প্রকৃতি দিচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব, অথচ সেই প্রকৃতি রক্ষায়ই নেই পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও জনবল। পাহাড়, বন, ঝরনা ও জীববৈচিত্র্যের অপূর্ব সমাহার সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক ও বোটানিক্যাল গার্ডেনের প্রায় দুই হাজার একর পাহাড়ি বনভূমি এখন সংরক্ষণ সংকটে। বড় অংশ খোলা থাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি যেমন রয়েছে, তেমনি পর্যটকের বাড়তি চাপ, যানবাহনের আনাগোনা, প্লাস্টিক বর্জ্য, খাবারের দোকান ও শব্দদূষণেও চাপ বাড়ছে প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর। সংশ্লিষ্টদের মতে, যথাযথ সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় অর্থ ও জনবল নিশ্চিত করা গেলে আগামী এক দশকের মধ্যে এ বিশাল বনভূমিকে জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ অভয়ারণ্যে পরিণত করা সম্ভব।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইজারার মাধ্যমে সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক থেকে এক কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আয় হয়েছে। ২০২৫ সালে আয় হয়েছে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা। এসব অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হলেও ইকোপার্কের সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নকাজে পর্যাপ্ত বরাদ্দ মিলছে না বলে জানিয়েছেন বন বিভাগের কর্মকর্তারা। ফলে যে বনভূমি থেকে সরকারের রাজস্ব আসছে, সেই বনভূমির নিরাপত্তা ও সংরক্ষণেই থেকে যাচ্ছে সীমাবদ্ধতা।
সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক ও বোটানিক্যাল গার্ডেনের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন আমার দেশকে বলেন, প্রায় দুই হাজার একর বনভূমি নিয়ে ইকোপার্ক ও বোটানিক্যাল গার্ডেন অবস্থিত। এর বেশিরভাগ পাহাড়ি বনভূমি খোলা রয়েছে। যদি কোনো ধরনের অগ্নিকাণ্ড না ঘটে, তাহলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে ইকোপার্ক ও বোটানিক্যাল গার্ডেনকে জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্যে পরিণত করা সম্ভব।
তিনি বলেন, ইকোপার্ক ও বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করলেও ইকোপার্ক সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নেই। এ কারণে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছি না। তাছাড়া লোকবল সংকট রয়েছে। পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় পরিকল্পনামাফিক সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করাও সম্ভব হচ্ছে না।
রেঞ্জ কর্মকর্তা আরও বলেন, সরকার আন্তরিক হলে এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ বরাদ্দ দিলে ইকোপার্ক ও বোটানিক্যাল গার্ডেন যে উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল, সেই উদ্দেশ্য সফল হবে। পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলে এটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদে পরিণত হতে পারে।
বন বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, ইকোপার্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ পরিকল্পনার ওপর। প্রাকৃতিকভাবে বনভূমি পুনরুদ্ধার, বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল তৈরি এবং জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে এখানে। তবে সেই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে সামান্য অসতর্কতা থেকেই আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। পাহাড়ি এলাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে নিয়মিত পাহারা, পর্যাপ্ত জনবল, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
শুধু অগ্নিঝুঁকি নয়, পর্যটকের বাড়তি চাপও ইকোপার্কের পরিবেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে অবস্থানের কারণে সারা বছরই এখানে পর্যটকের আনাগোনা থাকে। ছুটির দিন ও পর্যটন মৌসুমে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। চন্দ্রনাথ পাহাড়, সহস্রধারা ও সুপ্তধারা ঝরনার আকর্ষণে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পর্যটকরা আসেন। পর্যটনকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের কর্মসংস্থানও হয়েছে। খাবারের দোকান, পরিবহন ও ছোট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন অনেকে।
তবে পর্যটকের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেটসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য। বাড়ছে যানবাহনের আনাগোনা। কোথাও কোথাও উচ্চ শব্দে গান-বাজনা ও মাইক ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, পর্যটন বন্ধ করার প্রয়োজন নেই, বরং পরিবেশের ধারণক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। পর্যাপ্ত ডাস্টবিন, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং শব্দদূষণ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ও সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক ও বোটানিক্যাল গার্ডেনের পরিচালক মোহাম্মদ সোহেল রানা আমার দেশকে বলেন, ইকোপার্ক ও বোটানিক্যাল গার্ডেনে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও বন্যপ্রাণিদের অভয়ারণ্যে পরিণত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। তিনি বলেন, কোনো ধরনের বিঘ্ন না ঘটলে প্রাকৃতিকভাবেই এখানকার জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ হবে এবং একসময় এ এলাকা বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্যে পরিণত হতে পারে।
ইকোপার্ক ও বোটানিক্যাল গার্ডেন এলাকা চারপাশে ঘেরা দিয়ে সংরক্ষিত রাখা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পর্যটকদের সভা-সমাবেশ ও বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের অনুমতি দেওয়া হয়। তবে রাতে কেউ এলাকায় অবস্থান করেন না। লোকবল সংকট রয়েছে স্বীকার করে তিনি বলেন, ইকোপার্ক ও বোটানিক্যাল গার্ডেনকে জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্যে পরিণত করতে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও জনবল বাড়ানো হবে।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, ইকোপার্ক ও বোটানিক্যাল গার্ডেনকে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ এলাকাকে প্রাকৃতিক অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তোলা গেলে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল তৈরির পাশাপাশি প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, ইকোপার্কের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পর্যটন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য রেখেই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ইকোপার্কের গুরুত্ব শুধু পর্যটনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিবছর এখানে গবেষণার জন্য আসেন। বন, উদ্ভিদ, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ নিয়ে গবেষণার জন্য এ ধরনের প্রাকৃতিক এলাকা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে পরিবেশগত ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে পর্যটনের পাশাপাশি শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সচেতন মহলের মতে, ইকোপার্ক থেকে আদায় করা রাজস্বের একটি নির্দিষ্ট অংশ সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে পুনর্বিনিয়োগের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। বন পুনরুদ্ধার, অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পর্যটক নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধিতে এ অর্থ ব্যয় করা যেতে পারে। একই সঙ্গে সংরক্ষিত এলাকার জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা, পর্যটকের ধারণক্ষমতা নির্ধারণ এবং পরিবেশের ক্ষতি করে এমন কর্মকাণ্ডে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ইকোপার্ককে ঘিরে পর্যটন বাড়ায় তাদের আয়-রোজগারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাই পর্যটন বন্ধ নয়, বরং পরিবেশবান্ধব ও নিয়ন্ত্রিত পর্যটনব্যবস্থা চান তারা। তাদের মতে, প্রকৃতি রক্ষা করা গেলে পর্যটন টেকসই হবে, স্থানীয় কর্মসংস্থান থাকবে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও অব্যাহত থাকবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক ও বোটানিক্যাল গার্ডেনের সামনে এখন দুটি লক্ষ্য, রাজস্ব আয় এবং প্রকৃতি সংরক্ষণ। একটি বাদ দিয়ে অন্যটি দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। পর্যাপ্ত বরাদ্দ, জনবল, অগ্নিনিরাপত্তা ও পরিকল্পিত সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে আগামী ১০ বছরে প্রায় দুই হাজার একর পাহাড়ি বনভূমিকে সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থলে পরিণত করা সম্ভব। আর এ উদ্যোগ সফল হলে সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ ও গবেষণাক্ষেত্র হিসেবেও নতুন পরিচয় পেতে পারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

