চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে বাংলাদেশের খেরোখাতা

চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে বাংলাদেশের খেরোখাতা

বাংলাদেশের আইসিসির ইভেন্ট মানেই বড় স্বপ্নের ফানুস উড়ানো। বাজে ব্যাটিং আর ক্ষুরধার হীন বোলিংয়ের পসরা সাজানো। সেই ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে যেতে পেরেছে বাংলাদেশ একবারই। ইংল্যান্ডের মাটিতে টুর্নামেন্টের সবশেষ আসরে সেমিফাইনালে খেলেছে টাইগাররা- তবে তাতে ছিল প্রকৃতির অ্যাসিস্ট। ওয়ানডের এ বৈশ্বিক আসরে এটাই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সেরা সাফল্য। কিন্তু ১২ ম্যাচ খেললেও অর্জন বলতে মাত্র দুটি জয়। র‌্যাংকিংয়ে সেরা আটের মধ্যে থাকতে না পারায় ২০০৯ ও ২০১৩ সালে খেলার সুযোগ পায়নি বাংলাদেশ। ১৯৯৮ সালে আইসিসি নকআউট ট্রফি নামে টুর্নামেন্টের অভিষেক আসরে স্বাগতিক হয়েও খেলতে পারেনি দেশের ছেলেরা। চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পাঁচ আসরে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স এ আয়োজন-

২০০০ (প্রি-কোয়ার্টার ফাইনাল)

বিজ্ঞাপন

অভিষেক আসরে প্রি-কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে ইংল্যান্ডকে মোকাবিলা করেছিল বাংলাদেশ। টস জিতে আগে ব্যাটিংয়ে নেমে কেনিয়ার নাইরোবিতে জাভেদ ওমর বেলিম ৮৪ বলে অপরাজিত ৬৩ রানের ইনিংস খেলেন। সেই ম্যাচে বাংলাদেশ অধিনায়ক নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের ব্যাটে আসে ৪৬ রান। জিমখানা ক্লাব মাঠে দুজনের ব্যাটিং ঝলকে ৮ উইকেটের বিনিময়ে ২৩২ রানের লড়াকু পুঁজি গড়ে বাংলাদেশ। কিন্তু লক্ষ্য তাড়ায় নেমে অ্যালেক স্টুয়ার্ট ও নাসের হুসেইনের জোড়া অর্ধ শতকে বাংলাদেশের বোলিংকে মামুলি বানিয়ে ৮ উইকেটের বিশাল জয় ছিনিয়ে নেয় ইংলিশরা। এ জয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল উঠে যায় তারা।

২০০২, পুল পর্ব

চ্যাম্পিয়নস ট্রফি নামে আসর বসে শ্রীলঙ্কার মাটিতে। এক নম্বর পুলে বাংলাদেশ লড়াই করে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া ও টুর্নামেন্টের তৎকালীন ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। চরম ব্যাটিং ব্যর্থতায় অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে মাত্র ১২৯ রানে অলআউট হয়ে যায় বাংলাদেশ। টাইগারদের ধারহীন বোলিংয়ের সুযোগ নিয়ে অজিরা ম্যাচ জিতে নিয়েছিল ৯ উইকেটে। ওই আসরে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে তো বেরিয়ে আসে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের কঙ্কালসার। প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড ছুড়ে দেওয়া ২৪৫ রানের চ্যালেঞ্জিং লক্ষ্য তাড়ায় মাত্র ৭৭ রানে ধসে যায় দেশের ব্যাটিং লাইন-আপ।

২০০৪, গ্রুপ পর্ব

ইংল্যান্ডের মাটিতে ২০০৪ সালের আসরেও বাংলাদেশের পারফরম্যান্সও ছিল যাচ্ছে-তাই বাজে। ‘বি’ গ্রুপে একটি ম্যাচও জিততে পারেনি। প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে দুটি ম্যাচই হার মানে বাংলাদেশ। এ আসরেও দলের পিছু ছাড়েনি দৈন্যদশা ব্যাটিং। প্রোটিয়াদের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করে দেশের ছেলেরা। নিজেদের প্রথম ম্যাচে ৯৩ রানের বেশি পুঁজি গড়তে পারেনি বাংলাদেশ। হতশ্রী ব্যাটিংয়ের পসরা সাজিয়ে ম্যাচ হারে ৯ উইকেটে। ক্যারিবিয়ানদের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচে ব্যাটিংয়ে লড়াইও জমিয়ে তুলতে পারেনি বাংলাদেশ। ২৭০ রানের চ্যালেঞ্জিং টার্গেট ছোঁয়ার লড়াইয়ে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা গুটিয়ে যায় মাত্র ১৩১ রানে।

২০০৬, কোয়ালিফাইং রাউন্ড

হার দিয়ে বরাবরের মতো এ আসরও শুরু করে বাংলাদেশ। হারের তেতো স্বাদ হজম করে টানা দুই ম্যাচ। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৩৭ রানে ধরাশায়ী হওয়ার পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে বিধ্বস্ত হয় ১০ উইকেটে।

আগের তিন আসরে খেললেও জয় হয়েছিল সোনার হরিণ। ২০০৬ সালে ভারতের মাটিতে আসরে কাটে জয়খরা। নিজেদের শেষ ম্যাচে গিয়ে বহুল কাঙ্ক্ষিত জয়ের সন্ধান পেয়ে যায় বাংলাদেশ। জিম্বাবুয়ের ম্যাচে হাবিবুল বাশার সুমনের নেতৃত্বে ১০১ রানে দল পেয়ে যায় বহু আরাধ্য জয়ের দেখা। বাছাই পর্বে নিজেদের প্রথম ম্যাচে শাহরিয়ার নাফিস উপহার দেন জাদুকরী তিন অঙ্ক। তার হার না ১২৩* রানের ইনিংসের ওপর ভর করে ৬ উইকেটের বিনিময়ে ২৩১ রানের বড় পুঁজি পেয়েছিল টাইগাররা। দারুণ ব্যাটিংয়ের পর বোলিংটাও হয়েছে দুর্দান্ত। মোহাম্মদ রফিক, আবদুর রাজ্জাক ও সাকিব আল হাসানের বাঁ-হাতের ঘূর্ণি জাদুতে নাস্তানাবুদ হয়ে পড়া জিম্বাবুয়ের ব্যাটিং লড়াই থেমে যায় ১৩০ রানে। দাপুটে জয়ের পরও পরের রাউন্ডের টিকিট কাটতে ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ।

২০১৭, স্বপ্নের সেমিফাইনালের দেখা

মাশরাফি বিন মর্তুজার নেতৃত্বে একদিনের ক্রিকেটে সেরা সময় পার করছিল বাংলাদেশ। ওয়ানডেতে পরাশক্তি বনে যাওয়া টাইগাররা তামিম ইকবালের সেঞ্চুরিতে ৬ উইকেটে ৩০৫ রানের বড় সংগ্রহ গড়েছিল প্রথম ম্যাচে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। দেশসেরা ওপেনারের এনে দিয়েছিলেন ১২৮ রানের দুর্বার এক ইনিংস। তবে ব্যাটারদের জ্বলে উঠার দিনে বোলাররা ছিলেন নিষ্প্রভ। নির্বিষ বোলিংয়ের সুবিধা লুফে নিয়ে ৮ উইকেটের বড় জয়ের আনন্দে ভাসে ইংলিশদের ড্রেসিংরুম।

নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার পেসারদের সামনে যেন দাঁড়াতেই পারেনি টাইগার ব্যাটিং-অর্ডার। তামিমের ৯৫ রানের ইনিংসের ওপর ভর করে কোনোমতে ১৮২ রানের সংগ্রহ পায় মাশরাফি ব্রিগেড। ডেভিড ওয়ার্নারের বিস্ফোরক ব্যাটিংয়ে জয়ের চিত্রনাট্য লিখে যাচ্ছিল অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু ১৬ ওভার শেষে বৃষ্টির হানায় পণ্ড হয়ে যায় ম্যাচ। বৃষ্টিতে খেলা বন্ধ হওয়ার আগে অজিদের স্কোর ছিল ১ উইকেটে ৮৩। সেই ম্যাচ থেকে এক পয়েন্ট পায় বাংলাদেশ।

তার আগে নিউজিল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ম্যাচ বৃষ্টিতে ভেসে যায়। এতে শেষ ম্যাচে জিতে সেমিফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা জোরাল হয় বাংলাদেশের। সমীকরণটা সামনে রেখে সাকিব-তামিমরা কিউইদের ব্যাটিং ২৬৫ রানে থামিয়ে দিলে শেষ চারে খেলার সম্ভাবনা আরো বেড়ে যায়।

কিন্তু ব্যাটিংয়ে নেমে ৩৩ রানে প্রথম ৪ ব্যাটারকে খুইয়ে লড়াই থেকে প্রায় ছিটকে গিয়েছিল বাংলাদেশ। পঞ্চম উইকেটে সাকিব আল হাসান ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ রুখে দাঁড়ান। দুজনের ইতিহাস গড়া ২২৪ রানের পার্টনারশিপের গল্পে জয়ের সঙ্গে স্বপ্নের সেমিফাইনালের টিকিট কাটে বাংলাদেশ। সাকিবের ব্যাট ছুঁয়ে আসে ১১৪ রানের চমৎকার ইনিংস। আর মাহমুদউল্লাহ খেলেন হার না মানা ১০২ রানের ইনিংস।

শেষ চারে ভারতের বিপক্ষে ফের হতাশার গল্প লেখেন বোলাররা। তামিম-মুশফিকের জোড়া অর্ধশতকে ৭ উইকেটে ২৬৪ রানের পুঁজি গড়ে বাংলাদেশ। জবাবে রোহিত শর্মা হাঁকান সেঞ্চুরি। আর বিরাট কোহলি অপরাজিত থেকে যান ৯৬ রানে। তাতেই ৯ উইকেটের হারে বাংলাদেশের ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায়।

চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে বাংলাদেশ

আসর: ৫

ম্যাচ: ১২

জয়: ২

হার: ৯

নো রেজাল্ট : ১

সেরা সাফল্য: সেমিফাইনাল, ২০১৭।

বাংলাদেশের দুই জয়

১৩ অক্টোবর, ২০০৬

বাংলাদেশ: ২৩১/৬, ৫০ ওভার (নাফিস ১২৩*; রেইনফোর্ড ২/৪১)।

জিম্বাবুয়ে : ১৩০, ৪৪.৪ ওভার (টেলর ৫২; সাকিব ৩/১৮)।

ফল: বাংলাদেশ ১০১ রানে জয়ী।

ম্যাচসেরা: শাহরিয়ার নাফিস।

৯ জুন, ২০১৭, গ্রুপ পর্ব

নিউজিল্যান্ড: ২৬৫/৮, ৫০ ওভার (রস টেলর ৬৩; মোসাদ্দেক ৩/১৩)।

বাংলাদেশ: ২৬৮/৫, ৪৭.২ ওভার (সাকিব ১১৪, মাহমুদউল্লাহ ১০২*; সাউদি ৩/৪৫)।

ফল: বাংলাদেশ ৫ উইকেটে জয়ী।

ম্যাচসেরা: সাকিব আল হাসান।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন