শিক্ষা ও সংস্কৃতির ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে ভারতীয় আধিপত্যের রাজনীতি

শিক্ষা ও সংস্কৃতির ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে ভারতীয় আধিপত্যের রাজনীতি
ফাইল ছবি

নাইন-ইলেভেনের পর সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে আমেরিকার নেতৃত্বে ন্যাটো জোট ‘ওয়ার অন টেরর’ শুরু করলে; আমেরিকা দ্রুতই সেখানকার তালিবান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে আফগানিস্তানের দখল নেয়। আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে আমেরিকার সহযোগী হয়েছিল পাকিস্তান। কিন্তু পাকিস্তান আফগানিস্তানে সেখানকার জনগণের স্বশাসনের পক্ষে মনোভাব প্রকাশ করায় আমেরিকা আফগানিস্তান পুনর্গঠন প্রশ্নে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বে চলে আসে।

ইতিহাসে সেই প্রথম ওয়াশিংটন-দিল্লি মিত্রতা তৈরি হয়। আফগানিস্তানে ওয়ার অন টেররে ব্যস্ততার কারণে; বাংলাদেশে ভারত উত্থাপিত কথিত জঙ্গিবাদবিষয়ক অভিযোগের প্রেক্ষিতে; আমেরিকা বাংলাদেশে ‘ওয়ার অন টেরর’-এর সাব-কন্ট্রাক্ট দেয় ভারতকে।

বিজ্ঞাপন

ফলে ওয়ান-ইলেভেনের সেনাসমর্থিত সরকার আসে বাংলাদেশে। এরপর ভারতের রাজনীতিক প্রণব মুখার্জির পৌরোহিত্যে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসে। ভারতের মিডিয়া ও বাংলাদেশে ভারতের সহযোগী মিডিয়ার তৈরি করা কাল্পনিক জঙ্গিবাদের ঝুঁকি নিরসনে ভারতীয় মন্ত্রে দীক্ষিত আওয়ামী লীগই একমাত্র নির্ভরযোগ্য টোটকা।

২০০১-০৬ বিএনপি-জামায়াত জোট শাসনামলে জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ নামে যে জঙ্গি সংগঠন সক্রিয় হয়ে ওঠে; এর প্রধান ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা মির্জা আযমের আত্মীয় শায়খ আবদুর রহমান। এককালে সোভিয়েতবিরোধী আফগান মুজাহিদদের যুদ্ধে বাংলাদেশ থেকে যোগ দেওয়া সিদ্দিকুর রহমান (বাংলা ভাই) রীতিমতো প্রথম আলোয় সাক্ষাৎকার দিয়ে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ নামের ভারতীয় নেসেসারি ইলিউশনের নায়ক ও পরে খলনায়ক হয়ে ওঠে।

বিএনপি-জামায়াত শাসনামলেই ওই কথিত জঙ্গিবাদ নির্মূল হয় বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর কর্মকর্তাদের সাহসিকতায়। জঙ্গিবাদ নির্মূলে সাহসী ভূমিকা রাখা কর্নেল গুলজার ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানা হত্যাযজ্ঞে নিহত হন। এই হত্যাযজ্ঞে ভারতের সম্পৃক্ততার অভিযোগও প্রমাণ রয়েছে।

ভারতীয় প্রত্নদার্শনিক চাণক্য বলেছিলেন, প্রতিবেশী শত্রুরাজ্যের অন্যদিকের রাজ্যের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করো। তারপর শত্রু রাজ্যকে সেখান থেকে আঘাত হানো। চিরশত্রু পাকিস্তানের অন্যদিকের দেশ আফগানিস্তানে পাকিস্তান সীমান্ত ঘেঁষে বেশ কিছুসংখ্যক কনস্যুলেট গড়ে তোলে ভারত।

আমেরিকার পৌরোহিত্যে আফগানিস্তান পুনর্গঠনে ভারত শিক্ষক পাঠায় সেখানকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য। ভারতের শিক্ষকরা অত্যন্ত অধ্যবসায়ী ও নিষ্ঠাবান হয়ে থাকেন। ফলে আফগানিস্তানের ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকে ভারতের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়ে। পরে তালিবানরা আফগানিস্তান থেকে আমেরিকাকে বিতাড়িত করলেও ভারতীয় শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

আমেরিকাকে আফগানিস্তান থেকে তাড়াতে পাকিস্তানের সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সহযোগিতা পেয়েছিল তালিবানরা। কিন্তু ইমরান খানকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর শাহবাজ শরিফ প্রশাসনের সঙ্গে আবার আমেরিকার সখ্য গড়ে ওঠে। সোভিয়েতবিরোধী আফগান যুদ্ধের সময় প্রায় ৩০-৪০ লাখ আফগান শরণার্থী পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছিল। তালিবানরা আফগানিস্তানে দায়িত্ব গ্রহণের পর; শাহবাজ শরিফ প্রশাসন সেই আফগান শরণার্থীদের আফগানিস্তানে ফেরত পাঠাতে চেষ্টা করে। এতে আফগানিস্তানের জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়। কারণ পাকিস্তানে আফগান শরণার্থীরা থিতু হয়ে গিয়েছিল। সেই শিশুরা জন্মেছিল শরণার্থী পরিবারে তারাও পাকিস্তানকেই নিজের জন্মভূমি ভেবে সেখানে থাকতে চেয়েছিল।

ভারতীয় শিক্ষকদের নিষ্ঠা ও ভালোবাসার মাধ্যমে আফগানিস্তানে যে ভারতপ্রীতি তৈরি হয়েছে; দিল্লি এবার সে ফসল ঘরে তুলতে শুরু করে।

২০১৪ সালে পাকিস্তানের একটি স্কুলে জঙ্গি হামলায় অসংখ্য শিশু নিহত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানে জঙ্গিবাদ নির্মূলের কঠোর অভিযান পরিচালিত হতে থাকে। জঙ্গিবাদের কারণে যে ধূসর তালিকায় পাকিস্তানের নাম উঠে গিয়েছিল; ওই তালিকা থেকে সে নাম মুছে ফেলতে পাকিস্তানের মাদরাসাগুলোয় তাদের সিলেবাস ও আয়-ব্যয়ের হিসাবের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এ রকম পরিবেশে তেহেরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান বা টিটিপি নামের জঙ্গিগোষ্ঠীটি আফগানিস্তানে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

টিটিপি যেহেতু মার্সিনারি; তাই এবার ভারত তাদের ব্যবহার করতে শুরু করে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসী হামলা পরিচালনার জন্য। পাকিস্তানের বেলুচিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে আফগানিস্তান থেকে প্রবেশ করে হামলা চালিয়ে আবার সেখানে ফিরে যাওয়ার কৌশল অবলম্বন করতে থাকে টিটিপি।

পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে যেহেতু চীনের অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; তাই সেখানে প্রতিটি সন্ত্রাসী হামলা ভারতকে একই সঙ্গে পাকিস্তান ও চীনকে শায়েস্তা করার আনন্দ দেয়।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পাকিস্তানের পূর্ব সীমান্তে সার্জিক্যাল অ্যাটাক ও অপারেশন সিঁদুর চালিয়ে আশানুরূপ সাফল্য না পাওয়ায়; আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তে জঙ্গি হামলাকে প্রণোদনা দিয়ে ভারতের আজন্ম লালিত স্বপ্ন, পাকিস্তানকে শায়েস্তা করার এবং পরাবাস্তব সাধ, অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠার অসম্ভবের লড়াইটি লড়ছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ প্রশমনের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান ক্ষমতায়িত হওয়ায় আর আফগানিস্তানে চীনের বিনিয়োগ থাকায় তালিবানদের পক্ষে এখনো ভারতের পক্ষে হাত খুলে খেলার সুযোগ অবারিত নয়। তবে তালিবান নেতারা নিয়মিত দিল্লিতে যাতায়াত করে আওয়ামী লীগ নেতাদের মতো ব্যাপ্টাইজড হয়ে উঠলে তা নিশ্চয়ই সম্ভব হবে।

অবশ্য ভারত-পাকিস্তানের এই চিরস্থায়ী শত্রুতা; উভয় দেশে রাজনৈতিক প্রশাসনকে তাদের রাষ্ট্র পরিচালনার অক্ষমতা লুকাতে সাহায্য করে; সেনা বাজেট বাড়াতে প্রণোদিত করে। ঘুরে-ফিরে উভয় দেশের রাজনীতিক, সামরিক বাহিনী, ব্যবসায়ীরা লাভবান হয় এই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায়।

ভারতের শিক্ষা ও সংস্কৃতির ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে প্রক্সিযুদ্ধের ও আধিপত্য কায়েমের রাজনীতি খুবই আগ্রহ উদ্দীপক। ভারত তার চলচ্চিত্রে মনমতো ইতিহাস বানায় রূপকথার নৈপুণ্যে, যুদ্ধকল্পনার সাফল্য দেখিয়ে দারিদ্র্যের অগম্যে দুর্গমে পরাজিত মানুষের মধ্যে কাল্পনিক ভারত উদয়ের স্বপ্ন গেঁথে দেয়।

লেখক : এডিটর ইন চিফ, ই-সাউথএশিয়া

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন