যখন আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল প্রতিদিন, যখন আমাদের নিরপরাধ সন্তানদের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছিল ঘাতকের বুলেট, সেই জুলাই ২০২৪-এর উত্তাল সময়ের প্রতিফলন এই লেখা। কিন্তু ঘটনার ভয়াহবতা এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে এটি ছাপা সম্ভব হয়নি তখন।
“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে দুই প্রতিবাদী ছাত্রীকে লাঠি নিয়ে আক্রমণের ছবি মানুষের চোখ থেকে সরতে না সরতেই অসংখ্য শিক্ষার্থী রক্তাক্ত হওয়ার দৃশ্য।
প্রতিবাদে উত্তাল সারা দেশ। মিছিলের আওয়াজ স্তব্ধ করতে সহিংসতা এবং বলপ্রয়োগ। সেই নিষ্ঠুরতায় বাংলাদেশের অনেক মায়ের বুক খালি।
আন্দোলনকারী ছাত্রদের দাবি ছিল খুবই সাধারণ : মেধার ভিত্তিতে সরকারি চাকরির জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ—কোনো গোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত আসন বা বিশেষ সুবিধা নয়।
তখন পর্যন্ত কোটা সংস্কারের দাবিটি জাতীয় আন্দোলনে রূপ নেয়নি, তবে সেটি অন্তত ছাত্রদের অধিকার আদায়ের কর্মসূচি তো ছিল। কোটাব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাটাও এই প্রজন্মের মৌলিক অধিকার, নাকি সন্দেহ আছে?
কিন্তু একটি যৌক্তিক দাবির প্রতি উত্তর এলো বিভাজনের কায়দায়—তারা রাজাকার না মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এই বয়ানের ভিত্তিতে।
সংক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের রাজাকার বলে স্লোগান দিলে যথারীতি তাদের একই ট্যাগ দেওয়া হলো যদিও ১৯৭১ সালে এদের কারো কারো বাবা-মায়েরও জন্ম হয়নি।
দেশবাসীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো এভাবে, যেন এই মিছিলের তরুণদের আক্রমণকারীরাই মুক্তিযুদ্ধের আসল(!) উত্তরাধিকারী!
কারণ তারাই রক্ষক এমন এক আরোপিত পুরোনো বয়ানের, যে বয়ান কাজে লাগে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাগাড়ম্বরে, ভিন্ন মত দমনে, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার হরণে।
প্রথমে ক্যাম্পাসে এবং পরে দেশব্যাপী ছাত্রদের প্রতিবাদ মিছিলের পরিপ্রেক্ষিতে শাসক দল আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আনুষ্ঠানিকভাবে বললেন ‘রাজাকারদের’ জবাব দিতে তাদের ছাত্রলীগই যথেষ্ট।
ফলাফল : নিরপরাধ কিন্তু প্রতিবাদী ছাত্রছাত্রীদের রক্তে ভেজা ১৬ জুলাই, ২০২৪-এর বাংলাদেশ।
মিছিলে বুক চিতিয়ে পুলিশের গুলিতে শহীদ রংপুরের রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদের মায়ের সরল প্রশ্নই জাতির দশা : ‘তুই মোর ছাওয়াক চাকরি না দিবু না দে, কিন্তু মারলু ক্যানে?’
তাহলে কেউ কেউ প্রমাণসহ বলতে চাইছেন এ রাষ্ট্র আবু সাঈদদের নয়? তাদের বেকারত্ব, যৌবনে অনিশ্চয়তা ও স্বপ্নভঙ্গ, রাষ্ট্রীয় পক্ষপাতিত্ব, দুর্নীতি এবং অধিকারহীনতার কথা তারা বলতেও পারবে না!
আমাদের জানা মতে, শুধু নিজেদের পরবর্তী প্রজন্মকে অন্যায্য সুবিধা দিতে কিংবা গোষ্ঠীপ্রীতির দেশ বানাতে যুদ্ধ করেননি রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধারা। তারা ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী সময়ের সাহসী সন্তান।
‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না/ এই জল্লাদের উল্লাসমঞ্চ আমার দেশ না’—নবারুণ ভট্টাচার্যের এই বিপ্লবী কবিতা এখনকার অনেকে না পড়ে থাকলেও তাদের ক্ষোভ ও হতাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ!
এখনো অনেক জ্যেষ্ঠ নাগরিককে নিশ্চুপ দেখে ওই কবিতায় প্রকাশিত কবির অনুভূতি হয়তো প্রতিবাদী তরুণদেরও : ‘যে শিক্ষক বুদ্ধিজীবী কবি ও কেরানি/ প্রকাশ্যপথে এই হত্যার প্রতিশোধ চায় না/ আমি তাকে ঘৃণা করি—’।
সুতরাং হুঁশিয়ার! সময় এসেছে প্রশ্ন করার : ইতিহাসের কোন ঘোড়ায় আরোহণ করেছেন তথাকথিত পক্ষ-বিপক্ষের শক্তিরা।
নিজেকে বলুন তো মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে আপনি নাকি গণনিপীড়নের সমর্থক? কাদের দেখছেন গণতান্ত্রিক চেতনার পথে—ছাত্রলীগ নাকি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সমর্থকদের?
গাজায় ইসরাইলের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিবেকবান মানুষদের ঘৃণার মতো বাংলাদেশে ছাত্র হত্যার প্রতিবাদ করার তাগিদ যারা অনুভব না করেন, তারা কারা?
আজ যাদের লেখনীতে ও বক্তব্যে মজলুম মানুষের কথা আসে না, তারা তো থেমে থাকা স্মৃতির জাল বোনা আরোপিত দেবত্বের সেবাদাস মাত্র।
দেশ ১৯৭১ সালে থেমে থাকলে ১৯৯০-এর গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংঘটিত হতো না। সবকিছু ঠিকঠাক চললে, বুয়েটের ছাত্র আবরারকে জীবন দিতে হতো না দেশের স্বার্থের পক্ষে কথা বলার ‘অপরাধে’।
সর্বসাম্প্রতিক দেশীয় আন্দোলন শান্তির বদলে বিভাজনের রাজনীতির এক অবধারিত প্রতিক্রিয়া। কোটার মৌখিক উদ্দেশ্য যত মহান করেই দেখানো হোক না কেন, বাস্তবে এটি নিজেদের লোকপ্রশাসনে নিয়োগ দেওয়ার অপকৌশল।
এমনকি সুষ্ঠু প্রয়োগ হলেও পুরো ব্যবস্থাটি ন্যায়বিচার পরিপন্থী। এরপর প্রশ্ন ফাঁস করে নিয়োগ এবং টাকা কামানোর কৌশল তো রয়েই গেল!
একটি অন্যায় ব্যবস্থার আয়ুষ্কাল দীর্ঘায়িত করতে যখন চরমপন্থি মতবাদ বা বয়ান চাপিয়ে দেওয়া হয় মানুষের ওপর, একসময় ভিন্ন বয়ান দাঁড়িয়ে যায় এবং নতুনের জয় হয়।
যুগে যুগে উদ্ধত স্বৈরশাসকরা ভুলে যান ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহের ‘খেলোয়াড়’ তারা একা নন।
ধানমন্ডি, ঢাকা, ১৮ জুলাই ২০২৪।”
লেখক : সাংবাদিক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



