নেপচুনের কক্ষপথেরও বাইরে, সূর্য থেকে প্রায় ৪৩০ কোটি মাইল দূরে এক রহস্যময় মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। যুক্তরাষ্ট্রের ভেরা সি. রুবিন অবজারভেটরির পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে বস্তুটি। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এটি সৌরজগতের নতুন একটি বামন গ্রহ হতে পারে। এখন পর্যন্ত এর অস্থায়ী নাম দেওয়া হয়েছে ‘২০২৬ ইডি১৩৮’।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের স্পোকেন শহরে আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির প্ল্যানেটারি সায়েন্সেস বিভাগ আয়োজিত এক সম্মেলনে এ আবিষ্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়। অন্যান্য টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণে বস্তুটির আকার ও আকৃতি নিশ্চিত হলে এটি আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান সংঘের স্বীকৃত বামন গ্রহের তালিকায় যুক্ত হবে। বর্তমানে এ তালিকায় রয়েছে মাত্র পাঁচটি—প্লুটো, সেরেস, এরিস, হাউমেয়া ও মাকেমাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহবিজ্ঞানী পল বায়র্ন এ আবিষ্কারকে অত্যন্ত রোমাঞ্চকর বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, এটি সৌরজগৎ ও গ্রহবিজ্ঞান গবেষণায় নতুন যুগের সূচনা করবে।
নতুন এই মহাজাগতিক বস্তু সম্পর্কে এখনো খুব বেশি তথ্য জানা যায়নি। তবে সম্প্রতি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম শুরু করা রুবিন অবজারভেটরি এত বড় একটি বস্তুর সন্ধান পাওয়ায় উচ্ছ্বসিত বিজ্ঞানীরা। কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী সামান্থা ললার বলেন, বিষয়টি দারুণ! আমি খুবই আনন্দিত। এই বিশাল, ব্যয়বহুল ও জটিল যন্ত্রটি যে ঠিকঠাক কাজ করছে, তার প্রমাণ পাওয়াটা সত্যিই আনন্দের।
বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, ইডি১৩৮ নেপচুনের বাইরে বরফে ঢাকা অসংখ্য মহাজাগতিক বস্তুর একটি বলয়াকার অঞ্চলে অবস্থিত। এ অঞ্চলকে বলা হয় কুইপার বেল্ট। সৌরজগতের এ অংশ সম্পর্কে এখনো বিজ্ঞানীদের ধারণা সীমিত। পল বায়র্নের মতে, এ ধরনের প্রতিটি আবিষ্কার সৌরজগৎ এবং সামগ্রিকভাবে গ্রহব্যবস্থার উৎপত্তি সম্পর্কে জানার পথ আরো প্রসারিত করছে।
রুবিন অবজারভেটরির কল্যাণে আগামী দশ বছরে নেপচুনের কক্ষপথের বাইরে প্রায় ৩২ হাজার মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধান পাওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে অনেকগুলো আকারে ছোট হলেও বেশ কয়েকটি নতুন বামন গ্রহ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বামন গ্রহের ধারণাটি মূলত প্লুটোর গ্রহের মর্যাদা নিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের বিতর্ক থেকে এসেছে। ২০০৫ সালে প্লুটোর কাছাকাছি আকারের আরেকটি বস্তু এরিসের সন্ধান পাওয়ার পর বিতর্ক আরো জোরালো হয়। পরে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান সংঘ গ্রহের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে। সেই সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো মহাজাগতিক বস্তুকে গ্রহ হতে হলে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হবে—সূর্যকে কেন্দ্র করে কক্ষপথে ঘুরতে হবে, নিজের মহাকর্ষের প্রভাবে প্রায় গোলাকার আকৃতি ধারণ করতে হবে এবং নিজের কক্ষপথের আশপাশের অন্য সমজাতীয় বস্তুগুলোকে সরিয়ে দিতে হবে।
প্লুটো শেষ শর্তটি পূরণ করতে না পারায় ২০০৬ সালে গ্রহের মর্যাদা হারায় এবং বামন গ্রহের শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত হয়।
সৌরজগতের বিভিন্ন অঞ্চলে বামন গ্রহের সন্ধান পাওয়া যায়। মঙ্গল ও বৃহস্পতির মধ্যবর্তী গ্রহাণু বলয়ে রয়েছে সেরেস। সৌরজগতের প্রান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত এরিস। অন্যদিকে প্লুটো, হাউমেয়া ও মাকেমাকে রয়েছে কুইপার বেল্টে। এবার এ তালিকায় নতুন সংযোজন হতে পারে ইডি১৩৮।
চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিকসের জ্যোতির্পদার্থবিদ ম্যাথিউ হলম্যান রুবিন অবজারভেটরির স্বয়ংক্রিয় পর্যবেক্ষণ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করেন। কোটি কোটি চলমান মহাজাগতিক বস্তুর অবস্থান শনাক্ত করার জন্য তৈরি বিশেষ কম্পিউটার প্রোগ্রাম ব্যবহার করতে গিয়ে তিনি একটি উজ্জ্বল কিন্তু অত্যন্ত দূরবর্তী বস্তুর সন্ধান পান।
বস্তুটি পৃথিবীর তুলনায় সূর্য থেকে প্রায় ৪৬ গুণ দূরে অবস্থিত। তুলনা হিসেবে বলা যায়, নেপচুন সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্বের প্রায় ৩০ গুণ দূরে রয়েছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, নতুন বস্তুটির ব্যাস প্রায় ৩৭০ থেকে ৯৩০ মাইলের মধ্যে হতে পারে।
ব্রাজিলের সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী পেদ্রো বার্নারদিনেলি বলেন, বস্তুটি আকারে এত বড় যে এটি গোলাকার হওয়ার কথা। এ কারণেই একে সম্ভাব্য বামন গ্রহ হিসেবে বিবেচনা করছেন তারা। তবে চূড়ান্ত স্বীকৃতির জন্য আরো পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
সূত্র: দ্য ন্যাশনাল জিওগ্রাফি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


