একই দৃশ্য, কেবল সময় ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন

একই দৃশ্য, কেবল সময় ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন

দলের নমিনেশন পাওয়ার পর এটা নিশ্চিত ছিল, বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গত ২০ আগস্ট পার্লামেন্টের বিশেষ অধিবেশনে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সেটাই ঘটেছে। তবে যেটা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে, সেটা হচ্ছে, ফলাফল ঘোষণার পর নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের শুভেচ্ছা বিনিময় ও কোলাকুলি। এই কোলাকুলির মধ্যে কোনো ভণিতা ছিল না, ছিল আন্তরিকতা, যার মধ্যে গণতন্ত্রকে আরো শক্তিশালী করার ইঙ্গিত বহন করছে।

যদিও এই জাতীয় সংসদে এ ধরনের দৃশ্য আগেও আমরা দেখেছি। এখনো অনেকের স্মৃতিতেই সে দৃশ্য জ্বলজ্বল করছে। সেটা ছিল ১৯৯১ সালে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী পাস করার পরের দৃশ্য। আমরা দেখেছিলাম, কীভাবে ওই সংশোধনী পাস করার পর সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে পরস্পরকে কোলাকুলি করেছিলেন। এ দৃশ্য দেখে তখন সবাই ভেবেছিলেন যে, জেনারেল এরশাদের স্বৈরশাসন অবসানের পর রাজনৈতিক নেতারা হয়তো গণতন্ত্রের সুমহান পথ ধরে সামনে এগিয়ে যাবেন। কিন্তু এই কোলাকুলির আনন্দধারা খুব তাড়াতাড়িই তিক্ততায় পরিণত হয়। বলা যায়, হাওয়াই-মিঠাইয়ের মতো সে ধারণা উবে গিয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

তখন সরকারে ছিল বিএনপি এবং বিরোধী দলের আসনে ছিলেন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা। সেদিনের আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই অচিরেই আওয়ামী লীগের এমপিরা স্বরূপে আবির্ভূত হন। ঠিক সেই দিন থেকে শুরু হয়, যেদিন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদ পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বিএনপি সরকারকে অনভিজ্ঞ ও অদক্ষ হিসাবে অভিহিত করে ঝাঁকুনি দিয়ে গণতন্ত্র শেখানোর কথা বলেছিলেন।

প্রায়ই তিনি এবং তার দলের লোকজন স্পিকারের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়তেন। মনে হতো ইচ্ছাকৃতই হচ্ছে এসব। আর ঝাঁকি দেওয়ার বিষয়টি নিছক কথার কথা ছিল না, তা পরবর্তী সময়ে বোঝা গিয়েছিল। সে সময় প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে তুমুল আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। একপর্যায়ে তারা সংসদ বর্জন করে এবং অতঃপর ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরে সংসদ থেকে পদত্যাগ করে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে দেয়।

মূলত ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলকে শেখ হাসিনা কোন অবস্থাতেই মেনে নিতে পারেননি। তিনি ভেবেছিলেন ওই নির্বাচনে তার দল বিজয়ী হয়েছিল। কিন্তু সূক্ষ্ম কারচুপি ও অদৃশ্য শক্তির হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সেই ফলাফল পাল্টানো হয়েছে। তাই তিনি বিএনপি সরকারের বৈধতা ও যোগ্যতা নিয়ে সবসময় প্রশ্ন তুলতেন। পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি নিজের জন্য যা নৈতিক মনে করেন, অন্যের জন্য তা মনে করেন অনৈতিক।

এদিকে আবার আমরা দ্বিতীয়বার সংসদীয় সরকার পদ্ধতি চালু হওয়ার ৩৪ বছর পর পার্লামেন্টে আর একটা কোলাকুলির দৃশ্য দেখলাম। তবে এবার সময় ও প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ বিশ্ব এখন সেই সময়কার মতো সমাজতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী ক্যাম্পে বিভক্ত নয়, কিংবা ঠান্ডা যুদ্ধ-উত্তর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক কর্তৃত্বের বিশ্ব নয়। বরং এখন বহুমেরুর বিশ্ব বিরাজমান। ঠিক এই পটভূমিতে রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বিজয়ী ঘোষণার পর বিরোধী দলের সদস্যদের অভিনন্দন জানানোর দৃশ্যটি অর্থবহ মনে হয়েছে।

প্রথমে বিরোধী দলের নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুল ইসলাম শুভেচ্ছা জানান এবং কোলাকুলি করেন নতুন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে। তারপর একে একে বিরোধী দলের অন্য সদস্যরা রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আলিঙ্গন করেন। যদিও তাদের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ পরাজিত হয়েছেন, তথাপি তাদের চোখে-মুখে কোনো বিদ্বেষের ভাব ছিল না। আর ভারত যখন বাংলাদেশের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে, যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরে না যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ভারতীয় কূটনীতিকরা হুমকিমূলক বক্তব্য দিচ্ছে; তখন পার্লামেন্টের এই দৃশ্য জনগণের মধ্যে উৎসাহ সৃষ্টি করেছে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিএনপির শীর্ষ নেতারা দলের দীর্ঘসময়ের মহাসচিব এবং নানা সংকটকালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে কার্যত একজন নেতার অবদানকে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

অন্যদিকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হলেও বাংলাদেশে শাসন পদ্ধতি পরিবর্তনের পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেরও বিচিত্র ইতিহাসের কথা আমাদের স্মরণ করে দিয়েছে। বলা যায়, এ পর্যন্ত বাংলাদেশে তিন পদ্ধতিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালিত হয়ে এসেছে। অর্থাৎ কখনো ভোট ছাড়া বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, কখনো জনগণের সরাসরি ভোটে আবার কখনো সরাসরি জনগণের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে এসেছে।

এদিকে মজার বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে ২০ আগস্টের নির্বাচন নিয়ে সংসদীয় সরকার পদ্ধতিতে মাত্র দুবার প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। অর্থাৎ একাধিক প্রার্থীর মধ্যে ভোটাভুটি হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। আর এ দুটি ঘটনাই ঘটেছে বিএনপি সরকারের আমলে। প্রথমটা ঘটেছিল ১৯৯১ সালে। তখন বিএনপির প্রার্থী ছিলেন আবদুর রহমান বিশ্বাস এবং বিরোধী দলের আসনে বসা আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী। আর এবার দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত ঘটল এ বছর গত ২০ আগস্ট। এবারও বিএনপি ক্ষমতায় এবং তার প্রার্থী ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অন্যদিকে বিরোধী দলের আসনে বসা জামায়াতে ইসলামের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ছিলেন কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম। এই দুটো ঘটনা ছাড়া সংসদীয় পদ্ধতিতে এ ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন আর কোনো সময়ই অনুষ্ঠিত হয়নি। আর বাকি নির্বাচনগুলো রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি কালে জনগণের সরাসরি ভোটে, আর সংসদীয় পদ্ধতিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হয়েছে।

অন্যদিকে ইতিহাস বলছে, স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সূচনাপর্ব অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে হওয়ার ফলে বারবার গণতন্ত্রের কবর রচিত হয়েছে। যেমন করে বলা হয়, সকালটাই বলে দেয় সারা দিনটা কেমন যাবে। তাই দেখা যাচ্ছে, স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনাপর্বে যারা অগণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন, তারাই পরবর্তী সময়ে বারবার অগণতান্ত্রিক পন্থা অবলম্বন করেন নানা পদ্ধতিতে।

আর সেটার ধারাবাহিক ইতিহাস আমাদের চমকে দেয়। কারণ যারা গণতন্ত্রের জন্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানের কথা বলেন, তারাই মূলত স্বাধীনতার পর এমন সব অগণতান্ত্রিক পন্থা অবলম্বন করেন, যা জনগণকে দ্রুত হতাশায় নিমজ্জিত করেছিল। একটু পেছনে ফিরে গেলে আমরা দেখতে পাই, ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল প্রবাসী সরকার গঠন করা পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ সম্ভবত সঠিক ছিল। তখন প্রবাসী সরকারের রাষ্ট্রপতি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান এবং উপরাষ্ট্রপতি ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। ওই বছর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেন। কারণ শেখ মুজিবর রহমান তখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ছিলেন। তিনি ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ঢাকা প্রত্যাবর্তন করেন এবং ১২ জানুয়ারি সংসদীয় পদ্ধতি চালু করে নিজে প্রধানমন্ত্রী হন এবং বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি বানান। সে হিসেবে বিচারপতি চৌধুরী হলেন বাংলাদেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি। এরপর সংবিধান কার্যকর হলে ১৯৭৪ সালে ২৪ জানুয়ারি প্রথম সংসদীয় পদ্ধতিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তৃতীয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন, মোহাম্মদ উল্লাহ।

কিন্তু এক বছরের মাথায় তিনি অপসারিত হয়ে যান। কারণ ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে যে একদলীয় বাকশালী শাসন কায়েম হয়েছিল, সেই সংশোধনীর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান নিজেই সরাসরি প্রধানমন্ত্রী থেকে রাষ্ট্রপতি হয়ে যান। কিন্তু কীভাবে কোনো ভোটাভুটি ছাড়া সেটা সম্ভব হলো, সে প্রশ্ন থাকতেই পারে। মূলত চতুর্থ সংশোধনী আইনের চতুর্থ তফসিলে একটি সুনির্দিষ্ট ধারা যুক্ত করা হয়েছিল। সেই ধারায় সুস্পষ্টভাবে লিখে দেওয়া হয়েছিল যে, এই সংশোধনী পাস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হবেন এবং রাষ্ট্রপতির কার্যভার গ্রহণ করবেন। অর্থাৎ সরকার পদ্ধতির পরিবর্তনের পর তার পদ পরিবর্তনের বিষয়টি এই আইনি বিলের অংশ ছিল। তখন সংসদ থাকলেও শেখ মুজিবুর রহমানের কর্তৃত্বের কাছে তা অকার্যকর হয়ে ছিল। যেমনটা তৎকালীন যুবলীগের সভাপতি শেখ মনি বলেছিলেন, ‘কীসের আইনের শাসন, বঙ্গবন্ধুর আদেশই আইন।’ এ থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকারের নেতৃত্বে কীভাবে গণতন্ত্রের সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়ে ব্যক্তি-অর্চনা প্রাধান্য পেয়েছিল। সেই ধারা থেকে আওয়ামী লীগ কখনো পিছিয়ে যায়নি। তাই তারা কখনো সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে একদলীয় শাসন কায়েম করেছে, আবার কখনো দুঃশাসনের মাধ্যমে চরম ফ্যাসিবাদী শাসন জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। এমনকি চতুর্থ সংশোধনীতে শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলাদেশের সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করলেও কারো কিছুই করার ছিল না।

অন্যদিকে বাংলাদেশে এমন ইতিহাসও আছে, একজন সামরিক শাসক একদলীয় শাসনের অবসান ঘটিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। যেমন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আবার বহুদলীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন করে এবং ১৯৭৮ সালের ৩ জুন বাংলাদেশে প্রথম জনগণের সরাসরি ভোটে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এই ধারা অব্যাহত থাকে ১৯৯১ সালে সংসদীয় পদ্ধতিতে প্রত্যাবর্তন করা পর্যন্ত।

এরপর ’৯১ সালে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দ্বিতীয় দফায় সংসদীয় সরকার পদ্ধতি চালু হওয়ার পর মাত্র দুবার সংসদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা আগেই উল্লেখ করেছি। এই পদ্ধতিতে বাকি রাষ্ট্রপতিরা নির্বাচিত হয়েছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই ইতিহাস বাংলাদেশের গণতন্ত্র কতটা ভঙ্গুর সেটাই প্রমাণ করে দেয়। তবুও আমরা আশা রাখি, বর্তমান পার্লামেন্ট বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে উজ্জীবিত রাখবে, নিরাশ করবে না।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন