বৈশ্বিক আয়নায় বাংলাদেশ

বৈশ্বিক আয়নায় বাংলাদেশ

ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ল্যাবের নতুন ‘গ্লোবাল জাস্টিস রিপোর্ট’ দেখিয়েছে, আরো ন্যায়ভিত্তিক ও বাসযোগ্য একটি পৃথিবী নির্মাণ বস্তুগত ও নীতিগতভাবে সম্ভব। কিন্তু যে দেশ তার জিডিপির মাত্র সাড়ে ছয় শতাংশ রাজস্ব সংগ্রহ করতে সক্ষম, তার জন্য এই প্রতিবেদন কোনো প্রস্তুত নীলনকশা নয়; বরং একটি নির্মোহ আয়না, যেখানে সে নিজের বাস্তবতা, সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনাকে স্পষ্টভাবে দেখতে পারে।

ঢাকার গুলশান-বারিধারায় যখন একটি অ্যাপার্টমেন্টের মূল্য অনায়াসে কয়েক কোটি টাকা অতিক্রম করে, ঠিক তখনই সাতক্ষীরা, ভোলা কিংবা উপকূলের অন্য প্রান্তে লবণাক্ত জোয়ার ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে হাজারো মানুষ হারিয়ে ফেলেন তাদের ভিটেমাটি ও জীবিকার ভিত্তি। একই রাষ্ট্রের এই দুই বিপরীত বাস্তবতা—একদিকে অতি-সম্পদের দ্রুত সঞ্চয়, অন্যদিকে জলবায়ু-আঘাতে ক্রমেই নিঃস্ব হয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। এই বৈপরীত্য আজ আর শুধু নৈতিক বিবেকের প্রশ্ন নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও উন্নয়ন-আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রীয় ইস্যু।

বিজ্ঞাপন

মাঝেমধ্যেই এমন কিছু দলিল প্রকাশিত হয়, যা আমাদের কেবল আগামী ত্রৈমাসিক বা আগামী দশকের নয়, বরং আগামী শতাব্দীর ভবিষ্যৎ নিয়েই নতুন করে ভাবতে ও বিতর্কে অংশ নিতে বাধ্য করে। ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ল্যাবের উদ্যোগে অর্থনীতিবিদ লুকাস চ্যান্সেল, টমাস পিকেটি, গ্যাব্রিয়েল জুকম্যান এবং ইমানুয়েল সায়েজের যৌথ প্রয়াসে ২০২৬ সালের ৪ জুন প্যারিসে প্রকাশিত ‘Global Justice Report’ তেমনই এক যুগান্তকারী দলিল। এর কেন্দ্রীয় দাবি যেমন উচ্চাভিলাষী, তেমনি গভীরভাবে চিন্তা-উদ্রেককারী—২১০০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রতিটি দেশের গড় মাসিক আয় প্রায় পাঁচ হাজার ইউরোতে পৌঁছাতে পারে; মানবজাতির দরিদ্রতম অর্ধেকের বৈশ্বিক সম্পদে অংশ বর্তমানের দুই শতাংশ থেকে বেড়ে ৩০ শতাংশে উন্নীত হতে পারে; আর শতকোটিপতি শ্রেণির সম্পদ-অংশীদারত্ব ছয় শতাংশ থেকে কমে প্রায় ০.০৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। আরো তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিবেদনের মতে এই রূপান্তর অর্জন করা সম্ভব বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে ১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেই। অর্থাৎ, বর্তমান নীতিমালা অব্যাহত থাকলে যে প্রায় ৪.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণায়নের বিপর্যয়কর ঝুঁকির দিকে বিশ্ব ধাবিত হচ্ছে, সেই সম্ভাবনাকে কার্যকর নীতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে এড়ানো যেতে পারে।

এটি কোনো অবাস্তব কল্পনা বা ইউটোপিয়ান পুস্তিকা নয়; বরং বৈশ্বিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এ পর্যন্ত পরিচালিত সবচেয়ে বিস্তৃত পরিমাণগত (quantitative) গবেষণাপ্রয়াসগুলোর একটি। এর বিশেষত্ব হলো, এটি এমন চারটি বিষয়কে একটি সমন্বিত বিশ্লেষণাত্মক কাঠামোর মধ্যে মডেল করার চেষ্টা করেছে, যেগুলোকে নীতিনির্ধারণ ও একাডেমিক আলোচনায় সাধারণত পৃথকভাবে বিবেচনা করা হয়—বৈশ্বিক সম্পদ পুনর্বণ্টন, আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কার, জ্বালানি রূপান্তর এবং মানুষের ভোগের ধরনে পরিবর্তন। প্রতিবেদনটির মতে, এই বহুমাত্রিক সংকটের সমাধান নির্ভর করে তিনটি যুগপৎ রূপান্তরের ওপর। প্রথমত, দ্রুত কার্বন নিঃসরণ হ্রাস; দ্বিতীয়ত, অধিক ‘স্বয়ংসম্পূর্ণতা’-মুখী অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তর, যার অন্তর্ভুক্ত কর্মঘণ্টা কমানো, প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ হ্রাস এবং খাদ্যাভ্যাস ও ভূমি ব্যবহারে কাঠামোগত পরিবর্তন এবং তৃতীয়ত, আয়, সম্পদ ও ক্ষমতার বৈষম্যকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা। এই রূপান্তরের অর্থায়নের জন্য প্রতিবেদনের লেখকেরা একটি ‘গ্লোবাল জাস্টিস ফান্ড’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেছেন। তাদের হিসাব অনুযায়ী, এই তহবিল থেকে প্রতি বছর বিশ্ব জিডিপির গড়ে ১০ দশমিক ৩ শতাংশ সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হবে। এ ব্যয়ের অর্থ জোগাতে বিলিয়নেয়ারদের ওপর সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত সম্পদ কর এবং সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ পর্যন্ত আয়কর হার আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে।

বিলিয়নেয়ারদের ওপর সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ আয়কর কিংবা একটি বৈশ্বিক তহবিলের রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে মতভেদ ও বিতর্ক অবশ্যই হতে পারে। আমিও সেই বিতর্কের অংশ। তবে এই প্রতিবেদনের প্রকৃত তাৎপর্য করের হার বা অর্থায়নের কাঠামোতে নয়; এর কেন্দ্রে রয়েছে ন্যায়বিচার ও নৈতিকতার প্রশ্ন। এখানেই এটি এমন এক ভাষায় কথা বলে, যা বাংলাদেশের জন্য গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। পৃথিবীর পরিবেশগত সহনসীমা অতিক্রম না করে সম্পদ পুনর্বণ্টনের এই আহ্বান কি আসলে আমাদের নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক ঐতিহ্যে চৌদ্দ শতাব্দী ধরে লালিত এক মৌলিক নীতিরই আধুনিক ও ধর্মনিরপেক্ষ ভাষ্য নয়—যে সম্পদের ওপর কেবল ব্যক্তির নয়, সমাজেরও ন্যায্য দাবি রয়েছে। সম্পদের অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ একটি নৈতিক ঝুঁকি এবং ন্যায়বিচার (আদল) ও জনকল্যাণই (মাসলাহা) একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রকৃত সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি।

ঢাকার সামনে ধরা এক আয়না

যে দেশ এখনো আইএমএফের ঋণের পরবর্তী কিস্তি নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত, তার কাছে শতকোটিপতিদের সম্পদকর কিংবা বৈশ্বিক কার্বন বাজেট নিয়ে একটি প্রতিবেদন কেন গুরুত্বপূর্ণ হবে? কারণ প্রতিবেদনে যে তিনটি সংকটের আন্তঃসম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে, বাংলাদেশ আজ ঠিক সেই সংযোগস্থলেই দাঁড়িয়ে আছে—একদিকে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকি; আর তার সঙ্গে যুক্ত রাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী রাজস্ব ও সম্পদসংকট।

প্রথমেই বাংলাদেশের বৈষম্যের চিত্রটি দেখা যাক। বিশ্ববৈষম্য ডেটাবেসের (World Inequality Database) তথ্য অনুযায়ী, দেশের সর্বোচ্চ আয়কারী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত রয়েছে জাতীয় আয়ের প্রায় ৪১ শতাংশ; অথচ জনসংখ্যার নিম্ন অর্ধাংশের অংশে আসে মাত্র ১৯ শতাংশ। অর্থাৎ, আয়ের বণ্টনেই বৈষম্য সুস্পষ্ট। সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে চিত্রটি আরো গভীর ও উদ্বেগজনক। ‘বিশ্ববৈষম্য প্রতিবেদন ২০২৬’-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট সম্পদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ শীর্ষ এক শতাংশ মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত, আর শীর্ষ ১০ শতাংশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে প্রায় ৫৮ শতাংশ সম্পদ। অন্যদিকে জনসংখ্যার দরিদ্রতম অর্ধেকের হাতে রয়েছে মোট সম্পদের পাঁচ শতাংশেরও কম। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে, সম্পদ সঞ্চয়ের কেন্দ্রীভবন ক্রমেই তীব্রতর হচ্ছে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য আরো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে। অর্থাৎ সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বর্তমান গতিপথ এই প্রতিবেদনে কল্পিত অধিক ন্যায়ভিত্তিক ভবিষ্যতের দিকে নয়; বরং আমরা ক্রমেই সেই লক্ষ্য থেকে আরো দূরে সরে যাচ্ছি।

এরপর জলবায়ুর প্রশ্নটি বিবেচনা করা যাক। বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে বাংলাদেশের অবদান অত্যন্ত সামান্য, অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ ভূমি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এক মিটারেরও কম উচ্চতায় অবস্থিত। বিভিন্ন পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ব-দ্বীপ অঞ্চলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকিতে পড়তে পারে এবং দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ জনগণ চরম তাপপ্রবাহের সম্মুখীন হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে প্রতিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ—যেসব দেশ বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী, তারাই জলবায়ু অভিযোজন ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার জন্য সর্বাধিক আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ন্যায্য দাবিদার। বাংলাদেশের বাস্তবতা এই যুক্তিকে আরো শক্তিশালী করে। ফলে প্রতিবেদনটি কার্যত বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশের ন্যায্য অবস্থানকে সমর্থন করে এবং সেই জলবায়ু অর্থায়নের দাবিকেও জোরালো করে, যা আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোয় বারবার প্রতিশ্রুত হলেও বাস্তবে প্রায়ই বিলম্বিত বা অপূর্ণ থেকে যায়।

এবার রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রশ্নটি বিবেচনা করা যাক। এখানেই সবচেয়ে গভীর কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোর একটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৫ অর্থবছরে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত নেমে এসেছে প্রায় ৬ দশমিক ৭ শতাংশে, যা বিশ্বের সর্বনিম্নগুলোর মধ্যে একটি। এটি পাকিস্তানের প্রায় ১২ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার প্রায় ১৪ শতাংশ এবং ভুটানের প্রায় ২৭ শতাংশ কর-জিডিপি অনুপাতের তুলনায়ও অনেক কম। যে রাষ্ট্র তার অর্থনীতিতে সৃষ্ট প্রতি ১০০ টাকার আয় থেকে মাত্র সাত টাকা রাজস্ব হিসেবে সংগ্রহ করতে পারে, তার পক্ষে মানসম্মত শিক্ষা, জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো, সামাজিক সুরক্ষা কিংবা ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন; সবুজ রূপান্তরের মতো দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি বাস্তবায়ন তো আরো দুরূহ। এই প্রেক্ষাপটে Global Justice Report বৈশ্বিক সম্পদশালীদের ওপর অধিক কর আরোপের মাধ্যমে ন্যায়সংগত পুনর্বণ্টনের যে ধারণা তুলে ধরে, তা বাংলাদেশের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে। কারণ বিশ্বব্যাপী ধনীদের ওপর কর আরোপের আলোচনা যতটা জরুরি, বাংলাদেশের বাস্তবতায় তারও আগে প্রয়োজন একটি কার্যকর, ন্যায়সংগত ও সক্ষম করব্যবস্থা গড়ে তোলা। অন্য কথায়, বৈশ্বিক পর্যায়ে সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের দাবি জানানোর পাশাপাশি আমাদের নিজেদের রাজস্বভিত্তিক রাষ্ট্রকেও শক্তিশালী করতে হবে।

সমাধানের পথ নিয়ে আলোচনায় যাওয়ার আগে একটি বাস্তবতা অকপটে স্বীকার করা প্রয়োজন। প্রতিবেদনের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রস্তাবগুলো—যেমন বৈশ্বিক সম্পদ কর এবং একটি বিশ্ব সার্বভৌম তহবিল প্রতিষ্ঠা—অন্তত বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ নাগালের বাইরে। এগুলোর বাস্তবায়ন নির্ভর করে প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর, যার সুস্পষ্ট লক্ষণ এখনো দৃশ্যমান নয়। একইভাবে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও ওইসিডির মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও এখন পর্যন্ত এ প্রতিবেদন সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক কোনো অবস্থান প্রকাশ করেনি। তবে এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক ঐকমত্যের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। বরং প্রতিবেদনের অন্তর্নিহিত নীতিগত যুক্তি ও দিকনির্দেশনা অনুসরণ করে দেশটি তার নিজস্ব নীতি, প্রতিষ্ঠান ও রাজস্ব কাঠামোর মধ্যেই প্রয়োজনীয় সংস্কার শুরু করতে পারে এবং বর্তমান বাস্তবতায় সেটিই হওয়া উচিত সবচেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত পদক্ষেপ।

বাংলাদেশের এখন কী করা উচিত

বাংলাদেশের জন্য এই প্রেক্ষাপটে কয়েকটি নীতিগত অগ্রাধিকার স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রথমত, রাজস্বকে কেবল রাষ্ট্রের আয়ের উৎস হিসেবে নয়, বরং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আগামী এক দশকে কর-জিডিপি অনুপাত ১২-১৪ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত। এর জন্য প্রয়োজন একটি সরলীকৃত ভ্যাট ব্যবস্থা, কার্যকর সম্পত্তি কর এবং উচ্চ আয়ের গোষ্ঠীকে অযৌক্তিক সুবিধা প্রদানকারী কর-ছাড় ও অব্যাহতির সংস্কার। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটিই হতে পারে বৈষম্য হ্রাসের সবচেয়ে কার্যকর পুনর্বণ্টনমূলক পদক্ষেপ।

দ্বিতীয়ত, করব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে সেই সম্পদকে, যেখানে প্রকৃত সম্পদ সঞ্চিত রয়েছে—বিশেষত জমি ও নগর সম্পত্তি। একটি আধুনিক, ডিজিটাল সম্পত্তি মূল্যায়ন ব্যবস্থা এবং নিয়মিত সম্পত্তি কর শীর্ষ এক শতাংশের হাতে কেন্দ্রীভূত সম্পদের ওপর ন্যায্য কর আরোপের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

তৃতীয়ত, জাকাতকে কেবল ব্যক্তিগত দান হিসেবে নয়, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিক অর্থায়নব্যবস্থা হিসেবে পুনর্গঠন করতে হবে। আমাদের গবেষণা (হাসান, খান, মিয়া ও ইসলাম, ২০২৪) দেখায়, রাষ্ট্র-সমন্বিত ও সুশাসনভিত্তিক একটি জাকাত ব্যবস্থা সমাজের নিম্নআয়ের মানুষের কাছে কার্যকরভাবে সম্পদ পৌঁছে দিতে সক্ষম। এ ধরনের একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক জাতীয় জাকাত তহবিল বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতায় ‘গ্লোবাল জাস্টিস ফান্ড’-এর কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।

চতুর্থত, জলবায়ু অভিযোজন ও স্থিতিস্থাপকতা জোরদারে ওয়াক্‌ফকে একটি কৌশলগত অর্থায়ন কাঠামো হিসেবে সক্রিয় করতে হবে। ওয়াক্‌ফভিত্তিক অর্থায়নের মাধ্যমে উপকূলীয় ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে বাঁধ, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক অবকাঠামো নির্মাণ করে ইসলামি সামাজিক অর্থায়নকে জলবায়ু অভিযোজনের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা সম্ভব।

পঞ্চমত, কার্বনের উপযুক্ত মূল্য নির্ধারণ (carbon pricing) করে সেখান থেকে অর্জিত রাজস্ব নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর কাছে পুনর্বণ্টনের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে পরিবেশগত সংস্কারের ব্যয় দরিদ্র মানুষের ওপর বর্তায় না। প্রতিবেদনের মূল শিক্ষা হলো, জলবায়ু রূপান্তরের বোঝা ও এর সুফল—উভয়ই ন্যায্যভাবে ভাগাভাগি হতে হবে।

ষষ্ঠত, ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর অর্থায়নের জন্য সার্বভৌম সবুজ সুকুক (Sovereign Green Sukuk) ইস্যুর উদ্যোগ নেওয়া উচিত। এর মাধ্যমে একদিকে জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামোর অর্থায়ন নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে একটি নির্ভরযোগ্য বেঞ্চমার্ক ইয়িল্ড কার্ভ গড়ে উঠবে, যা বাংলাদেশের অগভীর পুঁজিবাজারকে আরো গভীর ও কার্যকর করে তুলতে সহায়তা করবে।

সপ্তমত, ব্রিজটাউন ইনিশিয়েটিভ (Bridgetown Initiative) এবং ভি২০ (V20)-এর মতো আন্তর্জাতিক জোটের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হয়ে বাংলাদেশকে আরো জোরালোভাবে দাবি জানাতে হবে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিপূরণ ও অভিযোজনের জন্য প্রাপ্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ঋণ হিসেবে নয়, অনুদান (grant) হিসেবে প্রদান করা হোক।

এবার হিসাব মেলানোর সময়

অনেকে Global Justice Report-কে উচ্চাভিলাষী হিসাব-নিকাশের ওপর দাঁড়ানো, কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন একটি আদর্শবাদী দলিল বলে উড়িয়ে দিতে পারেন। হয়তো সেই সমালোচনায় কিছুটা সত্যও রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এই প্রতিবেদনের প্রকৃত মূল্য এর প্রস্তাবিত বৈশ্বিক করব্যবস্থায় নয়; বরং একটি নির্মোহ দর্পণ হিসেবে। এটি আমাদের এমন এক বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি দেখায়, যে রাষ্ট্র একদিকে ‘ভিশন ২০৪১’-এর স্বপ্ন ধারণ করে, অথচ বিশ্বের অধিকাংশ দেশের তুলনায় অনেক কম রাজস্ব সংগ্রহ করে; অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাফল্য উদ্‌যাপন করে, অথচ সেই প্রবৃদ্ধির সুফল ক্রমেই সীমিত কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়; এবং এমন এক জলবায়ু সংকটের সম্মুখ সারিতে দাঁড়িয়ে আছে, যার জন্য তার দায় সবচেয়ে কম। প্রতিবেদনটির মূল বার্তা হলো—আরো ন্যায়ভিত্তিক একটি বিশ্ব গড়ে তোলা কেবল নৈতিক আকাঙ্ক্ষা নয়, বাস্তব নীতিগত পদক্ষেপের মাধ্যমেও তা সম্ভব। কিন্তু ঢাকার সামনে প্রশ্নটি আরো মৌলিক এবং আরো কঠিন—‘আমরা কি সত্যিই একটি অধিক ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং নীতিগত সাহস প্রদর্শনে প্রস্তুত?’

পবিত্র কোরআন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেকেই যেন ভেবে দেখে, আগামীকালের জন্য সে কী পাঠিয়েছে।’ (সুরা আল-হাশর, ৫৯: ১৮)। আজকের বিশ্ব তথ্য, পরিসংখ্যান ও নীতিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে সেই ‘আগামীকাল’-এর একটি সম্ভাব্য রূপরেখা আমাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। সতর্কবার্তাও স্পষ্ট, সুযোগও স্পষ্ট। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের—আমরা কি প্রয়োজনীয় সংস্কার ও ন্যায়ভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে ভবিষ্যতের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে নেব, নাকি সেই ব্যয়ের বোঝা আবারও অভ্যাসগতভাবে চাপিয়ে দেব দরিদ্র মানুষ এবং আগামী প্রজন্মের ওপর?

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রের এলএসইউ–নিউ অরলিয়েন্সের ফাইন্যান্সের অধ্যাপক ও মফেট চেয়ার; ইসলামিক ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্সে ২০১৬ সালের আইডিবি পুরস্কারপ্রাপ্ত; এএওআইএফআই এথিকস অ্যান্ড গভর্ন্যান্স বোর্ডের সদস্য এবং এডুকেশন বোর্ডের চেয়ারম্যান

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন