জুলাইয়ের অঙ্গীকার : রাষ্ট্র কোন পথে

জুলাইয়ের অঙ্গীকার : রাষ্ট্র কোন পথে

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পর বাংলাদেশের রাজনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। যে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, সেই আন্দোলনের মূল অঙ্গীকার আজ কতটা বাস্তবায়নের পথে—এ প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের গণ্ডি ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

জুলাইয়ের আন্দোলন কোনো একটি দলকে ক্ষমতায় আনার আন্দোলন ছিল না। এটি ছিল রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক ভিত্তির ওপর পুনর্গঠনের আহ্বান। মানুষের প্রত্যাশা ছিল—সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার হবে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে, নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ফিরে আসবে এবং এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠবে, যেখানে ক্ষমতার চেয়ে প্রতিষ্ঠান, দলীয় স্বার্থের চেয়ে জাতীয় স্বার্থ এবং প্রতিহিংসার চেয়ে ন্যায়বিচার বেশি গুরুত্ব পাবে।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ নতুন কিছু প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। রাষ্ট্র সংস্কারের গতি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে ব্যবধান নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। গণভোট, সাংবিধানিক সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং জুলাইয়ের রাজনৈতিক অঙ্গীকার—এসব বিষয় নিয়ে ক্ষমতাসীন দল ও সমালোচকদের অবস্থানের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ক্রমেই রাষ্ট্র সংস্কারের পরিবর্তে দলীয় বিরোধিতা বেশি স্থান পাচ্ছে।

একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর জানার চেষ্টা আজ অনেক মানুষের মধ্যে ক্রমে প্রবল আকার ধারণ করেছে। সেটি হলো—জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যে স্বপ্ন মানুষ দেখেছিল, রাষ্ট্র কি সেই পথেই এগোচ্ছে, নাকি আমরা ধীরে ধীরে পুরোনো রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকেই ফিরে যাচ্ছি? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু বর্তমান সরকারের জন্য নয়; বাংলাদেশের গণতন্ত্র, রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে সরকারের ভূমিকা নিয়ে নতুন বিতর্ক

জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশের অতীতের সব বড় আন্দোলন থেকে আলাদা ছিল। কোটা সংস্কার থেকে এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারের আকাঙ্ক্ষায় রূপ নেয়। সেই লক্ষ্যে প্রথমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ও ভারতীয় আধিপত্যের অবসান ঘটানো এ আন্দোলনের প্রথম এবং প্রধান তথা এক দফা দাবিতে পরিণত হয়।

যারা রাজপথে নেমেছিলেন, তাদের অধিকাংশের দাবি ছিল না কোনো নির্দিষ্ট দলকে ক্ষমতায় বসানো। তাদের দাবি ছিল—একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি। যেখানে রাষ্ট্র দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে থাকবে। যেখানে আর গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ভোটাধিকার হরণ কিংবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা রাষ্ট্র পরিচালনার হাতিয়ার হবে না। মানুষ চেয়েছিল এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে ক্ষমতার উৎস হবে জনগণ, আইনের শাসন হবে বাস্তব, বিচার বিভাগ হবে স্বাধীন, নির্বাচন হবে বিশ্বাসযোগ্য এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে। এই আকাঙ্ক্ষাই জুলাই আন্দোলনকে অন্যসব রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে আলাদা করেছে।

জুলাই-পরবর্তী সময়ে জনগণের সেই প্রত্যাশাকে সামনে রেখেই রাষ্ট্র সংস্কারের নানা প্রস্তাব আলোচনায় আসে। সাংবিধানিক সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি, নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কার, ক্ষমতার ভারসাম্য—এসব প্রশ্ন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও এসব সংস্কারের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয়। বিশেষ করে, বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে এসেছে। দলটির ৩১ দফা রূপরেখায় সংবিধান সংস্কার, স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ছিল। এসব অঙ্গীকার জনগণের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি করেছিল।

কিন্তু সরকার গঠনের পর সেই প্রত্যাশা কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে—এ নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির তুলনায় বাস্তব অগ্রগতি কতটা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সরকার অবশ্য বলছে, রাষ্ট্র সংস্কার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া; একদিনে তা সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। এই যুক্তি পুরোপুরি অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, বড় সংস্কারের ক্ষেত্রে জনগণ অন্তত একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ দেখতে চায়। সংস্কার শুধু ঘোষণা নয়, দৃশ্যমান পদক্ষেপও দাবি করে।

গণভোটের বিষয়টি এই বিতর্ককে আরো তীব্র করেছে। সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী সংসদে বলেছেন, নির্বাচন যাতে বিলম্বিত না হয়, সে কারণেই সরকার গণভোটের পক্ষে মত দিয়েছিল। এই বক্তব্যের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের একাংশের প্রশ্ন—যদি গণভোটের মূল বিবেচনা হয়ে থাকে নির্বাচনসংক্রান্ত রাজনৈতিক সময়সূচি, তাহলে জনগণের প্রত্যক্ষ মতামতের নৈতিক গুরুত্ব কোথায় দাঁড়ায়? অন্যদিকে সরকারের সমর্থকদের বক্তব্য-নির্বাচন এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই ছিল সরকারের লক্ষ্য।

এই বিতর্কের একটি মৌলিক দিক রয়েছে। গণতন্ত্রে আইনগত বৈধতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নৈতিক বৈধতাও গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের প্রত্যাশা উপেক্ষিত হচ্ছে—এমন ধারণা যদি বিস্তার লাভ করে, তাহলে রাজনৈতিক আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হান্না আরেন্ট লিখেছিলেন, ক্ষমতার প্রকৃত ভিত্তি বলপ্রয়োগ নয়; মানুষের সম্মতি। সেই সম্মতি দুর্বল হয়ে গেলে রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক বৈধতা থাকলেও রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র সংস্কারের অগ্রাধিকার কি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার আড়ালে চলে যাচ্ছে? সাম্প্রতিক সময়ে জনসমাবেশ, সংসদ এবং টেলিভিশনের টকশোগুলোয় সংস্কার নিয়ে গভীর আলোচনা যতটা হওয়ার কথা ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি জায়গা দখল করছে দলীয় পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। বিশেষ করে, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তিকে ঘিরে তীব্র বাগযুদ্ধ চলছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে মতবিরোধ স্বাভাবিক। কিন্তু যখন রাষ্ট্র সংস্কারের চেয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণই প্রধান আলোচ্য হয়ে ওঠে, তখন মূল এজেন্ডা আড়ালে পড়ে যায়।

এটি নতুন বাংলাদেশের জন্য সুখকর বার্তা নয়। কারণ জুলাই আন্দোলনের মূল প্রশ্ন ছিল—রাষ্ট্র কেমন হবে? ক্ষমতার চরিত্র কী হবে? বিচারব্যবস্থা কতটা স্বাধীন হবে? প্রশাসন কতটা নিরপেক্ষ হবে? নাগরিক অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত হবে? এই মৌলিক প্রশ্নগুলো যদি রাজনৈতিক কোলাহলের মধ্যে হারিয়ে যায়, তাহলে আন্দোলনের চেতনাও ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়বে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্টিভেন লেভিটস্কি ও ড্যানিয়েল জিবলাট তাদের গবেষণায় দেখিয়েছেন, গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সবসময় সামরিক অভ্যুত্থান নয়; অনেক সময় নির্বাচিত সরকারও ধীরে ধীরে সংস্কারের অঙ্গীকার থেকে সরে এসে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা দুর্বল করে ফেলে। ফলে গণতান্ত্রিক কাঠামো টিকে থাকলেও তার প্রাণশক্তি ক্ষয় হতে থাকে।

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই সতর্কবার্তা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ জুলাই আন্দোলনের শক্তি ছিল জনগণের আস্থা। আর সেই আস্থার ভিত্তি ছিল একটি প্রতিশ্রুতি, তথা রাষ্ট্র বদলাবে, শুধু সরকার নয়। সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি। কিন্তু সময় দ্রুত চলে যাচ্ছে। জনগণ এখন ঘোষণা নয়, বাস্তব পরিবর্তনের প্রমাণ দেখতে চায়।

সংস্কারের প্রতিশ্রুতি, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং জনগণের প্রশ্ন

গণতন্ত্রে নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নির্বাচনই গণতন্ত্রের শেষ কথা নয়। একটি নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে। একটি সরকার বৈধভাবেই ক্ষমতায় আসতে পারে। তবু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল থাকলে গণতন্ত্র দুর্বলই থেকে যায়। এ কারণেই জুলাই-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নটি এত গুরুত্ব পেয়েছিল। মানুষ বুঝতে পেরেছিল, শুধু সরকার বদলালেই হবে না। রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়মও বদলাতে হবে। এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকার সহজে রাষ্ট্রকে নিজের দলীয় সম্পত্তিতে পরিণত করতে না পারে।

সংস্কারের গতির সঙ্গে জনগণের প্রত্যাশার বড় একটি ব্যবধান তৈরি হয়েছে বলে প্রতীয়মান। বিশেষ করে, সংবিধান সংস্কারের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত পরিবর্তন নিয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনো স্পষ্ট নয়।

সরকারের দৃষ্টিতে, রাষ্ট্র সংস্কার একটি জটিল প্রক্রিয়া। সাংবিধানিক, আইনি ও প্রশাসনিক বাস্তবতা বিবেচনা করেই ধাপে ধাপে এগোতে হয়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাও সরকারের দায়িত্ব।

এই যুক্তির মূল্য আছে। গণতন্ত্রে আরেকটি বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হলো বিশ্বাস। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা লিখেছেন, ‘বিশ্বাসই শক্তিশালী রাষ্ট্র ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি।’ জনগণ যদি মনে করে ঘোষিত প্রতিশ্রুতি ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাচ্ছে, তাহলে সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরতে শুরু করে।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। গণভোটের সাংবিধানিক কার্যকারিতা এবং গণভোটের রাজনৈতিক গুরুত্ব—দুটি এক বিষয় নয়। সংবিধান সংশোধনের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া থাকতেই পারে। কিন্তু জনগণের প্রত্যক্ষ মতামতকে রাজনৈতিকভাবে সম্মান জানানোও একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অংশ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট ডাল বলেছেন, গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি শুধু ভোটে নয়; বরং নাগরিকদের কার্যকর অংশগ্রহণ এবং তাদের মতামতের প্রতি রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ায়। এই প্রতিক্রিয়া দৃশ্যমান না হলে মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।

জুলাই আন্দোলনের আগে বাংলাদেশে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, মতপ্রকাশের সংকোচন এবং নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক ছিল। এসব প্রশ্নই আন্দোলনের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল। আজ অনেকের অভিযোগ, সেই বিষয়গুলো আগের তুলনায় রাজনৈতিক আলোচনায় কম গুরুত্ব পাচ্ছে। এই অভিযোগ কতটা সঠিক, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এমন ধারণা কেন তৈরি হচ্ছে?

গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে শুধু সঠিক সিদ্ধান্ত নিলেই হয় না। জনগণের কাছে সেই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য ও অগ্রগতিকেও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জুয়ান জে. লিনৎস সতর্ক করেছিলেন, গণতন্ত্র তখনই দুর্বল হয়, যখন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা কমতে শুরু করে। বাংলাদেশের সামনে এখন সেই পরীক্ষা।

জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মানুষের ঐক্য। বিভিন্ন মত, বিভিন্ন দল এবং ভিন্ন সামাজিক অবস্থানের মানুষ একটি বিষয়ে একমত হয়েছিল—রাষ্ট্রকে বদলাতে হবে। সেই ঐকমত্য ধরে রাখা আজ সরকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দায়িত্ব।

কারণ ক্ষমতায় আসা একটি সাফল্য হতে পারে। কিন্তু ইতিহাসে স্থান পায় তারা, যারা ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রকে বদলাতে পারে। বাংলাদেশের মানুষ এখনো সেই পরিবর্তনের অপেক্ষায় আছে।

ইতিহাসের কঠিন পরীক্ষা এখন সরকারের সামনে

কোনো গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় আন্দোলনের সময় নয়। সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় শুরু হয় আন্দোলনের পর। রাজপথে মানুষকে এক করা সহজ। রাষ্ট্রকে বদলানো কঠিন। ক্ষমতার পরিবর্তন একটি ঘটনা।

কিন্তু রাষ্ট্রের চরিত্র পরিবর্তন একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের সঙ্গে অব্যাহত আস্থার সম্পর্ক। বাংলাদেশ আজ সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান মানুষকে নতুন স্বপ্ন দেখিয়েছিল। সেই স্বপ্ন ছিল—আর কখনো কোনো ব্যক্তি বা দল রাষ্ট্রের ওপর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকবে। নাগরিকের মৌলিক অধিকার রাষ্ট্রের দয়ায় নয়, আইনের শক্তিতে সুরক্ষিত হবে। এই প্রত্যাশা কোনো রাজনৈতিক দলের একার নয়। এটি জাতির প্রত্যাশা। সে কারণেই রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিটি পদক্ষেপ এখন জনগণ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

অনেকের মতে, বর্তমান সময়ে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিরোধী দল নয়; সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জনগণের প্রত্যাশা। কারণ জনগণ নির্বাচন জেতার জন্য ভোট দেয় না। জনগণ ভোট দেয় একটি প্রতিশ্রুতির ওপর ভরসা করে। সেই প্রতিশ্রুতির মধ্যে যদি সংস্কার থাকে, তাহলে মানুষ সংস্কারের ফল দেখতে চাইবে। যদি জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি থাকে, তাহলে মানুষ জবাবদিহি দেখতে চাইবে। যদি নতুন বাংলাদেশের কথা বলা হয়, তাহলে মানুষ পুরোনো রাজনীতির পুনরাবৃত্তি দেখতে চাইবে না।

ইতিহাস বলে, গণঅভ্যুত্থানের পর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো স্বাভাবিকীকরণ। অর্থাৎ মানুষ ধীরে ধীরে পুরোনো ব্যবস্থার সঙ্গে আবার মানিয়ে নিতে শুরু করে। তখন সংস্কারের গতি কমে যায়। প্রশাসন পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যায়। রাজনৈতিক দলগুলো আবার স্বল্পমেয়াদি কৌশলকে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রগঠনের ওপর অগ্রাধিকার দিতে শুরু করে।

এটি শুধু বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা নয়। বিশ্বের বহু দেশ এই বাস্তবতার মধ্য দিয়ে গেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন লিখেছিলেন, গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় শর্ত হলো শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানই রাষ্ট্রকে স্থায়িত্ব দেয়।

আজ সরকারের সামনে সুযোগ আছে—ইতিহাসের সঠিক পাশে দাঁড়ানোর। সংস্কারের রোডম্যাপ প্রকাশ করা যেতে পারে। সংবিধান সংস্কার নিয়ে জাতীয় সংলাপ আরো বিস্তৃত করা যেতে পারে। বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিয়ে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা দেওয়া যেতে পারে। নির্বাচনি ব্যবস্থাকে আরো বিশ্বাসযোগ্য করার উদ্যোগ দৃশ্যমান করা যেতে পারে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

এসব পদক্ষেপ সরকারের রাজনৈতিক শক্তি কমাবে না; বরং বাড়াবে। কারণ ইতিহাসে জনপ্রিয়তা ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু প্রতিষ্ঠান স্থায়ী।

একই সঙ্গে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা কখনোই এমন পর্যায়ে যাওয়া উচিত নয়, যেখানে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্ন দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার কাছে হার মানে। রাষ্ট্র বড়। সরকার তার একটি অংশমাত্র। রাজনীতি বড়। কিন্তু রাষ্ট্রনীতি আরো বড়।

জুলাই আন্দোলনের অন্যতম শিক্ষা ছিল—বাংলাদেশের মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। সেই ঐক্যকে বিভক্ত করা সহজ। কিন্তু পুনর্গঠন করা কঠিন।

এই বাস্তবতা সব রাজনৈতিক দলের মনে রাখা উচিত।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্টিভেন লেভিটস্কি ও ড্যানিয়েল জিবলাট একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাদের মতে, গণতন্ত্র টিকে থাকে তখনই, যখন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা একে অন্যের বৈধ অস্তিত্বকে স্বীকার করে এবং রাষ্ট্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার না করে। বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই শিক্ষা অত্যন্ত মূল্যবান।

জুলাই কোনো ক্যালেন্ডারের একটি মাস নয়। এটি একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি। একটি নৈতিক অঙ্গীকার। রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা। যে রাষ্ট্রের জন্য মানুষ জীবন দিয়েছে, সেই রাষ্ট্র যদি আবার পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যায়, তাহলে ক্ষতি শুধু একটি সরকারের নয়; ক্ষতি হবে জাতির। কারণ ইতিহাস দ্বিতীয়বার একই সুযোগ খুব কমই দেয়।

তাই আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ক্ষমতা কার হাতে, সেটি নয়; সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—রাষ্ট্র কোন পথে যাচ্ছে। সেই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে—জুলাই ইতিহাসের একটি অধ্যায় হয়ে থাকবে, নাকি নতুন বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর হয়ে উঠবে।

লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন