অরুণাচলে ভারতের পরাজয়ের শঙ্কা

অরুণাচলে ভারতের পরাজয়ের শঙ্কা

ভারতের অরুণাচল সীমান্তে চরম উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। অর্থাৎ, ভারত ও চীনের সেনারা মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। এই পরিস্থিতি ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। ওই যুদ্ধে ভারত শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছিল। আজ আবার তেমন যুদ্ধপরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। যদিও অরুণাচল অঞ্চলে বেশ কয়েক বছর ধরেই চীনের দখলদারত্বের খবর প্রকাশিত হয়ে আসছে, কিন্তু বিজেপি সরকার বারবার তা অস্বীকার করেছে।

অথচ একটু পেছনের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যাবে, ২০২০ সালের ১৫ জুন লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর বিরোধী দলগুলো, বিশেষ করে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী প্রথম চীনের অনুপ্রবেশের অভিযোগ উত্থাপন করেন। কিন্তু বিজেপি সরকার, এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও ওই অভিযোগ সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেন। এখন খবর প্রকাশিত হয়েছে, অরুণাচল সীমান্তে চীন ও ভারতের সেনাবাহিনী মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। আর এই খবর প্রকাশের পর কোনো কোনো গণমাধ্যম আরো একধাপ এগিয়ে প্রকাশ করেছে, চীন অরুণাচল অঞ্চলের ৫০ কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশ করে দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে।

বিজ্ঞাপন

এই খবর এমন একসময়ে প্রকাশিত হয়েছে, যখন বিজেপি সরকার ব্যাপক আন্দোলনের মুখে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। মূলত ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশের (আইটিবিপি) মহাপরিচালক শত্রুজিৎ সিং কাপুর গত ২২ অক্টোবর রাজস্থানের আলওয়ারে আইটিবিপির এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেওয়ার সময় অরুণাচল সীমান্তে দুই দেশের সেনাবাহিনীর মুখোমুখি অবস্থানের কথা উল্লেখ করলে খবরটি ব্যাপকভাবে প্রচার পায়।

আর এই খবর প্রকাশের পরই বিরোধী দলের মধ্যে এই ধারণা জন্মেছে যে, বিজেপি সরকার চলমান ব্যাপক গণআন্দোলন থেকে জনগণের মনোযোগ অন্যত্রে সরানোর জন্য এই খবর প্রকাশ করিয়েছে। অর্থাৎ বিজেপি মনে করছে, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার দোহাই দিয়ে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার একটা সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। কিন্তু বিষয়টি উল্টো ফল বয়ে এনেছে। কারণ বিরোধী দলগুলো এখন দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিজেপি সরকারের ব্যর্থতার কথা আরো জোরালো ভাষায় বলতে পারছে এবং তারা জনগণকে বোঝাতে সক্ষম হবে যে, বিরোধী দলের অভিযোগ সত্ত্বেও; বিজেপি সরকার সবসময়ই চীনের অনুপ্রবেশ অস্বীকার করে এসেছে, এখন দেখা যায় পরে প্রকাশ করছে। এছাড়া সীমান্ত উত্তেজনার পাশাপাশি চীনের একটি বাঁধের পাল্টা হিসাবে অরুণাচলে ভারতের একটি বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগণের ব্যাপক আন্দোলন কার্যত বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে চলে গেছে।

এখানে উল্লেখ করতে হয়, ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে তার ৩ হাজার ৪২৩ কিলোমিটারের দীর্ঘ সীমান্ত একটি চুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট করতে পেরেছে, যাকে বলা হয়, লাইন অব কন্ট্রোল (এলওসি)। কিন্তু চীনের সঙ্গে তার চার হাজার ছাপ্পান্ন কিলোমিটারের এই দীর্ঘ সীমান্তের ব্যাপারে কোনো সমাধান হয়নি। গোড়া থেকেই এটি অমীমাংসিত রয়ে গেছে। ব্রিটিশ আমলে এই সীমানা ম্যাকমোহন লাইন হিসেবে নির্দিষ্ট ছিল। কিন্তু চীন কখনোই ঔপনিবেশিক এই সীমানা মেনে নেয়নি এবং অরুণাচলকে তিব্বতের অংশ হিসেবেই দাবি করে আসছে।

ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৫৪ সালে অরুণাচল অঞ্চলের নাম রাখা হয়েছিল নর্থ-ইস্ট ফ্রন্টিয়ার স্ট্যাটাস। পরে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় নর্থ-ইস্ট বর্ডার এজেন্সি (নেফা)—অর্থাৎ উত্তর-পূর্ব সীমান্ত এজেন্সি। ১৯৬২ সালের যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয়ের পর আবার এর নাম পরিবর্তন করে ভারতীয়করণ করা হয়। অর্থাৎ ১৯৭২ সালে ২০ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নামকরণ করেন অরুণাচল। এরপর ১৯৮৭ সালে এটিকে ভারতের পূর্ণাঙ্গ রাজ্যে পরিণত করা হয়।

এদিকে ধারাবাহিক নাম পরিবর্তন এবং ওই অঞ্চলের মানুষের ধর্মীয় ও নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা করলে বিতর্কের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ, এ অঞ্চলের মানুষের শারীরিক গঠন, চেহারা ও সংস্কৃতির সঙ্গে তিব্বতের মানুষের গভীর মিল রয়েছে। প্রথমত, তাদের একটি বড় অংশ বৌদ্ধধর্মের অনুসারী। দ্বিতীয়ত, নৃতাত্ত্বিক দিক থেকে তাদের অনেকেই তিব্বতি-বর্মী ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। তাদের গায়ের রঙ, চোখের গঠন ও মুখের অবয়বের সঙ্গে তিব্বতের মানুষের সাদৃশ্য রয়েছে।

যাহোক, বর্তমান অরুণাচলে দুই দেশের সেনাবাহিনীর মুখোমুখি অবস্থান এবং সেখানে একটি বাঁধ নির্মাণকে কেন্দ্র করে জনগণের বিক্ষোভ কার্যত আরেকটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আশঙ্কার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, চীন অতীতেও কখনো সম্প্রসারণবাদী নীতি অনুসরণ করেনি। এমনকি দেশটি কখনো উপনিবেশও সৃষ্টি করেনি। তবে চীন তার সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষা এবং নিজের দাবি করা ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের ব্যাপারে কঠোর মনোভাব পোষণ করে। বর্তমানে চীনের মূল মাথাব্যথার কারণ হচ্ছে তাইওয়ান ও দক্ষিণ তিব্বত—অর্থাৎ অরুণাচল অঞ্চল। সে হিসাবে অরুণাচল নিয়ে আরেকটি সর্বাত্মক যুদ্ধের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ১৯৬২ সালের যুদ্ধের পর ভারতীয় কর্তৃপক্ষ দেশটির সেনাবাহিনীর পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে মাউন্টেন ব্যাটালিয়নের অভাবকে চিহ্নিত করেছিল। এ কারণে পরবর্তী সময়ে ভারত একটি শক্তিশালী মাউন্টেন ব্যাটালিয়ন গঠন করে। কিন্তু সেই যুদ্ধের ৬৪ বছর পর এখন দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধের ফল নির্ধারণে মাউন্টেন ব্যাটালিয়নের চেয়ে প্রযুক্তিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এ বিষয়ে ভারতের সামরিক বিশেষজ্ঞ এবং FORCE ম্যাগাজিনের সম্পাদক প্রবীণ সায়নী চীন ও ভারতের মধ্যে সম্ভাব্য যুদ্ধের একটি কাল্পনিক দৃশ্য তুলে ধরেছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি নিজের ইউটিউব চ্যানেল, বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের আলোচনা এবং নিজের একটি গ্রন্থে সেই যুদ্ধের কাল্পনিক চিত্র তুলে ধরেছেন। আমি দীর্ঘদিন ধরে তার বক্তব্য শুনে আসছি। তবে এবার অরুণাচল অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সায়নীর আঁকা যুদ্ধের চিত্রটি নতুন করে আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে। এতে যুদ্ধ বেধে গেলে কী পরিণতি হতে পারে, তা বোঝার সুযোগ হবে।

সায়নীর মতে, প্রথাগত যুদ্ধের (যেমন পদাতিক সেনা বা ট্যাংক নিয়ে লড়াই) দিন শেষ। সম্ভাব্য যুদ্ধ শুরু হলে প্রথম ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই চীনের ‘ডিসরাপশন টেকনোলজি’ বা ‘ধ্বংসাত্মক প্রযুক্তি’ ভারতের প্রতিরোধব্যবস্থা ভেঙে দিতে পারে। আর মূল যুদ্ধটি হিমালয়ের পাহাড়ে নয়, বরং সাইবারস্পেস ও ইলেকট্রনিক স্পেকট্রামে সংঘটিত হবে।

সায়নী তার বক্তব্যে ও গ্রন্থে চীন ও ভারতের মধ্যকার যুদ্ধের যে কাল্পনিক দৃশ্য ফুটিয়ে তুলেছেন, তাতে দেখা যায়, চীন ভারতের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার আগেই একযোগে বড় ধরনের সাইবার হামলা চালিয়েছে। এতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদর দপ্তরের ইন্টারনেট ও যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ফলে ভারতের সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর ব্যাটল গ্রুপগুলো সম্পূর্ণ অন্ধ ও বধির হয়ে পড়েছে। কারণ, তাদের স্যাটেলাইট ও যোগাযোগব্যবস্থা জ্যাম করে দেওয়া হয়েছে। এ কারণে লাদাখের মতো দুর্গম পাহাড়ি সীমান্তে অবস্থানরত হাজার হাজার ভারতীয় সেনা মূল কমান্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

তাই প্রবীণ সায়নী বলেছেন, প্রযুক্তিগত বিশাল ব্যবধানের কারণে অদূর ভবিষ্যতে ভারত ও চীনের মধ্যে সত্যিই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ বেধে গেলে ভারত মাত্র ১০ দিনের মাথায় হেরে যেতে পারে। তার মতে, চীন বড় ধরনের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও সাইবার আক্রমণের মাধ্যমে অরুণাচল ও লাদাখের নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম।

সায়নীর মতে, ভারতীয় সেনাবাহিনী এখনো মূলত তিনটি প্রথাগত ডোমেইনে—স্থল, জল ও আকাশে—যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যদিকে, চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) সাতটি ডোমেইনে যুদ্ধের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। সেগুলো হলো—স্থল, জল, আকাশ, গভীর সমুদ্র, মহাকাশ, সাইবারস্পেস ও ইলেকট্রনিক স্পেকট্রাম।

তাই প্রবীণ সায়নী স্পষ্ট করে বলেছেন, আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত যুদ্ধে ব্যক্তিগত বীরত্ব বা প্রথাগত সংখ্যাধিক্য দিয়ে জয়লাভ করা অসম্ভব। তিনি বলেন, চীন যুদ্ধে হাজার হাজার রোবট, লিথাল অটোনমাস বা স্বয়ংক্রিয় ঘাতক অস্ত্র এবং মাইক্রো ড্রোন ব্যবহার করবে, যার বিরুদ্ধে পুরোনো যুদ্ধকৌশল একেবারেই কার্যকর হবে না।

এই পটভূমিতে সায়নীর মূল বার্তা হলো, ভারতের উচিত পাকিস্তানের চশমা দিয়ে চীনকে না দেখা। কারণ, চীন সীমান্তে এসে সরাসরি মুখোমুখি সংঘাতে জড়াবে না। তারা দূর থেকে সাইবারস্পেস ও ইলেকট্রনিক অস্ত্রের সাহায্যে ভারতের পুরো ব্যবস্থাকে অচল করে দিয়ে যুদ্ধে জয়ের চেষ্টা করবে। এখন দেখার বিষয়, অরুণাচল অঞ্চলে শেষ পর্যন্ত চীন কী করতে যাচ্ছে। এজন্য হয়তো আমাদের আরো অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন