বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা ও গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে কৃষি গভীরভাবে জড়িত। কৃষিকে আধুনিক, বিজ্ঞানভিত্তিক ও লাভজনক করে তুলতে প্রয়োজন দক্ষ কৃষিবিদ, উদ্ভাবনী কৃষিবিজ্ঞানী এবং কৃষকের সমস্যা সমাধানে সক্ষম গবেষক। এ ক্ষেত্রে কৃষিশিক্ষা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (সিকৃবি) তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান। আজ (২ নভেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়টির ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। দুই দশকের এই পথচলা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন মূল্যায়নের পাশাপাশি এর ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে ভাবারও সুযোগ তৈরি করেছে।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসেবে। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই আমি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছি। এখানকার শিক্ষা আমার পেশাগত ভিত্তি গড়ে তুলতে এবং কৃষিকে গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করেছে। তাই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জনে যেমন গর্ববোধ করি, তেমনি এর ভবিষ্যৎ নিয়েও আমার প্রত্যাশা রয়েছে। আমার বিবেচনায়, একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য শুধু কতজন শিক্ষার্থী ডিগ্রি অর্জন করলেন, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। শিক্ষার্থীরা কতটা দক্ষ হয়ে উঠছেন, তাদের গবেষণা কতটা কার্যকর হচ্ছে এবং দেশের কৃষি ও কৃষকের জীবনমান উন্নয়নে তারা কতটা অবদান রাখছেন, সেগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রা শুধু প্রশাসন বা শিক্ষকদের একক প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়। এর জন্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সিকৃবির সঙ্গে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ আরো শক্তিশালী করা যেতে পারে। তাদের পেশাগত অভিজ্ঞতা, গবেষণার অর্জন, উদ্যোক্তা হিসেবে সাফল্য এবং কর্মক্ষেত্রের চাহিদা বর্তমান শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর দিকনির্দেশনা হতে পারে।
একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত আবাসন, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, আধুনিক পরীক্ষাগার, পর্যাপ্ত গবেষণা উপকরণ এবং নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। একাডেমিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি, মেধার যথাযথ মূল্যায়ন এবং গবেষণার স্বাধীনতা বজায় রাখতে হবে। শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা ও সামগ্রিক বিকাশের প্রতিও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে গুরুত্ব দিতে হবে।
কৃষি উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব। কৃষি গবেষণাকে শুধু ব্যয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। তাই বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থায়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি গবেষণার ফল মাঠপর্যায়ে প্রয়োগের ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে।
২০০৬ সালের ২ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করা সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় দুই দশকে কৃষিশিক্ষা ও গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে সাতটি অনুষদ ও ৪৭টি বিভাগ রয়েছে। কৃষি ও সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় শিক্ষা এবং গবেষণার এই বিস্তৃত পরিসরকে কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতে আরো এগিয়ে যেতে পারে।
আগামী দিনের সিকৃবির জন্য কয়েকটি লক্ষ্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের দক্ষ ও নৈতিকতাসম্পন্ন কৃষিবিদ হিসেবে গড়ে তোলা, মানসম্মত গবেষণার পরিসর বাড়ানো, কৃষকের সমস্যা সমাধানে গবেষণার ফল কাজে লাগানো, প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণের সংযোগ জোরদার করা এবং কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করতে হবে। তবে গবেষণার উৎকর্ষ যেন দেশের কৃষি ও কৃষকের প্রয়োজন থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়।
লেখক: সদ্য সাবেক কৃষি সম্পাদক, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি); সদস্য সচিব, জাতীয় কৃষক শক্তি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


