২০২৪-এর জুলাই মাসে আন্দোলনের হত্যা এবং নৃশংসতার যেসব ভিডিও ফুটেজ আমাদের কাছে আসত, সেটি ফেসবুকে শেয়ার দেওয়ার পর আওয়ামী লীগপন্থিরা সঙ্গে সঙ্গে কমেন্ট সেকশনে এসে বলত, এটা ফেক ভিডিও, আপনি প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছেন। কোনো ধরনের ভ্যালিডেশন ছাড়া সব ভিডিওকে তারা ফেক ভিডিও বলে হত্যাকাণ্ডগুলোকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিত। এমনকি আন্দোলনের যে ছবিগুলো আসত, প্রতিরোধের যে ভিডিওগুলো আসত, সেগুলোর পোস্টের নিচে এসেও বলত, এসব ভিডিও ফেক, আপনি প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছেন।
আজকে দুই বছর পর, ২০২৬-এর জুলাই মাসেও একইভাবে দেখবেন, পুরো এই দুই বছর জুড়েই দল হিসেবে আওয়ামী লীগের তরফ থেকে যে রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করা হয় এবং এই দুই বছর যাবৎই যেটা করা হয়েছে, সেটি হচ্ছে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এসব হত্যাকাণ্ডকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা। এমনকি এই ছাত্র-জনতার প্রতিরোধগুলোকেও অস্বীকার করা এবং এই যে ঘটমান সত্যকে তারা সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে, ডিনাই করে, এটি কোনো র্যান্ডম ঘটনা না; বরং এটা ডেলিবারেটলি দুই বছর ধরে করে আসা ঘটনা। এটাই তাদের সচেতন রাজনৈতিক অবস্থান যে, আওয়ামী লীগের দ্বারা সংঘটিত সব অপরাধকে চোখ বন্ধ করে অস্বীকার করে ফেলতে হবে। তাহলে বোধহয় তাদের দায়মুক্তি ঘটে গেল। এটি দল হিসেবে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান। অনেকটা এ রকম, যতক্ষণ অপরাধী অপরাধের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত অপরাধী অপরাধ ঘটিয়েছে—এর কোনো প্রমাণ নেই। আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী লীগের সমর্থকরা এটা মনে করে এবং রিলিজিয়াসলি এটা চর্চা করে।
এটাই হচ্ছে অস্বীকার বা ডিনায়ালের রাজনীতি। খুব দুঃখজনকভাবে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে গত দুই বছরে শুধু আওয়ামী লীগ নয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্টেকহোল্ডার আরো অনেক দল এই অস্বীকারের রাজনীতিকে এনডোর্স করেছে, প্যাট্রোনাইজ করেছে।
আরো কতগুলো রাজনৈতিক গোষ্ঠী আছে, যারা আওয়ামী লীগের দ্বারা হত্যাকাণ্ডকে স্বীকার করে, কিন্তু তার বিপরীতে জুলাইয়ের সময় মাঠে যে ছাত্র-জনতার রেজিস্ট্যান্স ছিল, সেই প্রতিরোধকারী স্টেকগুলোকে ক্রমাগত অস্বীকার করে। জুলাই অভ্যুত্থানে পরিষ্কার দুটি ভাগ ছিল। একটা হচ্ছে শেখ হাসিনা রেজিম দ্বারা ছাত্র-জনতাকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা আর দ্বিতীয় ধাপ হচ্ছে রাস্তায় ছাত্র-জনতার গড়ে তোলা রেজিস্ট্যান্স। আওয়ামী লীগ সরাসরি ডিনাই করে তাদের দ্বারা যে হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটেছে সেটাকে আর বাংলাদেশের অপরাপর অনেক রাজনৈতিক স্টেকহোল্ডার তারা অস্বীকার করে ছাত্র-জনতার যে শক্তিটা মাঠে রেজিস্ট্যান্স গড়ে তুলেছিল সেই অংশটাকে। তারা প্রধানত অস্বীকার করে মাঠের রেজিস্ট্যান্সের যে নিউক্লিয়াস ছিল, যারা খুব পরিকল্পিতভাবে অন্তত নিউক্লিয়াসের অংশটাকে সংগঠিত করেছে এবং দেশব্যাপী আন্দোলন ছড়িয়ে দিয়েছে, সেই রেজিস্ট্যান্সের নিউক্লিয়াসটাকে তারা অস্বীকার করে। এটাও ডিনায়ালের রাজনীতিই। ঘটমান সত্যকে অস্বীকার করা।
এবার একটু দেখতে চাই ডিফেম বা কলঙ্কিতকরণের রাজনীতিটা কীভাবে ঘটেছে। তার আগে একটু বলে নিই, ডিফেম বা কলঙ্কিতকরণ কেন করা হয়। আপনি যখন কোনো কিছুর গ্রহণযোগ্যতাকে নষ্ট করতে চান, তখন সে বিষয় বা ব্যক্তিকে ধরে ডিফেম করবেন বা কলঙ্কিত করবেন। পর্যাপ্ত পরিমাণে যদি ওই বিষয় বা ব্যক্তির ওপর কলঙ্ক আরোপ করা যায়, তাহলে তার গ্রহণযোগ্যতাকে সরাসরি নষ্ট করে দেওয়া যায় এবং রাজনীতিতে এটা খুবই কার্যকর একটা পন্থা। ঠিক এ বিষয়টিকেই আমরা দেখেছি জুলাই অভ্যুত্থানের আন্দোলন এবং তার পরবর্তী গত দুই বছর।
এবার একটু দেখতে চাই এই কলঙ্কিতকরণ প্রকল্পটা কী কীভাবে চলেছে
পুরো জুলাই মাসে ছাত্ররা যখন মাঠে আন্দোলন গড়ে তুলছে, তখন এটাকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছে জঙ্গিদের আন্দোলন হিসেবে।
আওয়ামী লীগ যেহেতু নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে পোর্ট্রে করতে পেরেছিল, কাজেই এই আন্দোলনকে তারা ট্যাপ ইন করার চেষ্টা করল ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় হেরে যাওয়া শক্তি জামায়াত-শিবির-রাজাকারের চক্রান্ত হিসেবে’।
আন্দোলনের মধ্যে তৃতীয় পক্ষ ঢুকে গেছে—এই ন্যারেটিভ মাঠে আমদানি করে। তবে এই কলঙ্কিতকরণ সবচেয়ে বেশি চলেছে ৫ আগস্টের পর। ৫ আগস্টের পর যেটি হলো, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারের পেছনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক যে ছাত্র সংগঠনটি নেতৃত্বদানকারী এবং অন্যতম প্রধান সংগঠকের ভূমিকায় ছিল, সেই ‘ছাত্রশক্তি’ সংগঠনটিকে ভিলেন হিসেবে হাজির করা হলো। কোনো ধরনের ডকুমেন্ট এবং ঐতিহাসিক রেফারেন্স ছাড়া ছাত্রশক্তি সংগঠনটিকে বাংলাদেশের রাজনীতির বিভিন্ন স্টেকহোল্ডাররা স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক, রাজনীতি না বোঝা, ক্ষমতালোভী একদল ছেলেমেয়ের ক্ষতিকারক ক্লাব হিসেবে হাজির করলেন। একটি লেজিটিমেট, শক্তিশালী নতুন ধরনের ছাত্র সংগঠনের ক্রেডিবিলিটিকে সম্পূর্ণভাবে ধসিয়ে দেওয়া সম্ভব হলো এই কলঙ্কিতকরণের মধ্য দিয়ে।
আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ব্যানারের নিচে ‘ছাত্র সমন্বয়ক’ এই পদটা। জুলাই অভ্যুত্থানের পরে সবচেয়ে বেশি কলঙ্কিত করা হয়েছে এই ছাত্র সমন্বয়ক দাবি করা এবং পরিচয়ে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আন্দোলনের যে সংগঠকরা ছিল, তাদের। সত্য-মিথ্যা জড়িয়ে অথবা বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ—এসব কিছু প্রয়োগ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছাত্র সমন্বয়ক পদটাকে সম্পূর্ণভাবে কলঙ্কিত করা গেছে। বাংলাদেশের আন্দোলন-সংগ্রামের রাজনীতিতে যে আন্দোলনের ব্যানারটা হতে পারত অসম্ভব শক্তিশালী একটা ব্যানার এবং রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারত, তাকে সম্পূর্ণভাবে ধসিয়ে দেওয়া গেছে।
পরে এই অভ্যুত্থানের মধ্যে থেকে উঠে আসা ছাত্র নেতৃত্বরা যখন রাজনৈতিক দল করতে চাইল, সে রাজনৈতিক দলের সম্মুখভাগে থাকা নেতৃত্বদের একজন একজন করে ধরে ভিলিফাই করা হয়েছে, কলঙ্কিত করা হয়েছে। তার অর্থনৈতিক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, পদবাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত—এই ধরনের বহুবিধ সত্য-মিথ্যা অ্যালিগেশন এনে, যেগুলো পরে প্রমাণও করা যায়নি, এগুলো করার মধ্য দিয়ে এই রাজনৈতিক ফোর্সটাকেও খুব সফলভাবে কলঙ্কিত করা গেছে।
অভ্যুত্থানপন্থি রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে কলঙ্কিত করার জন্য বা ডিফেম করার জন্য কতগুলো মতাদর্শিক অবস্থানকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন : অভ্যুত্থানপন্থি যে দলীয় রাজনৈতিক এবং নির্দলীয় রাজনৈতিক বর্গ বা এনটিটিগুলো ছিল, তাদের হরেদরে ডানপন্থি, উগ্রবাদী, নারীবিদ্বেষী, সংস্কৃতিবিদ্বেষী অথবা ধর্মবিদ্বেষী, শাহবাগি—এ ধরনের বিভিন্ন মতাদর্শিক কম্পাসের নিক্তিতে মেপে এই জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলোকে ভিলিফাই করা হয়েছে এবং তারা সমাজের জন্য ক্ষতিকারক, এই মতাদর্শিক অবস্থানগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়—সেটি প্রমাণ করা গেছে এবং এই মতাদর্শিক স্কেলে মেপে তাদের কলঙ্কিত করা হয়েছে, তাদের গ্রহণযোগ্যতাকে খারিজ করা হয়েছে। রাজনীতির ময়দানে এই ডিনায়াল এবং ডিফেমেশন খুবই কার্যকর দুটি টুলস। অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে পারপেট্রেটর বা অপরাধী সব অপরাধকে যেমন ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, একইভাবে গণমানুষের রেজিস্ট্যান্সকে অস্বীকার করে গণমানুষের যে সম্ভাবনা, সেটাকেও ধ্বংস করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
আর ডিফেমেশন বা কলঙ্কিতকরণ টুলসের মধ্য দিয়ে সব সম্ভাবনাময় যে বিপ্লবী বা পরিবর্তনকামী রাজনৈতিক ফোর্স ছিল, তাদের গণমানুষের সামনে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে হাজির করা হয়েছে। যেন গণমানুষের রাজনৈতিক শক্তি গড়ে ওঠার জন্য ন্যূনতম শর্তও মাঠে হাজির না থাকে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



