হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের চলমান সংঘাত আরো জটিল আকার ধারণ করতে যাচ্ছে। মক্কা চুক্তির অংশীদার তিন দেশ সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সেনাপ্রধানেরা বৈঠক করে হুথিদের সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধের বার্তা দিয়েছেন। এ থেকে তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে, একটি স্থানীয় যুদ্ধ কীভাবে আঞ্চলিক ক্ষমতা, নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ ভারসাম্য নিয়ে বৃহত্তর লড়াইয়ে রূপ নিতে পারে। সৌদি আরব জানিয়েছে, হুথিরা রাজধানী লক্ষ্য করে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে, যা দীর্ঘ ও জটিল এই যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধির একটি বড় ঘটনা।
তবে এই হামলাকে শুধু সৌদি আরবের দুর্বলতা হিসেবে দেখা হলে তাতে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার বৃহত্তর চিত্রটি এড়িয়ে যাওয়া হবে। সৌদির আছে উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী কূটনৈতিক অবস্থান। ক্ষেপণাস্ত্র হামলাটি রিয়াদকে বিচ্ছিন্ন করার পরিবর্তে বরং একটি বৃহত্তর ও সম্মিলিত আঞ্চলিক পদক্ষেপ গ্রহণের অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। সৌদি আরব হুথিদের হুমকিকে ক্রমেই একটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে তুলে ধরছে এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় কেন্দ্রগুলোর সুরক্ষায় একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছে।
যুদ্ধের দাবি ও অর্থনৈতিক দিক
সৌদি-সমর্থিত জোট যখন তাদের পরবর্তী পদক্ষেপগুলো গুছিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে, সে সময়ে লোহিত সাগরে সাম্প্রতিক সাফল্যের সুযোগ কাজে লাগিয়ে হুথিরা একটি সামগ্রিক চুক্তি নিশ্চিত করতে চাইছে এবং তাদের দাবিগুলো বাস্তবসম্মত। তারা সরকারি খাতের কর্মীদের বেতন পরিশোধ, ইয়েমেনের তেল ও গ্যাস থেকে প্রাপ্ত আয়ের সুনির্দিষ্ট অংশ এবং তাদের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে। নিজেদের অনুকূলে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা আদায়ের লক্ষ্যে তারা সরাসরি সামরিক চাপ প্রয়োগ করছে। বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তাদের সেই প্রয়োজনীয় সুবিধাজনক অবস্থানটিই এনে দিয়েছে। কৌশলগত পরিস্থিতি তাদের প্রতিকূলে যাওয়ার আগেই তারা এই সাময়িক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের চেষ্টা করছে।
তাদের লক্ষ্যবস্তু নির্বাচনের মধ্যেই এই কৌশলগত পরিবর্তনের বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। বছরের পর বছর ধরে সৌদি আরব ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’-এর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে আসছিল, যাতে কোনো বৈরীপক্ষ হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করলে সরাসরি লোহিত সাগরে তেল পরিবহন করা যায়। এখন হুথিরা ঠিক সেই বিকল্প পথটিকেই লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। তারা সৌদি তেল কোম্পানি আরামকোর জিজান ও ইয়ানবুতে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে।
ক্রমবর্ধমান এই হুমকির মোকাবিলায় অর্থনৈতিক বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সৌদি আরব আধুনিক ‘অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার’ বা ‘অপ্রতিসম যুদ্ধ’-এর যে সহজাত চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হচ্ছে, তা বর্তমানে বিশ্বের প্রধান সব শক্তিধর দেশের জন্যই একটি সাধারণ সমস্যা। নিজেদের আকাশসীমা সুরক্ষায় দেশটি বিপুল পরিমাণে ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে এবং বর্তমানে মিত্র দেশগুলোর কাছে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সহায়তা চাইছে। সস্তায় ও বিপুল সংখ্যায় উৎপাদিত ড্রোন ভূপাতিত করার জন্য ব্যয়বহুল ও অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনৈতিকভাবে বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
এছাড়া, মারিব এলাকায় সৌদি আরবের একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান হারানোর ঘটনা প্রমাণ করে যে, আকাশে নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় রাখা অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ। তবে এসব ঘটনা একটি রূপান্তরকালীন পরিস্থিতিরও ইঙ্গিত দেয়। সৌদি আরব মিসর, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো মিত্রদের সঙ্গে একটি সমন্বিত এবং বহুপক্ষীয় প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে। এর ফলে একক প্রতিরক্ষা-ভার এখন একটি যৌথ আন্তর্জাতিক দায়িত্বে পরিণত হচ্ছে।
মক্কায় হুথিদের হামলার চেষ্টার সাম্প্রতিক দাবিগুলো জনমত নিয়ে চলা তীব্র লড়াইকেই সামনে নিয়ে এসেছে। রিয়াদ দাবি করেছে, তারা পবিত্র মক্কা নগরীর উদ্দেশ্যে ধেয়ে আসা একটি ড্রোন মাঝপথে ধ্বংস করেছে। অন্যদিকে হুথিরা এই হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। মক্কার সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে সংঘাতকে তুলে ধরা সৌদি আরবের জন্য একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক হাতিয়ার। এটি বৃহত্তর ইসলামি বিশ্বের অটল সমর্থন আদায়ে সহায়তা করেছে। উদাহরণস্বরূপ, পাকিস্তান এরই মধ্যে দৃঢ় কূটনৈতিক সমর্থন জানিয়ে সৌদি সার্বভৌমত্ব রক্ষার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে এবং তেহরানকে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছে। ইসলামের পবিত্রতম স্থানগুলোর প্রতি হুমকিকে সামনে আনার মাধ্যমে রিয়াদ সফলভাবে একটি সম্মিলিত ধর্মীয় ও রাজনৈতিক জোট গড়ে তুলেছে, যা বিশ্বমঞ্চে কোণঠাসা করে ফেলেছে হুথিদের।
এই আঞ্চলিক উত্তেজনার নেপথ্যে ইরানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দাবি করেন, তেহরান হুথিদের নিয়ন্ত্রণ করে না, অন্যদিকে আরেকটি সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক হামলার জন্য তেহরানই স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছিল। উভয় বক্তব্যই প্রক্সি যুদ্ধের (পরোক্ষ যুদ্ধ) একটি বৃহত্তর সত্যকে তুলে ধরে। ইরানের সরাসরি বা দৈনন্দিন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন নেই, কারণ উভয় পক্ষের কৌশলগত লক্ষ্যগুলোর মধ্যে চমৎকার মিল রয়েছে। তেহরান ইয়েমেনের চলমান সংঘাতকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বৃহত্তর আলোচনার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। ফলে এমন একটি যুদ্ধের মাশুল রিয়াদকে গুনতে হচ্ছে, যা একই সঙ্গে ইরানের ভূরাজনৈতিক স্বার্থও রক্ষা করছে।
বাস্তবতা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত তাগিদ
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনটি প্রধান বিষয় বর্তমান পরিস্থিতিকে সংজ্ঞায়িত করছে এবং সংঘাতের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করছে। প্রথমত, সৌদি আরব সক্রিয়ভাবে তার সামরিক কৌশল ঢেলে সাজাচ্ছে। ইয়েমেনের সানা শহরে সৌদি স্থল অভিযানের সম্ভাবনা খুবই কম। রিয়াদের দীর্ঘস্থায়ী ও ক্লান্তিকর কোনো স্থলযুদ্ধে জড়ানোর ইচ্ছা নেই, বিশেষ করে যখন মিত্র ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী উপকূলীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। সামরিক নিষ্ক্রিয়তার ঝুঁকি এবং পূর্ণমাত্রার সামরিক হস্তক্ষেপের উচ্চ কৌশলগত ব্যয়ের মধ্যে রিয়াদকে সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ফলে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছ থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য ও লজিস্টিক সহায়তার ওপর ভিত্তি করে সীমিত পরিসরে ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালানোই সবচেয়ে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, হুথিদের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের জবাব সম্মিলিতভাবে দেওয়ার বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত। সৌদি, পাকিস্তান ও তুরস্কের সেনাপ্রধানরা এ ব্যাপারে বৈঠক করেছেন। সৌদি আরব বোঝে যে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের পথ সুরক্ষিত রাখা একটি বৈশ্বিক দায়িত্ব। আন্তর্জাতিক অংশীজনদের সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে রিয়াদ এটা নিশ্চিত করছে যে, হুথিদের একটি ঐক্যবদ্ধ জোটের মুখোমুখি হতে হবে। এই সম্মিলিত পদক্ষেপ সৌদি বাহিনীর ওপর সরাসরি চাপ কমাবে এবং হুথিদের আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হলে তা তাদের কূটনৈতিকভাবে কোণঠাসা করবে।
তৃতীয়ত, ইয়েমেনের যুদ্ধ এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বৃহত্তর আলোচনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কাতার ও পাকিস্তানের মতো দেশের মধ্যস্থতাকারীরা ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। লোহিত সাগর ও ইয়েমেনে প্রকৃত ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তি শেষ পর্যন্ত সেখানে প্রতিষ্ঠিত হতে যাওয়া একটি বৃহত্তর চুক্তির ওপরই নির্ভর করবে। সরকারি বেতন-ভাতা ও বন্দর পরিচালনার মতো স্থানীয় বিষয়গুলোর সুরাহা হওয়ার জন্য ওই বৃহত্তর কাঠামোটি গড়ে ওঠা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। যখন সেই সময় আসবে, তখন কোনো চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর রাজনৈতিক মূল্য অনেক বেশি হবে ঠিকই, তবে সম্ভবত বিশ্বশক্তিগুলোর একটি জোটের নিশ্চয়তা বা সমর্থন এর পেছনে থাকবে।
২০২২ সালের যুদ্ধবিরতিটি মূলত সৌদি আরবের জন্য একটি ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ বা সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার কৌশল হিসেবেই করা হয়েছিল। এর পেছনের মূল ধারণাটি ছিল এমন যে, হুথিরা আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করবে, স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের ক্ষমতা সুসংহত করবে এবং আঞ্চলিক আগ্রাসী মনোভাব থেকে সরে আসবে। কিন্তু হুথিরা এই অঞ্চলে এমন এক স্থায়ী ও অপরিহার্য শক্তিতে পরিণত হতে চায়, যা রিয়াদকে আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নিতেই হবে। সৌদি রাজধানীর ওপর দিয়ে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে তারা তাদের এই অবস্থানেরই আগ্রাসী জানান দিচ্ছে। এর জবাবে সৌদি আরবও বুঝিয়ে দিচ্ছে, তারা একা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবে না, বরং যুদ্ধের ক্ষেত্রটিকে তারা দ্বিপক্ষীয় সীমান্ত সংঘাতের গণ্ডি থেকে সরিয়ে সম্মিলিত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার বিষয়ে রূপান্তর করছে।
ডেইলি সাবাহ অবলম্বনে মোতালেব জামালী
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

