প্রতি বছর ঈদুল আজহায় বিভিন্ন ধরনের পশু কোরবানি করে থাকেন মুসলমান ধর্মের অনুসারীরা। বাংলাদেশের অনেকেই কোরবানির সঙ্গে সন্তানের আকিকাও দিয়ে থাকেন। বিশেষ করে যারা বিভিন্ন কারণে নির্ধারিত সময়ে সন্তানের আকিকা করতে পারেননি তাদের অনেককে কোরবানির সময় কোরবানির পশু দিয়েই আকিকা দিতে দেখা যায়।
আকিকা হলো সন্তানের নাম রাখার পরে তার নামে কোনো পশু উৎসর্গ করা।
ইসলামের বিধান অনুযায়ী, সন্তান জন্মের পর সপ্তম দিনে আকিকা করা উত্তম। তবে সেদিন সম্ভব না হলেও পরবর্তী সময়েও আকিকা করা যায়। এ নিয়ে কঠোর কোনো বিধান নেই ইসলামে।
যারা বিভিন্ন কারণে নির্ধারিত সময়ে আকিকা দিতে পারেননি তারা কোরবানির ঈদের সময় একই পশু দিয়ে আকিকা করতে পারবেন কী-না সেই প্রশ্নও করেন অনেকে। যদিও এ নিয়ে আলাদা আলাদা ব্যাখ্যা রয়েছে ইসলামে। ইসলামের ভিন্ন ভিন্ন মাহজাবে রয়েছে আলাদা ব্যাখ্যা।
যেমন কোনো মাজহাব বা মতবাদ অনুসারে কোরবানির সঙ্গে আকিকা করা জায়েজ নেই, আবার কোনো কোনো মাজহাব অনুযায়ী কোরবানির সঙ্গে আকিকা করা বৈধ।
ইসলামি লেখক ও গবেষকরা বলছেন, ভিন্ন মাহজাবের অনুসারীরা এ নিয়ে আলাদা ব্যাখ্যা দিলেও ধর্মগ্রন্থ কোরআন কিংবা হাদিসের আলোকেই এ নিয়ে সিদ্ধান্তের সুযোগ আছে।
ইসলাম বিষয়ক লেখক ও বিশ্লেষক শরীফ মুহাম্মদ বলছেন, ‘ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী আকিকা একটি সুন্নত আর কোরবানি ওয়াজিব। সচ্ছলতার অভাবে কেউ যদি নির্দিষ্ট সময়ে তার সন্তানের আকিকা করতে না পারে তাহলে কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে কোরবানির সময়ও আকিকা করতে পারেন।’
ইসলামের পরিভাষায়, মাজহাব বলতে বোঝায় ইসলামের শরীয়তের বিধানগুলো কোরআন ও হাদিসের আলোকে ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ করার নির্দিষ্ট পদ্ধতি বা চিন্তাধারা।
আকিকা করার নিয়ম নিয়ম কী?
ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত অনুষ্ঠান হচ্ছে সন্তানের আকিকা দেওয়া। নবজাতকের জন্য পশু কোরবানি করে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং সন্তানের কল্যাণ কামনা।
মুহাম্মদ সা:- নিজের নাতি হাসান ও হুসাইনের জন্মের পরও আকিকা দিয়েছিলেন। যে কারণে ইসলামের বিধান অনুযায়ী আকিকা সুন্নত।
ইসলামি গবেষক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বলেন, ‘ইসলামের বিধান অনুযায়ী আকিকা নামের সাথে যুক্ত একটা আমল। এটি সুন্নত। আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিদের আকিকা দেওয়া উচিত।’
ইসলামের বিধান অনুযায়ী, সাধারণত সন্তান জন্মের সপ্তম দিনে আকিকা করা উত্তম। কিন্তু নবজাতক জন্মের সপ্তম দিনে আকিকা করা সম্ভব না হলেও ১৪তম দিন বা ২১তম দিনেও করা যায়।
তবে যদি কোনো কারণে সাত থেকে ২১ দিনের মধ্যে আকিকা করা সম্ভব না হয়, তাহলে পরবর্তীতেও আকিকা করা যায়।
মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বলেন, ‘আকিকা যেহেতু নামের সাথে সম্পর্কিত একটি আমল সে কারণে একজন মানুষের নাম যদি ১০ বছর বা ২০ বছরেও পরিবর্তন হয় তাহলেও আকিকা করা যায়।’
তিনি আরো বলেন, ‘অনেক সময় বাচ্চা জন্মের পর নানা ধরনের জটিলতা বা মা চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি থাকে। কিংবা তখন আর্থিক স্বচ্ছলতা নিয়েও সংকট থাকতে পারে। কিন্তু পরে যখন তার স্বচ্ছলতা তৈরি হয় তখনো আকিকা আদায় করা যায়।’
সন্তান জন্মের পর তাদের নামে আকিকার ক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়ে সন্তানের ক্ষেত্রে আলাদা দুটি বিধানের কথা বলা আছে ইসলামে।
ইসলামের বিধান অনুযায়ী, ছেলে শিশুর জন্য দুটি এবং মেয়ে শিশুর জন্য একটি ছাগল বা ভেড়া বা দুম্বা জবাই করা হয়। পশু কোরবানির মতো সুস্থ, প্রাপ্তবয়স্ক ও নির্দোষ হতে হবে।
যদিও আকিকার পশু নির্বাচনের ক্ষেত্রে কিছু নমনীয়তা রয়েছে, তবে ছাগল দিয়ে আকিকা করা উত্তম।
ইসলামি লেখক শরীফ মুহাম্মদ বলেন, ‘উট, মহিষ বা অন্য প্রাণীও ছিল। কিন্তু সেগুলোর কথা না বলে ইসলামে আকিকার ক্ষেত্রে নবী সা: ছাগলের কথাই বলেছে সে কারণে সেটিই উত্তম।
হাদিস অনুযায়ী, সন্তান জন্মের সপ্তম দিনে শিশুর নাম রাখা এবং মাথা মুণ্ডন করে চুলের ওজনের সমপরিমাণ স্বর্ণ বা রুপা দান করা সুন্নাহ।
যে পশু দিয়ে আকিকা করা হয় সেই পশুর গোশত যিনি আকিকা দিবেন তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা খেতে পারবেন। এমনকি আত্নীয় স্বজনকেও দেওয়া যাবে। অর্থাৎ এই গোশত নিজেদের খাওয়ার ব্যাপারে কোনো ধর্মীয় বিধি-নিষেধ নেই।
কোরবানির পশু দিয়ে আকিকা করা যায়?
ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী কোরবানি পালিত হয় বছরের একটি নির্দিষ্ট মাসে। আরবি পঞ্জিকা অনুযায়ী জিলহজ মাসের ১০ তারিখ অনুষ্ঠিত হয় ঈদুল আজহা। ওইদিন এবং এর পরের দুই দিন অর্থাৎ ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত পশু কোরবানি করেন মুসলিম ধর্মের অনুসারীরা।
বিধান অনুযায়ী, স্বাভাবিক জ্ঞানসম্পন্ন ও প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম যদি কোরবানি ঈদের তিন দিন পর্যন্ত অর্থাৎ ১০ জিলহজ সকাল থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগে পর্যন্ত) সময়ের মধ্যে নিসাব (সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে ৫২ ভরি রুপা অথবা এর যেকোনো একটির মূল্যের সমপরিমাণ নগদ অর্থ বা ব্যবসার পণ্যের মালিক) থাকেন বা হন, তার জন্য কোরবানি করা ওয়াজিব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মুহা আব্দুর রশীদ বলেন, যে সম্পদ থাকলে জাকাত ওয়াজিব হয়, সেই ধরনের সম্পদ যদি তার থাকে তাহলে তো তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে। আর যার নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলো, তিনি অবশ্যই কোরবানি দিবেন।
অনেকেই নির্ধারিত সময় নানা কারণে আকিকা দিতে পারেন না। তাদের অনেকে কোরবানির ঈদের সময় একই পশু দিয়ে আকিকা দিতেও দেখা যায়। এটি নিয়ে দুই ধরনের বর্ণনাও রয়েছে।
ইসলামি বিধান অনুযায়ী, কোরবানি ও আকিকা আলাদা ও ভিন্ন দুটি ইবাদত। কিন্তু সন্তান জন্মের পর শুকরিয়া স্বরুপ যে পশু জবাই করা হয়। আর অন্যদিকে, কোনো ব্যক্তির নিসাব বা নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ থাকলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব। অর্থাৎ আকিকা যেখানে সুন্নত বা বাধ্যতামূলক নয় সেখানে কোরবানিকে ওয়াজিব বা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে সামর্থ্যবানদের জন্য।
ইসলামি লেখক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বলেন, ওয়াজিব হলো সেই ইবাদত যেটি পালন করা বাধ্যতামূলক। কোনো ব্যক্তি যদি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত, নির্দিষ্ট সম্পদের মালিক হন, তাকে কোরবানি দিতে হবে। অন্যদিকে, সন্তান জন্মের পর শুকরিয়া স্বরুপ যে পশু জবাইকে বলা হয় সেটি আকিকা। আকিকা করা বাধ্যতামূলক নয়।
ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী, গৃহপালিত পশু দ্বারা কোরবানি করতে হয়। যেমন ভেড়া, ছাগল, দুম্বা, গরু, মহিষ ও উট। এই ছয় প্রকার পশু দ্বারা কোরবানি করা যায়, এ ছাড়া অন্য কোনো পশু দ্বারা কোরবানি করা যায় না। এ ধরনের পশুকে কোরআনের ভাষায় বলা হয় 'বাহিমাতুল আনআম অর্থাৎ অহিংস্র গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু।'
আবার, অন্যদিকে আকিকার ক্ষেত্রে পশু হিসেবে ছাগল বা খাসিকে নির্ধারিত করা হয়েছে ইসলামে।
মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বলেন, ‘হাদিস অনুসারে ছাগল বা খাসি দিয়েই আকিকা করতে হবে বা উত্তম। কিন্তু কোরবানিতে উট, গরু, দুম্বা মহিষ সব কিছুই কোরবানি দেওয়া যাবে।’
ইসলামি গবেষকদের মতে, আকিকা ও কোরবানি একই ধরনের ইবাদত বা আমল। কোরবানির ক্ষেত্রে যে বিধান সেটি হবে আকিকার ক্ষেত্রেও একই নিময়। একইভাবে জবাই করতে হবে।
যারা নির্ধারিত সময়ে সন্তানের আকিকা করতে পারেননি বা সামর্থ্য না থাকার কারণে আকিকা করতে পারেননি তাদের ক্ষেত্রে একই পশু দিয়ে কোরবানি ও আকিকা সম্ভব কী-না এই প্রশ্নগুলোও সামনে আসছে।
জবাবে ইসলামি গবেষকরা বলছেন, বিভিন্ন মাজহাব অনুযায়ী আলাদা আলাদা নিয়ম আছে। তবে কোরবানির পশুতে ভাগ হিসেবে আকিকাও দেয়া যায়।
শরীফ মুহাম্মদ বলেন, ‘হানাফি মাজহাব অনুযায়ী কোরবানির পশু দিয়ে আকিকা করা যায়। কিন্তু আহলে হাদিসের অনুসারীরা এটার বিরোধিতা করেন।’
তার মতে, কোরবানির পশুতে যেটাতে ভাগ দেওয়ার সুযোগ আছে সেখানে একটা ভাগ বা দুটি ভাগ আকিকার জন্য দিতে পারে। এটা অনুমোদিত। কোরবানির দিন পশু জবাই করলে অন্তত প্রথম পশুটা কোরবানির হওয়া উত্তম। ধরেন একজন মানুষ কোরবানি করছেন না বা পারছেন না, কিন্তু তার সন্তানের আকিকাটা রয়ে গেছে। কিন্তু আপনি আকিকার পশুটা জবাই করলেন, কিন্তু কোরবানির কোনো পশু জবাই করলেন না। এটা তার জন্য উত্তম সিদ্ধান্ত না।
এর ব্যাখ্যায় এই গবেষক বলেন, যদি কেউ গরুতে এক ভাগ কোরবানির জন্য দিলেন আরেকটা ছাগল আলাদাভাবে আকিকা করলেন এটা উত্তম। আবার গরুর একভাগ আকিকা আরেক একভাগ কোরবানিও দিতে পারেন তার সামর্থ্য অনুযায়ী।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


