শিক্ষায় নৈরাজ্য আর কতকাল

শিক্ষায় নৈরাজ্য আর কতকাল

মাফিয়া শাসক শেখ হাসিনার আমলে পরিকল্পিতভাবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে। উচ্চশিক্ষা, তথা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরিণত করা হয়েছিল শিক্ষক নামধারী দলবাজদের ফোরামে। বুয়েটের মতো দেশের গৌরবজনক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসন চলত নিষিদ্ধঘোষিত সন্ত্রাসী ছাত্রলীগের নির্দেশনায়। আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় সামনে আসে কীভাবে সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ আর শিক্ষক নামের বিবেক ও মেরুদণ্ডহীন দলবাজদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছিল দেশের সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। দেড় যুগ ধরে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের প্রধান যোগ্যতা ছিল দলীয় পরিচয়। শিক্ষক নিয়োগে চূড়ান্ত দলীয়করণের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় ক্লাসে প্রথম হওয়া, মেধাবী হওয়া ছিল একটি অভিশাপ। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ আর্থিক লেনদেনের ঘটনাও ঘটেছে। এমনকি ২ কোটি টাকার বিনিময়ে ভিসি ও অর্ধকোটি টাকার বিনিময়ে কলেজের অধ্যক্ষ নিয়োগের অভিযোগের খবরও প্রকাশিত হয়েছে জাতীয় দৈনিকে। দলীয় অযোগ্যদের নিয়োগের জন্য নিয়োগের শর্ত শিথিল করাসহ আরো যা যা করা হয়েছে, তা ছিল জাতির সঙ্গে চূড়ান্ত তামাশা। সরাসরি দলীয় সন্ত্রাসী, অস্ত্রবাজদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে । ২০২৪ সালে সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজে পরীক্ষা চলাকালে শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থীকে গুলি করার ঘটনা তার নজির।

শুধু উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, প্রাথমিক পর্যায় থেকে সর্বস্তরে শিক্ষক নিয়োগ, বদলিসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে পদায়নের জন্য সীমাহীন দুর্নীতি আর দলীয়করণ করা হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে প্রায় সব পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। পঞ্চম শ্রেণি থেকে পাবলিক পরীক্ষা আয়োজন, সৃজনশীল ব্যবস্থা চালু, নতুন শিক্ষানীতি, বারবার পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তন, পাঠ্যবই পরিবর্তনসহ বিভিন্ন অরাজকতার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ওপর ভয়াবহ হয়রানি আর বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাঠ্যপুস্তকের মান বলতে কিছু ছিল না। অযোগ্য দলীয় লোকদের মাধ্যমে লিখিত নিম্নমানের পাঠ্যবই আর শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যম জাতির ওপর মুজিববন্দনা চাপিয়ে দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠা করা হয় ব্যক্তি, পরিবার ও দলীয় বয়ান। বিকৃত করা হয় ইতিহাস। সৃজনশীল ব্যবস্থা চালুর নামে মহা-অরাজকতার দিকে ঠেলে দেওয়া হয় শিক্ষাব্যবস্থাকে। সৃজনশীল মানে যার মনে যা আছে তাই সে পরীক্ষার খাতায় লিখবে এবং উত্তর হোক না হোক তাতেই পরীক্ষককে নম্বর ঢেলে দিতে হবে এমন অরাজকতাও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তখন। ফলে এসএসসি, এইচএসসি উভয় পরীক্ষায় গণহারে জিপিএ ৫ পেতে থাকে শিক্ষার্থীরা। কিন্তু জিপিএ ৫-ধারী লাখ লাখ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা পাস নম্বরও তুলতে না পারার মাধ্যমে উদোম হয়ে পড়ে শিক্ষার মানের আসল চিত্র।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু অতিশয় দুর্ভাগ্য ও পরিতাপের বিষয় হলো হাসিনার বিদায়ের পর দেশের সামগ্রিক শিক্ষা খাতে যে আমূল সংস্কারের পদক্ষেপ নেওয়ার দরকার ছিল, তা হয়নি। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যবইয়ে কিছু পরিবর্তন আনা হলেও শিক্ষা প্রশাসনের সর্বত্র এখনো রয়ে গেছে ফ্যাসিবাদের দোসররা এবং অযোগ্য দলীয় শিক্ষকরা। যার ফলে শিক্ষা খাতে অতীতে সেই নৈরাজ্যের ধারাবাহিকতা এখনো বারবার সামনে আসছে। এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় একের পর এক প্রশ্নপত্রে ভুল ও চায়ের দোকানে বসে বন্ধুদের দিয়ে পরীক্ষকের খাতা মূল্যায়নের ঘটনা তারই নজির।

প্রকাশিত খবর অনুযায়ী সিলেটের চায়ের দোকানে বসে বন্ধুদের দিয়ে চলমান এইচএসসি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের সময় হাতেনাতে ধরা পড়েছেন এক শিক্ষক। সেখান থেকে বাংলা দ্বিতীয় পত্রের এক বস্তা খাতা জব্দ করা হয়েছে। ১ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসংলগ্ন একটি চায়ের দোকান থেকে উত্তরপত্রগুলো জব্দ করা হয়। খাতাগুলোর পরীক্ষক সিলেটের মেট্রোসিটি উইমেন্স কলেজের প্রভাষক ইকবাল হোসেন সোহান। ইকবাল হোসেন সোহান তার বন্ধু নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহসভাপতি আইরিন লিনজাসহ দুজনকে দিয়ে খাতা মূল্যায়নের কাজ করান এ সময়। আগের দিন শুক্রবার রাতেও তারা একই দোকানে বসে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেন।

ন্যক্কারজনক এ ঘটনা ছাড়া এবার এইচএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগের পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও উচ্চতর গণিতের প্রত্যেক বিষয়ের প্রশ্নপত্রে একাধিক প্রশ্ন ভুল ছিল।

এবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় প্রায় ১৩ লাখ পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। এত বড় এবং এত গুরুত্বপূর্ণ একটি পাবলিক পরীক্ষায় এভাবে একের পর এক প্রশ্নপত্রে ভুল থাকা এবং চায়ের দোকানে বসে খাতা মূল্যায়ন ক্ষমাহীন অপরাধ। শিক্ষাব্যবস্থায় এখনো কী পরিমাণ নৈরাজ্য আর অরাজকতা বিরাজ করছে এবং কী পরিমাণ অযোগ্য, দায়িত্বহীন শিক্ষকদের কবলে দেশের শিক্ষা খাত তা এসব ঘটনায় প্রমাণিত।

এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও চূড়ান্তকরণ একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং কয়েক ধাপে অতিশয় সতর্কতার সঙ্গে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে হয়ে থাকে। কিন্তু তারপরও যখন এইচএসসির মতো অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার বিজ্ঞান বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ চারটি বিষয়ের প্রশ্নপত্রে ভুল প্রশ্ন থাকে, তখন বোঝা যায় শিক্ষা বোর্ডে কী ধরনের অরাজকতা আর নৈরাজ্য চলছে। এ ঘটনা প্রমাণ করে যারা এসব প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও মডারেশন তথা কয়েক ধাপে যাচাই-বাছাইয়ের সঙ্গে জড়িত, তারা শিক্ষক হিসেবে কতটা অযোগ্য। যাদের প্রশ্নপত্র প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাদের যোগ্যতাই নেই প্রশ্ন তৈরি করার। এ ঘটনা আরো প্রমাণ করে, লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা ও শিক্ষাজীবন তাদের কাছে কত তুচ্ছ ও মূল্যহীন। এত বড় একটি পরীক্ষায় একের পর এক প্রশ্নপত্রে ভুলের ঘটনা থেকে প্রমাণিত, এই প্রক্রিয়ার প্রতি পর্যায়ে কেউই সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেননি।

আট বছর পর এবার দেশের সব শিক্ষা বোর্ডে একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হয়েছে। তাছাড়া ছয় বছর পর ফুল সিলেবাসে পরীক্ষা হয়েছে। ফলে প্রতিটি শিক্ষার্থী ছিল বড় ধরনের চাপের মধ্যে। এ অবস্থায় প্রশ্নে ভুলের কারণে লাখ লাখ শিক্ষার্থীকে ওইসব প্রশ্নের ‍উত্তর লিখে আবার কেটে দিতে হয়েছে, বিভ্রান্তির শিকার হতে হয়েছে। মনোযোগ নষ্ট হয়েছে। পরীক্ষা হলে সীমিত সময়ের মধ্যে এভাবে সময় অপচয় আর বিভ্রান্তির কারণে অনেকেরই পরীক্ষা খারাপ হয়েছে। এর দায় কে নেবে?

চায়ের দোকানে বসে বন্ধুদের দিয়ে এইচএসসি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের ঘটনায় প্রমাণিত, আওয়ামী লীগ আমলে কাদেরকে পরীক্ষক হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। একজন শিক্ষক কতটা বেপরোয়া, কতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন আর শিক্ষার্থীদের কতটা তুচ্ছজ্ঞান করলে এ ধরনের কাজ করতে পারেন, এটি তার একটি প্রমাণ। তাছাড়া শিক্ষার্থীদের দিয়ে খাতা মূল্যায়নের একাধিক ঘটনাও এরই মধ্যে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে অতিশয় গুরুতর একটি অভিযোগ হলো, পাবলিক পরীক্ষায় উত্তরপত্র সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। ভালো করে উত্তরপত্র না পড়ে গড়ে নম্বর দেওয়া, শিক্ষার্থীদের দিয়ে খাতা দেখানোসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এই নৈরাজ্য চরম আকার ধারণ করে। বোর্ডের পক্ষ থেকে পরীক্ষকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে হাত খুলে নম্বর দেওয়ার জন্য। শিক্ষার্থী খাতায় ‍ভুল-শুদ্ধ যাই লিখুক না কেন, উদারহস্তে নম্বর দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হতো। যেসব পরীক্ষক খাতায় নম্বর কম দিতেন, তথা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতেন, তাদের অনেককে বোর্ডে ডেকে এনে কঠোর ভাষায় গালমন্দ করতেন কর্মকর্তারা।

আওয়ামী লীগ আমলে খাতা মূল্যায়নে অনেক পরীক্ষকের সীমাহীন অবহেলার অনেক নজির রয়েছে। পরীক্ষার খাতার বস্তা না খুলেই গড়ে নম্বর দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। খাতা মূল্যায়নের এই নৈরাজ্য থেকে এখনো বের হয়ে আসতে পারেননি অনেক পরীক্ষক।

এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলের ওপর অনেকটা নির্ভর করে একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জীবন। বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫-সহ পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও উচ্চতর গণিতে আলাদা করে জিপিএ ৫ পেতে হয়। প্রশ্নপত্রে ভুল থাকা এবং চায়ের দোকানে বসে বন্ধুদের দিয়ে বা শিক্ষার্থীদের দিয়ে খাতা মূল্যায়নের মতো অবিচারের কারণে হয়তো অনেক শিক্ষার্থীর জীবনে করুণ পরিণতি নেমে আসবে।

সঠিকভাবে খাতা মূল্যায়ন না করায় অনেকে কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পাবে না। অথচ অবিচারের শিকার না হলে সে হয়তো বুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানে চান্স পেত। ফলে তার জন্য খুলে যেত এক অপার সম্ভাবনার দুয়ার। একদিন হয়তো সে বিচরণ করতে পারত বিশ্বের অনেক উচ্চতর জ্ঞানবিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জগতে। কিন্তু সঠিকভাবে খাতা মূল্যায়ন না করাসহ পরীক্ষাকেন্দ্রিক নৈরাজ্যের কারণে অনেক শিক্ষার্থীর জীবন থেকে অনেক সম্ভাবনা হারিয়ে যায়।

শেখ হাসিনার আমলে শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস ও শিক্ষার মানের চূড়ান্ত অবনতির অন্যতম একটি কারণ ছিল শিক্ষক নিয়োগে দলীয়করণ এবং দুর্নীতি। শিক্ষার মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে অন্যতম একটি শর্ত হলো যোগ্য, মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষকদের উন্নত জীবনমান নিশ্চিত করা। শিক্ষা খাতে যে নৈরাজ্য আর অরাজকতা চলছে, তা থেকে উত্তরণে মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ যেমন অপরিহার্য, তেমনি অপরিহার্য শিক্ষা খাতে ফ্যাসিবাদবিরোধী শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করা। গত দেড় দশকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যাদের অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদের বাদ দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষক এখনো ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে দেশবিরোধী গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়েও হাসিনার আমলে প্রতিটি শিক্ষক নিয়োগের ঘটনার অনিয়ম তদন্তের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় ভুল প্রশ্ন প্রণয়নের সঙ্গে জড়িতদের অবিলম্বে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় শিক্ষা খাতের চলমান নৈরাজ্য দূর করা যাবে না।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, আমার দেশ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন