পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে দেশের ও ভারতের সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তোলার চেষ্টা করছে কিছু কুশীলব। এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ভীতি ছড়ানোর কাজে নিয়োজিত এসব অ্যাক্টিভিস্ট আগামী ডিসেম্বর সামনে রেখে যা মনে চায় তাই প্রচার করছে। রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারকে ভিত্তি করে চলছে প্রচারণা। তারা মনে করছে, একটি নির্দিষ্ট দিনে হাসিনা ও তার অনুসারীরা রাজধানীসহ সারা দেশে এক মারাত্মক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। জনগণ তা চেয়ে চেয়ে দেখবে।
এ ধরনের আলোচনার গোড়ায় রয়েছে, বাংলাদেশে ভারতের নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতের একটি বক্তব্য। একজন অকূটনৈতিক রাজনৈতিক দলীয় নেতাকে বাংলাদেশে এই প্রথমবারের মতো মন্ত্রী পদমর্যাদার দূত নিয়োগ দিয়েছে ভারত। স্বাভাবিকভাবে এ নিয়ে কিছু প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে তিনি প্রবেশ করে মিলেমিশে কাজ করার যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেখানে বলেছিলেন, ‘ভারত ও বাংলার একই আকাশ, একই বাতাস, একই যন্ত্রণা। আমার তো মনে হচ্ছে না আমি বাংলাদেশে এসেছি। ভারতের ১৪০ কোটি আর বাংলাদেশের ২০ কোটি—এই ১৬০ কোটি জনগণের জন্য যা ভালো সেটাই করা হবে।’ তার এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা চেয়েছিলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির। শুধু তিনি নন, গোটা জাতিই এর ব্যাখ্যা জানতে আগ্রহী। রাষ্ট্রদূতের এ বক্তব্যের সূত্র ধরেই হোক অথবা অন্য কোনো কারণে হোক, হাসিনার আগমন নিয়ে যে গরম বাতাস ছাড়ার চেষ্টা হচ্ছে, সেটি রাজনৈতিক মহলও হিসেবে নিয়েছে।
কিছুদিন থেকে একদিকে সীমান্তে অকূটনৈতিক আচরণে অভিবাসী পুশইনের অপচেষ্টা চলছে। অন্যদিকে বন্দি প্রত্যাবর্তন নিয়ে নানা ফন্দিফিকির করা হচ্ছে। ভারতীয় মিডিয়া বলছে, হাসিনা বন্দি নন। তার ইচ্ছেমতো ঘোরাফেরা করবার অধিকার রয়েছে। যার সঙ্গে খুশি বৈঠক করছে, কথা বলছে। ভারত তাকে কীভাবে রাখবে, কোন বিবেচনায় রাখবে বা রেখেছে, সেটি একান্তই তাদের ব্যাপার। ভারতের সঙ্গে আওয়ামী প্রধান শেখ হাসিনার সম্পর্ককে কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষণে ব্যাখ্যা করা আদৌ সম্ভব কি না, সেটিও বিচার্য।
গত ১৭ বছরের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে কূটনৈতিক সীমারেখায় দেখার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। তিনি এর আগে বলেছিলেন, ভারতকে যা দিয়েছেন, তাতে আর কিছু দেওয়ার বাকি নেই। অনুরূপ কথা ভারতীয় দূতেরও। ১৬০ কোটি জনগণের হিসেব প্রমাণ করে বিষয়টি পুরোপুরি একটি নীলনকশার অংশ।
বাংলাদেশ নিয়ে ভারতীয়রা যখন নানা ফন্দিফিকির আঁটছে, তখন কার্যত জ্বলছে ভারত। ‘তেলেপোকাদের’ দিল্লির বিক্ষোভে চ্যালেঞ্জের মুখে মোদির কর্তৃত্ব। যে আগুন ভারতে জ্বলছে, তার আঁচ পলাতক নেত্রীর গায়ে লাগবে না, সেটাই বা কে বলতে পারে!
জুলাই মাস চলছে। এ মাসের শুরু থেকেই এক ধরনের অপপ্রচার শুরু হয়েছে। এক ভিডিওতে দেখা গেল ’২৪-এর জুলাইয়ে গণহত্যার অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত একজন পুলিশ প্রিজনভ্যানে ওঠার আগে চিৎকার করে বলছে, ‘পুলিশ হত্যার বিচার হবেই।’ পুলিশ হত্যা মানে জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের বিপক্ষ শক্তির কথা। হ্যাঁ, এ কথা ঠিক যে এখনো জুলাই অভ্যুত্থানের বিচারের কোনো রায় কার্যকর করা যায়নি। সত্যি বলতে কি, কোনো গুরুতর আসামিকে গ্রেপ্তারই করা যায়নি। সাবেক পুলিশের আইজিপি, যিনি হুকুমের আসামি ছিলেন, তাকে রাজসাক্ষী বানিয়ে যাবজ্জীবন দেওয়া গেছে। আর পুরো ঘটনার যে ষড়যন্ত্রকারী, সেই সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা এখন ভারতে। তার বিচারের রায় কার্যকরে গোটা জাতি যখন সোচ্চার, তখন নানা বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে। মনস্তাত্ত্বিক এই যুদ্ধে যারা অংশ নিচ্ছেন, তারা আসলে জাতীয় বিশ্বাসঘাতক হিসেবে নিজেদের শনাক্ত করছেন। তারা বুঝছেন না, বিচারের রায় কার্যকর হওয়ার জন্য জনগণ কতটা ব্যাকুল হয়ে আছে।
ক্ষমতা দখলকারী বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর যে কথাকে কেন্দ্র করে গোটা দেশ উত্তাল হয়েছিল, সেটি যেমন স্তূপীকৃত বারুদে একটি আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছিল, তেমনি ভারতের বিচারপতির বক্তব্যও ভারতের মাটিতে সেখানকার বঞ্চিত-ক্ষুব্ধ জনতাকে সাহসী করে তুলেছে। একই ধরনের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ভারতের তেলেপোকাদের আন্দোলন। ভারতে মেডিকেল পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে তিন দফা আন্দোলন জোরদার করার ঘোষণায় অটল রয়েছে ভারতের ককরোচ বা তেলেপোকা পার্টি। রাজনৈতিক নয়া সমীকরণের দিকে যাচ্ছে সেখানকার লড়াই।
বাংলাদেশে যে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন হয়েছে, তার অন্য নাম দাদাগিরির বিরুদ্ধে জনমত। অভ্যুত্থান-পরবর্তী নেপালের দিকে দেখলে যে চিত্র দেখা যাবে, তার সঙ্গে শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের কোনো পার্থক্য নেই। আঞ্চলিক পরাশক্তির মোকাবিলায় এবং ভারতীয় দাদাগিরিতে ক্ষুব্ধ এ অঞ্চলের মানুষ। বাংলাদেশে গত ১৭ বছরে যে গণতান্ত্রিক আন্দোলন হয়েছে, তার মূলেও ছিল ভারতীয় আগ্রাসন মোকাবিলা। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন একই সঙ্গে দেশীয় স্বৈরাচার ও ভারতীয় আগ্রাসনবিরোধী ছিল। বাংলাদেশে আওয়ামী সরকারবিরোধী আন্দোলন একই সঙ্গে ভারত সরকারবিরোধী আন্দোলন। জনগণের ন্যূনতম মৌলিক অধিকার—ভোটাধিকারকে কীভাবে, কোন পন্থায়, কতটা শঠতার সঙ্গে এড়িয়ে যাওয়া যায়, তার সব ধরনের ফর্মুলাই ভারতীয় কূটনীতিকরা দিয়েছে এবং সে মোতাবেক কাজ হয়েছে।
আসলে আজ ভারতে যে আগুন লেগেছে, তা ভারতীয় শাসকশ্রেণির কর্মকাণ্ডের ফল। গণঅভ্যুত্থানে পতিত শেখ হাসিনা ও তার দলবলকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার মধ্য দিয়ে মূলত বর্তমান প্রক্রিয়াকে উসকে দেওয়া হয়েছে। এ অঞ্চলের এমন কোনো দেশ নেই যার সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্ক আছে। আঞ্চলিক শান্তির জন্য বড় হুমকি দেশটি।
বাংলাদেশ নিয়ে তার কল্পিত খেলার কোনো অন্ত নেই। ছলেবলে-কৌশলে বাংলাদেশকে করায়ত্ত রাখতে তার চেষ্টার কোনো কমতি নেই। আর সে চেষ্টায় সহযোগী গণঅভ্যুত্থানে পরাজিত পতিত আওয়ামী লীগ। সম্প্রতি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়ার হত্যাকারী মেজর মোজাফফর ধরা পড়ার পর বেশ কিছু বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এই ঘৃণিত মানুষটি মূলত ভারতের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ছিল। এ কথাও পুরোনো যে জিয়া হত্যায় ভারতের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এক-এগারোর প্রধান কুশীলব মাসুদ উদ্দীনের সঙ্গে যোগাযোগ মূলত সেই পুরোনো হিসেবকেই মিলিয়ে দেয়। ভারত বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার দেখতে অভ্যস্ত নয়। জুলাইয়ের অভ্যুত্থান-পরবর্তী যে সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাকে নড়বড়ে করে লুটেপুটে খাবার একটি বিষয় যে থাকতে পারে, সেটি না বললেও চলে।
মেজর মোজাফফরের সঙ্গে মাসুদ উদ্দীন চৌধুরীর যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক অঙ্গনের উত্তাপকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই। এতদিন ধরে চিহ্নিত এই দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি বাংলাদেশে অবস্থান করেছে। কে তাকে আশ্রয় দিয়েছে, ভরসা দিয়েছে—সেসব বিষয় হয়তো কখনো পরিষ্কার হবে না। এ কথা পরিষ্কারভাবেই বলা যায়, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন থেকে যে ভারতীয়দের লালনভূমিতে রয়েছে, এক-এগারো বাংলাদেশের রাজনৈতিক মূল্যায়নে সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। প্রশাসননির্ভর এই অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার মূল বিষয় ছিল গোটা জাতিকে নিঃশেষ করে দেওয়া।
ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাদের মূল দায়িত্ব হচ্ছে ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধে সর্বাত্মক ব্যবস্থা ও কর্মপন্থা গ্রহণ করা। মতপার্থক্য যা-ই থাকুক, ফ্যাসিবাদ বিরোধিতায় যে বৃহত্তর ঐক্য ছিল সেটি সুবিদিত। ব্যক্তিস্বার্থে নয়, বরং জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়েই মনোনিবেশ করা জরুরি। জনতা জেগে আছে। রাজধানীর দেয়ালে এখনো ’২৪-এর জুলাইয়ের চিত্র মুছে যায়নি। ভারতীয়রা যা করছে, এটি আসলে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


