বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ বাংলাদেশ নদীরই সৃষ্টি। পূর্ব হিমালয় থেকে বয়ে আসা গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা—এই তিন বৃহৎ নদী ব্যবস্থার নিষ্কাশন পথ হলো বাংলাদেশ। মোট ৫৭টি আন্তঃসীমান্ত নদীর মধ্যে ৫৪টি ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এই নদীগুলো দেশের মোট পানির প্রায় ৯৭ শতাংশের উৎস। কিন্তু উজানের দেশ ভারত ৫৪টি যৌথ নদীর ওপর বাঁধ, ব্যারাজ বা জলাধার নির্মাণ করায় বাংলাদেশ এখন পরিবেশগত ও জীব-জাগতিক বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
বিগত কয়েক দশক ধরে বর্ষা ও শুষ্ক—দুই মৌসুমেই পানি এখন বাংলাদেশের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের কুমিল্লা, চাঁদপুর, পাবনা, বগুড়া, টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জসহ কিছু অঞ্চল স্বাভাবিক বর্ষাকালীন প্লাবন পায় না; উজানে ভারতে পানি প্রত্যাহার বা সংরক্ষণের কারণে এসব এলাকার প্লাবনভূমি কয়েক দশক ধরে শুকনো থাকছে। ফলে এসব ভূমি শাপলা-শালুক, অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ, শেওলা, পোকামাকড় ও ক্ষুদ্র মাছের উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ কারণে এসব এলাকা জীববৈচিত্র্য হারাচ্ছে। মাটি আর আগের মতো প্রাকৃতিক পুষ্টি আর পাচ্ছে না।
অন্যদিকে বৃহত্তর রংপুর ও বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে প্রতিবছর তীব্র বন্যা দেখা দেয়, যা শুধু ফসলই নয়, ঘরবাড়ি ও বসতভিটাও ভাসিয়ে নিয়ে যায়। শুষ্ক মৌসুমে নদীগুলো শুকিয়ে যায়। আর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নদীগুলো সাগর পর্যন্ত প্রবাহিত হয় না। এর ফলে সাগরের লবণাক্ততা ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত স্থলভাগে প্রবেশ করে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, কৃষি, শিল্প ও জীব-জাগতিক অবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
উজানের প্রতিবেশী দেশ ভারত যখন পরিবেশগত বিপর্যয়ের প্রভাবকে উপেক্ষা করছে, তখন আমাদের দেশের কর্তৃপক্ষ এই দুর্যোগ মোকাবিলা করছে চরম সন্তর্পণে। এই ধীর কিন্তু নিশ্চিত পরিবেশগত বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে সব মহল থেকে আওয়াজ তোলা এখন জরুরি হয়ে উঠেছে; কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এটি আরো তীব্র হয়ে ২০৫০ সালের মধ্যে লাখ লাখ মানুষকে বাস্তুহারা করবে।
আগামী ১১ ডিসেম্বর গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। বাকি ৫৩টি ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীনের সঙ্গে যৌথ নদীর বিষয়ে কোনো চুক্তি নেই। তাই বাংলাদেশকে তার পানি কূটনীতি আরো জোরালো করতে হবে। বিশ্বজুড়ে পানি বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদরা এক কণ্ঠে বলেন, ‘সব নদীকে অবশ্যই জীবিত এবং উৎস থেকে সাগর পর্যন্ত প্রবহমান থাকতে হবে।’ ২০২৬ সালের জুনে রিও ডি জেনেইরোতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অববাহিকা সম্মেলন এ কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে। সঙ্গে সঙ্গে উজান ও ভাটির নদী সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে সহযোগিতার মাধ্যমে সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার আহ্বান জানিয়েছে। কারণ প্রাকৃতিক প্রবাহ নদীকে সাগরে পৌঁছানোর আগে তাদের তীরে বা যেসব দেশ দিয়ে প্রবাহিত হয়, সেসব দেশের রাজনৈতিক সীমান্তে ভাগ করা যায় না।
নদী যদি জীবিত থাকে, তবে নদীর তীরবর্তী সব সম্প্রদায় নদীর সেবাগুলো থেকে উপকৃত হবে এবং নদীও তাদের দ্বারা উপকৃত হবে। গঙ্গার অবস্থা অসংখ্য বাঁধ ও ব্যারাজ নির্মাণের কারণে এতটাই সংকটাপন্ন হয়েছে যে তার পানিপ্রবাহ, বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কা ব্যারাজ পয়েন্টে ঐতিহাসিক প্রবাহের মাত্র ১০ শতাংশে নেমে এসেছে।
উজানের দেশ বড় প্রতিবেশী ভারত কি গুরুতর ভুলের কারণে সৃষ্ট এই অবস্থার উপলব্ধি করবে, বা এই উপলব্ধি আসতে কত বছর লাগবে? কেউ জানে না, যদি না তাদের পানি ব্যবস্থাপনা-বিষয়ক চিন্তায় মৌলিক পরিবর্তন আসে। কিন্তু ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বসে থাকলে তার নিজেরই ক্ষতি হতে থাকবে।
অন্য কোনো পথ না থাকায় বাংলাদেশ এখন গঙ্গার নিজ অংশে একটি ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে, যেন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গঙ্গার শাখা নদীগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করে উপকূলীয় প্রতিবেশ পুনরুদ্ধার করা যায়। এই এলাকাগুলো দীর্ঘদিন ধরে মিষ্টি পানির প্রবাহ বন্ধ থাকার কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু ব্যারাজ নির্মাণ হলেও প্রবাহ অক্ষুণ্ণ রাখা ও নদী পুনরুজ্জীবনের জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করা দরকার। অথবা ৫৪টি যৌথ নদীর টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সার্বিক ও সমন্বিত চুক্তি সম্পাদন করা জরুরিভাবে প্রয়োজন।
পানি কূটনীতির দায়িত্বপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও যৌথ নদী কমিশনের এ বিষয়ে নীরবতা এবং সন্তর্পণ ভেঙে পরিবেশবিদ, জীব-জাগতিক বিশেষজ্ঞ, জলবায়ু বিজ্ঞানী, মৃত্তিকা বিজ্ঞানী, রসায়নবিদ, জীববিজ্ঞানী, কৃষি ও মৎস্য বিশেষজ্ঞ এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের সঙ্গে সংলাপ শুরু করা উচিত, যাতে নদী রক্ষার জন্য একটি জাতীয় কৌশল প্রণয়ন করা যায়। এতে তারা পানি ব্যবস্থাপনার নতুন ধারণার ভিত্তিতে অপর পক্ষের সঙ্গে কার্যকরভাবে আলোচনা করতে সক্ষম হবে।
প্রায় ১৬ বছর ধরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিষয়টি আলোচনায় আনা হয়নি। যত দ্রুত এটি আবার আলোচনায় আনা হবে ততই ভালো। কারণ হাতে সময় আর খুব বেশি নেই।
লেখক : অধ্যাপক জসিম উদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ টিপু সুলতান ও মোস্তফা কামাল মজুমদার যথাক্রমে প্রধান উপদেষ্টা, আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটি (আইএফসি); চেয়ারম্যান, আইএফসি, নিউ ইয়র্ক; এবং সভাপতি, আইএফসি, বাংলাদেশ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


