সিলেটে জিম্বাবুয়ের কাছে হারের পর অনেক প্রশ্নের মুখে পড়েছিল বাংলাদেশ। বিস্ময় জেগেছিল এমন ভঙ্গুর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেও বাংলাদেশ এখন হারে! চট্টগ্রামে পিছিয়ে থেকে সিরিজের শেষ টেস্টে খেলতে নামা বাংলাদেশ পণ করেছিল এমনসব প্রশ্নের জবাব দেওয়ার। মোক্ষম কায়দায়ই সেই প্রশ্নের জবাব দিয়েছে দল। চট্টগ্রামে জিম্বাবুয়েকে ব্যাটে-বলে একেবারে গুঁড়িয়ে দিয়েই জিতেছে বড় ব্যবধানে। ইনিংস ও ১০৬ রানের বিশাল এই জয়ই জানাচ্ছে সিলেটের হারটা ‘দুর্ঘটনা’ ছিল। চট্টগ্রাম টেস্টের বাংলাদেশই সত্যিকারের বাংলাদেশ!
এই জয়ে সিরিজে সমতা এলো। তাতে মান-কুল উভয়ই রক্ষা হলো বাংলাদেশের। সেই সঙ্গে ঘুরে দাঁড়ানোর আরেকটি নজির তৈরি হলো।
চট্টগ্রাম টেস্ট শুরুর আগে সবচেয়ে বড় ভাবনা ছিল একটাইÑ দলের ব্যাটিং। এই টেস্টের পারফরম্যান্স জানাচ্ছে সেই সংকটও কাটিয়ে উঠেছে দল। ৪৪৪ রানের ইনিংসে বাংলাদেশের দুটি সেঞ্চুরি। একটি সেঞ্চুরির এবং চারটি হাফসেঞ্চুরির জুটি হয়েছে। এই পারফরম্যান্সই জানাচ্ছে সম্মিলিতভাবেই বাংলাদেশের ব্যাটিংটা ভালো হয়েছে চট্টগ্রামে।
সংকট কাটা শুরু হয় ওপেনিংয়েই। চার বছর পর ওপেনিং জুটিতে সেঞ্চুরির পার্টনারশিপ হলো। সাদমান ইসলাম ও এনামুল হক বিজয়ের ওপেনিং জুটিতে যোগ হয় ১১৮ রান। সাদমান সেঞ্চুরির আনন্দে ভাসেন। ১২০ রানের অনবদ্য ইনিংস খেলেন। টেস্টে এটি তার দ্বিতীয় সেঞ্চুরি। নিজের প্রথম সেঞ্চুরিও জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধেই করেছিলেন তিনি। ওপেনিং জুটির ওপর ভর করে বাংলাদেশের মিডলঅর্ডার ব্যাটাররা দলকে এগিয়ে নেন। তবে মুমিনুল হক, নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুশফিকুর রহিমÑ তিন অভিজ্ঞ ক্রিকেটার উইকেটে সেট হয়েও নিজেদের ইনিংসটা লম্বা করতে পারেননি। বিশেষ করে মুশফিকের ব্যাটে বড় রানের আশায় ছিল পুরো টিম ম্যানেজমেন্ট। রাওয়ালপিন্ডি টেস্টের ডাবল সেঞ্চুরি ছুঁইছুঁই ইনিংস শেষে পেছনের এক ডজন ইনিংসে কোনো হাফসেঞ্চুরিও পাননি তিনি। দলে শুধু ব্যাটার হিসেবে খেলা মুশফিক এই সিরিজে ব্যর্থতার সেই বলয় থেকে বেরিয়ে আসবেন এমন প্রত্যাশায় ছিলেন সবাই। সিলেটে উভয় ইনিংসে ব্যর্থতার পর চট্টগ্রামে তার ওপর চাপটা আরো বেড়ে যায়। সেই চাপ এড়িয়ে মুশফিক ভালোই শুরু করেছিলেন। কিন্তু ৪০ রানে নিজের দোষেই রান আউটের শিকার হয়ে ফেরেন। দ্বিতীয় দিনের বিকেলে জিম্বাবুয়ে ২০ রানের মধ্যে বাংলাদেশের চারটি উইকেট তুলে নিলে মনে হচ্ছিল বেশিদূর যাবে না স্বাগতিকদের ইনিংস। কিন্তু তৃতীয় দিনের ব্যাটিংয়ে মেহেদি হাসান মিরাজ সেই সংশয় দ্বিধা দূর করেন। খেললেন দারুণ ইনিংস। লেজের সারির তিন ব্যাটারকে নিয়ে যে কায়দায় মেহেদি হাসান মিরাজ ব্যাট হাতে লড়লেন সেটা আরেকবার তার ব্যাটিং দক্ষতার প্রমাণ দিল। করলেন সেঞ্চুরি। টেস্টে এটি তার দ্বিতীয় সেঞ্চুরি। তাইজুলের সঙ্গে অষ্টম উইকেটে ৬৩ এবং তানজিম হাসান সাকিবকে সঙ্গী করে নবম উইকেট জুটিতে ৯৬ রানের জুটি গড়লেন মেহেদি। আর শেষ জুটিতে হাসান মাহমুদকে সঙ্গী করে নিজের সেঞ্চুরি পুরো করলেন। শেষ ব্যাটার হিসেবে মেহেদি যখন আউট হলেন তখন তার নামের পাশে ১৬২ বলে ১০৪ রানের ইনিংস। আর বাংলাদেশের সঞ্চয় ৪৪৪। ম্যাচে বাংলাদেশের লিড দাঁড়ায় ২১৭ রানের।
শুধু সেঞ্চুরিতেই তৃপ্ত রইলেন না মেহেদি হাসান মিরাজ, শেষ বিকেলে বল হাতেও রং ছড়ালেন। জিম্বাবুয়ের দ্বিতীয় ইনিংসে তার শিকার সংখ্যা ৫। ২১ ওভারে ৩২ রানে ৫ উইকেট। প্রথম ইনিংসে উইকেটশূন্য থাকার শোধ নিলেন যেন দ্বিতীয় দফায় বেশ কড়ায় গণ্ডায়। একই টেস্টে সেঞ্চুরি ও ইনিংসে পাঁচ উইকেট শিকারের প্রথম কৃতিত্ব এটি তার। তবে বাংলাদেশের হয়ে তার আগে এই কৃতিত্বের মালিক আরো দুজন। সাকিব আল হাসান ও সোহাগ গাজীর সঙ্গে এখন এই রেকর্ডে তৃতীয় বাংলাদেশি মেহেদি হাসান মিরাজ। পুরো সিরিজে ১৫ উইকেট ও ১১৬ রান নিয়ে সিরিজ সেরারও পুরস্কার উঠল মেহেদির হাতে।
জিম্বাবুয়ে প্রথম ইনিংসে ২২৭ রানের যে ইনিংস খেলেছিল, দ্বিতীয় দফায় তার ধারকাছেও যে যেতে পারল না। বাংলাদেশের স্পিন বিষে নুইয়ে পড়ল মাত্র ১১১ রানে। দলের ওপেনার বেন কারেন কেবল ৪৬ রানের ইনিংস খেললেন। তার সঙ্গে আর মাত্র দুজন ডাবল ফিগারে গেলেন।
জিম্বাবুয়েকে হারাতে চট্টগ্রামে বাংলাদেশের স্পিন কৌশল শতভাগ সফল হলো। এই টেস্টে জিম্বাবুয়ে শুধু এক জায়গায় জিতলÑ টস!
সংক্ষিপ্ত স্কোর (দ্বিতীয় দিন শেষে) : জিম্বাবুয়ে প্রথম ইনিংস : ২২৭/১০ (৯০.১ ওভারে, বেনেট ২১, কারেন ২১, ওয়েলেচ ৫৪, উইলিয়ামস ৬৭, আরভিন ৫, মাধেভেরে ১৫, সিগা ১৮, তাইজুল ৬/৬০, নাইম ২/৪২, তানজিম সাকিব ১/৪৯, মেহেদি ০/৪৪)।
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস : ৪৪৪/১০ (১২৯.২ ওভারে, সাদমান ১২০, এনামুল ৩৯, মুমিনুল ৩৩, নাজমুল ২৩, মুশফিকুর ৪০, জাকের আলী ৫, মেহেদি ১০৪, নাঈম ৩, তাইজুল ২০, তানজিম হাসান সাকিব ৪১, হাসান মাহমুদ ০, মাসেকেসা ৫/১১৫)।
জিম্বাবুয়ে দ্বিতীয় ইনিংস : ১১১/১০ (৪৬.২ ওভারে, কারেন ৪৬, আরভিন ২৫, ওয়েলিংটন ১০, মিরাজ ৫/৩২, তাইজুল ৩/ ৪২, নাইম ১/৩৪)। ফল: বাংলাদেশ ইনিংস ও ১০৬ রানে জয়ী।
ম্যাচসেরা : মেহেদি হাসান মিরাজ।
সিরিজসেরা : মেহেদি হাসান।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

