আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

একটি ভোট ও সিঁড়ির গোড়ায় থমকে যাওয়া গণতন্ত্র

ড. ইশরাত জাকিয়া সুলতানা ও ইপ্সিতা কাজুড়ী চৈতি

একটি ভোট ও সিঁড়ির গোড়ায় থমকে যাওয়া গণতন্ত্র
প্রতীকী ছবি

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। খুরশিদা তার মায়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে ভোটকেন্দ্রের দিকে যাচ্ছিলেন। তার চোখে ছিল প্রত্যাশা, মনে ছিল গর্ব। কারণ আজ তিনি শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি একজন ভোটার। এর আগেরবার ভোট দেওয়া হয়নি। তাই আজ তার জন্য একটি বিশেষ দিন। পথে নেমে মনে হচ্ছিল, তিনি এই সমাজের অংশ, এই দেশের অংশ, এই গণতন্ত্রের অংশ।

কিন্তু ভোটকেন্দ্রে পৌঁছে যখন জানলেন তার ভোটকক্ষ তৃতীয়তলায়, তখন একটু আগের সেই অনুভূতির ফানুসটি মুহূর্তেই ফুটো হয়ে গেল। তিনি ভোটকেন্দ্রের সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে রইলেন কিন্তু সিঁড়ি বেয়ে আর ওঠা হলো না। কারণ সিঁড়িগুলো অন্যদের জন্য একটি সাধারণ স্থাপনা হলেও তার জন্য ছিল একটি অনতিক্রম্য বাধা। শৈশব থেকেই হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী খুরশিদা অপেক্ষা করতে থাকলেন—হয়তো কেউ সাহায্য করবে, হয়তো কোনো বিকল্প ব্যবস্থা তার জন্য করা হবে। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেল, কেউ এলো না, কোনো ব্যবস্থাও হলো না। অগত্যা তিনি ফিরে গেলেন। সেদিন তিনি অনুভব করেছিলেন যে সমানাধিকার শব্দটি এখনো তার মতো মানুষদের জন্য নয়। আর যেখানে সমান অধিকার নেই, সেখানে কেমন করে গণতন্ত্র থাকে?

বিজ্ঞাপন

খুরশিদার অভিজ্ঞতা বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিফলন, যা বাংলাদেশের লাখ লাখ প্রতিবন্ধী নাগরিক প্রতিদিন অনুভব করেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে বসবাস করেন। তারা প্রতিদিন বিভিন্ন কাঠামোগত এবং সামাজিক বাধার সম্মুখীন হন। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ১৪ লাখ শিশু প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে বেড়ে উঠছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে এই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য থাকবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের সমাজ এবং আমাদের গণতন্ত্র কি তাদের জন্য প্রস্তুত?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মানুষ, অর্থাৎ প্রতি ছয়জনে একজন কোনো না কোনো ধরনের প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে বসবাস করেন। এই জনগোষ্ঠী বিশ্বের বৃহত্তম সংখ্যালঘু। জাতিসংঘের ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮০ শতাংশ উন্নয়নশীল দেশে বাস করে, যেখানে অবকাঠামো এবং সামাজিক ব্যবস্থা প্রায়ই তাদের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশ্বব‍্যাংকের ২০২১ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে। ইন্টারন‍্যাশনাল আইডিয়ার ২০২০ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, প্রতিবন্ধী ভোটারদের অংশগ্রহণ সাধারণ ভোটারদের তুলনায় গড়ে ৫ থেকে ২০ শতাংশ কম।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই বৈষম্য আরো স্পষ্ট। দেশের অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র স্কুল ভবনে স্থাপন করা হয়, যেগুলোর বেশির ভাগই বহু বছর আগে নির্মিত এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব নয়। সেন্টার ফর ডিসেবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্টের ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সরকারি ভবনে পর্যাপ্ত প্রবেশগম্যতা নেই। ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ বাংলাদেশের ২০১৮ সালের একটি পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৭৫ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে স্থায়ী র‍্যাম্প নেই। এর ফলে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ব্যক্তিরা ভোটকেন্দ্রে এলেও খুরশিদার মতো তারা অপেক্ষা করে। প্রবেশ করতে না পেরে কষ্ট বুকে নিয়ে ফিরে যায়। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য ব্রেইল ব‍্যালট বা ট‍্যাকটাইল ভোটিং সিস্টেমের অভাব রয়েছে। তারা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেন না এবং অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন, যা তাদের ভোটের গোপনীয়তা ক্ষুণ্ণ করে।

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রায় ১০ দশমিক ৪ কোটি ভোটার নিবন্ধিত ছিল। কিন্তু ইন্টারন‍্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর ইলেক্টোরাল সিস্টেমের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী ভোটারদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট দিতে গিয়ে সমস্যার সম্মুখীন হন এবং প্রায় ২৫ শতাংশ শুধু প্রবেশগম্যতার অভাবের কারণে ভোট দিতে পারেন না। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা নয়; এটি একটি কাঠামোগত বৈষম্যের প্রতিফলন। নিবন্ধিত ভোটারের উচ্চসংখ্যা নিয়ে তৃপ্তি বোধ করার চেয়ে ভোটকেন্দ্রে সব ভোটারের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা বেশি জরুরি নয় কি?

যুক্তরাষ্ট্রে আমেরিকানস উইথ ডিসেবিলিটিস অ্যাক্ট ১৯৯০ পাস হওয়ার আগে অনেক সরকারি ভবন প্রতিবন্ধীবান্ধব ছিল না। কিন্তু এই আইনপ্রণয়নের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে ভোটকেন্দ্রসহ সব সরকারি ভবন প্রতিবন্ধীবান্ধব হবে। যুক্তরাজ্যে ট‍্যাক্টাইল ভোটিং ডিভাইস চালু করা হয়েছে, যাতে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ভোটাররা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেন। ভারতের নির্বাচন কমিশন হুইলচেয়ার সহযোগিতা, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক এবং বাড়িতে গিয়ে ভোট গ্রহণের ব্যবস্থা চালু করেছে। এই পদক্ষেপগুলোর ফলে প্রতিবন্ধী ভোটারদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে সেসব দেশে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা শুধু মানবাধিকারের বিষয় নয়; এটি একটি অর্থনৈতিক বিষয়ও। বিশ্বব‍্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোটে অন্তর্ভুক্ত করতে না পারার কারণে অনেক দেশে মোট দেশজ উৎপাদনের ৩ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হয়। আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এর অর্থ হলো, প্রতিবন্ধী মানুষদের অন্তর্ভুক্ত করা শুধু নৈতিকভাবে সঠিক নয়, এটি অর্থনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।

পরিতাপের বিষয় হলো, মানুষের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার বিষয়গুলো যে ভিন্ন হয়, এটাই আমরা অনেকে বুঝি না। সে কারণেই দেশের প্রথম সারির উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কিংবা স্বনামধন্য সরকারি-বেসরকারি সংস্থায় ব্যবহার করা লিফটের ভেতর থাকে না ভয়েস অ্যানাউন্সমেন্ট সিস্টেম অথবা ব্রেইল বাটন, থাকে না হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য র‌্যাম্প। ফলে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী শিক্ষক বা উপদেষ্টা কিংবা দৃষ্টি/শ্রবণ প্রতিবন্ধী সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা আমাদের সমাজে আমরা দেখি না। রাজনৈতিক নেতাদের আমরা দেখি না নির্বাচন-পূর্ব বা নির্বাচনোত্তর কোনো ম্যানিফেস্টো বা আলোচনায় অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গড়ার কথা বলতে। দেখি না দৃষ্টি-শ্রবণ-বাকপ্রতিবন্ধীদের জন্য প্রয়োজনীয় ও আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন চিকিৎসা এবং প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং সংবেদনশীল প্রশিক্ষক। বাদের তালিকায় থাকাই কি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের নিয়তি? যদি তাই হতো, তাহলে মিস সুলিভান অনন্য মানুষ হিসেবে হেলেন কেলারকে তৈরি পারতেন না।

গণতন্ত্রের যথার্থতা নিহিত থাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থাপনায়। গণতন্ত্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন এটি সবার জন্য সমানভাবে কাজ করে। যখন কোনো নাগরিক শুধু তার শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে তার অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন না, তখন সেই গণতন্ত্র অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এ সমস্যার সমাধান অসম্ভব নয়। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে স্থায়ী বা সাময়িকভাবে র‍্যাম্প নির্মাণ করা যেতে পারে। ভোটকক্ষগুলো নিচতলায় স্থাপন করা যেতে পারে। ব্রেইল ব‍্যালট চালু করা যেতে পারে। নির্বাচন কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। এই পদক্ষেপগুলো প্রযুক্তিগতভাবে জটিল নয় এবং আর্থিকভাবেও বাস্তবসম্মত। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক অগ্রাধিকার নির্ধারণের বিষয়।

খুরশিদার মতো অনেক মানুষ এখনো সেদিনের অপেক্ষায় আছেন, যেদিন তারা কোনো বাধা ছাড়াই ভোট দিতে পারবেন। যেদিন তারা ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন, ব্যালট হাতে নিতে পারবেন এবং বের হয়ে আসার সময় তাদের আঙুলে একটি ছোট কালির দাগ থাকবে। সেই দাগটি শুধু একটি ভোটের চিহ্ন হবে না—এটি হবে একটি স্বীকৃতির প্রতীক। এটি হবে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের প্রতীক।

লেখক : ড. ইশরাত জাকিয়া সুলতানা, সহযোগী অধ‍্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইপ্সিতা কাজুড়ী চৈতি, শিক্ষক, সানবিমস স্কুল

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন