আরবি বর্ষপঞ্জির সর্বশেষ মাস হলো জিলহজ, যা ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যময়। এ মাসেই হয় ইসলামের অন্যতম প্রধান ইবাদত—হজ। তাই জিলহজ শুধু একটি মাস নয়; এটি ত্যাগ, ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির এক মহিমান্বিত সময়। এ সময়কে কেন্দ্র করে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ভালোবাসায় উদ্বেলিত হয়ে হাজিরা ছুটে যান পবিত্র মক্কায়। ২০২৬ সালেও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশ থেকেও হাজারো মানুষ যাচ্ছেন সেই পবিত্র ভূমির উদ্দেশে। তাদের মধ্য থেকেই আমরা শুনব চারজন সৌভাগ্যবান হজযাত্রীর প্রথম হজে যাওয়ার অনুভূতি, প্রস্তুতি ও হৃদয়ের অজানা এক টানের কথা।
প্রথমে ফিউচার ওভারসিজ পরিচালক, এহসান মাহমুদ মজুমদারের অনুভূতি শোনা দিয়েই শুরু করি, যিনি জীবনের প্রথম হজে যাচ্ছেন। তিনি নিজ অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘আমার ছোট্ট জীবনে অনেক জায়গায় ঘোরা হয়েছে; কিন্তু প্রথম হজের সফরটি হবে সবচেয়ে বিশেষ। এটি শুধু ভ্রমণ নয়, বরং হৃদয়ের এক গভীর ডাকে সাড়া দেওয়া। ভাবতেই ভালো লাগে—পবিত্র মক্কা-মদিনায় গিয়ে কেমন শান্তি পাব। আরাফার দিনে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়ার স্বপ্ন দেখি। মিনার নীরবতা, মুজদালিফার রাত—সবকিছু যেন আগেই অনুভব করছি। হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ত্যাগের স্থানে কোরবানি করার ইচ্ছা মনে গভীর আলোড়ন তোলে। প্রতিদিন মনে হয়—কবে সেদিন আসবে, কবে আমি আল্লাহর ঘরের মেহমান হব।’
একই অনুভূতির ভেতর দিয়ে এবার আমরা যাই আরেকজন হজযাত্রীর কাছে, যার হৃদয়েও জমে আছে পবিত্র কাবার অদম্য টান। তিনি হচ্ছেন যাত্রাবাড়ীর নাওশিন তাসনীম জারা প্রধান, যিনি চলতি বছর (২০২৬) মা-বোনের সঙ্গে হজে যাচ্ছেন।
তিনি অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, ‘জীবনের প্রথম এবারই হজে যাচ্ছি। মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে অসংখ্য শুকরিয়া, যিনি আমাকে এই পবিত্র সফরের সৌভাগ্য দান করেছেন। মনটা কেমন অস্থির হয়ে আছে, বুকের ভেতর এক অজানা টান আর ব্যাকুলতা কাজ করছে। ছুটে যেতে ইচ্ছে করছে পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র ঘর কাবার দিকে। চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে সেই কালো গিলাফে মোড়া বায়তুল্লাহ, যার দিকে মুখ করে সারাজীবন নামাজ পড়েছি। রাসুল (সা.)-এর রওজা জিয়ারতের কথা ভাবলেই চোখ ভিজে আসে। যাকে কখনো দেখিনি অথচ ভালোবাসি সবার চেয়ে বেশি, তাঁর দরজায় গিয়ে সালাম জানাব। ইহরাম বেঁধে যখন প্রথম বলব ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক…’, সেই মুহূর্তের অপেক্ষাতেই এত দিন ছিলাম। আর কয়েকটি দিন পর সেই অপেক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে।’
এই অনুভূতির ধারাবাহিকতায় এবার আমরা পৌঁছে যাই চট্টগ্রামের ফার্মাসিস্ট মুহাম্মদ সিরাজুল মোস্তফার কাছে, যার অন্তরেও এই পবিত্র ডাক প্রতিনিয়ত ধ্বনিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহতায়ালার জন্য, যিনি তার অপার করুণায় আমাকে পবিত্র কাবাঘরের দিকে যাত্রার সৌভাগ্য দান করেছেন। এবারই প্রথম হজে যাচ্ছি। এখনো সেই মুহূর্ত আসেনি, তবু হৃদয়ের ভেতর অদ্ভুত এক আলো জ্বলে উঠেছে। মনে হচ্ছে, জীবনের সবচেয়ে বড় ডাকটি শিগগিরই এসে পৌঁছাবে। আর মাত্র কয়েকটি দিন; তারপরই পবিত্র ঘরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু হবে। যাত্রার আগেই মন কখনো অস্থির হয়ে ওঠে, আবার মুহূর্তেই শান্ত হয়ে যায়। এক অজানা টান আমাকে প্রতিনিয়ত কাবার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। চোখ বন্ধ করলেই দেখি, আমি বায়তুল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে আছি আর হৃদয় ভরে উঠছে কৃতজ্ঞতায়। তবে সেটি এখনো বাস্তব নয়, শুধু স্বপ্নের মতো ভেসে বেড়াচ্ছে। তবু বিশ্বাস আছে, একদিন আমি সত্যিই সেই পবিত্র ঘরের সামনে দাঁড়াব। তখন আর কোনো ভাষা থাকবে না—থাকবে শুধু নত এক বান্দার নীরব কান্না আর সীমাহীন শুকরিয়া।’
এই অনুভূতির ধারাবাহিকতায় আমরা এবার পৌঁছে যাই, গাজীপুর কাপাসিয়ার কলেজ রোড চৌরাস্তা জামে মসজিদের খতিব মুফতি মুশতাক আহমদ রাহমানির কাছে। তিনি নিজের প্রথম হজে যাওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, ‘মহান রবের দরবারে অশেষ শুকরিয়া, তিনি আমাকে এ বছর হজের জন্য কবুল করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ। আর কদিন পরই ফ্লাইট; অথচ হৃদয়ের ভেতর যে আবেগ ও ভালো লাগার ঢেউ উঠছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। শুধু অপেক্ষা, কখন বায়তুল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে রবের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কথা বলব, প্রিয় নবীজি (সা.)-এর রওজার সামনে দাঁড়িয়ে জানাব সালাম।
সময় যেন আর কাটতেই চায় না। সেজদায় গেলে আনন্দে চোখ ভিজে ওঠে—ভাবী, আমিও শিগগিরই বায়তুল্লাহকে সামনে রেখে সেজদা দেব। হাদিসের কিতাব পড়াতে গিয়ে বারবার আবেগে ভেসে যাই, নবীজির সামনে দাঁড়ানোর তাওফিকও কি আমাকে দান করবেন মহান রব! প্রথম হজে যাওয়ার এই অনুভূতি—সত্যিই বলে বোঝানো যায় না।’
প্রথম হজের এই অনুভূতি আসলে এক অদৃশ্য টান, যা হৃদয়কে বারবার ডেকে নেয় আল্লাহর ঘরের দিকে।
ভিন্ন ভিন্ন মানুষ, ভিন্ন ভিন্ন জীবন, তবু অনুভূতি এক, আকাঙ্ক্ষা এক। এই যাত্রা শুধু পথচলা নয়; এটি আত্মার এক পবিত্র প্রত্যাবর্তন। প্রথম হজে যাওয়ার এই অপার্থিব সৌভাগ্যের অনুভূতি সব মুমিনের জীবনে আসুক—সেটাই প্রার্থনা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


লেবাননে যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানাল ইরান