দল জিতল, ‘জিতলেন’ কোচ বাটলারও
২০২৫ সালের শুরুর দিকের কথা। দ্বিতীয়বারের মতো সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে দেশে ফেরে নারী ফুটবল দল। দেশে ফিরেই তাদের মধ্যে অসন্তোষের শুরু। যার নেপথ্যে ছিলেন সিনিয়র কয়েকজন খেলোয়াড়, কেন্দ্রবিন্দুতে কোচ পিটার বাটলার। ধীরে ধীরে বিদ্রোহ চরম আকার ধারণ করে। তৎকালীন অধিনায়ক সাবিনা খাতুনের নেতৃত্বে ১৭ জন ফুটবলার নাম লেখান বিদ্রোহের তালিকায়। পরে এই বিদ্রোহের প্রভাব ফুটবল পাড়া থেকে শুরু করে দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। বিদ্রোহের সারমর্ম দাঁড়ায় ‘হয় কোচ নতুবা আমরা’।
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) একটা ঝুঁকি নেয়। তারা কোচকেই বেছে নেয়। ১৭ জন বিদ্রোহী ফুটবলারের লিখিত অভিযোগ, হুমকি, নারীবাদীদের চোখ রাঙানি, কিছু শীর্ষস্থানীয় মিডিয়ার কলমের তীক্ষ্ণ খোঁচা হজম করে ইংলিশ ম্যান বাটলারেই আস্থা রাখে দেশের ফুটবলের অভিভাবক সংস্থা। এই পরিস্থিতিতে আরো একজন লোক বিন্দুমাত্র বিচলিত ছিলেন না, তিনি বাটলার নিজে। তিনি কেবল লাল-সবুজের ফুটবলে জাগরণের স্বপ্ন দেখছিলেন। সেটা যে এত দ্রুত ধরা দেবে কে জানতো!
২ জুলাই, ২০২৫। এএফসি এশিয়ান কাপের বাছাই পর্বের ম্যাচে মিয়ানমারকে ২-১ গোলে হারিয়ে মূল মঞ্চে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ। চারদিকে বাঘিনী কন্যাদের কীর্তিগাথার গল্প। অসাধ্যকে সাধন করে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখানোর অজস্র মহাকাব্যিক উপাখ্যান। অথচ আসল মানুষটা আড়ালে! পাঁচ মাস আগে এই বাটলারই যদি দায়িত্ব ছেড়ে দিতেন, লাল-সবুজের ফুটবলে ইংলিশ নিয়মকানুনের বালাই বেঁধে না দিতেন, ক্যাম্পে দেদার ওজন বাড়িয়ে চলা সিনিয়র ডিফেন্ডারকে পরামর্শ না দিতেন কিংবা ফাইনাল থার্ডে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়া ফরোয়ার্ডকে কঠিন ভাষায় কথা না শোনাতেন; তবে কী হতো?
কী হতো সেই উত্তর জানতে হলে ইংলিশ ফুটবলের চিরাচরিত নিয়মে প্রবেশ করতে হবে, যেখানে নিয়মানুবর্তিতা, পরিশ্রম কিংবা ত্যাগের সঙ্গে কোনো আপস চলে না। সেই পরিবেশে বেড়ে ওঠা বাটলার কীভাবে এশিয়ান কাপের মাত্র ১০-১১ মাস আগে খেলোয়াড়দের নিয়মের বাইরে চলতে দেন? দেননি বলেই সেই বিদ্রোহ আর আজকের এই সাফল্য, বাংলাদেশের নারী ফুটবলের পালে বসন্তের দীঘল বাতাস, খুলে গেল বিশ্বকাপে আর অলিম্পিক খেলার সম্ভাবনার দুয়ার।
বাটলার উত্তাল সমুদ্রের ভীষণ ঝড়ে নাবিকের মতো হাল ধরেছেন। সিনিয়রদের একপাশে রেখে মাত্র ১৩ জন উদ্যমী তরুণীকে নিয়ে শুরু করে দিয়েছিলেন এশিয়ান কাপের যাত্রা। এই যাত্রায় প্রথমে ধাক্কা ছিল অনিবার্য। তবু সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে হার, জর্ডান এবং ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে ড্র করেও পেছনে ফিরে তাকাননি। একের পর এক ইট গেঁথে গেছেন সাফল্যের ইমারত নির্মাণে। ফল পেলেন হাতেনাতে, ৩৬ ধাপ এগিয়ে থাকা বাহরাইনকে ৭-০ গোলে হারানোর পর ৭৩ ধাপ এগিয়ে থাকা মিয়ানমারকে ২-১ গোলে হারানো যেন বাটলারের প্রতিশ্রুতিরই প্রতিফলন।
বাটলার আগেই জানিয়েছিলেন, ‘আমার পরিকল্পনা আগামী দিনের জন্য।’ সেই ‘আগামী দিন’ সম্ভবত এসে গেছে। মাঠের খেলায় শৃঙ্খলা, ফিটনেস ও পজিশনিং। বাজপাখির মতো বল কেড়ে নেওয়া, হাই লাইন ডিফেন্স এবং কাউন্টার অ্যাটাকে দ্রুত সাড়া দেওয়ার মতো ইউরোপিয়ান ধাঁচের ফুটবল; এ যেন স্বপ্নিল আগামীরই প্রতিচ্ছবি। যে প্রতিচ্ছবিতে ফুটে উঠেছে ইতিহাসের নতুন এক অধ্যায়। বাটলার যে অধ্যায়ের স্বপ্ন এঁকে যাওয়া পথপ্রদর্শক।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

