জনস্বাস্থ্য নীরবে এমন এক সংকটের দিকে এগোচ্ছে, যার প্রভাব শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও বহন করতে হবে। ভেজাল খাদ্য রোধে অভিযান হয়, জরিমানা হয়, কয়েক দিন আলোচনাও চলে। তারপর সবকিছু আবার আগের জায়গায় ফিরে যায়। সম্প্রতি বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের দেশব্যাপী অভিযানে আতঙ্কজনক চিত্র উঠে এসেছে। দেখা গেছে, বিভিন্ন নামি রেস্তোরাঁয় বাসি খাবার সংরক্ষণ, রান্না করা ও কাঁচা খাবার একসঙ্গে রাখা হয়। একই তেল বারবার ব্যবহার আর অস্বাস্থ্যকর রান্নাঘর যেন স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে গেছে। তাছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ উপকরণ ব্যবহারের মতো অনিয়মও রয়েছে। কয়েকটি সুপারশপে বিদেশি পণ্যের মেয়াদের তারিখ পরিবর্তনের অভিযোগও পাওয়া গেছে। অন্যদিকে কাঁচাবাজারে রাসায়নিক দিয়ে পাকানো ফল, মাছ ও মাংসে ক্ষতিকর সংরক্ষণকারী এবং গুঁড়া মসলায় শিল্পকারখানার রঙ বা ভেজাল উপাদান ব্যবহারের ঘটনাও প্রায়ই সামনে আসছে।
খাদ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে ক্যানসার, কিডনি এবং লিভারের জটিলতা, হৃদরোগ কিংবা হরমোনজনিত সমস্যার মতো অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।
সম্প্রতি Journal of Food Composition and Analysis-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের বাজারে যে চিনি পাওয়া যায়, এর অধিকাংশ নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষার জন্য নেওয়া নমুনার ৯৫ শতাংশেই এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা রয়েছে। প্রতি কেজি চিনিতে ২১০ থেকে ৫০৮টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। এসব দীর্ঘ মেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় মাছ, মুরগি, দুধ, লবণ, শাকসবজি, বোতলজাত পানিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে।
ঢাকা ওয়াসার পানিতে শনাক্ত হয়েছে রাসায়নিক ‘পিফাস’, যা ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে সতর্ক করছেন গবেষকরা। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে আলাদা দুটি গবেষণায় ‘পিফাস’ ধরা পড়লে কমিটি গঠন করে ওয়াসা। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও সুইডেনের উমেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় ঢাকার ওয়াসার বিভিন্ন জোন থেকে সংগ্রহ করা পানির নমুনায় শনাক্ত হয়েছে ‘পিফাস’, বিভিন্ন কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ এবং ওষুধজাত রাসায়নিক। পিফাস দীর্ঘদিন পরিবেশে টিকে থাকে এবং মানবদেহেও জমা হতে পারে।
এর আগে, ইএসডিও ও আইপিইএনের গবেষণায় ওয়াসার পানিতে পিফাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়। ওই গবেষণার নমুনা যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটিসহ আন্তর্জাতিক গবেষণাগারে বিশ্লেষণ করা হয়। কিছু নমুনায় পিএফওএ ও পিএফওএসের মতো উচ্চঝুঁকির ‘পিফাস’ এবং আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ কিছু পিফাসও শনাক্ত হয়।
খাদ্য ও পানিতে রাসায়নিক দূষণ, পরিবেশগত দূষক এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিও অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনের খাবারে ভেজাল, অতিরিক্ত কীটনাশক, অ্যান্টিবায়োটিক, ক্ষতিকর রাসায়নিক, ভারী ধাতু এখন মাইক্রোপ্লাস্টিকের মতো নতুন ঝুঁকি যুক্ত হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বের প্রায় ৬০ কোটি মানুষ দূষিত খাদ্যগ্রহণের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। পাঁচ বছরের কমবয়সি শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA), বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI) এবং জাতীয় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরীক্ষায় খাদ্যে কীটনাশক, সিসা, ক্রোমিয়াম, আর্সেনিক, ভারী ধাতু এবং আরো অনেক ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি ধরা পড়েছে।
শুধু মোবাইল কোর্ট বা বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে খাদ্যে ভেজাল রোধ করা সম্ভব নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, অভিযান শেষ হওয়ার কিছুদিন পর পুরোনো অনিয়ম আবার ফিরে আসে। কারণ সমস্যার মূল জায়গা—উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে কার্যকর নজরদারি এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
খাদ্য নিরাপত্তার জন্য প্রযুক্তিনির্ভর ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের দাবি । কোনো খাদ্যপণ্য বাজারে অনিরাপদ প্রমাণিত হলে যেন দ্রুত তার উৎপাদক, সরবরাহকারী ও পরিবেশককে শনাক্ত করা যায়। একই সঙ্গে পরীক্ষাগারের ফল, অনিরাপদ পণ্যের তালিকা এবং লাইসেন্স বাতিল বা স্থগিতের তথ্য নিয়মিত জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
খাদ্যে ভেজালকে আমরা প্রায়ই একটি সাধারণ বাজার-অপরাধ হিসেবে দেখি। বাস্তবে এটি জনস্বাস্থ্য, মানবসম্পদ এবং অর্থনীতির বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি অপরাধ।
নিরাপদ উৎপাদন ও সৎ ব্যবসায়িক চর্চাকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
খাদ্যে ভেজাল ও রাসায়নিক দূষণের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু মোবাইল কোর্ট, মৌসুমি অভিযান বা প্রতীকী জরিমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়ন, আধুনিক পরীক্ষাগার, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি। এছাড়া সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপে কার্যকর তদারকি এবং সর্বোপরি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সুশাসন অবশ্যই থাকতে হবে। অভিযান সাময়িকভাবে অনিয়ম কমাতে পারে, কিন্তু সুশাসনই পারে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে।
লেখক : সাংবাদিক, কবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



