আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ইরানে স্থল অভিযান হবে পশ্চিমাদের আত্মহত্যা

জুলফিকার হায়দার

ইরানে স্থল অভিযান হবে পশ্চিমাদের আত্মহত্যা

ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি হামলা নিয়ে আলোচনা এখন নতুন মোড় নিয়েছে। তেহরানের পাল্টা আঘাতের জবাবে যুক্তরাষ্ট্র কি সেখানে স্থল অভিযানে নামবে—এই প্রশ্ন তোলা হচ্ছে গণমাধ্যমে, আলোচনার টেবিলে। বাস্তবতা হলো, ইরানে বড় ধরনের স্থল অভিযান কঠিন শুধু নয়, সেটা ট্যাকটিক্যাল আত্মহত্যার শামিল। যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরাইল স্থলযুদ্ধের কথা ভাবলে, সেটা সামরিক মহাবিপর্যয় বয়ে আনবে। কোনো দেশই এই অভিযানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বা লজিস্টিক ধকল সইতে পারবে না। ইরানের ভূপ্রকৃতির যে ধরন, শুধু সেটাই এ ধরনের স্থল অভিযানের সাফল্যকে অসম্ভব করে রেখেছে।

ইরান ইরাক বা আফগানিস্তান নয়, দেশটা বিশাল। পর্বতের প্রাকৃতিক বেষ্টনী দুর্গের মতো ঘিরে রেখেছে তাদের। দেশের যে ভূপ্রকৃতি, সেটাই তাদের প্রথম ও সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা স্তর। ইরানের কেন্দ্রে পৌঁছাতে হলে হামলাকারী বাহিনীকে অবশ্যই জাগরোস পর্বতমালা পার হতে হবে। এই পর্বতমালা হলো ৯০০ মাইল দীর্ঘ দুর্গম দেয়াল। এই পর্বতগুলোয় বিভিন্ন দুর্গম জায়গা রয়েছে, যেগুলো হামলাকারীদের গতি রুখে দেবে। ইরান সেখানে বাড়তি সুবিধা পাবে। সামান্য যেসব পাসিং আছে, সেগুলো ট্যাংকবিধ্বংসী অস্ত্র দিয়ে রক্ষা করা সহজ। ভারী সরঞ্জাম নিয়ে হামলাকারী বাহিনীর পক্ষে এগুলো পার হওয়া প্রায় অসম্ভব। এম১ আব্রামসের মতো ভারী সাঁজোয়া যান নিয়ে এই পাস পার হওয়াটা রীতিমতো একটা দুঃস্বপ্ন। খাড়া পাহাড়ের ঢাল আর সংকীর্ণ ঘূর্ণিবায়ুর সড়কের কারণে সাঁজোয়া গাড়ির বহরের গতি এমনিতেই কমে যাবে, ফলে সাঁজোয়া বহরকে কার্যত ইরানের ট্যাংকবিধ্বংসী অস্ত্রের আঘাত খাওয়ার জন্য বসে থাকতে হবে।

বিজ্ঞাপন

এই পার্বত্য এলাকায় লজিস্টিক্স চ্যালেঞ্জের কোনো সীমা-পরিসীমা নাই। পাসিংয়ের অনেক জায়গায় মাটি এমন নরম যে, সেটা যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে। যেকোনো জায়গায় সুবিধামতো একটা বিস্ফোরণ ঘটালেই পুরো ডিভিশন কয়েক দিন ধরে সেখানে আটকে থাকবে। উদ্ধারকারী বা মেরামতকারী যানবাহন সাধারণত এসব সংকীর্ণ জায়গায় খুব সহজে পৌঁছাতেও পারবে না। এমনকি দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলে অবস্থান নিয়েও খুব একটা লাভ হবে না। পারস্য উপসাগর থেকে সামনে এগুনোর পথটা খুবই প্রতিকূল আর দুর্গম। এই জায়গাগুলো সরবরাহকারী ট্রাকের জন্য এক একটি মৃত্যুফাঁদের মতো। ভৌগোলিক আয়তনের দিক থেকে ইরান বিশ্বের ১৭তম বৃহত্তম দেশ। সেখানে ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে যেকোনো আগ্রাসী শক্তির বহু মিলিয়ন সক্রিয় সেনা লাগবে। যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরাইলের এত বিপুল সেনা নেই। উচ্চভূমিতে পৌঁছানোর জন্য যে ক্ষয়ক্ষতির শিকার হতে হবে, সেই ধকলই তারা সইতে পারবে না।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সোমবার দাবি করেছিলেন, ইরানের মিসাইল ধ্বংস করা তাদের প্রধান লক্ষ্য। সামরিক বিশেষজ্ঞরা সাফ জানিয়েছেন, শুধু বিমান দিয়ে এই কাজ হবে না। ভূগর্ভস্থ যুদ্ধের কৌশল পাকাপোক্ত করতে ইরান বহু দশক ধরে কাজ করেছে। তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ তারা গভীর বাংকারে সংরক্ষিত রেখেছে। এর মধ্যে মিসাইল উৎপাদনের সিস্টেম ও কমান্ড সেন্টারও আছে। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র এমনকি ইরাকের স্কাড মিসাইল ঠেকাতেও ব্যর্থ হয়েছিল। আমেরিকার অনেক উন্নত বিমানশক্তি থাকার পরও সেটা ঘটেছিল। ইরানের বর্তমান অস্ত্রসম্ভার ইরাকের চেয়ে অনেক উন্নত। এটা আরো বেশি স্থানান্তরযোগ্য, আরো বেশি লুকানো। ইরানিরা অস্ত্র অ্যাসেম্বলির অগ্রসর কৌশল রপ্ত করেছে। তারা অস্ত্রগুলো খুলে ছোট ছোট টুকরা করে বেসামরিক যানবাহনে বহন করতে পারে। দুই হাজার পাউন্ডের বোমা দিয়ে বিমান হামলা করে হয়তো টানেলের মুখের ক্ষতি করা গেছে। কিন্তু ইরানি ইঞ্জিনিয়ারদের প্রযুক্তিগত কৌশল তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে। সত্যিই এই হুমকি নিশ্চিহ্ন করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের স্পেশাল ফোর্স পাঠাতে হবে ইরানের ভূগর্ভস্থ শহরগুলোয়। সেটা হলে গভীর টানেলগুলোয় ভয়াবহ যুদ্ধ হবে। সেখানে সম্পূর্ণ সুবিধা পাবে ইরানের সেনারা।

স্থল অভিযান চালানো হলে সেটা ইরানের সীমানার মধ্যে সীমিত থাকবে না। তেহরান হাইব্রিড ও অসম যুদ্ধের কৌশল রপ্ত করেছে। আঞ্চলিক আগুনের রিং তৈরির জন্য তারা প্রতিরোধ অক্ষ গড়ে তুলেছে। এই নেটওয়ার্কের মধ্যে লেবাননের হিজবুল্লাহ আছে, আছে ইয়েমের হুথিরা। ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্স বা পিএমএফ-ও তাদের সঙ্গ দেবে। হিজবুল্লাহ ইসরাইলের শহরগুলোয় হাজার হাজার প্রিসিশন রকেট ফেলবে। ইসরাইলের সামরিক বাহিনী তখন বাধ্য হবে দুই ফ্রন্টে লড়তে। হুথিরা লোহিত সাগরের বাবেল মান্দেপ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। বৈশ্বিক জাহাজ পরিবহন আর বাণিজ্য তখন কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে। এর মধ্যে ইরাকের পিএমএফ আমেরিকার সরবরাহ লাইনে হামলা করবে। ফলে আগে অগ্রসর আমেরিকান বাহিনীর লজিস্টিক্স সরবরাহ তখন কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে। আমেরিকানদের বুট যদি ইরানের মাটিতে পড়ে, তাহলে এই আঞ্চলিক শক্তিগুলোও তাৎক্ষণিক আঘাত হানবে। তারা হামলাকারী সেনাদের দুর্বল জায়গাগুলোকে টার্গেট করবে। স্থানীয় হামলা তখন আঞ্চলিক দাবানলে রূপ নেবে। পশ্চিমাদের আর্থিক সম্পদ তখন কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শুকিয়ে আসবে।

ইসরাইলের পক্ষে স্থল অভিযান কৌশলগত ও ভৌগোলিকভাবে অসম্ভব। ইরানের সঙ্গে তাদের সরাসরি কোনো স্থলসীমান্ত নেই। টার্গেটে যেতে হলে ইসরাইলি বাহিনীকে ইরাক বা জর্ডানের ভেতর দিয়ে যেতে হবে। সে রকম চেষ্টা হলে জায়নবাদী ইসরাইলের বিপক্ষে ভয়ানক আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে। ইসরাইলের সামরিক বাহিনী তৈরিই করা হয়েছে সংক্ষিপ্ত ও উচ্চ মাত্রার হামলার জন্য। ৮৫ মিলিয়ন মানুষের বিরুদ্ধে দীর্ঘ যুদ্ধ চালানোর জন্য তাদের তৈরি করা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লজিস্টিক্সের বোঝাটা বারবার দুঃস্বপ্ন হয়ে ফিরে আসছে। প্রতি গ্যালন জ্বালানিকে সেখানে বিপজ্জনক হরমুজ প্রণালি পার হয়ে যেতে হবে। এই সাগরপথ ইরানের নিয়ন্ত্রণে। বহু ধরনের মিসাইল সম্ভার তৈরি আছে এই প্রণালি রক্ষায়। প্যারাট্রুপার নামানোটাও আধুনিক যুদ্ধ বিশ্লেষকদের মতে হবে আত্মঘাতী। আকাশপথে সেনা ইউনিট নামানোর চেষ্টা হলে তাদের ঘিরে ফেলে শেষ করে দেওয়া হবে। পার্বত্য এলাকা পার হয়ে সময়মতো সেখানে সাহায্য পৌঁছাতে পারবে না সহায়ক বাহিনী। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের সমর্থনও ভেঙে পড়বে।

পশ্চিমা বিশ্লেষকদের কেউ কেউ আশায় আছেন, শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে ইরানে। তেহরানে পাহলভি শাসন আবার ফিরে আসবে, এমন দিবাস্বপ্ন দেখছে তারা। ইরানি জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে এটা মৌলিক ও বিপজ্জনক ভুল ধারণার ফল। বহু ইরানি হয়তো ইরানের বর্তমান সরকারের নীতির বিরোধিতা করে; কিন্তু ক্ষমতাসীনদের বাইরেও তাদের জাতীয়তাবাদী চেতনা অটুট রয়েছে। বিদেশি আগ্রাসনের যে স্মৃতি রয়েছে তাদের, সেটা ইরানের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে রাখে। যেকোনো আগ্রাসন হলে জাতীয় পতাকা ঘিরে বড় ধরনের ঐক্য তৈরি হবে। সরকারের কঠোর সমালোচকও তখন মাতৃভূমির রক্ষকের ভূমিকায় নামবে। কেন্দ্র দুর্বল হওয়া মানেই তাদের পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্র আঁকড়ে ধরা নয়। সে রকম ঘটলে বরং বিশৃঙ্খল লিবিয়া বা ইরাকি ধাঁচের একটা পরিস্থিতি তৈরি হবে, জাতিগত বিভাজন তৈরি হবে। কুর্দি বা বালুচদের মতো গোষ্ঠীগুলো তখন হয়তো নিজেদের স্বাধীনতা দাবি করতে পারে। এতে করে পুরো অঞ্চলে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ শুরু হতে পারে। এরকম শূন্যতা সৃষ্টি হলে রাশিয়া ও চীন চুপ করে থাকবে না। তারা সেখানে সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে। বেইজিং ইরানকে তাদের অর্থনীতির জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎস মনে করে। যুক্তরাষ্ট্র সেখানে পোষা সরকার বসানোর চেষ্টা করলে তারা চুপচাপ সেটা মানবে না।

যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরাইলের কৌশল টিকে আছে প্রযুক্তির ওপর। তাদের বিশ্বাস উন্নত সেন্সর প্রতিটি লুকানো মিসাইল খুঁজে বের করতে পারবে। কিন্তু তাদের সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা একমত নন। তারা বলছেন, বিশাল পর্বতে একটা মিসাইল লঞ্চার খোঁজাটা খড়ের গাদায় সুচ খোঁজার মতো।

অতীতের প্রতিটি পশ্চিমা সংঘাত থেকে ইরানিরা কিছু না কিছু শিখেছে। তারা এমন সব যোগাযোগ সিস্টেম গড়ে তুলেছে, যেগুলো স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভর করে না। তাদের কারখানাগুলো মাটির এতটা গভীরে বানানো হয়েছে, যেখানে বাংকার বাস্টার পৌঁছাতেই পারে না। স্থলযুদ্ধ হলে তার মানবিক ক্ষয়ক্ষতি হবে নজিরবিহীন। আর্থিক টানাপোড়েনে থাকা পশ্চিমা অর্থনীতিকে সেটা দেউলিয়া বানিয়ে দেবে। তেলের দাম রাতারাতি হয়তো তিনগুণ হয়ে যাবে। এতে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বাড়বে, ইউরোপ ও আমেরিকায় দেখা দেবে অস্থিরতা।

ওয়াশিংটন আর তেল আবিবের কথাবার্তায় মনে হচ্ছে, সামরিক শক্তি একটা সহজ সমাধান। কিন্তু বাস্তব তথ্য ঠিক উল্টোটাই বলছে। ইরানের ভূ-প্রকৃতি দুর্ভেদ্য ঢালের মতো। তাদের ভূগর্ভস্থ মিসাইল শহর ধারালো আর লুকানো তলোয়ারের মতোই শানিত। মিত্রদের আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক একটা জটিল ফাঁদ। এখানে স্থল অভিযান হবে পশ্চিমাদের জন্য আত্মহত্যার শামিল। যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরাইল হয়তো বিমান হামলা করে ভবন ধ্বংস করতে পারে। কিন্তু দৃঢ়চেতা বিশাল একটা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে স্থলে টিকে থাকতে তারা পারবে না। এ ধরনের যেকোনো চেষ্টা হলে তাদের সামরিক বাহিনীর মেরুদণ্ড ভেঙে যাবে। বৈশ্বিক অর্থনীতির পতন হবে। একটা প্রজন্ম হারিয়ে যাবে। ইরানের চোরাবালি পশ্চিমাদের জন্য একটা গভীর গর্তের মতো। ইতিহাস দেখিয়েছে, ইরানের মালভূমিতে যেসব হামলাকারীর পা পড়েছে, তারা সাধারণত ফিরে আসেনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন