প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিপর্যস্ত বলে মন্তব্য করেন কেন্দ্রীয় যুবদলের সভাপতি মোনায়েম মুন্না।
শনিবার সকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিষয়ে জাতীয়তাবাদী যুবদল, স্বেচ্ছাসেবকদল ও ছাত্রদলের যৌথ সংবাদ সম্মেলন তিনি এই মন্তব্য করেন।
মুন্না বলেন, এক তীব্র মানসিক যাতনা নিয়ে আমরা আজকের সংবাদ সম্মেলনটি করছি। দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে আমরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। আপনারা জানেন, রাজধানীর চকবাজার থানার ব্যবসায়ী ও যুবদল কর্মী মইনকে প্রকাশ্য দিবালোকে অত্যন্ত নৃশংস কায়দায় নির্মমভাবে পাথর মেরে হত্যা করা হয়েছে। এমন নৃশংস বর্বরতা প্রত্যক্ষ করে সমগ্র জাতি স্তম্ভিত। আমরা এই নৃশংসতার তীব্র নিন্দা, প্রতিবাদ ও ধিক্কার জানাচ্ছি। সভ্যতার এই যুগে এমন আদিম বর্বরতা আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না।
তিনি বলেন, এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ও ইন্ধনদাতা হিসেবে যেসকল যুবদল ও ছাত্রদল কর্মীদের নাম এসেছে তাদের সকলকে আমরা সংগঠন থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করেছি। সাংগঠনিক দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার জায়গা থেকে যা কিছু প্রয়োজন, আমরা সেই ব্যবস্থাগুলো নিয়েছি। কিন্তু এই ঘটনায় যারা সরাসরি সংশ্লিষ্ট হিসেবে ভিডিও ফুটেজ ও সিসি ক্যামেরার ফুটেজে নিশ্চিত হওয়া গেছে, আশ্চর্যজনকভাবে তাদেরকে মামলার প্রধান আসামি করা হয়নি। যারা প্রাণঘাতী আঘাতগুলো করেছে তারা অদ্যাবধি গ্রেফতারও হয়নি। এর কারণ আমাদের বোধগম্য নয়। আমরা গণমাধ্যমসূত্রে জানতে পেরেছি, মামলার এজাহারে খুনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত তিনজন খুনিকে পুলিশ কৌশলে বাদ দিয়ে নিরপরাধ তিনজনকে আসামি করেছে।ঘটনার পর ৬০ ঘণ্টার বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও, খুনিদের খুনের প্রমাণাদি হাতে থাকা সত্ত্বেও অদ্যাবধি কেন মূল আসামিদের গ্রেফতার করা গেল না, এটা এক বিরাট প্রশ্ন ও রহস্য।
যুবদল সভাপতি বলেন, গত ৫ আগস্ট দীর্ঘ দেড়যুগের অবর্ণনীয় নির্যাতন, নিপীড়ন, গুম, খুন, সোয়া লাখ গায়েবি মামলা, ইতিহাসের বর্বরতম ফ্যাসিবাদী নিষ্পেষণ থেকে দেশ, জাতি ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতাকর্মীরা মুক্তি লাভ করে। এই দীর্ঘ ১৬ বছর যাবৎ বিএনপির নেতাকর্মীরাই নিজেদের জীবন, ক্যারিয়ার, পরিবার, ব্যবসাসহ জীবন ও সম্পদকে বিপন্ন করে এক বর্বর ফ্যাসিস্ট একনায়কের বিরুদ্ধে মাঠের প্রতিরোধটুকু জারি রেখেছিল। তারা গুম, খুন, অপহরণসহ নানামাত্রিক বর্বরতার নির্মম শিকার হয়েও কখনও মাঠ ছেড়ে যায়নি। গত জুলাইয়ের আন্দোলনেও আমরাই সবচাইতে বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছি। সর্বমোট যে শহীদের তালিকা আমরা অদ্যাবধি পেয়েছি, তার প্রায় অর্ধেক সংখ্যকই আমাদের দলীয় নেতাকর্মী। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের সফলতার পর আমরা ক্রেডিটের নেশায় মোহগ্রস্থ না হয়ে, শহীদদের রক্ত নিয়ে ব্যবসা না করে স্বাভাবিক সাংগঠনিক কার্যক্রমে ফিরে গেছি।
মোনায়েম মুন্না বলেন, গত কয়েক মাসে সারাদেশের যেকোনো জায়গা থেকে যখনই আমাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, আমরা অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেলেই চূড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। গত প্রায় এক বছরে আমরা আমাদের হাজারো নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করেছি। আমরা কোথাও দায় এড়ানোর রাজনীতি করিনি। বরং দায় গ্রহণ করে সর্বোচ্চ সাংগঠনিক ব্যবস্থাটুকু নিশ্চিত করেছি। কিন্তু আমরা যে হাজারো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছি, প্রশাসন কি তাদের বিষয়ে যথাযথ আইনি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েছে? না নিয়ে থাকলে কেনো নেয়নি?
