অঘোষিত রাজতন্ত্র এবং গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা

আজাদ খান

অঘোষিত রাজতন্ত্র এবং গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা
ছবি: সংগৃহীত

আমাদের দেশে আজকাল গণতন্ত্র নামক পরিবারতন্ত্র বা অঘোষিত রাজতন্ত্র নিয়ে কথা বলছেন কেউ কেউ। আমাদের দেশের গণতন্ত্র কেন রাজতন্ত্রের সঙ্গে তুলনীয়? কারণ আমাদের দেশের গণতন্ত্র আর অন্য দেশের রাজতন্ত্র দুটোরই ক্ষমতা উত্তরাধিকার সূত্রে পারিবারিক ধারায় প্রতিষ্ঠিত। যদিও বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সরকার সব রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে একটা নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু ৯০-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে যে রাজনৈতিক দল দুটি ক্ষমতায় এসেছে, তাদের রয়েছে একটা ডাইনেস্টি বা পারিবারিক রাজনৈতিক ইতিহাস। এই দুটি দলের শীর্ষ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ডাইনেস্টি ধারায়। যে কারণে ঘুরেফিরে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সরকার মূলত এক ধরনের রাজতান্ত্রিক সরকার।

এবার আসি রাজতন্ত্রের ধরন নিয়ে। প্রকৃত রাজতন্ত্র দুই ধরনের হয় : Absolute Monarchy (সর্বোচ্চ ক্ষমতা) এবং Constitutional Monarchy (সাংবিধানিক রাজতন্ত্র)।

বিজ্ঞাপন

Absolute Monarchy : রাজা বা রানির হাতে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা থাকে, যা সৌদি আরব বা ওমানের মতো দেশে দেখা যায়।

Constitutional Monarchy : রাজা বা রানি রাষ্ট্রের প্রতীকী প্রধান, কিন্তু প্রকৃত শাসন ক্ষমতা নির্বাচিত সংসদ বা প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকে, যেমন : যুক্তরাজ্য, স্পেন বা ভুটান।

কিন্তু Absolute Monarchy হোক আর Constitutional Monarchy হোক, তাদের কারোরই কোনো নিজস্ব রাজনৈতিক দল থাকে না। তারা যুগ যুগ ধরে একটা ট্রেডিশনাল ধারায় প্রতিষ্ঠিত।

কিন্তু আমাদের দেশে গণতন্ত্রের আড়ালে যে রাজতন্ত্র চলে, তা মূলত ওই দুই ধারার রাজতন্ত্রের চেয়েও ভয়ংকর। কেন ভয়ংকর? কারণ আমাদের সরকার যেহেতু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটা নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়, সেহেতু সাংবিধান সরকারের ক্ষমতাকে ব্যাপক শক্তিশালী এবং সুসংহত করে। অন্যদিকে এই গণতন্ত্র নামক রাজতান্ত্রিক সরকারের সবচেয়ে বড় যে প্লাস পয়েন্ট হয়, তা হলো তার থাকে বিশাল একটা রাজনৈতিক দল, থাকে লাখ লাখ নেতাকর্মী। ক্ষমতার মসনদের পেছনে এটাই হলো তার সবচেয়ে বড় শক্তি। এই বিশাল রাজনৈতিক কর্মীবাহিনীর ওপর ভর করেই সে রাষ্ট্র ক্ষমতায় টিকে থাকে। রাষ্ট্রের তৃণমূল থেকে শহরে-নগরে, বন্দরে দলের আধিপত্য বিস্তার, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো দমন, নিপীড়ন, রক্তচক্ষু প্রদর্শন—সবকিছু এই বিশাল কর্মীবাহিনী দ্বারাই নিয়ন্ত্রণ করে।

অন্যদিকে দলের লাখ লাখ নেতাকর্মী দলের অপরিসীম ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে দেশব্যাপী সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, খুন, রাহাজানি, ডাকাতিসহ সব অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে। যেহেতু নেতাকর্মীরা দলের পরিচয়ে লাভবান হয়। অর্থাৎ প্রভাবশালী, ক্ষমতাশালী এবং বিত্তশালী হয়, সেহেতু তারা রাষ্ট্রের কিংবা দলে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে চায়। আর এই উদ্দেশ্যে দলের ডাইনেস্টি লিডারকে খুশি করতে নেতাকর্মীরা তার চাটুকারিতা আর বন্দনার উন্মাদ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। কারণ ডাইনেস্টির মন্ত্রবলে এই নেতা আমৃত্যু দলের শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত থাকেন। ক্ষমতা হয় এককেন্দ্রিক। তাকে খুশি রাখতে পারলে সরকার কিংবা দলে তাদের অবস্থানও চিরস্থায়ী হয়। তারা তখন নেতাকে নেতা থেকে দেবতায় পরিণত করে। নেতার চারপাশে তৈরি হয় তার কাছের মানুষদের এক শক্তিশালী, দুর্ভেদ্য চাটুকার বলয়। যে বলয়ে দেবতাতুল্য নেতা আটকা পড়ে যান, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন সাধারণ মানুষ এবং পৃথিবীর মুক্ত আলো-বাতাস থেকে। তখন নেতার চারপাশের ওই একান্ত চাটুকার মানুষ যা বলেন, যে মন্ত্র দেন নেতা, তাই বিশ্বাস করেন, অন্ধের মতো হজম করেন, অন্ধের মতো পথ হাতড়ে চলেন।

এই চাটুকারিতা আর বন্দনা শুধু দলের নেতাকর্মীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এই উন্মাদ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় দেশের সিভিল, পুলিশ ও মিলিটারি প্রশাসন। বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পেতে সঙ্গে যোগ হয় দেশের চতুর্থ এস্টেট বলে পরিচিত গণমাধ্যম, শিল্পসাহিত্য, সংস্কৃতি, শিক্ষাঙ্গন, রাষ্ট্রের বিবেকবান সুশীল সমাজ, ব্যবসায়ী মহলসহ বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার প্রতিষ্ঠিত ও পরিচিত মুখরা। এদের সবার দ্বারা তৈরি হয় একটা ডিপ স্টেটের। এই ডিপ স্টেটের দ্বারা রাষ্ট্রের সম্পদের ব্যাপক লুটতরাজ হয়, যা একটা রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে ফেলে। এই ব্যবস্থায় এই গণতন্ত্র নামক রাজতন্ত্রের নেতা এবং তার দলের নেতাকর্মী কিংবা ডিপ স্টেট সবাই সমান্তরালভাবে লাভবান হন। আর ধ্বংস হয় রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের সম্পদ, অর্থনীতি; বঞ্চিত হয় সাধারণ মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার এবং প্রকৃত গণতন্ত্র। এভাবেই গণতন্ত্র নামক রাজতন্ত্র স্বৈরাচারী হিসেবে দেশের মানুষের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে। অতএব দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে, জুলাইয়ের হাজারো শহীদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে, নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে গণতন্ত্র নামক পরিবারতন্ত্র বা রাজতন্ত্র হঠাতে হবে—এর কোনো বিকল্প নেই।

কিন্তু কীভাবে? একে হটানো কি এতই সহজ? এতবড় একটা বিপ্লব হওয়ার পরও কেন একে হটানো গেল না! তার অন্যতম একটা কারণ হলো কয়েক দশক ধরে চলা গণতন্ত্র নামক এই রাজতন্ত্র আমাদের মনস্তত্ত্বে ঢুকে গেছে। এই অঘোষিত রাজতন্ত্রের পক্ষে আমাদের একটা ফেনোমেনা তৈরি হয়ে গেছে। আর এই ফেনোমেনা যারা লালন করছে, তারা হলো ওই রাজতান্ত্রিক গোষ্ঠীর কাছ থেকে নিজেদের সুবিধা আদায়ে অত্যন্ত তৎপর ওল্ড এস্টাবলিশমেন্ট, এরা খুবই শক্তিশালী। আরেকটা কারণ হলো, আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতীয় আধিপত্যবাদের প্রভাব। ভারত আমাদের সীমান্তবর্তী প্রতিবেশী এবং বৃহৎ শক্তি হওয়ায় এই প্রভাব থেকে বের হওয়া আমাদের খুব সহজ না। কিন্তু ছোট দেশ নেপাল পারলে আমরা পারব না কেন? হ্যাঁ আমরাও পারব, আমাদের পারতে হলে আগে ঘরের শত্রু নির্মূল করতে হবে, ভাঙতে হবে ওই ওল্ড এস্টাবলিশমেন্ট। এ জন্য দেশে প্রবল প্রতিরোধী এন্টি-এস্টাবলিশমেন্ট শক্তি গড়ে তুলতে হবে। তরুণ সমাজ এবং প্রকৃত দেশপ্রেমিক নাগরিক সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তবে নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভের পর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী বিএনপি সরকারের এই দুই মাসের শাসনব্যবস্থায় গণভোটকে অস্বীকার এবং ছোট করে দেখা; গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশসহ ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে বড় ধরনের ছেদ ঘটেছে। এছাড়া শিক্ষাঙ্গন, ক্রীড়াঙ্গনসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক বা নিজেদের পছন্দের লোক নিয়োগ, সরকার বা প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ায় সাইবার সিকিউরিটি আইনের অপব্যবহার করে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন ব্লগার বা আকটিভিস্টকে গ্রেপ্তার, প্রশাসনের শীর্ষপর্যায়ে ঘুস, দুর্নীতি, অনিয়ম; দেশের চলমান অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি—সবকিছু প্রায় গত ফ্যাসিস্ট সরকারের চেহারায় ফিরে আসায় দেশের জনগণের খুব তাড়াতাড়ি মোহভঙ্গ ঘটছে বলে মনে হচ্ছে। সেদিক দিয়ে এই যুদ্ধটা খুব বেশি লম্বা হবে বলে মনে হয় না। কারণ ২৪-এর বিপ্লব আমাদের সে রাস্তাটা অনেকটা সহজ করে দিয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে একটা ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ বা ‘অক্টোবর বিপ্লব’ খুব বেশি দূরে হবে বলে মনে হয় না।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন