ইসরাইলের রাজনীতিতে নয়া আতঙ্ক ‘আরব ভোট’

ইসরাইলের রাজনীতিতে নয়া আতঙ্ক ‘আরব ভোট’
ছবি: এপি

ইসরাইলের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী আরব দলগুলোর সাফল্য ইহুদিবাদী প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরকেই কাঁপিয়ে দিয়েছে। সর্বশেষ গণনা অনুযায়ী, আরব ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দল জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম ১২০ আসনের নেসেটের ১৯টিতে জিতেছে। দেশটির পার্লামেন্টের ইতিহাসে এটিই আরবদের সর্বোচ্চ প্রতিনিধিত্ব। এর আগে ২০২০ সালের নির্বাচনে তারা ১৫টি আসন পেয়েছিল। আরব দলগুলো এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং সরকার গঠনের ক্ষেত্রে ‘কিংমেকার’ হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি নির্বাচনে আরব দলগুলোর অবিশ্বাস্য এই সাফল্যকে নির্বাচনি রাজনীতিতে ‘ভূমিকম্পের’ সঙ্গে তুলনা করেছে।

বিজ্ঞাপন

‘ইসরাইল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউট’-এর বিশ্লেষকরা একসময় দেশটির সাধারণ নির্বাচনে আরব ভোটারদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়াকে প্রায় অপরিবর্তনীয় প্রবণতা হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। ১৯৯৯ সালে যেখানে আরব ভোটার উপস্থিতির হার ছিল প্রায় ৭৫ শতাংশ, ২০২১ সালে তা ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসে। এরপর ২০২২ সালে তা কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩ দশমিক ২ শতাংশে। আর ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে আরব ভোটার উপস্থিতির হার ছিল প্রায় ৮০ শতাংশ, যা জাতীয় গড় ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশের চেয়েও বেশি। এ ঘটনা দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশই ফিলিস্তিনি নাগরিক।

নির্বাচনে আরব ভোটারদের ব্যাপক অংশগ্রহণের পেছনে বেশ কিছু কারণ আছে। প্রথম ও সবচেয়ে প্রত্যক্ষ কারণটি হলো নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থি সরকারের প্রতি আরব ফিলিস্তিনিদের তীব্র ক্ষোভ। নেতানিয়াহুর সরকার আদর্শগতভাবে আরববিদ্বেষী এবং কট্টর ডানপন্থি ও বর্ণবাদী মন্ত্রীরা প্রকাশ্যেই আরবদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের উসকানি দিয়ে থাকেন। সেপ্টেম্বর মাসে ‘ইসরাইল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউট’-এর এক জরিপে দেখা গেছে, আরব ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ৫৪ শতাংশই তাদের বিরুদ্ধে নেতানিয়াহু সরকারের ক্রমবর্ধমান অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে এবারের নির্বাচনে নিজেদের ভোট দেওয়ার প্রধান ইস্যু হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

দ্বিতীয় কারণটি হলো, নির্বাচনের দিন নেতানিয়াহু আতঙ্ক ছড়াতে ব্যস্ত ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ফিলিস্তিনি নাগরিকরা দলে দলে ভোটকেন্দ্রে ভিড় করছেন। তিনি তাদের বিরুদ্ধে নির্বাচন ছিনতাইয়ের চেষ্টার অভিযোগও তোলেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, লিকুদ পার্টি এবং ‘রিলিজিয়াস জায়োনিজম’ জোট আরব অধ্যুষিত ভোটকেন্দ্রগুলোতে প্রায় দুই হাজার দলীয় কর্মী পাঠিয়েছিল। আরব দলগুলোর দাবি, ভোটারদের ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যেই এ কাজ করা হয়েছিল।

তৃতীয় সম্ভাব্য কারণটি হলো, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে সরকারের ব্যর্থতা এবং পরবর্তী পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে জাতীয় পর্যায়ে যে চেষ্টা চলছে, তাতে ডানপন্থি ও বামপন্থি—উভয় ধারার দলগুলোর অংশগ্রহণ। গাজায় নৃশংসতা এবং অধিকৃত পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বসতিস্থাপনকারী উগ্রপন্থিদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য ইসরাইলের আরব ফিলিস্তিনিরা নেতানিয়াহুকে দায়ী করে তাকে জবাবদিহির আওতায় আনার কথা বলেছেন।

প্রতিদ্বন্দ্বী জায়নবাদী শিবিরগুলোর কোনোটিই নির্বাচনে আরব দলগুলোর এমন সাফল্য আশা করেনি। আরবদের এই চমকপ্রদ সাফল্য প্রতিদ্বন্দ্বী দুই ইহুদি জোটের এককভাবে সরকার গঠনের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। নেতানিয়াহুর জোট ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে আটটি আসন পিছিয়ে আছে, আর গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পিছিয়ে আছে ১৩ আসনে। আরব ভোটারদের উচ্চ উপস্থিতি কোনো পক্ষকেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে দেয়নি। তবে দিনের শেষে এটি আইজেনকোটের জন্য বেশি ক্ষতিকর হতে পারে, কারণ নেতানিয়াহুর এখনো তার জোটের বাইরের দলগুলোকে নিজের দিকে টানার সুযোগ আছে। অন্যদিকে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন বা সরকার গঠনের জন্য আইজেনকোটের আরব দলগুলোর সমর্থন প্রয়োজন।

ফলে এখন শুরু হবে রাজনৈতিক দরকষাকষির প্রক্রিয়া, যা ইসরাইলি রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়। আইজেনকোটের সামনে তিনটি সম্ভাব্য পথ খোলা আছে। প্রথমত, তিনি আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে পারেন। তবে এটি ঘটার সম্ভাবনা কম। কেননা, তার মিত্র আভিগদর লিবারম্যান এবং নাফতালি বেনেট সরকারে আরবদের সরাসরি অংশগ্রহণের বিষয়টি আগেই নাকচ করে দিয়েছেন। দ্বিতীয় পথটি হতে পারে পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে একটি চুক্তি, যেখানে আরব দলগুলো বাইরে থেকে সমর্থন দিয়ে সরকারকে সংসদীয় সুরক্ষা দেবে। আরব ‘জয়েন্ট লিস্ট’-এর নেতা ইউসেফ জাবারিন এমন একটি প্রস্তাবই দিয়েছেন। যেকোনো সরকার, যারা নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চায়, তাদের তিনি এমন সমর্থন দিতে প্রস্তুত। অন্যদিকে, রা’আম দলের মানসুর আব্বাস একটি প্রকৃত অংশীদারত্ব চাইছেন এবং জানিয়েছেন, তিনি উভয় শিবিরের সঙ্গেই আলোচনা করছেন।

তৃতীয় পথটি হলো নেতানিয়াহু ও আইজেনকোটের সমন্বয়ে একটি ‘ঐক্য সরকার’ গঠন করা। শোনা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু অংশ এর পক্ষে রয়েছে। কাগজে-কলমে এটি সম্ভব হলেও সংশ্লিষ্ট সবাই, বিশেষ করে বিরোধী শিবিরে থাকা আইজেনকোট ও লিবারম্যান, এটি মেনে নেবেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কারণ, কোনো অবস্থাতেই তারা নেতানিয়াহুর অধীনে কাজ করবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। আইজেনকোট এবং আরব দলগুলো তাৎক্ষণিকভাবে একটি কাজ করতে পারে—পার্লামেন্ট অর্থাৎ নেসেটের বর্তমান লিকুদ দলীয় স্পিকারকে সরিয়ে দেওয়া এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতা ও এ বিষয়ে নেতানিয়াহুর দায়বদ্ধতা তদন্তের জন্য একটি স্বাধীন কমিটি গঠন করা। এ বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী বারবার এড়িয়ে গেছেন।

অবশ্য ইসরাইল সরকারে আরব দলের যোগ দেওয়ার নজির রয়েছে অতীতে। ২০২১ সালে মানসুর আব্বাস, নাফতালি বেনেট ও ইয়াইর লাপিদের সঙ্গে একটি জোট গঠনের চুক্তি করেছিলেন। সেই চুক্তির আওতায় আরবদের জন্য কয়েক বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছিল এবং বেশ কয়েকটি বেদুইন গ্রামকে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। খবর অনুযায়ী, নেতানিয়াহু নিজেও এর আগে আব্বাসের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন, যদিও লিকুদ পার্টি তা অস্বীকার করেছে। তবে বেজালেল স্মোট্রিচ আপত্তি জানানোয় সেই সমঝোতা ভেঙে যায়।

নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনি দলগুলোর সঙ্গে আইজেনকোটের যেকোনো ধরনের অংশীদারত্বকে নিজের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়ে যাওয়া হিসেবে দেখছেন। এক্সিট পোল বা বুথফেরত জরিপের ফল প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি আরব দলগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের অংশীদারত্বকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে অভিহিত করে বলেছেন, তাদের নিয়ে গঠিত কোনো সরকার ইসরাইলের জন্য বিপজ্জনক হবে।

আর এ কারণেই নির্বাচনে আরব দলগুলোর অভাবনীয় সাফল্যের পরই নেতানিয়াহু ও তার দল লিকুদ পার্টি দাবি করে, আরব দলগুলো নির্বাচন ‘চুরি’ করেছে। তারা আরব অধ্যুষিত ভোটকেন্দ্রগুলোতে কারচুপির তদন্ত দাবি করেছে। নেতানিয়াহুর এই উসকানিমূলক দাবি উত্থাপনের অর্থ হলো, যে সরকার আরব ভোটের ওপর নির্ভরশীল হবে, তাকে প্রথম দিন থেকেই ‘অবৈধ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে।

ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট সরকার গঠনের জন্য কাকে প্রথম সুযোগ দেবেন, তা নির্ধারণ করার আগ পর্যন্ত যেসব কট্টর ডানপন্থি দল আরব ভোটারদের উপস্থিতিকেই হুমকি হিসেবে তুলে ধরে প্রচারণা চালিয়েছিল, তারা এখন আরবদের প্রভাবকে হুমকি হিসেবে সামনে এনে নতুন করে প্রচারণা শুরু করবে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, নতুন সরকার গঠনের চেষ্টা ব্যর্থ হলে নেতানিয়াহু হয়তো পরিস্থিতিকে আবার নির্বাচনের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করবেন। ফলে ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভোট দেওয়ার হার কমে যেতে পারে, যেমনটি ২০২১ সালে বারবার নির্বাচনের সময় ঘটেছিল। এতে কট্টর ডানপন্থিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এই মুহূর্তে বেশ উচ্ছ্বসিত আরব দলগুলোর জন্য সবচেয়ে ভালো কৌশল হবে, কোনো সমর্থন দেওয়ার আগেই ভোটারদের অংশগ্রহণের বিষয়টিকে কাজে লাগিয়ে অপরাধ দমন ও বাজেট বরাদ্দের মতো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি আদায় করে নেওয়া। এ ধরনের প্রতিশ্রুতি সেই ভোটারদের আশ্বস্ত করবে, যারা ভোটকেন্দ্রে এসেছিলেন। ২০১৯ ও ২০২১ সালের রাজনৈতিক বিপর্যয়গুলো প্রমাণ করে যে অর্জিত সাফল্য কত দ্রুত মিলিয়ে যেতে পারে।

এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক হলো, ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকরা নজিরবিহীন সংখ্যায় ভোট দিতে এগিয়ে এসেছিলেন। এখন দেখার বিষয়, এই অংশগ্রহণের বিনিময়ে তারা কী অর্জন করতে পারেন। বহু বছর ধরে অনেক আরব ভোটার নির্বাচন বর্জন করছিলেন। তাদের বক্তব্য ছিল, ভোট দিলে এমন একটি ব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়া হয়, যেখানে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এবার নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ইসরাইলের ইতিহাসের সবচেয়ে কট্টর ডানপন্থি জোট সরকারকে উৎখাত করতেই তারা বিপুলসংখ্যায় ভোট দিয়েছেন। তাদের সেই লক্ষ্য কতটুকু পূরণ হবে, তা সামনের দিনগুলোতে স্পষ্ট হবে।

আরব নিউজ অবলম্বনে মোতালেব জামালী

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...