গুম সংক্রান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ বিলুপ্ত করে বিএনপি সরকারের করা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার খসড়া আইনের ১৪ ধারা সংশোধনসহ ৪ দফা দাবি উত্থাপন করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
দলটি বলেছে, গুমবিরোধী আইন অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকেই নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করতে বলতে পারে না। স্বাধীন তদন্ত-ব্যবস্থা ছাড়া এই খসড়া আইন দায়মুক্তির অবসান ঘটাবে না; বরং তা টিকিয়ে রাখবে। বৃহস্পতিবার এনসিপির দপ্তর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা দিনা স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ দাবি জানানো হয়।
এনসিপির অন্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—গুমের প্রতিটি অভিযোগ পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং খসড়া আইনে তালিকাভুক্ত অন্য সব বাহিনীর চেইন অব কমান্ডের বাইরে থাকা একটি স্বাধীন সংস্থাকে দিয়ে তদন্ত করা; আগের অধ্যাদেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রশিক্ষিত তদন্ত ইউনিটকে এই দায়িত্ব দেওয়ার অধ্যাদেশে থাকা (বিলুপ্ত) ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা; অথবা সরকার এমন আরেকটি সত্যিকার স্বাধীন তদন্ত সংস্থা গঠন করতে পারে, যার পুলিশ, সামরিক, গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থার বিরুদ্ধে তদন্ত করার প্রয়োজনীয় আইনি ক্ষমতা ও সক্ষমতা থাকা।
গুম সংক্রান্ত অধ্যাদেশটি গত এপ্রিলে বিলুপ্ত করায় নতুন করে সংঘটিত গুমের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বর্তমানে কোনো আইনি সংজ্ঞা নেই উল্লেখ করে এনসিপি বলেছে, অতএব আইন হওয়া জরুরি। তবে অধিকতর ভালো আইন করার প্রতিশ্রুতি দিলেও বর্তমান সরকার মূলত একটি দুর্বল আইনই করেছে। নতুন খসড়া আইনটি গুরুতরভাবে ত্রুটিপূর্ণ: এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তের দায়িত্বও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেই দেওয়া হয়েছে।
দলটি বলেছে, খসড়া আইনের ১৪ ধারা অনুযায়ী, কেউ গুমের অভিযোগ করতে চাইলে তাকে থানায় যেতে হবে। এরপর সেই অভিযোগ তদন্ত করবে পুলিশ। অথচ খসড়া আইনটি নিজেই বলছে, পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, র্যাব, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, আনসার এবং সরকারের গোয়েন্দা ও তদন্ত সংস্থার সদস্যরা গুমে জড়িত হতে পারে। অর্থাৎ, যাদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠতে পারে, তদন্তের নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতেই থাকছে।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার খসড়া আইনে থাকা ব্যবস্থা তিনটি প্রধান কারণে কার্যকর হবে না বলে মনে করে এনসিপি।
সেগুলো হলো— প্রথম কারণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে পারে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ সেই বাহিনীই তদন্ত করলে স্পষ্ট স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়। পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে পুলিশ নিজের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই তদন্ত করবে। সংজ্ঞাগতভাবেই এটি স্বাধীন তদন্ত নয়। অন্য কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও তদন্তটি বৃহত্তর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ভেতরেই থেকে যাবে। এ ধরনের অপরাধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততার ইতিহাস আছে। ফলে পরিবার ও সাক্ষীদের এই প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রাখা অসম্ভব।
দ্বিতীয় কারণ হিসেবে এনসিপি বলেছে, গুমের অভিযোগ নথিভুক্ত না করার দীর্ঘ ইতিহাস পুলিশের আছে। গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন দেড় হাজারের বেশি গুমের অভিযোগ পেয়েছে। এর মধ্যে ২৫০টিরও কম ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি করা গিয়েছিল কারণ পুলিশ অভিযোগ নথিভুক্ত করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছে। খসড়া আইনে বলা হয়েছে, পুলিশ অভিযোগ নিতে অস্বীকৃতি জানালে পরিবার ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যেতে পারবে। কিন্তু এতে মূল সমস্যার সমাধান হয় না। ম্যাজিস্ট্রেট অভিযোগটি নথিভুক্ত হওয়া নিশ্চিত করতে পারেন, কিন্তু তদন্ত আবারও পুলিশের কাছেই ফিরে যাবে। স্বার্থের সংঘাত থেকেই যাবে।
তৃতীয় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, একজন সাধারণ পুলিশ কর্মকর্তা ক্ষমতাবান বাহিনীগুলোকে সহযোগিতা করতে বাধ্য করতে পারবে না। গুমের ঘটনায় ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা, গোয়েন্দা সংস্থা, সামরিক কর্মকর্তা বা আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্যরা জড়িত থাকতে পারে এবং এর দীর্ঘ ইতিহাস বাংলাদেশে আছে। একজন সাধারণ উপ-পরিদর্শকের পক্ষে এসব প্রতিষ্ঠানকে নথি দিতে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পরিচয় প্রকাশ করতে, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সদস্যদের হাজির করতে বা সন্দেহভাজন আটকস্থলে প্রবেশের অনুমতি দিতে বাধ্য করা অত্যন্ত কঠিন হবে।
এনসিপি বলেছে, কোনো পুলিশ কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দিলেই তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতাবান প্রতিষ্ঠানের ওপর তার বাস্তব কর্তৃত্ব তৈরি হয় না। ফলে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সহযোগিতা না করে যথাযথ তদন্ত এড়িয়ে যেতে পারবে। কাগজে তদন্ত চলবে, কিন্তু বাস্তবে দায়মুক্তি থেকেই যাবে। নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিজেই তদন্ত করে দায়মুক্তি পেতে পারে পুলিশ, শাস্তি হতে পারে অভিযোগকারী পরিবারের।
দলটি বলেছে, খসড়া আইনের ২১ ধারায় বলা হয়েছে, বিচার শেষে অভিযোগ মিথ্যা এবং হয়রানির উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল বলে প্রমাণিত হলে আদালত অভিযোগকারীকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিতে পারবেন। ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা অভিযোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা প্রয়োজন এবং এই বিধানটি থাকা উচিত বলে এনসিপি মনে করে। কিন্তু মূল অভিযোগটি স্বাধীনভাবে তদন্ত করা হলেই কেবল এই বিধান ন্যায্য হতে পারে।
এনসিপি মনে করে, বর্তমান খসড়া আইন অনুযায়ী, কোনো পরিবার পুলিশের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ করলে পুলিশই সেই অভিযোগ তদন্ত করবে। অর্থাৎ, পুলিশ নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিজেই তদন্ত করে নিজেকে দায়মুক্ত দেখাতে পারবে। এরপর সেই তদন্তের ভিত্তিতে অভিযোগটি মিথ্যা বিবেচিত হলে অভিযোগকারী পরিবারই সশ্রম কারাদণ্ডের মুখে পড়তে পারে।
এতে প্রকৃত ভুক্তভোগী ও পরিবারগুলো অভিযোগ করতে ভয় পাবে উল্লেখ করে দলটি বলেছে, কেউ গুমের অভিযোগ করবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তাকে ভাবতে হবে; অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানটি তদন্তকে প্রভাবিত বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে; অভিযোগ প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় আলামত সেই প্রতিষ্ঠানের হাতেই থেকে যেতে পারে; এবং মামলা প্রমাণিত না হলে অভিযোগকারীকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হতে পারে।
মিথ্যা অভিযোগের বিধানটি মূল সমস্যা নয় উল্লেখ করে এনসিপি বলেছে, সমস্যা হলো, এই বিধানকে এমন একটি তদন্তব্যবস্থার ওপর বসানো হয়েছে, যেখানে অভিযুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করবে।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার কথা উল্লেখ করে দলটি বলেছে, বাংলাদেশ ২০২৪ সালের আগস্টে গুম থেকে সব ব্যক্তির সুরক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদে যোগ দিয়েছে। সনদের ১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, গুমের অভিযোগ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। জাতিসংঘের গুমবিষয়ক কমিটিও স্পষ্ট করেছে, কোনো বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকলে সেই বাহিনী তদন্তে অংশ নিতে পারবে না। খসড়া আইনের ১৪ ধারা এই ন্যূনতম মানও পূরণ করে না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