তিনি আরো বলেন, গত প্রায় এক বছরেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি তো দূরের কথা, সাধারণ মানুষের জীবনের ন্যূনতম নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয়নি। আপনারা দেখেছেন, গতকাল খুলনায় যুবদলের একজন বহিষ্কৃত নেতাকে গুলি করে ও রগ কেটে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা জাতীয় গণমাধ্যমে কোনো প্রতিবাদ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। চাঁদপুরে খুতবা দেওয়ার সময়ে একজন ইমামের ওপর নারকীয় কায়দায় প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে হামলা করা হয়েছে।
মুন্না বলেন, গত সপ্তাহে কুমিল্লায় মব তৈরি করে একই পরিবারের তিনজনকে নৃশংস কায়দায় হত্যা করা হয়েছে। ইতোপূর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে তোফাজ্জল নামীয় এক যুবককে এবং পরবর্তীতে ছাত্রদল নেতা সাম্যকে বর্বর কায়দায় হত্যা করা হয়। ইতোপূর্বে প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা পারভেজকে প্রকাশ্য দিবালোকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নামধারী স্থানীয় সন্ত্রাসীরা।
তিনি বলেন, বর্তমানে প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিপর্যস্ত। কিন্তু একটি সুযোগসন্ধানী বিশেষ গোষ্ঠী রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিলেক্টিভ প্রতিবাদ করে বিএনপি এবং তার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড এবং তীব্র কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য বিবৃতি দেওয়া শুরু করেছে। বিএনপি ইতোমধ্যে দুষ্কৃতিকারীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে সরকার ও প্রশাসনকে অসংখ্যবার অনুরোধ করেছে। কিন্তু সরকার ও প্রশাসন এক্ষেত্রে মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। আমরা মনে করি, সরকার পরিকল্পনামাফিক প্রশাসনকে নিষ্ক্রিয় করে রেখেছে যাতে দেশে অরাজক পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকে এবং এই অজুহাতে জাতির দীর্ঘ প্রত্যাশিত জাতীয় নির্বাচন বিলম্বিত করা যায়। একটি বিশেষ গোষ্ঠী যারা নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে উত্তরণ চায় না তারা এই সুযোগটি গ্রহণ করে বিএনপি এবং বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে সহিংসতার উসকানি দিচ্ছে। তারা চায় দেশে আরও অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হোক। সরকারের একটি অংশ তাদের এই দুরভিসন্ধিমূলক পরিকল্পনার অংশ হয়ে অপরাধ দমনে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য কোন দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। আমরা বারবার অনুরোধ করার পরেও দুষ্কৃতিকারীদের গ্রেফতার করা হয়নি।
যুবদল সভাপতি বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনের সমর্থনসহ নানা বিষয়ে তরুণদের মাঝে পরিচালিত এক জরিপের ফলাফল গত সপ্তাহে প্রকাশিত হয়েছে। এখানে দেখা গেছে, যারা নিজেদেরকে তারুণ্যের একমাত্র স্টেকহোল্ডার হিসেবে দাবি করেন, জরিপে তাদের সেই দাবি বুমেরাং হয়েছে। বরং এদেশের তরুণেরা বহু লড়াই ও সংগ্রামের পরীক্ষিত বাংলাদেশপন্থী শক্তি বিএনপিতেই তাদের আস্থা ও বিশ্বাস রাখে বলে প্রতিভাত হয়েছে। আগামীতে বিএনপিকেই এদেশের অধিকাংশ তরুণেরা ক্ষমতায় দেখতে চায় বলে জরিপের ফলাফলে উঠে এসেছে। আমরা মনে করি, এরপরই একটি গুপ্ত সংগঠন ও তাদের দিকনির্দেশনায় পরিচালিত একটি আনাড়ি দলের নেতাকর্মীরা উদ্ভ্রান্ত হয়ে পড়েছে এবং নতুন করে নানা ষড়যন্ত্র ও ফন্দিফিকিরে লিপ্ত হয়েছে।
মোনায়েম মুন্না বলেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আমরা মনে করছি, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। আপনারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিকল্পে কার্যকর পদক্ষেপ নিন৷ এখানে আমাদের যদি কোনো ধরনের সহযোগিতার প্রয়োজন হয়, আমরা তা করতে সর্বদা প্রস্তুত আছি। একইসাথে দেশের জনগণকে অনুরোধ করছি, আপনারা সতর্ক থাকুন। আইনশৃঙ্খলার নাজুক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কোন সুযোগসন্ধানী রাজনৈতিক দল বা অগণতান্ত্রিক শক্তি যাতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সেই বিষয়ে অনুগ্রহপূর্বক সতর্ক থাকুন। একসময় আরব বসন্ত শুরু হয়েছিল তিনিসিয়ায়। কিন্তু বেন আলীর পতন হলেও সেখানে ১৫ বছরেও প্রত্যাশিত শান্তি ও স্থিতিশীলতা আসেনি। আমাদের এখানেও যারা ধারাবাহিকভাবে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা জারি রেখে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়, তাদের অসৎ উদ্দেশ্যের বিষয়ে সতর্ক থাকুন।
এক প্রশ্নের জবাবে যুবদলের সভাপতি বলেন, গতকাল খুলনায় যুবদল নেতাকে গুলি ও রগ কেটে হত্যা ও চাঁদপুরে মসজিদে ইমামকে কুপিয়ে হত্যাচেষ্টা করা হয়েছে। এই ঘটনা আড়াল করতেই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গত ২ দিন সোহাগ হত্যার এই ভিডিও কোথাও ছিল? কাদের নিয়ন্ত্রণ ছিল? পাথর মেরে এই হত্যার ঘটনায় আমরা তীব্র নিন্দা জানাই৷ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কি কি অপরাধ হয় তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানার কথা। তার কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
আরেক প্রশ্নের উত্তরে মুন্না বলেন, আমরা তো অন্যদের মতো মব তৈরি করতে পারি না। মামলার আসামি থেকে নিরাপদ তিন জনকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে পরিবার জানিয়েছে। আমাদের দল করে এমন কাউকে সরাসরি ভিডিও তে দেখা যায়নি। ভিডিওতে যাদের দেখা গেছে তাদের পরিচয় এখনো আমরা নিশ্চিত হতে পারেনি। মামলার আসামি হিসেবে তাদেরকে আমরা বহিষ্কার করেছি।
তিনি আরও বলেন, রগ কাটার প্র্যাকটিস কাদের আছে এটা দেশবাসী জানে। ফেসবুকে ইশরাক হোসেনকে মেরে কুকুর দিয়ে খাওয়া খাবে বলে স্ট্যাটাস দিয়েছে এনসিপির নেতা আহনাফ জামান। এটা কি রাজনৈতিক কালচার হতে পারে! আওয়ামী লীগ অতীতে কোন ঘটনা স্বীকার করতো না। আমরা তো স্বীকার করে দায়িত্বও নিচ্ছি। অন্যায়কারী বিরুদ্ধে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের জিরো টলারেন্স নীতি।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন, সেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এসএম জিলানী, সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান, যুবদলেরসিনিয়র সভাপতি রেজাউল করিম পল, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বিল্লাল হোসেন তারেক, সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান জুয়েল, ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব, সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির, যুবদলের সাবেক যোগাযোগ সম্পাদক নেতা গিয়াসউদ্দিন মামুন প্রমুখ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

