বিরোধীদলীয় নেতা

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে যা বললেন বিরোধীদলীয় নেতা

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে যা বললেন বিরোধীদলীয় নেতা

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দীনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দেরিতে হলেও জাতির ওপর থেকে স্বৈরাচারের কালো ছায়া সরে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তবে তার গ্রেপ্তার বা বিচার দাবি বিষয়ে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে জানানো হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিজ্ঞাপন

শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে আয়োজিত জরুরি প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

এ সময় ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করায় জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদকে অভিনন্দন জানান বিরোধীদলীয় নেতা। একই সঙ্গে তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্মোহ ও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবেন-এমন প্রত্যাশা করে জানান, যতদিন তিনি এভাবে দায়িত্ব পালন করবেন আমরা তাকে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করবো।

সাহাবুদ্দীনের পদত্যাগ প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, ২০২৩ সালের এপ্রিলে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার তাকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দিয়েছিলেন। চব্বিশের ৩৬ জুলাই বাংলাদেশে যে পরিবর্তন হয়েছিল, তার দাবি ছিল-এই প্রেসিডেন্ট থাকবেন না। কারণ তিনি প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় অনেকগুলো অগঠন ঘটেছে। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে এতগুলা মানুষের জীবন গিয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অভিভাবক হিসেবে তিনি কোন দায়িত্ব পালন করেন নাই। শুধু নীরবতা না, জনগণ মনে করে যে তিনি এই অপকর্মের মদদদাতাও ছিলেন। এজন্য তখনই একটা দাবি উঠেছিল যে, তাকে দায়িত্ব থেকে সরে যেতে হবে। এমনকি যুবকদের একটা অংশ তখন বঙ্গভবনের সামনে গিয়ে এই দাবি উত্থাপন করেছিল, যদিও ওই অংশের এই পদক্ষেপের সঙ্গে আমরা সরাসরি ছিলাম না।

তিনি বলেন, ৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি ভবনে অনুষ্ঠিত মিটিংয়ে আলাপ-আলোচনার পরামর্শের আলোকেই মধ্যরাতে তিনি জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছিলেন । সেই ভাষণে তিনি স্পষ্টতই বলেছিলেন, শেখ হাসিনা তার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং তিনি তা গ্রহণ ও মঞ্জুর করেছেন । কিন্তু পরবর্তী বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের প্রথম ভাগে একটি জাতীয় দৈনিকের সাক্ষাৎকারে তিনি পুরো বিষয়টাকে অস্বীকার করে সম্পূর্ণ উল্টো ন্যারেটিভ নিয়ে আসলেন । তিনি বললেন যে, তিনি কোনো পদত্যাগপত্র দেখেনই নাই, যার অর্থ হলো তিনি ১২ কোটি মানুষের সামনে মিথ্যাচার করেছেন, অথবা সাক্ষাৎকারে মিথ্যা বলেছেন । সম্পূর্ণ পরস্পর বিরোধী দুইটা জিনিস সঠিক হতে পারে না এবং এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট তার শপথ ভঙ্গ করেছেন ।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মর্যাদার পদে থেকে তিনি এমন মিথ্যাচার করতে পারেন না, তাই আমি বলেছিলাম যে তিনি এই পদে থাকার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন এবং তার জন্য নিজ থেকে সরে যাওয়া উত্তম হবে । তিনি যাননি। বর্তমান সরকারও তাকে সরায়নি বরং স্বৈরাচারের এই দোসরকে রেখে দিয়ে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ শোনানোর কসরত করা হয়েছে । আমরা বিরোধী দল হিসেবে এর প্রতিবাদ করেছিলাম, কারণ যিনি স্বৈরাচারের দোসর এবং গণহত্যার সহযোগী ছিলেন, তাকে দিয়ে সংসদে ভাষণ দেওয়া উচিত নয় । আমরা সংসদ থেকে ওয়াক-আউট করে বের হয়ে আসলাম এবং অবাক করার বিষয় হলো ২৯৮ জন সদস্যের মধ্যে পাঁচজনও প্রেসিডেন্টকে তার বক্তব্যের জন্য ধন্যবাদ জানাননি। সরকারি দল সন্তুষ্ট ছিল যে, হাসিনার নিয়োগ দেওয়া প্রেসিডেন্টের মুখ দিয়ে তাকে ফ্যাসিস্ট বলাতে পেরেছে, কিন্তু জনগণ তা পছন্দ করেনি । অবশেষে আজকে (শুক্রবার) তিনি পদত্যাগ করলেন । ইতোমধ্যেই জাতীয় সংসদের দুটি সেশন শেষ হয়েছে এবং আগামী ২০ সেপ্টেম্বর তৃতীয় অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে । দেরিতে হলেও জাতির ঘাড় থেকে স্বৈরাচারের একটা কালো ছায়া সরে গেল, এজন্য আমরা আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করি ।

জামায়াত আমির বলেন, তিনি কি কারণে পদত্যাগ করেছেন এই বিষয়ে আমাদের কোন আগ্রহ নাই। কারণ আমরা আগে থেকেই বিবেচনায় নিয়েছি যে, তিনি প্রেসিডেন্ট পদে থাকার আর যোগ্য নন। তিনি তার যোগ্যতা হারিয়েছেন। অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বর্তমান স্পিকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। আমরা তাকে অভিনন্দন জানাই। এবং আমরা তাকে আশ্বস্ত করছি- তিনি যতদিন দায়িত্ব পালন করবেন আশা করব যে তিনি ন্যায়নিষ্ঠভাবে দায়িত্ব পালন করবেন। নির্মোহভাবে দায়িত্ব পালন করবেন। কারো প্রতি তিনি কোন ধরনের কোন পক্ষপাতিত্ব করবেন না।

তিনি নিরপেক্ষভাবে রাষ্ট্রপতির মর্যাদা রক্ষা করে একদিনের জন্যও যদি তিনি দায়িত্ব পালন করেন বা যতদিন তিনি দায়িত্ব পালন করবেন, তিনি এইভাবেই দায়িত্ব পালন করবেন বলে আমরা আশা করি। যদি এইভাবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন তাহলে আমরা তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করব। আমরা অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির সুস্বাস্থ্য কামনা করি। সংবিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের ভিতরে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে হবে। যেহেতু এর ভিতরেই সংসদ অধিবেশন হওয়ার কথা রয়েছে,তাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই সেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার হিসেবে যারা শপথ নিয়েছেন, তারা একইসঙ্গে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবেও শপথ নিয়ে ফেলেছেন, ফলে কোনো সাংবিধানিক সংকট তৈরি হওয়ার কথা নয়।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমির বলেন, আমরা চাই কোনো সংকট তৈরি না হোক, তবে জনগণের মৌলিক প্রত্যাশা হলো একটি পরিবর্তনের বাংলাদেশ। সাবেক রাষ্ট্রপতির ক্ষেত্রে যদি কোনো বিশ্বাসযোগ্য আলামত পাওয়া যায়, তবে কোনো ব্যক্তিই আইনের ঊর্ধ্বে নন এবং আমরা তা চিন্তাভাবনা করেই আমাদের পদক্ষেপ ঠিক করব।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়; প্রস্তাবক ও সমর্থক থাকবে এবং একাধিক প্রার্থী হলে সংসদে ভোটাভুটির মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন। আমরা প্রেসিডেন্টকে তার নিজ মর্যাদায় দেখতে চাই, কোনো তোষামোদকারী হিসেবে নয়। আমরা এমন রিফর্ম বা সংস্কারের কথা বলছি, যেখানে অফিসের একজন পিয়ন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত সবাই মর্যাদার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন এবং কারো ডিক্টেশনে নয় বরং রাষ্ট্রের নীতি মেনে চলবেন।

জামায়াত আমির বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতির অসুস্থতার বিষয়ে আমাদের অভিমত হলো—সব ট্রিটমেন্ট দেশেই সম্ভব; প্রয়োজনে বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ আনা যেতে পারে। তিনি একজন অভিভাবক হিসেবে ব্যর্থ হয়েছেন, কারণ এই গণহত্যার বিরুদ্ধে তিনি একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি, বরং নীরব থেকে একে সমর্থন দিয়েছেন। আমরা চাই রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা যেন দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর আস্থা রেখে দেশেই চিকিৎসা নেন, যাতে ব্যবস্থার উন্নতি হয়। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পরবর্তীতে আরো বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া জানানো হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন