সার সংকট নিরসন এবং ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০২৫ (সংশোধিত)’ বাস্তবায়নে কৃষকের স্বার্থ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে জাতীয় কৃষক শক্তি।
বুধবার এক সংগঠনটির আহ্বায়ক সাঈদ উজ্জ্বল ও সদস্য সচিব কৃষিবিদ গোলাম মর্তুজা সেলিস এক যৌথ বিবৃতিতে সার সংকট নিরসনে ৮ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন।
কৃষক শক্তির প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে—অভিযোগ কেন্দ্র: কৃষকের অভিযোগ জানানোর জন্য সহজ ও কার্যকর ব্যবস্থা চালু করতে হবে; কঠোর তদারকি ও শাস্তি: নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি, মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি কিংবা কৃষকের প্রতি যেকোনো হয়রানির বিরুদ্ধে নীতিমালায় কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান অন্তর্ভুক্ত করতে হবে; ডিলারশিপ বাতিল: ডিলার কর্তৃক সংঘটিত অনিয়ম প্রমাণিত হলে অবিলম্বে ডিলারশিপ বাতিলের বিধান নিশ্চিত করতে হবে; সাব-ডিলার নিয়োগে কৃষকদের অগ্রাধিকার: সাব-ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে আগ্রহী কৃষকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
সংগঠনটি আরও প্রস্তাব দিয়েছে— অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি বন্ধ: ডিএপি সারের সরকারি মূল্য ১০৫০ টাকা হলেও বিভিন্ন এলাকায় ১৭০০ টাকা থেকে ২,২০০ টাকায় বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়টি তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। আমন মৌসুমে সারের কৃত্রিম সংকটের শঙ্কা: ডিলারশিপ পুনর্বণ্টনকে কেন্দ্র সারের বাজারে অরাজকতার আশঙ্কা করছে জাতীয় কৃষক শক্তি। যা আমন মৌসুম মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। ডিলারশিপ পুনর্বণ্টন যেন আসন্ন আমন মৌসুমে সারের সরবরাহ যেন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় সে লক্ষ্যে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা জনগণের সামনে তুলে ধরার জন্য সরকারকে আহ্বান করছি।
কৃষক শক্তির প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে— জৈব সারে প্রণোদনা: রাসায়নিক সারের বেশিরভাগ আমদানি করতে হয়। ফলে উৎপাদন খরচ অনেকাংশে বেড়ে যায়। সেইসাথে বৈদেশিক মুদ্রাও ব্যয় করতে হয় এর পিছনে। আমরা যদি রাসায়নিক সারের উপর নির্ভরতা কমাতে পারি জৈব সার ব্যবহার বৃদ্ধি করার মাধ্যমে তাহলে কৃষি উৎপাদন খরচ কমবে। সেইসাথে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়ও কমবে। তাই জৈবসার ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ খাতে কৃষককে প্রণোদনা প্রদানের আহ্বান করছি। কৃষক ভর্তুকি বহাল: দেশি ও আন্তর্জাতিক নানা মহল কৃষি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ভর্তুকি হ্রাস করার জন্য সরকারকে চাপ প্রয়োগ করছে বলে জানা যাচ্ছে। সরকারের প্রতি আমাদের আহ্বান, কৃষকের উৎপাদন খরচ ও খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো মহলের চাপের কাছে নতিস্বীকার না করে কৃষি সংশ্লিষ্ট সকল প্রকার ভর্তুকি যেন বহাল রাখা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, কৃষকের কাছে সঠিক সময়ে, নির্ধারিত মূল্যে ও সহজলভ্যভাবে সার পৌঁছে দেওয়া কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম পূর্বশর্ত। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক প্রণীত ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০২৫’ সংশোধন করেছে বর্তমান সরকার।
নতুন ব্যবস্থায় একই পরিবারের একাধিক ডিলারশিপের সুযোগ রহিত করা হয়েছে এবং ইউনিয়ন ও পৌরসভায় ডিলার ইউনিট পুনর্বিন্যাস করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ দুটি সিদ্ধান্তকে জাতীয় কৃষক শক্তি সাধুবাদ জানাচ্ছে। তবে সাব-ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা ব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্তকে আমরা প্রত্যাখ্যান করছি।
সাব-ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা ব্যবস্থা বাতিল করা হলে ডিলারকেন্দ্রিক সিন্ডিকেট গড়ে উঠবে এবং কৃষকরা তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়বেন। এই সিন্ডিকেট সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত দামে সার কিনতে কৃষককে বাধ্য করার সুযোগ পাবে, যার ফলে সারের বাজারের সুস্থ প্রতিযোগিতা হারিয়ে যাবে।
জাতীয় কৃষক শক্তি মনে করে, যথাযথ স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে পুরনো মধ্যস্বত্বভোগী কাঠামোর পরিবর্তে নতুন ডিলার সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার আশঙ্কা থেকে যায়।
রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি, অর্থনৈতিক ক্ষমতা বা পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে একই গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ডিলারশিপ কেন্দ্রীভূত হলে একটি ইউনিয়ন/পৌরসভার তিনজন ডিলার মিলে একটি স্থানীয় সিন্ডিকেটে পরিণত হতে পারেন। তাই ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় সুপারিশ নয়; যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতাকেই একমাত্র ভিত্তি করতে হবে।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন এলাকায় সারের সংকট ও সরবরাহে ঘাটতির যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা নিয়েও জাতীয় কৃষক শক্তি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। সারের সংকট কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সার দ্রুত সরবরাহ, মজুত ও বিতরণ ব্যবস্থার তদারকি এবং কৃত্রিম সংকট ও কালোবাজারি বন্ধে সরকারকে অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। সারের বরাদ্দ হতে হবে একটি ওয়ার্ডের চলমান ফসলের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে। নির্দিষ্ট ওয়ার্ডের কৃষক সেই ওয়ার্ডের ডিলার পয়েন্ট থেকেই সার গ্রহণ করবেন।
যেহেতু স্মার্ট কৃষি কার্ডে কৃষকের জমির পরিমাণ ও সারের চাহিদা ইনপুট দেওয়া হচ্ছে, সেহেতু সার সরবরাহ, মজুত ও বিতরণ ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ করার লক্ষ্যে একে পুরোপুরি ডিজিটালাইজড করতে হবে। নির্দিষ্ট সফটওয়্যারের মাধ্যমে দেশের যেকোনো ডিলারের কাছে কী পরিমাণ সার সরবরাহ করা হয়েছে, কতটুকু মজুত আছে এবং সেখান থেকে কোন কৃষক কী পরিমাণ সার কিনছেন—তা যেন সবার কাছে দৃশ্যমান হয়। এটি নিশ্চিত করা গেলে কোনো ডিলার সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করতে পারবেন না।
একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বৈধভাবে সার বিক্রি করে আসা বিপুলসংখ্যক খুচরা বিক্রেতার জীবিকার বিষয়টিও সরকারকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিতে হবে। যোগ্য পুরনো খুচরা বিক্রেতাদের নতুন ব্যবস্থায় অনুমোদিত বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং যারা এ ব্যবস্থায় থাকতে পারবেন না, তাদের বিকল্প জীবিকার জন্য স্বল্পসুদে ঋণ, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের বিদ্যমান দোকান ও অবকাঠামোকে ‘কৃষক সেবাকেন্দ্র’ হিসেবে ব্যবহারের সুযোগও সৃষ্টি করা যেতে পারে।
জাতীয় কৃষক শক্তি মনে করে, সার কোনো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বা ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের সম্পদ নয়; এটি কৃষকের উৎপাদনের অপরিহার্য উপকরণ। তাই নতুন নীতিমালার বাস্তবায়ন হতে হবে কৃষককেন্দ্রিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক।
ডিলার সিন্ডিকেট নয়, কৃষকের সরাসরি সারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নীতিমালার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত খুচরা বিক্রেতাদের পুনর্বাসন করতে হবে এবং চলমান সার সংকট দ্রুত দূর করতে হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


