কত চেহারা ঢেকে গেছে রক্তে

আব্দুল্লাহ আল মিনহাজ

কত চেহারা ঢেকে গেছে রক্তে

২০২৪ সালে জুলাই আন্দোলনের সময় আমি তা’মীরুল মিল্লাত কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের (টাকসু) ভিপি। ভিপি হিসেবে ছাত্রদের নিরাপত্তা, আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণ, সবাইকে নিয়ে অংশগ্রহণ, দেখাশোনাসহ সরাসরি ময়দানে দায়িত্ব পালনের সুযোগ হয়েছে। প্রতিদিনই সকাল-সন্ধ্যা কয়েক গাড়ি যৌথ বাহিনী ক্যাম্পাসে সতর্ক অবস্থানে থাকত। মাদরাসার একটি গেট প্রশাসনের লোকেরা দেয়াল তুলে বন্ধ করে দেয়। সার্বিক দিক বিবেচনায় জুলাই আন্দোলনে মিল্লাতের সব ছাত্রকে নিয়ে আমরা অংশগ্রহণ করতাম উত্তরা আজমপুর বিএনএস সেন্টারের সামনে। আন্দোলনকে যেন জামায়াত-শিবিরের আন্দোলন বলতে না পারে, এজন্যই এত দূরে আসতাম। এমনকি সবাইকে বলে দেওয়া হতো কেউ যেন পাঞ্জাবি-টুপি পরিধান না করে আসে। এই কৌশল জুলাই বিপ্লবসহ আগের আন্দোলনগুলোয়ও মেনে চলা হতো। মাদরাসাটির শুধু টঙ্গী ক্যাম্পাসেই ১৪ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। জুলাই বিপ্লবে তা’মীরুল মিল্লাত মাদরাসা থেকে মোট পাঁচজন শাহাদাতবরণ করেন—১. শহীদ হাফেজ নাসির, ২. শহীদ ওসমান পাটোয়ারী, ৩. শহীদ শাকিল পারভেজ, ৪. শহীদ মো আদিল এবং ৫. শহীদ মুনতাসির রহমান আলিফ। আহত হয় তিন শতাধিক। একটা সময় বিজয় ধরা দিল। কিন্তু চূড়ান্ত পর্যায়ের টানা ২০ দিনের আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যে বর্বতার মুখোমুখি হয়েছি, তাতে দীর্ঘদিন ট্রমাটাইজড থাকতে হয়েছে। ঘুমের মধ্যেও গোলাগুলির শব্দ শুনতাম। হালকা কোনো শব্দে আঁতকে উঠতাম। এ রকম অনেকেরই হয়েছে।

১৮ জুলাই, ২০২৪

বিজ্ঞাপন

দেশের সবচেয়ে বেশি ম্যাসাকার হয়েছে যেসব এলাকায় তার মধ্যে যাত্রাবাড়ীর পরপরই অবস্থান করবে উত্তরা বিএনএস সেন্টার। কত রক্তাক্ত দেহ পড়ে থাকতে দেখেছি! চেহারা ঢেকে গেছে রক্তে। তাও জোরে জোরে বলছে, ‘ভাই আমাকে নিয়ে চিন্তা করেন না, আপনারা রাস্তা ছাড়বেন না।’ এক ভাইকে রিকশায় তুলে সেই ভাইয়ের রক্তের প্রতিশোধ নিতে আবারও সামনের সারিতে এসে দাঁড়িয়ে যায় কত তাজা প্রাণ। গুলি এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে বেরিয়ে গেছে; বলছে, ভাই দোয়া করেন আল্লাহ যেন শহীদ হিসেবে কবুল করেন। সকালের দিকে কেউ একজন বলল, ‘ভাই, আপনার সঙ্গে কেউ নেই কেন? সঙ্গের সবাইকে ছেড়ে সামনের দিকে ছিলাম। যতটুকু মনে করতে পারছি, প্রশ্নটা শহীদ শাকিল পারভেজ করেছিলেন। দুপুরের আগে হঠাৎ রাবার বুলেটের কয়েকটা রাবার বিদ্ধ হই। বেশি আঘাত হানে ডান চোখে। মেডিকেলের অভিজ্ঞতা অবর্ণনীয়। মুহূর্তে মুহূর্তে একটার পর একটা রিকশায় আসছে কত-কত রক্তাক্ত ক্ষত-বিক্ষত দেহ! উত্তরা আধুনিক হাসপাতালের কথা বলতেই হয়, যেটা বাংলাদেশ মেডিকেল নামেও পরিচিত। ফুল মেডিকেল টিম কাজ করেছে। সব চিকিৎসা সুবিধা দিয়েছে। কোনো টাকা নেয়নি। আমার চোখের অপারেশন শেষে অল্প টাকা সঙ্গে ছিল। ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলাম, বিল কত টাকা? তিনি বললেন, বাবা, আমরা নামতে পারিনি; বিলের কথা বলে লজ্জা দিয়ো না। হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার দিয়ে বললেন ফলোআপের জন্য যোগাযোগ করতে; বললেন, বিল নিয়ে টেনশন করো না। এক চোখে ব্যান্ডেজ, সঙ্গের জনের হাত ধরে নিচে এসেছি। অপরিচিত একজন শিক্ষার্থী ভাইকে প্রেসক্রিপশন দিয়ে বললাম, ভাইয়া, ওষুধগুলো এনে দিতে পারবেন? এনে দিলেন ঠিকই, কিন্তু জোর করেও টাকা দিতে পারিনি। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর মনে হলো আমার তো আরেক চোখ ভালো আছে। সামনের সারিতে না হোক, পেছনে বসে থাকলেও যেতে হবে। কারণ আমার মিল্লাতের ছাত্ররা কোন অবস্থায় আছে, এটা নিয়ে টেনশন হচ্ছিল। পাশাপাশি মনে হচ্ছিল, আমি গুলিবিদ্ধ হওয়ায় অনেকের মনে ভয় তৈরি হতে পারে, কারণ রাবার বুলেটের বিষয়টি বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নভাবে বর্ণনা করা হচ্ছিল। বাড়িতে কেউ একজন আম্মুকে ফোন করে জানিয়েছেন, মিনহাজের মাথায় একপাশ দিয়ে গুলি ঢুকে আরেকপাশ দিয়ে বের হয়ে গেছে। রাস্তায় গাড়ি নেই, মোড়ে মোড়ে ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা যাকে-তাকে চেক করছে। তার মধ্যে আম্মুজি ও ভাইয়া বের হয়েছেন আসার জন্য। জিএস ইকবাল ভাই চলে আসছেন। সাধারণত কৌশলগত জায়গা থেকেই রিস্কি পয়েন্টগুলোয় ভিপি-জিএস একসঙ্গে অংশগ্রহণ করতাম না। যেন একজনের কিছু হলে আরেকজন বেকআপ পলিসি নিয়ে আন্দোলন সংগঠন চালিয়ে নিতে পারেন। সবাইকে স্বাভাবিক করলাম। আরেকটা রিকশা নিলাম—মেডিকেল থেকে আবার বিএনএস যাব। পথিমধ্যে আখের রস বিক্রেতা মামা রিকশা আটকে দাঁড়িয়ে বললেন, আখের রস খেয়ে যেতে হবে। বিএনএসে এসে বসলাম। চেনা-অচেনা কত ভাই-বোন সমবেদনা জানাচ্ছেন, ইয়ত্তা নেই। কেউবা জড়িয়ে চোখের পানি ছেড়ে দিচ্ছেন, কেউবা পকেটে টাকা গুঁজে দিয়ে বলছেন, ভাই মানসিক তৃপ্তি নেওয়ার জন্য এটা দিয়েছি, এটা রাখতে হবে। বললাম, ভাই আমার চেয়ে সিভিয়ার কেস অনেক আছে, প্লিজ তাদের সহযোগিতা করেন। আন্দোলনের দিনগুলোয় যতটুকু মনে করতে পারছি, কোনোদিন খাবার সংকটে পড়তে হয়নি। বিস্কুট, টিফিন বাটিতে করে ভাত-তরকারি, খিচুড়ি, স্যালাইন, টিয়ার গ্যাস থেকে বাঁচার জন্য আগুন, পেস্ট—কোনোকিছুর ঘাটতি হয়নি কোনোদিন। খাবার, চিকিৎসা, সেবা-শুশ্রূষা কাজগুলোয় মা-বোনদের বেশি ভূমিকা পালন করতে দেখেছি।

সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসে ফিরে শুনি, মিল্লাত থেকে দাখিল শেষ করা শাকিল পারভেজ শাহাদাতবরণ করেছেন। প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ আসতে পারে ভেবে শাকিলের জানাজা মাদরাসায় না আদায় করে শত শত মানুষের উপস্থিতিতে বাইরে আদায় করলাম। ১৮ তারিখেরই ঘটনা। জীবন্ত শহীদ জুনায়েদ। স্টিল বুলেট। ডান হাত ভেদ করে পেটে নাড়িভুঁড়িতে ১০টা ছিদ্র হয়ে বুকের দিকে উঠে গেছে। বাংলাদেশ মেডিকেল ও কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালে চিকিৎসা হবে না বলে দেওয়ার পর অনেক কষ্টে কুর্মিটোলা হাসপাতালে নিয়ে আসা হলে তারাও শুরুতে অপারগতা প্রকাশ করল। এদিকে রক্তবমি শুরু হয়ে গেছে। বলছে, ভাইয়া দোয়া করবেন আল্লাহ যেন শহীদ হিসেবে কবুল করেন। ডাক্তাররা ডিএমসিতে পাঠাতে বলে দেখলেন, নিতে নিতে হয়তো বাঁচবে না। অবশেষে মেডিকেল অফিসারসহ ডাক্তারদের সিনিয়র টিম সম্মিলিতভাবে রাত ৩টা ৩০ মিনিটের দিকে সাকসেসফুলি অপারেশন শেষ করেন। আলহামদুলিল্লাহ হাতের তিনটা আঙুল ছাড়া বাকি সব স্বাভাবিক হয়েছে। এখানেও দীর্ঘদিন ট্রিটমেন্ট নেওয়া, আইসিইউ, সিসিইউ—সবসহ যৎসামান্যই বিল নিয়েছেন। দিনশেষে মিল্লাতের ছাত্রদের এ রকম ছোট-বড় আরো বেশকিছু ঘটনার সংবাদ পেলাম।

২০ জুলাই, ২০২৪

যে সতর্কতায় উত্তরায় গিয়ে আন্দোলন করতাম, ২০ তারিখে সেটা মেইনটেইন করতে ব্যর্থ হলাম। আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে দেখলাম মিল্লাতের আশপাশের এলাকার মসজিদ্গুলোর মাইক দিয়ে রাস্তায় নেমে আসার ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। অধিকাংশ গার্মেন্টের কর্মী। ঘোষণার পরপর স্থানীয় এলাকাবাসী, মিল্লাতের ছাত্রসহ হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি। আন্দোলন ঠেকাতে টঙ্গী পশ্চিম থানা, পূর্ব থানা, যৌথবাহিনী, ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ, বাস্তুহারার ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী, হেলিকপ্টার থেকে গুলিসহ এলোপাতাড়ি অ্যাটাক চালানো হয়। লাশের পর লাশ পড়তে থাকে। শহীদ হয় মিল্লাতের হাফেজ নাসির ইসলাম। মিল্লাতের আরেক ছাত্র ওমর ফারুকের পায়ে স্টিল বুলেট একদিক ভেদ কর অন্য পাশ দিয়ে বের হয়ে গেল। এখনো চিকিৎসা চলমান। সবাইকে নিরাপদে আশ্রয় নিতে নির্দেশনা দিয়ে ওমর ফারুকের জন্য ব্লাড ডোনার নিয়ে উপস্থিত হলাম গুটিয়া হাসপাতালে। একটার পর একটা লাশ আসছে হাসপাতালে। বেশকিছু লাশ বেওয়ারিশ। সাইরেন বাজাতে বাজাতে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বয়ে বেশকটা গাড়ি এসে বেওয়ারিশ লাশগুলো নিয়ে চলে গেল। নিয়ন্ত্রণহীন বেকআপ প্রস্তুতি ছাড়া হঠাৎ নামায় ক্ষতিটা হয়েছে বেশ মারাত্মক। রাবার বুলেট ও ছড়রা গুলিতে আহত মানুষের সংখ্যাটা ছিল অনেক।

৩৬ জুলাই, ২০২৪

প্রতিদিনের কর্মসূচিগুলো শিবিরের কেন্দ্র থেকে আমাদের জানিয়ে দেওয়া হতো। ব্ল্যাক-আউটের সময়গুলোয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদিক ভাই, ফরহাদ, সিবগাত ভাই থেকে খোঁজ-খবর পেতাম। প্রতিদিনই বিভিন্ন স্পটে কেন্দ্রে দায়িত্বশীল ভাইয়েরা সরাসরি এসে সার্বিক খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি আন্দোলনের গতিবিধি জানাতেন। ভাইয়েরা প্রয়োজনীয় সব খরচ করতে বললেন। প্রতিদিনই সিএনজি করে লাঠি নিয়ে আসতাম বিএনএসে। ৩৬ জুলাই লাঠি কিনেছি প্রায় ১২ হাজার টাকার। এনে রাখার সঙ্গে সঙ্গেই শিক্ষার্থীরা নিজেদের মতো হাতে নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে নিত। এর আগেও সাউন্ড সিস্টেম, ব্যানার—প্রয়োজনীয় সব ম্যানেজ করতাম। বিজয়ের দিন সকালবেলা। ইন্টারনেট বন্ধ। কিছুক্ষণ পরপর ঢাবি থেকে বিভিন্ন দায়িত্বশীল কর্মীরা ফোন দিয়ে আপডেট নিচ্ছে। গলির রাস্তা থেকে মিছিল শুরু করার সময় ৩০০-৩৫০ জনের মতো ছিলাম। বসুন্ধরার এদিকে সংগঠন থেকে দায়িত্বে ছিলেন শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি সালাহউদ্দিন আইউবী ভাই। কল দিয়ে বললেন, সেনাবাহিনী সরাসরি মাথায় গুলি করে দুজনকে শহীদ করে দিয়েছে। মনে পড়ে ঢাবির ভাইদের কিছুক্ষণ পরপর বলছিলাম, মানুষ বাড়ছে, হয়তো দুই হাজার, পাঁচ হাজার। সর্বশেষ এটা বলেছিলাম মনে আছে। এই মিছিলের শুরু কোথায় আর শেষ কোথায় দেখা যাচ্ছে না। সময় যাচ্ছে, খবর এলো হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার। কী আনন্দ! কী উল্লাস! প্রতিটি প্রাণে। গিয়ে শুয়ে পড়লাম সংসদ ভবনের সবুজ ঘাসে। কত মানুষ শুকরিয়া নামাজ পড়ছে, কত মানুষ আনন্দ ভাগাভাগি করছে। হঠাৎ চোখের কোণে পানি এলো সাঈদী হুজুরের কথা স্মরণে এসে। গাজীপুর থেকে গণভবন পায়ে হেঁটে। আমার মতো এরকম পুরুষের পাশাপাশি শত শত বোনেরাও হেঁটেছেন এত পথ। নেই কোনো ক্লান্তি, কী শক্তি, কী স্পিরিট সবার মধ্যে! রাস্তার পাশের বাসাগুলো থেকে মা-বোনেরা ও পিচ্চিরা আপেল, কমলা, পানি, রুটি, পিঠা—যে যেভাবে পারছে ছুড়ে দিচ্ছেন। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বয়স্ক মুরুব্বিরা পানি কিনে নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিতরণ করছেন। আহ! ফ্যাসিবাদ পতনে চোখ জুড়িয়ে যাওয়া দৃশ্যগুলো। যেখানে মিশে গেছে ধনী-গরিব, ছোট-বড়, স্কুল-কলেজ-মাদরাসা শিক্ষার্থী, কৃষক, রিকশাচালক ও হকার থেকে শুরু করে শিক্ষক, ডাক্তারসহ সব পেশাজীবী মানুষ। হারিয়ে যেতে ইচ্ছা করে বারবার জুলাইয়ের সেই দিনগুলোয়। আহ! কী দেশপ্রেম, কী উদ্দাম সাহস—একজন আরেকজনের পাশে দাঁড়ানো। এটাই আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। এটাকে কখনো নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। এই দেশ আমাদের সবার, আমরা সবাই সবার জন্য। এত রক্ত, এত প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এই দ্বিতীয় স্বাধীনতা সার্থক করতে হবে। এটা শহীদ আহতদের রক্তের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা।

লেখক : স্বাস্থ্য ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক, ডাকসু

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন