যত দিন গড়াচ্ছে, চলমান বিশ্বকাপে রেফারিং নিয়ে বিতর্ক ততই যেন ডালপালা মেলছে। বিশেষ করে নকআউট পর্বের শুরু থেকে ফুটবল বিশ্বের সব আলোচনা ও সমালোচনা ঘুরপাক খাচ্ছে লাল কার্ডের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। কোয়ার্টার ফাইনালের আগপর্যন্ত নকআউট পর্বে লাল কার্ড দেখেছেন দুজন খেলোয়াড়। কিন্তু এরপর দুজনের ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেছে সম্পূর্ণ বিপরীত দুই দিকে। একজন ফিফার বিশেষ ক্ষমায় পার পেয়ে মাঠে নেমে পড়েছেন, আর অন্যজনকে নিষিদ্ধ হতে হয়েছে দুই ম্যাচের জন্য। একই অপরাধে ফিফার এই দ্বৈত নীতি ও দ্বিমুখী আচরণ নিয়ে এখন ফুটবল অঙ্গনে বইছে বিতর্কের ঝড়।
বিতর্কের সূত্রপাত শেষ ৩২-এর ম্যাচে, যেখানে মুখোমুখি হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও বসনিয়া। সেই খেলায় বসনিয়ার এক খেলোয়াড়ের গোড়ালিতে আঘাত করায় সরাসরি লাল কার্ড দেখেন যুক্তরাষ্ট্রের তারকা ফোলারিন বালোগান। ফিফার সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, পরবর্তী অর্থাৎ শেষ ষোলোর গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তার মাঠের বাইরে থাকার কথা ছিল। তার আগে একই ধরনের ফাউল করলেও লিওনেল মেসিকে হলুদ কার্ডও দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি।
কিন্তু ঠিক এই জায়গাতেই দৃশ্যপটে আসে নাটকীয় পরিবর্তন। লাল কার্ডের বিরুদ্ধে ফিফার কাছে আপিল করে যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল ফেডারেশন। আর এই আপিলকে সফল করতে মাঠের বাইরে থেকে যুক্ত হয় সর্বোচ্চ রাজনৈতিক চাপ।
বালোগানের লাল কার্ড বাতিলের জন্য হোয়াইট হাউস থেকে স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি ফোন দেন ফিফা সভাপতিকে। এর পরপরই যেন জাদুর মতো বদলে যায় দৃশ্যপট। ফিফা তড়িঘড়ি করে জানিয়ে দেয়, লাল কার্ড দেখলেও পরবর্তী ম্যাচে বালোগানের খেলতে কোনো বাধা নেই। ফলে শেষ ষোলোতে বেলজিয়ামের বিপক্ষে মাঠে নামেন তিনি।
ফিফা এই সিদ্ধান্ত বৈধ করতে নিজেদের আচরণবিধির ২৭ নম্বর ধারা ব্যবহার করে। এই ধারায় স্পষ্ট বলা আছে, ‘কমিটির সবাই যদি একমত হয়, তবে যেকোনো শাস্তি এক বছরের জন্য স্থগিত করতে পারবে।’
এই নিয়ম খাটিয়ে বালোগানের শাস্তি এক বছরের জন্য স্থগিত করা হয়। তবে শর্ত থাকে যে, এই সময়ের মধ্যে তিনি যদি একই ধরনের আচরণ করেন বা আবারও লাল কার্ড দেখেন, তবে তার জন্য অপেক্ষা করবে আরও বড় ও কঠোর শাস্তি।
যুক্তরাষ্ট্র যখন ফিফার নিয়মের ফাঁক গলে পার পেয়ে উল্লাস করছে, ঠিক তখনই মুদ্রার নিষ্ঠুর উল্টো পিঠ দেখতে হয় ইংল্যান্ডকে। শেষ ষোলোর ম্যাচে মেক্সিকোর বিপক্ষে লাল কার্ড দেখেন ইংলিশ ডিফেন্ডার জ্যারেল কোয়ানসা। মেক্সিকান খেলোয়াড়ের পা মাড়িয়ে দেওয়ার কারণে ভিএআর দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর রেফারি তাকে লাল কার্ড দেখান।
মজার ব্যাপার হলো, যেদিন রাতেই বালোগানের লাল কার্ড বাতিল করেছিল ফিফা, সেদিনই কোয়ানসা এই শাস্তি পান। বিষয়টি নিয়ে ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেল কিছুটা রসিকতা করে বলেছিলেন, 'হ্যারি কেইনকে বলব ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলতে। যাতে কোয়ানসার লাল কার্ডটাও বাতিল করা হয়।
টুখেলের রসিকতার বাইরেও ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন আনুষ্ঠানিকভাবে কোয়ানসার লাল কার্ডের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য ফিফার কাছে আপিল করেছিল। তারা আশা করেছিল, যুক্তরাষ্ট্রের মতো তাদের ক্ষেত্রেও হয়তো ২৭ নম্বর ধারা ব্যবহার করা হবে। কিন্তু ফিফা ইংল্যান্ডের আবেদন তো গ্রহণ করেইনি, উল্টো ফাউলের ধরন ও তীব্রতা দেখে কোয়ানসার নিষেধাজ্ঞা এক ম্যাচ থেকে বাড়িয়ে দুই ম্যাচ করে দেয়।
একই মঞ্চ, একই ধরনের ফাউল এবং দুই ক্ষেত্রেই ভিএআর প্রযুক্তির সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ—তা সত্ত্বেও ডিসিপ্লিনারি কমিটির টেবিল থেকে দুই খেলোয়াড়ের জন্য এলো দুই রকম সিদ্ধান্ত। যেখানে মাঠে রেফারির নেওয়া সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করার পর ফিফার সুযোগ ছিল দুজনকে সমান চোখে দেখার, সেখানে তারা দেখাল স্পষ্ট বৈষম্য।
ফিফা সভাপতি প্রকাশ্যে রাজনৈতিক প্রভাবের কথা অস্বীকার করলেও, ফুটবলপ্রেমী ও বিশ্লেষকদের মনে প্রশ্নটা জোরালোভাবেই থেকে যাচ্ছে—স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফোনকলেই কি বদলে গেল ফিফার নিয়ম? নাকি একই দোষে এক দেশে মুক্তি আর অন্য দেশে শাস্তির এই ঘটনা নিছকই এক কাকতালীয় প্রহসন? বিশ্বকাপের মতো আসরে ফিফার এই দ্বৈত নীতি ফুটবলীয় নিরপেক্ষতাকেই বড় ধরনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিল।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

