সাধারণে বিপর্যয়, অসাধারণে অর্জন

সাধারণে বিপর্যয়, অসাধারণে অর্জন

শিক্ষা কোনো জাতির শুধু জ্ঞানার্জনের উপায় নয়; এটি রাষ্ট্র গঠন, সামাজিক রূপান্তর এবং সভ্যতার ধারাবাহিকতা রক্ষার অন্যতম প্রধান নিয়ামক। প্লেটো তার The Republic গ্রন্থে আদর্শ রাষ্ট্রের আলোচনায় শিক্ষাকে নাগরিক চরিত্র ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা নির্মাণের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেছেন। অর্থাৎ শিক্ষার সংকট কখনোই শুধু শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত সংকট নয়; এর সঙ্গে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ, সমাজের কাঠামো এবং প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত। সম্প্রতি প্রকাশিত উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফল আমাদের সেই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পাসের হার ও শিক্ষার্থীদের অর্জনে উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটেছে। অন্যদিকে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তুলনামূলক ভালো ফল করেছে। এই বৈপরীত্যের মধ্যেই এবারের ফলের প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত। একদিকে সাধারণে বিপর্যয়, অন্যদিকে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় অসাধারণ অর্জন।

প্রথমেই একটি বিষয় স্বীকার করা প্রয়োজন। এবারের ফলাফলে কৃত্রিম সাফল্যের পরিবর্তে প্রকৃত মূল্যায়নের প্রতিফলন ঘটেছে বলে যদি বিবেচিত হয়, তবে তা ইতিবাচক। অতীতে পাসের হার বাড়ানো কিংবা অধিকসংখ্যক জিপিএ ৫ প্রদর্শনের প্রবণতা শিক্ষার প্রকৃত মান সম্পর্কে একধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছিল। শিক্ষার্থী যথাযথভাবে উত্তর দিতে না পারলেও তাকে নম্বর দিতে হবে—এমন মানসিকতা কোনোভাবেই শিক্ষার উদ্দেশ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। পরীক্ষার ফল হতে হবে শিক্ষার্থীর অর্জিত জ্ঞানের প্রতিফলন, প্রশাসনিক প্রত্যাশা পূরণের উপায় নয়। স্পিনোজার দর্শনে বাস্তবতাকে তার প্রকৃত স্বরূপে অনুধাবনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই বিবেচনায় অপ্রিয় বাস্তবতাকে আড়াল করে কৃত্রিম সাফল্য প্রদর্শনের চেয়ে প্রকৃত দুর্বলতা স্বীকার করা অধিকতর যুক্তিসংগত। তবে বাস্তবতা স্বীকার করাই যথেষ্ট নয়; কেন এই বিপর্যয় ঘটেছে, তার প্রাতিষ্ঠানিক কারণ অনুসন্ধান করাও জরুরি।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষামন্ত্রী যথার্থই ইঙ্গিত করেছেন, এই ফল শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার প্রতিফলন নয়; এর পেছনে শিক্ষক, প্রতিষ্ঠান এবং সামগ্রিক পরিবেশের দুর্বলতাও রয়েছে। বস্তুত শিক্ষার ফলাফল একটি সম্মিলিত প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার পরিণতি। শিক্ষার্থীর মেধা ও অধ্যবসায় গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই মেধার বিকাশ নির্ভর করে শিক্ষকের দক্ষতা, পাঠদানের ধারাবাহিকতা, প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষার অনুকূল পরিবেশের ওপর। সুতরাং ফল খারাপ হলে শুধু শিক্ষার্থীদের দায়ী করা একধরনের বিশ্লেষণগত সীমাবদ্ধতা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় প্রতিষ্ঠান হচ্ছে এমন একটি কাঠামো, যা ব্যক্তির আচরণ, সক্ষমতা ও সম্ভাবনাকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করে। প্রতিষ্ঠান কার্যকর না হলে ব্যক্তিগত যোগ্যতার পূর্ণ বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়।

এবারের ফলাফলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বল ফলের বিপরীতে ক্যাডেট কলেজ এবং সশস্ত্র বাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত কিছু প্রতিষ্ঠানসহ বিশেষ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনামূলক ভালো অর্জন। একই জাতীয় শিক্ষাক্রমের অধীনে, একই সময়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেও ফলাফলে এত পার্থক্য কেন? অবশ্য শিক্ষার্থীদের আর্থসামাজিক অবস্থা, পারিবারিক সহায়তা এবং প্রতিষ্ঠানের সম্পদের পার্থক্যও এখানে বিবেচ্য। তবু এই অর্জন একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার কথা বলে—যথাযথ ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত পাঠদান, শৃঙ্খলা এবং নিবিড় তদারকি নিশ্চিত করা গেলে ভালো ফল অর্জন সম্ভব। অ্যারিস্টটল তার Politics গ্রন্থে শিক্ষাকে রাষ্ট্রীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তার চিন্তার তাৎপর্য হলো, শিক্ষাকে ব্যক্তিগত উদ্যোগের ওপর সম্পূর্ণ ছেড়ে দেওয়া যায় না; রাষ্ট্রকেও এর উপযুক্ত পরিবেশ ও কাঠামো নিশ্চিত করতে হয়।

এখানে স্যামুয়েল পি. হান্টিংটনের Political Order in Changing Societies গ্রন্থে আলোচিত প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ তত্ত্ব বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। হান্টিংটন প্রতিষ্ঠানের অভিযোজনক্ষমতা, জটিলতা, স্বায়ত্তশাসন ও সংহতিকে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই তাত্ত্বিক কাঠামোতে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, অনেক প্রতিষ্ঠানে নিয়মকানুন থাকলেও এর কার্যকর প্রয়োগ, প্রশাসনিক তদারকি এবং জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ভালো ফলের পেছনে যে শৃঙ্খলা ও পরিচর্যা কাজ করে, তার কার্যকর উপাদানগুলো সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিস্থাপন করা প্রয়োজন। অবশ্য সামরিক বা ক্যাডেট প্রতিষ্ঠানের পুরো ব্যবস্থাপনা সাধারণ কলেজে প্রয়োগ করা বাস্তবসম্মত নয়। বরং তাদের কার্যকর একাডেমিক চর্চা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাকে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।

সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ শিক্ষকস্বল্পতা। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসংখ্য স্কুল-কলেজে বিজ্ঞান, ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। কোথাও বিজ্ঞান শিক্ষক নেই, কোথাও ইংরেজি বিষয়ের পাঠদান অন্য বিষয়ের শিক্ষককে দিয়ে পরিচালনা করা হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ভিত্তি দুর্বল রেখে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভালো ফল প্রত্যাশা করা আত্মপ্রবঞ্চনার শামিল। সরকারকে অবিলম্বে শূন্য পদের প্রকৃত চিত্র নিরূপণ করে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। এর দ্বিমুখী সুফল রয়েছে। একদিকে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত পাঠদানের সুযোগ পাবে, অন্যদিকে শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, পেশাগত মর্যাদা এবং নিয়মিত মূল্যায়নের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষার পরিবেশের সঙ্গে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতার সম্পর্কও উপেক্ষা করা যায় না। ছাত্রসমাজের সাহসী অংশগ্রহণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। রাজনৈতিক সচেতনতা নাগরিক বিকাশের একটি ইতিবাচক উপাদান। কিন্তু আন্দোলনমুখী রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠচর্চা ব্যাহত হলে তার নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। জন ডিউই তার Democracy and Education গ্রন্থে শিক্ষা ও গণতান্ত্রিক সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেছেন। তার চিন্তার আলোকে বলা যায়, গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশ এবং শিক্ষার ধারাবাহিকতা পরস্পরের বিরোধী নয়; বরং একটি অন্যটির পরিপূরক। রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন শিক্ষার্থীকে একই সঙ্গে জ্ঞান, দক্ষতা ও দায়িত্বশীল নাগরিকত্বে সমৃদ্ধ হতে হবে।

অতএব, এখন প্রয়োজন শিক্ষার্থীদের আবার শ্রেণিকক্ষমুখী করা—ব্যাক টু দ্য স্কুল, ব্যাক টু দ্য কলেজ। তবে এ দায়িত্ব শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না। সরকার, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষক, অভিভাবক এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সম্মিলিতভাবে শিক্ষামুখী পরিবেশ প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে হবে। ট্যালকট পারসন্সের সামাজিকীকরণ তত্ত্বে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সমাজের মূল্যবোধ, নিয়মশৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চারের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়েছে। সুতরাং শিক্ষাঙ্গন শুধু পাঠ্যবই পড়ার স্থান নয়; এটি ভবিষ্যৎ নাগরিক তৈরির সামাজিক প্রতিষ্ঠান। সেখানে দলাদলি, সংঘাত ও অস্থিরতার পরিবর্তে জ্ঞানচর্চা, সৃজনশীলতা এবং দায়িত্বশীলতার পরিবেশ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

এদিকে যেসব শিক্ষার্থী এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা রক্ষায় বিশেষ মূল্যায়ন বা পুনঃপরীক্ষার উদ্যোগ ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। পুরো একটি বছর অপেক্ষা না করিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি করা হলে শিক্ষার্থীরা হতাশা কাটিয়ে শিক্ষার মূলস্রোতে ফিরে আসতে পারবে। তবে এ ক্ষেত্রে মূল্যায়নের মানদণ্ড ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি। একই সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদে মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে বিশ্লেষণী চিন্তা, সৃজনশীলতা ও ব্যবহারিক দক্ষতাভিত্তিক পাঠ্যক্রম গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষার লক্ষ্য শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া নয়, বরং বাস্তব জীবনের সমস্যা অনুধাবন ও সমাধানে সক্ষম নাগরিক তৈরি করা।

সর্বোপরি, এবারের এইচএসসি ফলাফলকে নিছক হতাশার ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অন্তর্নিহিত দুর্বলতা চিহ্নিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। কৃত্রিম সাফল্যের পরিবর্তে বাস্তব মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠিত হলে সেই বাস্তবতার ভিত্তিতে সংস্কারের সাহসও দেখাতে হবে। বিশেষ প্রতিষ্ঠানের অর্জন প্রমাণ করে যে, সঠিক ব্যবস্থাপনা ও উপযুক্ত পরিবেশে ভালো ফল সম্ভব। এখন সেই অভিজ্ঞতার কার্যকর দিকগুলো সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে দিতে হবে। শিক্ষকস্বল্পতা দূরীকরণ, প্রশাসনিক জবাবদিহি, শিক্ষার্থীদের পাঠমুখী করা এবং মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কারকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করতে হবে। একটি রাষ্ট্রের শিক্ষাগত সাফল্য শুধু তার শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্জনে নির্ধারিত হয় না; বরং সাধারণ শিক্ষার্থীর জন্য কতটা মানসম্মত ও সমতাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা গেল, তার মধ্যেই প্রকৃত সাফল্য নিহিত। আজকের সাধারণ বিপর্যয়কে যদি আমরা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সূচনা হিসেবে গ্রহণ করতে পারি, তবেই তা আগামী দিনের অসাধারণ জাতীয় অর্জনে রূপ নিতে পারে।

লেখক : অধ্যাপক (অব.), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন