সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটের পারফরম্যান্স দীনতা চোখে পড়ার মতো। জিম্বাবুয়ে ও আরব আমিরাতের মতো দলের বিপক্ষে পরাজয় বিরাট অশনিসংকেত। উন্নতির গ্রাফ ধীরে ধীরে নিম্নমুখী হচ্ছে। সাবেক ক্রিকেটাররা দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন, আফসোসে পুড়ছেন। দেশের ক্রিকেটের এমন দুর্দিনের কারণ কী? উত্তর পাওয়া যাবে সাবেক অধিনায়ক ও উইকেটকিপার ব্যাটার খালেদ মাসুদ পাইলটের বিশ্লেষণে।
অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশ ক্রিকেটের এই নিম্নমুখীর ব্যাপারটা আমি আঁচ করতে পেরেছিলাম, যেহেতু আমি এই অঙ্গনেই আছি। অনেক আগে থেকেই এটাকে অ্যালার্মিং বলেছিলাম। কারণ, সিস্টেমটা ধসে গেলে তখন আর ফল পাওয়ার আশা থাকে না। বাংলাদেশ ভালো খেলছে না এটা আমরা দেখছি। কিন্তু কেন ভালো খেলছে না, সেটার কারণগুলো বের করার জন্য ম্যানেজমেন্টের অনেক আগে থেকেই পরিকল্পনা করা উচিত ছিল।
দলে অনেক ভালো খেলোয়াড় আছে। আরব আমিরাতের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচের কথাই ধরা যাক। ম্যাচটা আমরা হেরেছি, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু বিষয় হচ্ছে আপনি কতটা কোয়ালিটিফুল ক্রিকেট খেলছেন। কোয়ালিটি ছিল না বাংলাদেশের খেলায়। বিশেষ করে বোলিং-ফিল্ডিংয়ে। এই লেভেলে এসে আমরা দেখব দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, ভারতের খেলোয়াড়রা কেমন ফিল্ডিং করে। আমরাও তো অনেক দিন টেস্ট ক্রিকেট খেলছি। সে তুলনায় আমাদের লেভেলটা এখন কোথায় কোন অবস্থানে আছে?
টি-টোয়েন্টিতে ম্যাচ জেতানোর জন্য স্পেশালিস্ট বোলার তৈরি হয়। আইপিএলে দেখেন, একজন বোলার ইয়র্কার, ওয়াইড ইয়র্কার, স্লোয়ার, বাউন্সারসহ বিভিন্ন ভেরিয়েশন থাকে; দ্বিতীয় ম্যাচে বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যে যেসব ছিল না। শরিফুল চেষ্টা করলেও নিয়ন্ত্রণ ছিল না নিজের ওপর। এসব অনুশীলনের মাধ্যমে আয়ত্ত করতে হবে।
এখানে খেলোয়াড়দের দায় আছে। খেলোয়াড়দের স্বপ্নবাজ হতে হবে। নিজের লক্ষ্য থাকতে হবে। অল্প কিছুতেই খুশি হয়ে গেলে, নিজেকে অভিজ্ঞ তৃপ্তির ঢেঁকুর তুললে সেটা হবে একটা বাজে অভ্যাস। ভালো খেলুড়ে দেশের ক্রিকেটারদের লেভেল অনুসরণ করতে হবে। কিছু রান করলাম আর ব্যাংকে টাকা চলে এলো, এমন চিন্তা অপেশাদার।
ক্রিকেটারদের অভিভাবকদেরও উন্নতি করতে হবে। তাদেরকে ভালো ক্রিকেটার তৈরির দিকে নজর দিতে হবে। উদাহরণ তো হাতের কাছেই! আরব আমিরাত সিরিজে অধিনায়ক, সহ-অধিনায়ক নিয়ে কথা হচ্ছিল। আমরা দেখলাম, শেখ মাহেদিকে সহ-অধিনায়ক করা হলো। অথচ ঠিক এক ম্যাচ পর সেই সহ-অধিনায়ক একাদশ থেকে বাদ। সহ-অধিনায়ক করেও বাদ দিলেন! আপনাকে আসলে চিন্তা করতে হবে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে যে রেগুলার খেলতে পারবে তেমন একজনকেই এই সহ-অধিনায়কের দায়িত্ব দেবেন।
নির্বাচক বা অন্য যারা অফিসিয়াল আছেন তাদের কাজটা কী? তাদের কাজ হচ্ছে এই প্ল্যানগুলো করা। সঠিক পরিচর্যায় যোগ্য খেলোয়াড়কে বের করে আনা। একটি টিম যখন খেলতে যাবে তখন চিন্তা করতে হবে এই খেলোয়াড়টা প্রস্তুত কিনা। প্রস্তুত হলেই কেবল খেলাতে হবে।
আমাদেরকে বড় কিছুর মানসিকতা নিয়ে খেলতে হবে। যে সমস্যাটা হচ্ছে আমাদের, ইনডিভিজুয়াল পারফরম্যান্স আসছে না। ভালো খেলোয়াড় যারা আছে, তাদের কাছ থেকে দলগতভাবে পারফরম্যান্স বের করে আনার কাজগুলো করতে হবে। ওদেরকে কাজ করার তাড়না দেন। কী করে আমরা জিততে পারি সেটা বের করতে বলেন। সমস্যা থাকলে সমাধানও আছে। বাংলাদেশ দলের আসল শক্তি হলো আত্মবিশ্বাস। সেটা নিচের দিকে নেমে গেছে।
ক্রিকেট খেলতে গেলে আপনাকে টেকনিক্যালি এত সাউন্ড না হলেও চলবে। আফগানিস্তানের ক্রিকেটাররা কিন্তু টেকনিক্যালি তেমন শক্তিশালী নয়। ধোনিও তা-ই। অথচ তারা মাঠে নামে রান করার জন্য, ম্যাচ জেতার জন্য। তো কলিজা হতে হবে বড়। আত্মবিশ্বাস যখন আপনার সঙ্গে থাকবে তখন দেখবেন সবকিছু করতে পারবেন। এই আত্মবিশ্বাসের অনেক ঘাটতি আছে আমাদের। এই জায়গায় উন্নতি করতে হবে। বয়সভিত্তিক দলগুলোকে কোয়ালিটিফুল দলগুলোর সঙ্গে ম্যাচ খেলানোর ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলঙ্কায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। ঢাকা লিগের যে মান সেটা দিয়ে হবে না।
আর একটা বিষয় এখানে উল্লেখ না করলেই নয়। মনে রাখতে হবে মাঠের ঘটনার সম্পূর্ণ দায় কিন্তু খেলোয়াড়দের। এখানে ম্যানেজমেন্টের কিছু করার নেই। যেমন তাওহীদ হৃদয় দ্বিতীয় ম্যাচে প্রথম দফায় বল থ্রো না করে যে ভুলটা করলেন, সেটা একান্তই তার ভুল। দায়টা তার ঘাড়েই পড়বে। শুধু ক্রিকেটে নয়, জীবনের সর্বক্ষেত্রেই কমনসেন্স অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এসব বিষয়ে আপনাকে কেউ শিখিয়ে দেবে না। নিজে শিখে এসে তবেই মাঠে নামতে হবে। এসব সেন্স প্রত্যেককে নিজেই উন্নতি করতে হবে।
আপনাকে এগুলোর জন্য প্রাকটিস করতে হবে ঘরোয়া ক্রিকেটে । এই ম্যাচগুলো যদি আমরা আরো আগে থেকেই দেখে আসতাম, বিভিন্ন হিস্ট্রি দেখতাম, ঘরোয়াতে যদি আমাদের কোয়ালিটিফুল ক্রিকেট খেলানো হতো, তাহলে এসব ভুল হতো না। ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি লিগে এমনভাবে প্র্যাকটিস করব যেন ৯০ শতাংশ ঠিক হয়।
লেখাটা শেষ করি মাঠের বাইরের প্রসঙ্গ দিয়ে। আমি জানি, সামনে বোর্ডের নির্বাচনের জন্য বিশাল পরিকল্পনা চলছে। রীতিমতো যুদ্ধ লেগে গেছে চারদিকে। এটা হতাশাজনক। মাঠের ক্রিকেটের অবস্থা খারাপ। আপনি ক্রিকেট নিয়ে আগে ভাবেন। মাঠের ক্রিকেট ঠিক থাকলেই সব ঠিক। গোয়ালে যদি গরুই না থাকে তাহলে আপনার গোয়াল রেখে লাভ কী! কোনো লাভ হবে না। লালবাতি জ্বলবে!
খালেদ মাসুদ পাইলট
জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

