জেডিপির চোখে ৬ মাসে বিএনপি সরকারের ৬ ব্যর্থতা

জেডিপির চোখে ৬ মাসে বিএনপি সরকারের ৬ ব্যর্থতা

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ছয় মাসকে ‘মূল্যায়নের সময়’ হিসেবে উল্লেখ করে সরকারের ছয়টি প্রধান ব্যর্থতা তুলে ধরেছে জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টি (জেডিপি)। দলটির অভিযোগ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন, ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসের রাজনীতি বন্ধ, অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বেকারত্ব দূরীকরণে সরকার প্রত্যাশিত অগ্রগতি করতে পারেনি।

বুধবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে ‘জেডিপির চোখে ৬ মাসে বিএনপি সরকারের শীর্ষ ৬ ব্যর্থতা ও আমাদের প্রস্তাবনা’ শীর্ষক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন জেডিপির আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ। এ সময় সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ডের রাজনৈতিক ও জনস্বার্থভিত্তিক মূল্যায়ন তুলে ধরে দলটি।

বিজ্ঞাপন

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে সরকারের কয়েকটি ইতিবাচক তৎপরতা তুলে ধরে জেডিপি। দলটির মতে, নিষিদ্ধ নয়—এমন রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিদের মতপ্রকাশের সুযোগ অব্যাহত রাখা, আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসনের পথ প্রশস্ত না করা, শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে ভারত সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া, সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লটের সুবিধা বাতিলের উদ্যোগ এবং সরকারি কর্মচারীদের সকাল নয়টার মধ্যে কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করার উদ্যোগ ইতিবাচক।

ছয় ব্যর্থতা

তবে এসব ইতিবাচক উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারের ছয়টি বড় ব্যর্থতার কথাও তুলে ধরে জেডিপি।

জেডিপির প্রথম অভিযোগ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অনেক আকাঙ্ক্ষা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। বিশেষ করে সংসদ অধিবেশন বসার ১৮০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না হওয়া এবং উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট না হওয়ায় প্রশ্ন তুলেছে দলটি।

জেডিপির প্রস্তাব, অবশিষ্ট সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে এবং উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

দ্বিতীয় অভিযোগে জেডিপি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবারও সন্ত্রাস ও সংঘাতের রাজনীতি ফিরে আসার কথা বলেছে।

দলটির ভাষ্য, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ১৭ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রলীগ বিতাড়িত হওয়ার পর শিক্ষাঙ্গনে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে কুয়েটে ছাত্রদলের হামলার মধ্য দিয়ে ক্যাম্পাসে সংঘাতের রাজনীতি ফিরে আসে। সম্প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘাতের মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসের রাজনীতি পুরোপুরি ফিরে আসছে মনে করে জেডিপি।

এ ক্ষেত্রে সংঘাতে জড়িত ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে দলটি। একই সঙ্গে ছাত্ররাজনীতিকে ছাত্র সংসদকেন্দ্রিক করা এবং উপাচার্য নিয়োগে গণতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণের প্রস্তাব দিয়েছে।

তৃতীয় অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সংসদে যথাযথ আলোচনা না হওয়ার অভিযোগ করেছে জেডিপি।

দলটির বক্তব্য, অতীতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে সরকারের বিরুদ্ধে গোপনীয়তার অভিযোগ উঠেছে। নতুন সরকার যেন সেই একই ধারায় না হাঁটে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

জেডিপি সংবিধানের ১৪৫ক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সব আন্তর্জাতিক চুক্তি সংসদে উপস্থাপন ও আলোচনা করার দাবি জানিয়েছে।

চতুর্থ অভিযোগে জেডিপি বলেছে, অর্থনীতির সংকট কাটাতে সরকার এখনো যথেষ্ট কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। দলটির অভিযোগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে দক্ষ ও পেশাদারদের মাধ্যমে পরিচালনার পরিবর্তে রাজনৈতিক বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসাবে একজন কেন্দ্রীয় নেতাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, যার ব্যাংকিং সেক্টরে অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং তিনি মূলত একজন ব্যবসায়ী।

ব্যাংক খাতের সংকট, খেলাপি ঋণ এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগের অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে দলটি।

জেডিপির প্রস্তাব, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে পেশাদারদের মাধ্যমে পরিচালনা করতে হবে। ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা বন্ধের পাশাপাশি বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত এনে সহজ শর্তে দরিদ্র ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করার কথাও বলেছে দলটি। প্রয়োজনে এ জন্য পৃথক আইন করার প্রস্তাব দিয়েছে তারা।

পঞ্চম অভিযোগে দেশের গ্যাস, তেল ও বিদ্যুতের সংকটের কথা তুলে ধরে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে দাবি করেছে জেডিপি।

দলটির প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে সরকারি প্রণোদনা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী অন্তত ৯০ দিনের তেল মজুতের সক্ষমতা তৈরি, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বিনিয়োগ এবং কয়লা উত্তোলনে কার্যকর উদ্যোগ।

একই সঙ্গে জ্বালানি খাতকে কোনো সিন্ডিকেট বা করপোরেট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে দলটি।

ষষ্ঠ অভিযোগে জেডিপি বলেছে, নির্বাচনী ইশতেহারে বেকার ভাতার প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। একই সঙ্গে এক বছরের মধ্যে দেড় কোটি বেকার তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতিও পূরণ হয়নি বলে দাবি করেছে দলটি।

শিক্ষাব্যবস্থাকে কর্মসংস্থানমুখী করার ক্ষেত্রেও সরকারের কার্যকর উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ জেডিপির। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম আধুনিকায়ন এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির বিষয়ে বাজেটে সুস্পষ্ট রূপরেখা না থাকার কথাও উল্লেখ করেছে দলটি।

এ ক্ষেত্রে জেডিপি উন্নত দেশগুলোর আদলে ‘কো-অপারেটিভ এডুকেশন’ চালুর প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি বিদেশে দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে বিদেশি দূতাবাসগুলোর তত্ত্বাবধানে কারিগরি প্রশিক্ষণ ও ভাষাশিক্ষার ব্যবস্থা, নতুন শিল্প স্থাপন এবং শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।

শিক্ষিত বেকারদের কৃষিকাজে যুক্ত করা এবং কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোরও প্রস্তাব দিয়েছে দলটি।

ছয়টি প্রধান ব্যর্থতার পাশাপাশি জুলাই গণহত্যার বিচার ত্বরান্বিত না করা, বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে সংঘাত ও হতাহতের ঘটনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি না হওয়া, মাজারে হামলা, নারী ও শিশুদের ওপর নিপীড়ন বন্ধে ব্যর্থতা এবং অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়ন নিয়ে সরকারের অবস্থানেরও সমালোচনা করেছে জেডিপি।

সংবাদ সম্মেলনে জেডিপির আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধিতা মানে সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপের বিরোধিতা করা নয়। জনগণের স্বার্থে সরকার ভালো কিছু করলে তার প্রশংসা করা এবং ভুল হলে সমালোচনা করা দায়িত্বশীল রাজনীতির অংশ।

তিনি বলেন, জেডিপি সরকারের কাছে প্রত্যাশা করে, তাদের সমালোচনাগুলোকে রাজনৈতিক বিরোধিতা হিসেবে না দেখে জনস্বার্থের প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ দ্রুত নেওয়া হবে।

বাংলাদেশকে সুখী, সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রে পরিণত করতে সরকার দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে—এমন প্রত্যাশা জানিয়ে সংবাদ ব্রিফিং শেষ করে জেডিপি।

সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন জেডিপির প্রধান সংগঠক মোঃ আহছান উল্লাহ, যুগ্ম সদস্যসচিব আবদুল হামিদ, নাঈম আল ইসলাম, ফাইজুল্লাহ নোমান, ইয়াসিন আরাফাত রাজ, মো. মুহিব্বুল্লাহ, জাতীয় ছাত্রমঞ্চের প্রধান সংগঠক সালমান শরীফ প্রমুখ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন