ভিকারুননিসার শিক্ষক আনোয়ারের দুই কিডনিই অকার্যকর

ভিকারুননিসার শিক্ষক আনোয়ারের দুই কিডনিই অকার্যকর

দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা ভিকারুননিসা নূন স্কুলের আজিমপুর শাখার ইংরেজি বিভাগের সহকারী শিক্ষক মো. আলী আনোয়ার এখন নিজেই জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে। তার দুটি কিডনিই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বর্তমানে সপ্তাহে দুই দিন ডায়ালাইসিস নিতে হচ্ছে তাকে। চিকিৎসকরা দ্রুত কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দিলেও দীর্ঘদিন সন্তানের চিকিৎসায় প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়ায় চিকিৎসার ব্যয় বহন করা তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে।

শৈশব থেকেই নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছেন মো. আলী আনোয়ার। মাত্র চার বছর বয়সে মায়ের হাত ধরে বাবার বাড়ি ছাড়তে হয় তাকে। এরপর গুরুদাসপুরের চন্দ্রপুর গ্রামে নানাবাড়িতে আশ্রয় নেন। সংসারের অভাবের কারণে মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে ছেলের পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

অভাবের মধ্যেও পড়াশোনায় মেধার পরিচয় দেন আনোয়ার। স্থানীয় শিক্ষকরা তার আর্থিক অসচ্ছলতা বিবেচনায় স্কুলের বেতন ও পরীক্ষার ফি মওকুফ করে সহযোগিতা করেন। এসএসসি পরীক্ষার আগে এক বছর প্রধান শিক্ষক তাকে নিজ বাড়িতে রেখে পড়ান। কৈশোরে অন্যের জমিতে কৃষিশ্রমিকের কাজ করেও নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন তিনি।

১৯৯০ সালে গুরুদাসপুর উপজেলার হালসা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ১৯৯২ সালে নাটোরের নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় মেসে থেকে টিউশনি করে নিজের খরচ চালিয়েছেন।

সন্তানের চিকিৎসায় নিঃস্ব

২০০০ সালের গোড়ার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে ঢাকায় আসেন আনোয়ার। কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির পর বিয়ে করেন। পরে তার একটি ছেলে সন্তান জন্ম নেয়। তবে সন্তানের জন্মের প্রায় দেড় বছর পর জানা যায়, সে বাকপ্রতিবন্ধী।

সন্তানের চিকিৎসার জন্য এরপর শুরু হয় দীর্ঘ সংগ্রাম। আনোয়ার বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে চাকরি পেলেও পোস্টিং হয় নাটোরের প্রত্যন্ত এলাকায়। সন্তানের চিকিৎসার প্রয়োজনে ঢাকার বাইরে থাকা সম্ভব না হওয়ায় সরকারি চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। পরে ভিকারুননিসা নূন স্কুলের আজিমপুর শাখায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।

এরপর প্রায় দুই দশক ধরে সন্তানের চিকিৎসায় দেশে-বিদেশে ছুটতে হয়েছে তাকে। বিশেষ করে ভারতের সিএমসি হাসপাতালে সন্তানের চিকিৎসার জন্য নিয়মিত যাতায়াত করেছেন। দীর্ঘ চিকিৎসায় তার সঞ্চয় বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

বর্তমানে তার ২২ বছর বয়সী সন্তান দু-একটি বাক্য বলতে পারলেও স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারে না। সন্তানের চিকিৎসা ও পরিবারের দায়িত্ব সামলে শিক্ষকতার আয় দিয়ে সংসার চালিয়ে আসছিলেন আনোয়ার।

এবার নিজের চিকিৎসার পালা

২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন আনোয়ার। চিকিৎসা করাতে গিয়ে জানতে পারেন, তার দুটি কিডনিই কার্যক্ষমতা হারিয়েছে। এরপর ধীরে ধীরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। বর্তমানে তাকে সপ্তাহে দুই দিন ডায়ালাইসিস নিতে হচ্ছে।

চিকিৎসকরা দ্রুত কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু কিডনি প্রতিস্থাপনসহ চিকিৎসার ব্যয় বহন করার মতো আর্থিক সামর্থ্য তার নেই। সন্তানের চিকিৎসায় দীর্ঘদিনের ব্যয়ের পর নিজের চিকিৎসার অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিনি।

আলী আনোয়ার জানান, জীবনের শুরু থেকেই নানা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগিয়েছেন। সন্তানের চিকিৎসার জন্য নিজের সাধ্যের সবটুকু ব্যয় করেছেন। এখন নিজের চিকিৎসার প্রয়োজনীয় অর্থ একার পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব নয়। সামর্থ্যবান ও হৃদয়বান মানুষ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে তিনি আবার সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান।

দুই দশক ধরে সন্তানের চিকিৎসার ব্যয় বহন করার পর বর্তমানে নিজের কিডনি চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছেন এই শিক্ষক। পরিবারের পক্ষ থেকে চিকিৎসার জন্য মানবিক সহায়তা চাওয়া হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন