হামজা ভালোমতোই পাস করলেন, দলের বাকিরা?

হামজা ভালোমতোই পাস করলেন, দলের বাকিরা?

ইংল্যান্ডের বিলাসবহুল জীবন থেকে তেঁতুলিয়ার মাটির ঘ্রাণ, প্রিমিয়ার লিগের জাঁকজমক থেকে মতিঝিলপাড়ার অনাড়ম্বর আয়োজন; হামজা দেওয়ান চৌধুরীর আগমন যেন বাংলাদেশ ফুটবলে বিস্ময়ের মতো। সে বিস্ময় ফুঁড়ে বের হলো আচানক প্রশ্নও, ‘হামজা কি এ পরীক্ষায় পাস করতে পারবেন?’

প্রতিপক্ষ ভারত, এশিয়ার ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি। বাংলাদেশের সঙ্গে যে কোনো ক্রীড়াক্ষেত্রেই তাদের দ্বৈরথ চিরকালীন। ফুটবলটা একটু বেশিই যেন। তাতে আলোর চেয়ে আঁধার বেশি, আনন্দের চেয়ে বিষাদ বেশি। এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে ভারতের ঘরের মাঠে খেলতে যাওয়া বাংলাদেশের এবারের পরিস্থিতিটা অবশ্য ভিন্ন ছিল। এর কারণ একজনইÑহামজা। আশার প্রদীপটা তাকে ঘিরেই জ্বলজ্বল করছিল।

বিজ্ঞাপন

নব্বই মিনিটের বারুদঠাসা লড়াই। ঝাঁজ ছড়াল শিলংয়ের গ্যালারি থেকে বাফুফের আর্টিফিশিয়াল টার্ফের বড় পর্দায়। তাতে বাদ গেল না কিছুই। আক্রমণ-পালটা আক্রমণ, গোল মিসের মহড়া, প্রতিপক্ষকে চেপে ধরা, শেষে এক পয়েন্ট নিয়ে ফেরা; সবই ছিল। সব ছাপিয়ে আলোটা কেড়ে নিলেন লাল-সবুজের জার্সিতে অভিষিক্ত হামজা । অগুনতি ভক্ত-সমর্থকদের প্রশ্নের উত্তরটা হামজা দিলেন বল পায়ে। তিনি পাস করেছেন, খুব ভালোভাবেই।

ম্যাচে হামজা খেলেছেন মাঝমাঠে। অথচ বিচরণ ছিল মৌমাছির মতো। উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন পুরো মাঠ। মাঝমাঠ থেকে দ্রুতগতির লং পাস দিয়েছেন, আচমকা উঠে গেছেন ডিফেন্সে, নিষ্ক্রিয় করেছেন প্রতিপক্ষের আক্রমণ। ছোঁ মেরে বল কেড়ে নিয়েছেন সুনীল ছেত্রীদের পা থেকে। শেফিল্ড ইউনাইটেড তারকা জয় করে নিয়েছেন ভক্ত-সমর্থকদের মন।

হামজা যখন একাই হয়ে উঠেছেন দশভূজা, বাকিরা তখন যোগ দিয়েছেন ব্যর্থতার মিছিলে। যে মিছিল হওয়ার কথা ছিল অন্তত দুই গোলের নিশ্চিত জয়ের। তাতে প্রশ্ন উঠছে, বাকিরা কি করলেন? খালি গোলপোস্ট পেয়েও বল জালে জড়াতে পারেননি মুজিবর রহমান জনি। হামজার ছুড়ে দেওয়া সুযোগ লুফে নিতে পারেননি ফাহিম ফয়সাল-রাকিব হোসেনরা।

ব্যর্থতার চিত্র মেলে ধরলে অশেষই থেকে যাবে। কিক অফের পরই হামজা লং পাস দিলেন জনিকে। কিন্তু তাল মেলাতে পারলেন বসুন্ধরা কিংসের স্ট্রাইকার। ভারতীয় গোলকিপার বিশাল কাইথ বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে তুলে দিলেন তার পায়েই! ফাঁকা পোস্ট পেয়েও জনি তিনকাঠির আয়তাকার ক্ষেত্রের মাপ যেন বুঝেই উঠলেন না!

এরপর শাকিল আহাদ তপুর ক্রসে ইমনের হেড গেল বাইরে। মোরসালিনের ক্রসে ঠিকঠাক মাথা লাগাতে ব্যর্থ ইমন। এত এত মিসের মধ্যেও প্রথমার্ধের বিরতির ঠিক আগে আরেকবার জনির মুখে খাবার তুলে দিতে চাইলেন ইমন। অথচ ভারত গোলকিপারকে একা পেয়েও জনি না করলেন চিপ, না নিলেন শট। বিস্ময়ে হতবাক সবাই!

পুরো ম্যাচের দৃশ্যপটে হামজা বাদে বাংলাদেশের মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগের বাকিদের অবস্থা ছিল এই! সুযোগের পর সুযোগ পেয়েও ইমন-ফাহিম-জনি ত্রয়ী নেমেছিলেন গোল মিসের মহড়ায়। ফলস নাম্বার নাইনে থেকে রাকিবও যে কিছুই করতে পারলেন না। মোরসালিন নিজের ছায়া হয়ে রইলেন পুরোটা সময়।


আরেকটা প্রশ্ন আসছে খুব জোরেশোরেই। পর্যাপ্ত বল হামজা পাননি কিংবা তাকে জোগান দেওয়া হয়নি। দলের বাকিরা কি করলেন? এই প্রশ্নের উত্তরটা তারা অন্তত দিতে পারতেন হামজাকে সঠিকভাবে বলের জোগান দিয়ে। তাতে ৩ পয়েন্টও হয়তো পাওয়া যেত। যেহেতু সেটা হয়নি, দিনশেষে তাই ‘হয়তো, যদি, কিন্তু’র বৃত্তেই ঘুরপাক খায় বাংলাদেশ ফুটবল। আমাদের কেবল দীর্ঘশ্বাস বাড়ে।

ফুটবল টিম গেম। এগারোজনের খেলা। একজন আলো ছড়ালে বাকিরা সেই আলোয় নিজেকে আলোকিত করে নেন। যেখানে আলোর উৎসের প্রতি খেয়াল রাখা জরুরি। যখন সেটা হয় না, সবাই একই বৃত্তে ঘুরপাক খায়, তখন হামজার মতো কেউ আলোকবর্তিকা হয়ে এলেও যা আঁধার তা তিমিরই রয়ে যায়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন