আমার দেশ পাঠকমেলা চট্টগ্রাম (উত্তর) জেলা শাখার উদ্যোগে গত ৩ জানুয়ারি শনিবার বিপ্লবী ও বিদ্রোহী শহীদ শরীফ ওসমান হাদির স্মরণে এবং আমার দেশ-এর নবযাত্রার দ্বিতীয় বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে একটি আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। স্থানটি ছিল বালুচরার শাইনিং জুয়েলস ইনস্টিটিউট। সংগঠনের আহ্বায়ক ও লিডার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের পরিচালক মো. জুবায়েত আরেফীনের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন সমাজসেবক, চিকিৎসক ও ঐতিহ্যবাহী সামাজিক সংগঠন রাউজান ক্লাবের প্রাণপুরুষ ডা. মোহাম্মদ ওমর ফারুক।
সভায় স্বাগত বক্তব্যে সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক প্রিন্সিপাল খায়ের উদ্দীন আহমেদ সোহেল বলেন, ‘কঠিন-কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে যুগান্তকারী বিপ্লব সাধন করে ফ্যাসিস্ট শক্তির বিতাড়নের পরও আমরা তারুণ্যের আইকন জুলাই বিপ্লবী ওসমান হাদির জীবনের সুরক্ষা দিতে পারিনি। এটি জাতি হিসেবে আমাদের জন্য চরম লজ্জা ও দুর্ভাগ্যের বিষয়।’ আমার দেশ-এর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই আপসহীন ও স্বাধীনচেতা মিডিয়ার সঙ্গে একীভূত হতে পারাটা আমাদের জন্য সত্যিই সৌভাগ্যের।’
সংগঠনের সদস্য সচিব মুহাম্মদ মহসীন আবুল কাশেমের সঞ্চালনায় শহীদ ওসমান হাদির সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত পাঠ করেন সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট ও সমাজকর্মী মো. বরকত উল্লাহ চৌধুরী (কাওসার)। তিনি বলেন, ‘সাড়ে ৩২ বছরের যুবক ও আট মাসের শিশুসন্তানের পিতা শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদি একজন আপাদমস্তক বিপ্লবী ছিলেন। দ্রোহের ঝাণ্ডা উড্ডীন করে আমৃত্যু লড়ে গেছেন বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের সময় দৃশ্যপটে এলেও মূলত ওসমান হাদি তৃণমূল থেকে উঠে আসা এমন একটি চরিত্র, যার রক্তে রয়েছে খাঁটি দেশপ্রেম। হাদি জানতেন, কায়েমি দুষ্টচক্র তাকে বাঁচতে দেবে না, বরং তার লাশ নিয়ে রাজনীতি করবে এবং বিচার ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা চালাবে। তাই আগেই তিনি তার হত্যাকারীর সুষ্ঠু বিচারের দাবি করে গিয়েছিলেন।’
শিক্ষাবিদ ও পাঠকমেলার যুগ্ম আহ্বায়ক মো. শহিদুল ইসলাম শাহজাদা তার বক্তব্যে বলেন, ‘নব আকাঙ্ক্ষার স্থিতিশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণে ওসমান হাদির স্বপ্ন, চেতনা ও কর্মস্পৃহাকে আমাদের অন্তরে ধারণ করতে হবে। তাহলেই দুর্বৃত্তায়িত অপশক্তির মোকাবিলায় আমরা টিকতে পারব। এজন্য আমার দেশ-এর অবস্থান সুসংহত ও দৃঢ় করতে সচেষ্ট হতে হবে।’
তরুণ গবেষক মুহাম্মদ মহসীন আবুল কাশেম বলেন, ‘হাদির নির্মম শাহাদাতই প্রমাণ করে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ও দেশমাতৃকার পক্ষে তিনি সঠিক পথে ছিলেন। কিন্তু আজ কেউ কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাকে তথাকথিত গণতন্ত্রের সৈনিক আখ্যা দিয়ে ইনসাফ কায়েমের পক্ষে তার অবদানকে খাটো করার চেষ্টা করছে, তার বিপ্লবী চরিত্রকে মুছে ফেলার পাঁয়তারা চালাচ্ছে। স্বার্থান্বেষী মিডিয়াও এ হীন ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তাই শহীদ হাদির বিপ্লবী আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখতেই ‘জান দেব, জুলাই দেব না’ স্লোগানে উজ্জীবিত হয়ে আমার দেশ-এর মতো বস্তুনিষ্ঠ, সত্যনিষ্ঠ ও হলুদ সাংবাদিকতামুক্ত সাহসী মিডিয়ার গতিশীল প্রচার-প্রসারে নীতিগতভাবে সবাইকে নির্মোহচিত্তে এগিয়ে আসতে হবে।’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘বহুমাত্রিক প্রতিভাবান শরীফ ওসমান হাদি আধিপত্যবিরোধী কালচারাল ফোরাম ইনকিলাব মঞ্চ প্রতিষ্ঠা করে দেশবিরোধী চক্র, সার্বভৌমত্ব বিনষ্টকারী গোষ্ঠী, ইতিহাস বিকৃতিকারী, গুম-খুনে নেতৃত্বদানকারী, গণহত্যাকারী, বিনা বিচারে মানুষ হত্যাকারী, ফ্যাসিস্টের সুবিধাভোগী, অন্যায়ের প্রশ্রয়দানকারী, সত্য অস্বীকারকারী, দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ, ঘুষগ্রহীতা ও দালাল মিডিয়াসহ সবার বিরুদ্ধে সর্বদা বজ্রকণ্ঠ ছিলেন। প্রতিবাদের জোয়ার সৃষ্টি করেছেন।
পাশাপাশি দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায়, ইনসাফের পক্ষে, সুশাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় এবং সঠিক ইতিহাসজ্ঞান ও সুস্থ সংস্কৃতিচর্চায় তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন। রাজপথে, টকশোতে ও বক্তৃতার মঞ্চে শুধু নয়, ক্ষুরধার লিখনী ও প্রকাশনার মাধ্যমেও তিনি জাতিকে জাগাতে বিদ্রোহের বীজ বপনে প্রাণপণ চেষ্টা করে গেছেন অকুতোভয়ে। তাই হাদির দেখানো পথের অনুসারী হয়ে সবাইকে নব্য ফ্যাসিস্টের উত্থান ঠেকাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, “আমার দেশ ‘শেখ হাসিনা দিল্লিকে ঢাকা অ্যাটাক করতে বলেছিল’ শিরোনামে দৃষ্টি-আকর্ষণকারী ও অনুসন্ধানী লিড নিউজ নিয়ে নবযাত্রা শুরুর পর বিগত এক বছরে নিষ্কলুষ সাংবাদিকতার এক অনুপম ও আশাজাগানিয়া দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তাই বিপ্লবের ধারা অব্যাহত রাখতে হলে এই মুহূর্তে আমার দেশ-এর বিকল্প নেই।”
সামাজিক ব্যক্তিত্ব ও শিক্ষানুরাগী মো. জুবায়েত আরেফীন সমাপনী বক্তব্যে বলেন, ‘মেধাবী শিক্ষার্থী ও প্রজ্ঞাবান শিক্ষক ওসমান হাদির মতো তেজস্বী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হলে তরুণ প্রজন্মকে সর্বত্র মেধা ও নৈতিকতার স্বাক্ষর রাখতে হবে এবং প্রযুক্তির জ্ঞানে সমৃদ্ধি অর্জন, পাঠ্যাভ্যাস সৃষ্টি ও সময়ের সদ্ব্যবহারে যত্নবান হতে হবে।’ তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, ক্ষণজন্মা হাদির কর্মযজ্ঞ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের গবেষণার বিষয় হবে। তুলনামূলকভাবে কম সময়ের ভেতর এত উপস্থিতির সমাবেশে সভা আয়োজন করতে পারায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বক্তারা অদূর ভবিষ্যতে একুশে পদকপ্রাপ্ত মজলুম সাংবাদিক ও আমার দেশ সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমানকে পাঠকমেলার এ মঞ্চে অতিথি হিসেবে দেখার আশা পোষণ করেন।
হাফেজ মো. তানভীরের কণ্ঠে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে সভাটি ইমাম ও খতিব মাওলানা হারুনুর রশিদের পরিচালনায় দোয়া-মুনাজাতের মাধ্যমে শেষ হয়। এ সময় শহীদ হাদি ও দেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, রাজনীতির কিংবদন্তি খালেদা জিয়ার মাগফিরাত কামনা এবং আমার দেশ পরিবার ও পাঠকমেলার সদস্যদের জন্য বিশেষভাবে দোয়া করা হয়। হাদিভক্ত আবৃত্তিশিল্পী, জুলাই সংগঠক আদিল আরেফীনের হৃদয়গ্রাহী আবৃত্তি পরিবেশনায় সভাস্থলে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের যুগ্ম সদস্য সচিব মো. মনির উদ্দিন, লেখক-চিন্তক সিএম আলী হায়দার, ব্যাংকার রফিকুল ইসলাম ইসলামাবাদী, ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইব্রাহিম, পদ্মা অয়েলের ম্যানেজার (অব.) সাইফুদ্দিন আহমেদ, ব্যবসায়ী ও সমাজকর্মী গোলাম মোস্তফা রেজা, সংগঠক ইঞ্জিনিয়ার আনোয়ার হোসেন মিশু, ছাত্রনেতা নাহিদুল ইসলাম, জুলাইযোদ্ধা আশরাফ উদ্দীন, মো. বেলাল হোসেন প্রমুখ।
লেখক : সদস্যসচিব, আমার দেশ পাঠকমেলা, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা
ক্যাপশন : আলোচনা সভায় অংশগ্রহণকারী পাঠকমেলার সদস্যরা
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

