বিকেলবেলায় আমাকে নিয়ে তিনি শ্রীনগর শহরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক জায়গায় গেলেন। ওই দিন মাগরিব নামাজ আদায় করতে শহরের একটি পুরোনো মসজিদে গেলাম। মসজিদের ডানপাশে একটি অংশজুড়ে শিশু-কিশোরদের অবস্থান। তারা স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। তাদের সবার চেহারা সুন্দর, কোমল আর মায়াবী। মনে হলো মহান আল্লাহ তায়ালা তাদের জান্নাত থেকে সবেমাত্র পাঠিয়েছেন এই ভূস্বর্গে! আমজাদ বেশ বুদ্ধিদীপ্ত। তিনি শিশুদের সঙ্গে স্থানীয় ভাষায় আমাকে কথা বলিয়ে দিলেন এবং হতাশ কণ্ঠে বললেন, এখানে উচ্চশিক্ষা খুবই সীমিত। কাশ্মীরে যারা চাকরিজীবী তাদের বড় অংশই অন্যান্য রাজ্য থেকে আসা। কাশ্মীরিদের জন্য সরকারি চাকরির দরজা প্রায় বন্ধই বলা চলে। ফলে একটা পর্যায়ে গিয়ে ছোটখাটো কাজকর্ম বা ব্যবসায় লেগে যেতে হয় সবাইকে।

মসজিদ থেকে বেরিয়ে কিছুটা নিরিবিলি জায়গায় একটি চায়ের দোকানে গেলাম। সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের স্থানীয় একজন প্রতিনিধি। বিশ্বের অন্যতম সামরিকীকৃত এ অঞ্চলটি নিয়ে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য দিলেন তিনি। তার কথায় উঠে এলো ভারত তার সেনাশক্তির বড় একটা অংশই জম্মু-কাশ্মীর উপত্যকার মানুষকে দমন করার জন্য অন্যায্যভাবে মোতায়েন করে রেখেছে। কাশ্মীরের শান্তিপ্রিয় মানুষ এখন বলতে গেলে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ কারাগারের বাসিন্দা।

ভারত ১৯৪৭ সালে বেআইনিভাবে কাশ্মীর দখলে নিয়ে দেশটির একমাত্র মুসলিমপ্রধান এই রাজ্যের (বর্তমানে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল) মুসলমানদের দমিয়ে রাখতে যে নিপীড়ন শুরু করে তা আজও চলমান। জাতিসংঘে গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরিদের ভাগ্য নির্ধারণের কথা ছিল। ওই সাংবাদিক জানালেন, গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের বিষয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ১৯৪৮ সালে সর্বপ্রথম সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব (রেজোলিউশন ৪৭) গ্রহণ করে। ১৯৪৯ সালে জাতিসংঘ আরো বিস্তারিত প্রস্তাব গ্রহণ করে, যেখানে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ গণভোটের রূপরেখা দেওয়া হয়। কিন্তু ভারত অধিকৃত এই ভূখণ্ডে ৭৫ বছর ধরে সেই প্রস্তাব অমান্য করে আসছে।

ঘণ্টা খানেকের আলোচনায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ওই প্রতিনিধি যে বিষয়টির অবতারণা করলেন, সেটার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। তিনি গুমের প্রসঙ্গ আনলেন; বললেন, কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামীদের বিরুদ্ধে ভারতীয় বাহিনী আন্তর্জাতিক সব আইনকানুন ও রীতিনীতি লঙ্ঘন করে স্টিমরোলার চালিয়ে আসছে। সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন কাশ্মীরের অনেক নিরীহ তরুণ। বিয়ের আসর কিংবা বাসরঘর থেকেও বরকে তুলে নেওয়ার অনেক ঘটনা ঘটছে এখানে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এটি উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে বলে জানিয়ে এ ব্যাপারে কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরলেন তিনি।

একটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্যের বরাত দিয়ে ওই সাংবাদিক জানালেন, দখলদার ভারতের অব্যাহত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের কারণে ১৯৮৯ সালের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ২২ হাজারের বেশি কাশ্মীরি নারী বিধবা হয়েছেন। এর বাইরে ১৯৮৯ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত ১০ হাজারের বেশি কাশ্মীরি নাগরিককে ভারতীয় সেনা হেফাজতে নেওয়ার পর আর কোনো খোঁজ পায়নি তাদের পরিবার। আট হাজারের বেশি কাশ্মীরি নারী অর্ধ-বিধবা অবস্থায় জীবন অতিবাহিত করছেন, যারা এখনো জানেন না তাদের স্বামীরা কোথায়, তারা আদৌ বেঁচে আছেন কি না। এই বিপুলসংখ্যক বিধবা ও অর্ধ-বিধবা মুসলিম নারী অধিকৃত ভূখণ্ডে ভারতীয় সেনাদের নৃশংসতার সাক্ষী হিসেবে বেঁচে আছেন।

অর্ধ-বিধবাদের করুণভাবে সংজ্ঞায়িত করে সাংবাদিক বন্ধুটি বললেন, ভারতীয় বাহিনী যেসব তরুণের লাশ তাদের স্ত্রীদের কাছে ফেরত দিয়েছে, কিংবা যারা তাদের স্বামীর লাশের সন্ধান পেয়েছেন, তারা বিধবা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন। ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, তারা চাইলে এখন নতুন করে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারেন। কিন্তু এমন অনেক নারী আছেন, যারা জানেন না তাদের স্বামীকে আদৌ বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে, নাকি হত্যার পর লাশ গুম করা হয়েছে। তাদের বিষয়ে শরয়ী বিধান কী হবে? এমন নারীরাই কাশ্মীরে অর্ধ-বিধবা হিসেবে পরিচিত। কাশ্মীরি এই অর্ধ-বিধবা নারীরা বছরের পর বছর ধরে অনিশ্চয়তা ও মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে দুঃসহ জীবন কাটাচ্ছেন।

‘অ্যাসোসিয়েশন অব প্যারেন্টস অব ডিজঅ্যাপিয়ার্ড পারসন্স (এপিডিপি)’ নামে একটি স্থানীয় সংগঠন এসব বিধবা ও অর্ধ-বিধবা নারীদের নিয়ে কাজ করছে। তারা সাধ্যমতো ওইসব হতভাগা নারীর বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছে বলেও জানালেন ওই সাংবাদিক বন্ধু। তিনি বলছেন, আর আমি পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছছিলাম। আমার অবস্থা দেখে তিনি আলোচনায় ইতি টেনে বিদায় দিলেন। আড়ষ্ট শরীর আর ভাঙা হৃদয় নিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম। পা চলছে না। প্রায় সিকি শতকের পেশাগত জীবনে এত বেদনাক্লিষ্ট আর কখনো হইনি। ধরা কণ্ঠে আমজাদকে বললাম, আমাকে হোটেলে পৌঁছে দিন। ভূস্বর্গ দেখেও ভাঙা হৃদয় নিয়ে ফিরে এলাম।

লেখক : বিশেষ প্রতিনিধি, আমার দেশ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন