উচ্চাকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রে হুথিদের আঘাত

খুব বেশি পথ খোলা নেই সৌদি আরবের

খুব বেশি পথ খোলা নেই সৌদি আরবের
ফাইল ছবি

গত এক দশকে সৌদি আরবে সবচেয়ে বড় ও প্রাণঘাতী হামলাটি ঘটে গেল। এরপর থেকেই ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ওপর চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিরা যেভাবে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ছে, তা ঠেকানোর উপায় তাকে বের করতেই হবে।

বিজ্ঞাপন

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন ভিন্নকথা। সৌদি আরবের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এই যুবরাজ এক অসম লড়াইয়ের মুখোমুখি হয়েছেন। এক দশক আগে তিনি এই হুথিদের বিরুদ্ধেই ব্যর্থ এক যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। সেই শত্রু এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। আর তাদের মোকাবিলায় যুবরাজের হাত-পা বলতে গেলে অনেকটাই বাঁধা।

গত এক সপ্তাহে রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরপর তিনটি প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে হুথিরা। এর মধ্যে শনিবার রাতের হামলাটি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। ধারণা করা হচ্ছে, যাত্রী টার্মিনালে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন দিয়ে ওই হামলা চালানো হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এতে অন্তত ১২ জন নিহত হন। আহত হন ৩০০ জনের বেশি মানুষ, যাদের অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। এ ঘটনার পর বিমানবন্দরটির সব কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।

এই হামলাগুলো বহু দূরের ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধকে সরাসরি সৌদি আরবের ঘরের ভেতরে নিয়ে এসেছে। এতদিন ধরে প্রতিবেশী ইয়েমেনে বোমা হামলা চালিয়ে সৌদিরা নিজেদের দেশকে নিরাপদ ভেবে নিশ্চিন্ত ছিল। এই হামলা এক ঝটকায় স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রবাসীদের সেই নিরাপত্তাবোধ কেড়ে নিয়েছে।

শুধু তা-ই নয়, এই আঘাত সরাসরি গিয়ে লেগেছে যুবরাজ মোহাম্মদের স্বপ্নের বুকে। তেলনির্ভর ও অনেকটা বিচ্ছিন্ন একটি দেশকে বিশ্ববাণিজ্য এবং পর্যটনের কেন্দ্রে পরিণত করার যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা তিনি পোষণ করেছিলেন, তা এখন বড় প্রশ্নের মুখে।

কিন্তু হুথিদের হামলা থামানো যুবরাজের জন্য মোটেও সহজ নয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, হুথিদের আত্মবিশ্বাস ও দাবি-দাওয়া যেভাবে দিন দিন বাড়ছে, তাতে রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানো ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে সামরিক শক্তি দিয়ে যে তাদের পরাজিত করা যাবে, সেই আশাও কম। এই গোষ্ঠীর হারানোর তেমন কিছু নেই। বড় ও ধনী শত্রুদের সঙ্গে বারবার লড়াই করে তারা এখন অভিজ্ঞ যোদ্ধায় পরিণত হয়েছে।

হুথিদের মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে সৌদি আরবকে যথেষ্ট সহায়তা করছে। লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ থেকে শুরু করে আকাশে যুদ্ধবিমানে জ্বালানি সরবরাহ—সব ক্ষেত্রেই সহায়তা দিচ্ছে তারা। শনিবারের ঘটনার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এ বিষয়ে আরো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত তিনি নেবেন। তবে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।

অবশ্য গত বছরও হুথিদের ওপর ব্যাপক বোমাবর্ষণ করেছিলেন ট্রাম্প। প্রথম মাসেই প্রায় ১০০ কোটি ডলারের অস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহার করে তিনি দ্রুত জয়ের ঘোষণাও দিয়েছিলেন।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সৌদি আরববিষয়ক বিশেষজ্ঞ এফ গ্রেগরি গসের মতে, সৌদি আরবের জন্য একমাত্র বাস্তবসম্মত সমাধান হলো ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের অবসান ঘটানো। যুক্তরাষ্ট্র যদি একটি বৃহত্তর চুক্তির অংশ হিসেবে হুথিদের দিয়ে হামলা বন্ধ করাতে পারে, তবেই রিয়াদ রক্ষা পাবে। তবে আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, সৌদি আরবের জন্য দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, এ ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাদের কথা কতটা শুনবেন, তা বলা কঠিন।

রিয়াদকে কেন্দ্র করে যুবরাজ একটি নতুন আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন চালু করেছিলেন। বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালুর মাত্র কয়েক মাসের মাথায় বিমানবন্দরে এই হামলার ঘটনা ঘটল। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সৌদি আরবে বেশ কয়েকটি বড় রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও কর্মকর্তারা সেখানে যেতে নিজেদের নিরাপদ মনে করবেন কি না, তা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

রোববারই রিয়াদে বিশ্বের জ্বালানিশিল্পের শীর্ষ নির্বাহী ও নীতিনির্ধারকদের অংশগ্রহণে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন শুরু হয়েছে। আর মাত্র দুই সপ্তাহ পর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা যুবরাজের সেই বিখ্যাত বার্ষিক বিনিয়োগ সম্মেলন। সেখানে বিশ্বের নামকরা নেতা, শতকোটিপতি ও বড় বড় প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের অংশ নেওয়ার কথা ছিল। সৌদি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিভিন্ন তহবিলের ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে তাদের এক টেবিলে বসার কথা।

গ্রেগরি গসের মতে, আসল সমস্যাটি অন্য জায়গায়। সৌদি আরব হুথিদের অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে যে ক্ষতি করতে পারে, হুথিরা সৌদি আরবের অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে তার চেয়ে অনেক বড় ধাক্কা দিতে পারে। রিয়াদ বিমানবন্দরে একটি হামলাই সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীকে দ্বিতীয়বার ভাবতে বাধ্য করবে।

শনিবারের হামলাটি ছিল ২০১৫ সালে একটি মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলার পর সৌদি আরবে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঘটনাগুলোর একটি। শুধু তা-ই নয়, গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের যেকোনো দেশে এটিই সবচেয়ে বড় ও প্রাণঘাতী হামলা।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হুথি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র এহিয়া সারি বিমান সংস্থা ও যাত্রীদের কয়েকবার সতর্ক করেছেন। সৌদি বিমানবন্দরগুলোকে তারা নিজেদের সামরিক অভিযানের লক্ষ্যবস্তু বলে ঘোষণা করেছেন। রোববার তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তাদের সতর্কবার্তাকে যেন সবাই গুরুত্বের সঙ্গে নেয়। এরপর আকাশে কোনো প্রতিরোধব্যবস্থা ব্যর্থ হলে বা কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তার দায় সৌদি আরবকেই নিতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, হুথিদের হিসাবটি বেশ স্পষ্ট। যে দেশের গ্রামের পর গ্রাম বোমার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত, যেখানে বড় অবকাঠামোর বলতে গেলে কিছুই অবশিষ্ট নেই, তাদের হারানোর তেমন কিছু নেই। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব হুথিদের যতটা ক্ষতি করতে পারবে, হুথিরা সৌদি আরবের তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ক্ষতি করতে পারে। এই বিশ্বাস থেকেই তারা এগোচ্ছে।

সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে সহিংসতার নতুন এই অধ্যায়ের সূচনা হয় জুলাই মাসে। ইয়েমেনের রাজধানী সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক বিমান হামলাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। সানা শহরটি হুথিদের নিয়ন্ত্রণে। তারা সঙ্গে সঙ্গে এই হামলার জন্য সৌদি আরবকে দায়ী করে। তবে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার দাবি করে, হামলাটি তারাই চালিয়েছে। অনুমোদনহীন একটি ইরানি বিমানকে অবতরণে বাধা দিতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল বলে জানায় তারা। বিশ্লেষকরা অবশ্য ভিন্ন কথা বলছেন। তাদের মতে, ইয়েমেন সরকারের এককভাবে এ ধরনের হামলা চালানোর সক্ষমতা নেই, কারণ দেশটির কার্যকর কোনো বিমানবাহিনী অবশিষ্ট নেই।

সানার বিমানবন্দরে ওই হামলার পর থেকেই পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত গত সপ্তাহে হুথি, সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকারের মধ্যে আবার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হয়। হুথিদের উত্থান ঘটে ২০১৪ সালে। সে সময় সানা দখল করে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে রাজধানী থেকে উৎখাত করে তারা।

এরপরই মাত্র ২৯ বছর বয়সে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নেন মোহাম্মদ বিন সালমান। তার প্রথম দিককার পদক্ষেপগুলোর একটি ছিল হুথিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। সে সময় হুথিরা ছিল একটি বিশৃঙ্খল বিদ্রোহী গোষ্ঠী। যুবরাজ প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, তিনি ইয়েমেন সরকারকে আবার ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনবেন।

এখন যুবরাজের বয়স ৪১ বছর। সৌদি আরবের ভেতরে ও বাইরে তিনি নিজের ক্ষমতা ও অবস্থান সুসংহত করেছেন। তবে ইয়েমেনের এই মিলিশিয়া গোষ্ঠীও বসে থাকেনি। তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও স্বনির্ভর হয়ে উঠেছে। যুবরাজ তার জীবনে যত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন, হুথিরা এখন তার মধ্যে অন্যতম কঠিন সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এক দশক আগে সৌদি আরবের নেতৃত্বে শুরু হওয়া বোমাবর্ষণ ইয়েমেনে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছিল। দেশটিতে সহিংসতা, ক্ষুধা ও রোগে প্রাণ হারিয়েছেন লাখ লাখ মানুষ। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন বারবার বলেছে, সৌদি আরবের ওই হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন সাধারণ মানুষ। ২০১৮ সালে সৌদি যুদ্ধবিমানের একটি হামলা বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দার জন্ম দেয়। একটি স্কুলবাসে চালানো ওই হামলায় ৪৪ শিশুসহ ৫৪ জন নিহত হয়েছিল।

এত কিছুর পরও হুথিরা টিকে থাকে। শুধু টিকে থাকাই নয়, উত্তর ইয়েমেনে নিজেদের শাসন আরো সুসংহত করেছে তারা।

২০২২ সালের একটি যুদ্ধবিরতির ফলে ইয়েমেনে সাময়িকভাবে ভঙ্গুর শান্তি ফিরে এসেছিল। কিন্তু সাত মাসেরও বেশি সময় আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা চালালে পুরো অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এর সঙ্গে সৌদি আরব ও হুথিদের পুরোনো শত্রুতাও নতুন করে জেগে ওঠে।

সৌদি আরবের আরোপিত আকাশপথের বিধিনিষেধ নিয়ে হুথিরা অনেক দিন ধরেই ক্ষুব্ধ ছিল। সানার বিমানবন্দরে হামলার পর তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, এখন থেকে তারা অবরোধের জবাবে অবরোধের নীতি অনুসরণ করবে। লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে তারা। ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর লোহিত সাগরই সৌদি আরবের তেল রপ্তানির প্রধান বিকল্প পথে পরিণত হয়েছিল।

ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ আবার তীব্র হয়ে ওঠে। হুথিদের সঙ্গে ইয়েমেন সরকার ও সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর সংঘর্ষ শুরু হয়। গত সপ্তাহে ইয়েমেন সরকার হুথিদের বিরুদ্ধে নতুন অভিযান চালানোর ঘোষণা দেয়। গত ১২ বছরে হুথিদের দখলে যাওয়া সব এলাকা পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দেয় তারা। এর পরপরই সৌদি আরব এই মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে নতুন করে বিমান হামলা শুরুর কথা জানায়।

সৌদি রাজপরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্য ও দেশটির সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান প্রিন্স তুর্কি আল-ফয়সাল এক সাক্ষাৎকারে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। গত সপ্তাহে সৌদি সংবাদপত্র আরব নিউজ-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে সৌদি আরব সবসময় সংযম পছন্দ করে। তবে এবার হুথিরা তাদের ধৈর্যের সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, সংযম দেখানোর দিন শেষ।

নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে ভাষান্তর: জুলফিকার হায়দার

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন