আওয়ামী লীগ পুনর্মিলনের আলোচনার আড়ালে

আওয়ামী লীগ পুনর্মিলনের আলোচনার আড়ালে

‘শর্তপূরণ’, ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’, ‘রিকনসিলিয়েশন’—শব্দগুলো যতই মার্জিত হোক, শব্দের সৌন্দর্য দিয়ে মানুষের হারানো অধিকার ফিরে আসে না। গুম হওয়া মানুষ ফিরে আসে না, হত্যার বিচার সম্পন্ন হয় না, নির্যাতিত পরিবারের ক্ষত শুকিয়ে যায় না, লুণ্ঠিত অর্থনীতির ক্ষতি পূরণ হয় না। রাজনৈতিক অভিধানে নতুন শব্দ যোগ করলেই ইতিহাসের দায় মুছে যায় না। বরং জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়ার আগেই পুনর্মিলনের আলোচনা সামনে এলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—এটা কি সত্য ও ন্যায়বিচারের পথে অগ্রযাত্রা, নাকি অতীতের দায়কে রাজনৈতিক দর-কষাকষির টেবিলে সরিয়ে নেওয়ার আয়োজন?

প্রশ্নটি কে কোন দলকে ভালোবাসে, কে কোন দলকে অপছন্দ করে—এতটুকুতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্নটি হলো, গুরুতর মানবতাবিরোধী ঘটনার দায়ে একটি সফল গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া রাজনৈতিক দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় বিচারের চেয়ে পুনর্বাসনের ভাষা কেন বেশি শোনা যায়? অতীতের ক্ষত নিরাময় না করেই যদি রাজনৈতিক পুনর্মিলন বা প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা সামনে আসে, তাহলে তার নৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি কোথায়?

বিজ্ঞাপন

১৭ বছর পর একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। এমন অবস্থায় দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অস্পষ্ট বক্তব্য, পুনর্মিলনের তাত্ত্বিক আলোচনা কিংবা নতুন পরিচয়ে ফিরে আসার সম্ভাবনা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। বিচার নিশ্চিত করার আগে রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের আলোচনা কেন সামনে আসছে? জনগণের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা পূরণে সরকারের দৃশ্যমান অঙ্গীকার কোথায়?

একটি দলকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া আর তার শাসনসংস্কৃতির অবসান ঘটানো এক কথা নয়। সরকার বদলেছে, ক্ষমতার কেন্দ্র বদলেছে; কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক সুবিধাবাদ এবং অতীতের দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা টিকে থাকলে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি শুধু স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকবে। গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা শেষ পর্যন্ত ‘নতুন বোতলে পুরোনো মদ’ প্রবাদকেই সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব কোনো দলের একক সম্পত্তি নয়; জনগণের অধিকারও কোনো সরকারের দয়া নয়। ‘শর্তপূরণ’, ‘রিফাইন্ড’ কিংবা ‘রিকনসিলিয়েশন’—কোনো শব্দই সত্য, বিচার ও জবাবদিহির বিকল্প হতে পারে না। বাংলাদেশের মানুষ নতুন কোনো রাজনৈতিক অভিধান চায় না; তারা চায় অধিকার, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার। তারা চায় না, ‘শর্তপূরণ’-এর অস্পষ্টতায় অপরাধের দায় হারিয়ে যাক; ‘রিফাইন্ড’-এর মোড়কে পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি ফিরে আসুক; কিংবা ‘রিকনসিলিয়েশন’-এর নামে বিচারপ্রক্রিয়া ও ভুক্তভোগীদের দাবি গৌণ হয়ে পড়ুক।

২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনামল বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্নে এক গভীর সংকটের অধ্যায়। এ সময়ে বিরোধী মত দমন, গুম, খুন, নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, ভোটাধিকার হরণ এবং ‘আয়নাঘর’-কেন্দ্রিক গোপন আটক ও নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ আজ প্রমাণিত সত্য। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা, দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং ধর্মীয় অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও প্রতিষ্ঠিত। এসব অভিযোগ কোনো বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক বিতর্ক নয়। এসব অভিযোগের ব্যাপ্তি ও পরিসর এতই গভীর এবং গুরুতর যে, সেগুলোকে রাজনৈতিক আলোচনায় গৌণ করে দেখার সুযোগ নেই। একইভাবে বিচারিক প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতার আড়ালে দায়মুক্তির পথ তৈরি করারও অবকাশ নেই।

উন্নয়নের প্রচার দিয়ে ভোটাধিকার হরণের অভিযোগ মোছা যাবে না; অবকাঠামোর সাফল্য দেখিয়ে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ এড়িয়ে যাওয়া যাবে না; আর দলীয় আনুগত্যের অজুহাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগকে তুচ্ছ করারও সুযোগ নেই। রাষ্ট্র পরিচালনার নামে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যদি ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়, তবে সেটি শুধু সরকারের ভাবমূর্তির সংকট নয়—তা আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্যও গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। গুম, খুন, আয়নাঘর, গণহত্যার পাশাপাশি বিচারিক হত্যাকাণ্ড, শাপলাচত্বর গণহত্যা ও বিডিআর গণহত্যা—এসব ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়, গভীর রাজনৈতিক সংকট ও দীর্ঘস্থায়ী বিতর্কের এক কলঙ্কিত অধ্যায়। এসব গুরুতর অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি শুধু অতীতের হিসাব চুকানোর বিষয় নয়।

আয়নাঘরে বন্দি বা গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে পুনর্মিলনের অর্থ কী, যদি স্বজনের ভাগ্য অজানা থাকে? পিলখানায় নিহত সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারের কাছে সমঝোতার মূল্য কী, যদি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সেই বিপর্যয়ের প্রশ্নগুলোর উত্তর না মেলে? জুলাই গণঅভ্যুত্থানে স্বজন হারানো মানুষের কাছে সহাবস্থানের প্রতিশ্রুতিই-বা কী অর্থ বহন করে?

ক্ষমতার দম্ভে মানুষের অধিকার পদদলিত হলে রাষ্ট্রের দেয়াল যত উঁচুই হোক, সত্যকে চিরকাল বন্দি রাখা যায় না। আয়নাঘরের প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিচার এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই হোক বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার।

পিলখানার ঘটনা ছিল জাতির নিরাপত্তাবোধ, সামরিক শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধের ওপর এক ভয়াবহ আঘাত। সেদিনের স্বজনহারা কান্না, হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন এবং অনিশ্চয়তার ভার কোনো রায় কিংবা সময়ের প্রবাহে সম্পূর্ণ মুছে যাওয়ার নয়।

‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’—অর্থাৎ পরিশীলিত বা সংস্কার করা আওয়ামী লীগের ধারণা সামনে এলে প্রশ্ন ওঠে, সংস্কার বলতে আসলে কী বোঝানো হচ্ছে? নাম, প্রতীক, নেতৃত্ব কিংবা বক্তব্য পাল্টে দেওয়াই কি রাজনৈতিক সংস্কার? নাকি দলীয় কর্তৃত্ববাদ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংস্কৃতি থেকে বাস্তব বিচ্ছেদ ঘটানোই সংস্কারের প্রকৃত অর্থ?

পুরোনো বোতলে নতুন লেবেল লাগালে ভেতরের তরল বদলে যায় না। একইভাবে, পুরোনো নেতৃত্ব বা কাঠামো নতুন নামে হাজির হলেই অতীতের দায় বিলুপ্ত হয় না। ‘রিকনসিলিয়েশন’ বা ‘রিহ্যাবিলিটেশন’ (Reconciliation or Rehabilitation) কোনো জাদুমন্ত্র নয়। প্রকৃত পুনর্মিলনের ভিত্তি হলো অপরাধীর জবাবদিহি ও বিচার, ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতিকার এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।

বিএনপি সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা—তারা কি অতীতের নিপীড়নের শিকার মানুষদের পাশে দাঁড়াবে, নাকি আওয়ামী লীগ প্রশ্নে এমন ভাষা ব্যবহার করবে, যা পুনর্বাসনের সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহ বাড়ায়? যে পরিবার গুমের শিকার হয়েছে, যে পরিবার জুলাইয়ের সহিংসতায় স্বজন হারিয়েছে, যে বিডিআর সদস্য অন্যায্য বিচারের অভিযোগ তুলেছেন, যে নাগরিক ভোটাধিকার হারানোর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন—তাদের কাছে ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা ছাড়া পুনর্মিলনের অর্থ কী?

সরকারের দায়িত্ব কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি ব্যক্তিগত দরদ দেখানো নয়; দায়িত্ব হলো আইনের সমান প্রয়োগ, নাগরিকের অধিকার রক্ষা এবং অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সরকার যদি আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের কোনো পরিকল্পনা না করে থাকে, তাহলে তার সবচেয়ে কার্যকর প্রমাণ হবে স্বচ্ছ নীতিমালা, স্বাধীন তদন্ত এবং বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা।

বিরোধী দলে থেকে যে দল গণতন্ত্র ও জবাবদিহির দাবি তুলেছে, ক্ষমতায় এসে সেই দাবির বাস্তবায়ন দেখানোর দায়িত্বও তাদের। পুরোনো শাসকের বিরুদ্ধে অভিযোগের তীব্রতা ক্ষমতা বদলের সঙ্গে কমে গেলে জনগণ জানতে চাইবে—নীতির পরিবর্তন হয়েছে, নাকি শুধু রাজনৈতিক অবস্থান বদলেছে? অতএব, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা সরকারের দায়িত্ব; অস্পষ্টতা দিয়ে সেই দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।

সম্প্রতি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল, জামায়াত-বিএনপির পারস্পরিক অভিযোগ এবং ইতিহাসের বিতর্ক—সবকিছুই বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মেরূকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দুর্নীতি, অপশাসন ও জুলাইয়ের রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত না করে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের পথ তৈরি হলে তা শুধু বর্তমান সরকারের জন্য নয়, বরং দেশের অস্তিত্বের জন্যও সংকট তৈরি করবে।

লেখক : গবেষক ও রাজনীতিক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন